মতিউর রহমান
বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে গতানুগতিক আলোচনা সাধারণত নৈতিকতার সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে। আমরা দুর্নীতিকে দেখি কিছু অসৎ ব্যক্তি বা চারিত্রিকভাবে দুর্বল মানুষের ব্যক্তিগত বিচ্যুতি হিসেবে। এই ব্যাখ্যাটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, কারণ এতে দোষ চাপানো যায় নির্দিষ্ট কয়েকজনের ওপর, কঠোর শাস্তির দাবি তোলা যায় এবং এমন একটি মোহ তৈরি করা যায় যে, কেবল নৈতিকতা ফিরিয়ে আনলেই দুর্নীতি নির্মূল হবে।
বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে গতানুগতিক আলোচনা সাধারণত নৈতিকতার সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে। আমরা দুর্নীতিকে দেখি কিছু অসৎ ব্যক্তি বা চারিত্রিকভাবে দুর্বল মানুষের ব্যক্তিগত বিচ্যুতি হিসেবে। এই ব্যাখ্যাটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, কারণ এতে দোষ চাপানো যায় নির্দিষ্ট কয়েকজনের ওপর, কঠোর শাস্তির দাবি তোলা যায় এবং এমন একটি মোহ তৈরি করা যায় যে, কেবল নৈতিকতা ফিরিয়ে আনলেই দুর্নীতি নির্মূল হবে। কিন্তু যুগের পর যুগ আইন সংস্কার, দুর্নীতি দমন অভিযান এবং নৈতিক প্রচারণার পরেও কেন দুর্নীতি একইভাবে টিকে আছে?
কিন্তু যুগের পর যুগ আইন সংস্কার, দুর্নীতি দমন অভিযান এবং নৈতিক প্রচারণার পরেও কেন দুর্নীতি একইভাবে টিকে আছে? এই স্থায়িত্বই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে দুর্নীতি কেবল ব্যক্তিগত নৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি গভীরভাবে প্রোথিত সামাজিক ব্যবস্থা।
দুর্নীতিকে একটি সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখার অর্থ একে বৈধতা দেয়া নয়; বরং এটি স্বীকার করা যে, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও অনানুষ্ঠানিক লেনদেন আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক অসাম্যের ভেতরে নিয়মিত ও কাঠামোগতভাবে কাজ করে। প্রখ্যাত ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুরদ্যু-এর ‘হ্যাবিটাস’ তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, দুর্নীতি এখানে একটি ‘সামাজিক অভ্যাস’ বা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
যখন দুর্নীতি ব্যত্যয় না হয়ে নিয়মে পরিণত হয়, তখন তা ব্যক্তিগত অসততার চেয়ে শাসনব্যবস্থার একধরনের বিকল্প পদ্ধতিতে রূপ নেয়। প্রখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট কে. মার্টন তার ‘স্ট্রেইন থিওরি’-তে দেখিয়েছিলেন যে, যখন সমাজ স্বীকৃত লক্ষ্য (যেমন- আর্থিক নিরাপত্তা বা সামাজিক মর্যাদা) অর্জনের বৈধ পথগুলো রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন মানুষ লক্ষ্য অর্জনে অবৈধ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেকেই দুর্নীতিতে জড়ান নৈতিকতার অভাবে নয়, বরং এই ব্যবস্থার বাইরে থাকলে বঞ্চনা বা শাস্তির মুখে পড়তে হয় বলেই।
বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থাগত দুর্নীতির মূলে রয়েছে এ দেশের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ঐতিহাসিক বিবর্তন। দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল শাসনকার্য পরিচালনা এবং সম্পদ আহরণ, নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা নয়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের পরিধি ও দায়িত্ব ব্যাপক হারে বাড়লেও সেই অনুপাতে প্রশাসনিক সংস্কার সাধিত হয়নি। ফলে জন্ম নিয়েছে এক জটিল ও অতি-ক্ষমতাকেন্দ্রিক আমলাতন্ত্র, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর, অস্বচ্ছ এবং অস্পষ্ট।
এই পরিস্থিতিতে ঘুষ অনেক সময় ‘কাজের চাকা সচল করার তেল’ বা ‘স্পিড মানি’ হিসেবে কাজ করে। এখানে দুর্নীতি ব্যক্তিগত লোভ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতার বিপরীতে একধরনের বিকৃত প্রতিক্রিয়া। নাগরিক যখন দেখেন যে স্বাভাবিক পথে আবেদন করলে মাস গড়িয়ে যায়, কিন্তু অনানুষ্ঠানিক লেনদেনে কাজ হয় সাত দিনে, তখন তিনি দুর্নীতির ব্যবস্থার অংশ হতে বাধ্য হন।
সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্নীতির অভিজ্ঞতা প্রায়ই বড় অংকের অর্থ আত্মসাৎ নয়, বরং ছোট ছোট কিন্তু অনিবার্য লেনদেনের মাধ্যমে ঘটে। জমির দলিল সংশোধন, হাসপাতালে শয্যা পাওয়া, বিদ্যুৎ সংযোগ কিংবা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা-এসব ক্ষেত্রেই ‘অতিরিক্ত’ অর্থ ছাড়া কাজ এগোয় না। এই লেনদেনগুলোকে অনেকেই এখন আর অপরাধ হিসেবে দেখেন না, বরং সেবার ‘অঘোষিত মূল্য’ হিসেবে মেনে নেন।
এভাবে নাগরিক অধিকার ধীরে ধীরে ‘পণ্য’ হয়ে ওঠে, যা বাজারে দর-কষাকষির মাধ্যমে কিনতে হয়। সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ভেবার যে নৈর্ব্যক্তিক ও আইনানুগ আমলাতন্ত্রের কথা বলেছিলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতা তার ঠিক উল্টো। এখানে আইন সবার জন্য সমান হওয়ার বদলে ‘কার কত টাকা বা ক্ষমতা আছে’-তার ওপর ভিত্তি করে অধিকার নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোও দুর্নীতিকে একটি ব্যবস্থায় রূপ দিয়েছে। আমাদের রাজনীতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে। বিনিময়ে ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রের সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা এসব নেটওয়ার্কের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
এতে সরকারি দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত স্বার্থের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। সমাজতাত্ত্বিক জেমস স্কট দুর্নীতির এই রূপকে ‘পলিটিক্যাল ক্লায়েন্টালিজম’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এখানে দুর্নীতি কেবল ব্যক্তিগত লোভ নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি অপরিহার্য কৌশল। যখন একজন রাজনৈতিক কর্মী জানেন যে তার পদ-পদবি ও নিরাপত্তা নির্ভর করছে ওপরতলায় অর্থ পৌঁছানোর ওপর, তখন তিনি সেই ব্যবস্থার সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠেন।
সরকারি চাকরির কাঠামোও এই ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বেতন কাঠামো, সামাজিক প্রত্যাশা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে বিশাল অসামঞ্জস্য থাকে। বৈধ পথে আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন যখন অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন অনানুষ্ঠানিক আয়ের পথ ‘স্বাভাবিক’ সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এই ব্যবস্থায় যারা সৎ থাকতে চান, তারা প্রায়ই কোণঠাসা হয়ে পড়েন। তারা বদলি, পদোন্নতিতে বঞ্চনা কিংবা সহকর্মীদের কাছ থেকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হন। এটি এক ধরনের ‘নেতিবাচক নির্বাচন’ প্রক্রিয়া তৈরি করে, যেখানে সৎ মানুষ ব্যবস্থার চাপে নুইয়ে পড়ে অথবা ব্যবস্থা থেকে ছিটকে যায়।
এই ব্যবস্থা সাংস্কৃতিকভাবেও পুনরুৎপাদিত হয়। নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা যখন কর্মস্থলে যোগ দেন, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আইন শিখলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে শেখেন ‘সিস্টেম’ কীভাবে কাজ করে। অভিজ্ঞ সহকর্মীদের কাছ থেকে তারা শিখে নেন কীভাবে ফাইল সরাতে হয় বা অডিট ফাঁকি দিতে হয়।
ধীরে ধীরে দুর্নীতি একটি নৈতিকভাবে ধূসর এলাকায় পরিণত হয়। মানুষ প্রকাশ্যে দুর্নীতির নিন্দা করে, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে ‘অন্য উপায় নেই’ বলে তাতে অংশ নেয়। এটি কোনো নৈতিক ভণ্ডামি নয়; বরং এক ধরনের বেঁচে থাকার কৌশল। বিশেষ করে উচ্চ অসমতার সমাজে দরিদ্র মানুষকে অধিকার আদায়ের জন্য এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই পথ চলতে হয়।
বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানগুলো প্রায়ই ব্যর্থ হয় কারণ সেগুলো কেবল ‘লক্ষণ’ নিয়ে কাজ করে, ‘কারণ’ নিয়ে নয়। আইন বা জেল-জরিমানা দুর্নীতিকে ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে, কিন্তু সেই প্রণোদনাগুলো বদলায় না যেগুলো দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখে। ফলে মানুষের মধ্যে একধরনের গভীর হতাশা তৈরি হয়। মানুষ দুর্নীতিকে সমাধানযোগ্য সমস্যা নয়, বরং নিয়তির অংশ হিসেবে মেনে নিতে শেখে।
দুর্নীতি যদি একটি সামাজিক ব্যবস্থা হয়, তবে তার সমাধান কেবল কয়েকজন ব্যক্তির শাস্তি নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক ও সামষ্টিক সংস্কার। নৈতিক আহ্বান জরুরি, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। আমাদের প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে। যখন মানুষ রাষ্ট্রকে নিজের শত্রু বা দূরের কিছু মনে করে, তখন তারা অনানুষ্ঠানিক পথই বেছে নেয়। ডিজিটাল সেবার প্রসার (যেমন- ই-মিউটেশন বা অনলাইন পাসপোর্ট) কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমিয়ে থাকলেও প্রযুক্তি একা রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না।
সততাকে পুরস্কৃত করা এবং অসততাকে ব্যয়বহুল করা-এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো দুর্নীতিকে কেবল নৈতিক বিপর্যয় হিসেবে নয়, একটি কাঠামোগত বাস্তব হিসেবে তুলে ধরা।
পরিশেষে, দুর্নীতিকে শুধু নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে আমরা ক্ষমতা, বৈষম্য ও শাসনব্যবস্থার গভীর সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাই। বাংলাদেশের দুর্নীতির স্থায়িত্ব প্রমাণ করে যে এই সরল ব্যাখ্যা আর কার্যকর নয়। দুর্নীতি যদি একটি সামাজিক ব্যবস্থা হয়, তবে তার সংস্কারও হতে হবে আমূল ও কাঠামোগত। এতে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা অস্বীকার করা হয় না, বরং স্বীকার করা হয় যে একজন মানুষ তখনই সৎ থাকতে পারে, যখন তার চারপাশের পরিবেশ ও ব্যবস্থা তাকে সৎ থাকার জন্য সহায়তা করে। যতদিন সেই অবকাঠামো গড়ে না উঠবে, ততদিন দুর্নীতি থাকবে-নৈতিকতার অভাবে নয়, বরং ব্যবস্থার চাপে।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতিউর রহমান
রোববার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে গতানুগতিক আলোচনা সাধারণত নৈতিকতার সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে। আমরা দুর্নীতিকে দেখি কিছু অসৎ ব্যক্তি বা চারিত্রিকভাবে দুর্বল মানুষের ব্যক্তিগত বিচ্যুতি হিসেবে। এই ব্যাখ্যাটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, কারণ এতে দোষ চাপানো যায় নির্দিষ্ট কয়েকজনের ওপর, কঠোর শাস্তির দাবি তোলা যায় এবং এমন একটি মোহ তৈরি করা যায় যে, কেবল নৈতিকতা ফিরিয়ে আনলেই দুর্নীতি নির্মূল হবে।
বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে গতানুগতিক আলোচনা সাধারণত নৈতিকতার সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে। আমরা দুর্নীতিকে দেখি কিছু অসৎ ব্যক্তি বা চারিত্রিকভাবে দুর্বল মানুষের ব্যক্তিগত বিচ্যুতি হিসেবে। এই ব্যাখ্যাটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, কারণ এতে দোষ চাপানো যায় নির্দিষ্ট কয়েকজনের ওপর, কঠোর শাস্তির দাবি তোলা যায় এবং এমন একটি মোহ তৈরি করা যায় যে, কেবল নৈতিকতা ফিরিয়ে আনলেই দুর্নীতি নির্মূল হবে। কিন্তু যুগের পর যুগ আইন সংস্কার, দুর্নীতি দমন অভিযান এবং নৈতিক প্রচারণার পরেও কেন দুর্নীতি একইভাবে টিকে আছে?
কিন্তু যুগের পর যুগ আইন সংস্কার, দুর্নীতি দমন অভিযান এবং নৈতিক প্রচারণার পরেও কেন দুর্নীতি একইভাবে টিকে আছে? এই স্থায়িত্বই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে দুর্নীতি কেবল ব্যক্তিগত নৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি গভীরভাবে প্রোথিত সামাজিক ব্যবস্থা।
দুর্নীতিকে একটি সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখার অর্থ একে বৈধতা দেয়া নয়; বরং এটি স্বীকার করা যে, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও অনানুষ্ঠানিক লেনদেন আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক অসাম্যের ভেতরে নিয়মিত ও কাঠামোগতভাবে কাজ করে। প্রখ্যাত ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুরদ্যু-এর ‘হ্যাবিটাস’ তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, দুর্নীতি এখানে একটি ‘সামাজিক অভ্যাস’ বা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
যখন দুর্নীতি ব্যত্যয় না হয়ে নিয়মে পরিণত হয়, তখন তা ব্যক্তিগত অসততার চেয়ে শাসনব্যবস্থার একধরনের বিকল্প পদ্ধতিতে রূপ নেয়। প্রখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট কে. মার্টন তার ‘স্ট্রেইন থিওরি’-তে দেখিয়েছিলেন যে, যখন সমাজ স্বীকৃত লক্ষ্য (যেমন- আর্থিক নিরাপত্তা বা সামাজিক মর্যাদা) অর্জনের বৈধ পথগুলো রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন মানুষ লক্ষ্য অর্জনে অবৈধ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেকেই দুর্নীতিতে জড়ান নৈতিকতার অভাবে নয়, বরং এই ব্যবস্থার বাইরে থাকলে বঞ্চনা বা শাস্তির মুখে পড়তে হয় বলেই।
বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থাগত দুর্নীতির মূলে রয়েছে এ দেশের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ঐতিহাসিক বিবর্তন। দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল শাসনকার্য পরিচালনা এবং সম্পদ আহরণ, নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা নয়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের পরিধি ও দায়িত্ব ব্যাপক হারে বাড়লেও সেই অনুপাতে প্রশাসনিক সংস্কার সাধিত হয়নি। ফলে জন্ম নিয়েছে এক জটিল ও অতি-ক্ষমতাকেন্দ্রিক আমলাতন্ত্র, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর, অস্বচ্ছ এবং অস্পষ্ট।
এই পরিস্থিতিতে ঘুষ অনেক সময় ‘কাজের চাকা সচল করার তেল’ বা ‘স্পিড মানি’ হিসেবে কাজ করে। এখানে দুর্নীতি ব্যক্তিগত লোভ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতার বিপরীতে একধরনের বিকৃত প্রতিক্রিয়া। নাগরিক যখন দেখেন যে স্বাভাবিক পথে আবেদন করলে মাস গড়িয়ে যায়, কিন্তু অনানুষ্ঠানিক লেনদেনে কাজ হয় সাত দিনে, তখন তিনি দুর্নীতির ব্যবস্থার অংশ হতে বাধ্য হন।
সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্নীতির অভিজ্ঞতা প্রায়ই বড় অংকের অর্থ আত্মসাৎ নয়, বরং ছোট ছোট কিন্তু অনিবার্য লেনদেনের মাধ্যমে ঘটে। জমির দলিল সংশোধন, হাসপাতালে শয্যা পাওয়া, বিদ্যুৎ সংযোগ কিংবা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা-এসব ক্ষেত্রেই ‘অতিরিক্ত’ অর্থ ছাড়া কাজ এগোয় না। এই লেনদেনগুলোকে অনেকেই এখন আর অপরাধ হিসেবে দেখেন না, বরং সেবার ‘অঘোষিত মূল্য’ হিসেবে মেনে নেন।
এভাবে নাগরিক অধিকার ধীরে ধীরে ‘পণ্য’ হয়ে ওঠে, যা বাজারে দর-কষাকষির মাধ্যমে কিনতে হয়। সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ভেবার যে নৈর্ব্যক্তিক ও আইনানুগ আমলাতন্ত্রের কথা বলেছিলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতা তার ঠিক উল্টো। এখানে আইন সবার জন্য সমান হওয়ার বদলে ‘কার কত টাকা বা ক্ষমতা আছে’-তার ওপর ভিত্তি করে অধিকার নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোও দুর্নীতিকে একটি ব্যবস্থায় রূপ দিয়েছে। আমাদের রাজনীতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে। বিনিময়ে ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রের সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা এসব নেটওয়ার্কের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
এতে সরকারি দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত স্বার্থের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। সমাজতাত্ত্বিক জেমস স্কট দুর্নীতির এই রূপকে ‘পলিটিক্যাল ক্লায়েন্টালিজম’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এখানে দুর্নীতি কেবল ব্যক্তিগত লোভ নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি অপরিহার্য কৌশল। যখন একজন রাজনৈতিক কর্মী জানেন যে তার পদ-পদবি ও নিরাপত্তা নির্ভর করছে ওপরতলায় অর্থ পৌঁছানোর ওপর, তখন তিনি সেই ব্যবস্থার সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠেন।
সরকারি চাকরির কাঠামোও এই ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বেতন কাঠামো, সামাজিক প্রত্যাশা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে বিশাল অসামঞ্জস্য থাকে। বৈধ পথে আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন যখন অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন অনানুষ্ঠানিক আয়ের পথ ‘স্বাভাবিক’ সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এই ব্যবস্থায় যারা সৎ থাকতে চান, তারা প্রায়ই কোণঠাসা হয়ে পড়েন। তারা বদলি, পদোন্নতিতে বঞ্চনা কিংবা সহকর্মীদের কাছ থেকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হন। এটি এক ধরনের ‘নেতিবাচক নির্বাচন’ প্রক্রিয়া তৈরি করে, যেখানে সৎ মানুষ ব্যবস্থার চাপে নুইয়ে পড়ে অথবা ব্যবস্থা থেকে ছিটকে যায়।
এই ব্যবস্থা সাংস্কৃতিকভাবেও পুনরুৎপাদিত হয়। নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা যখন কর্মস্থলে যোগ দেন, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আইন শিখলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে শেখেন ‘সিস্টেম’ কীভাবে কাজ করে। অভিজ্ঞ সহকর্মীদের কাছ থেকে তারা শিখে নেন কীভাবে ফাইল সরাতে হয় বা অডিট ফাঁকি দিতে হয়।
ধীরে ধীরে দুর্নীতি একটি নৈতিকভাবে ধূসর এলাকায় পরিণত হয়। মানুষ প্রকাশ্যে দুর্নীতির নিন্দা করে, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে ‘অন্য উপায় নেই’ বলে তাতে অংশ নেয়। এটি কোনো নৈতিক ভণ্ডামি নয়; বরং এক ধরনের বেঁচে থাকার কৌশল। বিশেষ করে উচ্চ অসমতার সমাজে দরিদ্র মানুষকে অধিকার আদায়ের জন্য এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই পথ চলতে হয়।
বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানগুলো প্রায়ই ব্যর্থ হয় কারণ সেগুলো কেবল ‘লক্ষণ’ নিয়ে কাজ করে, ‘কারণ’ নিয়ে নয়। আইন বা জেল-জরিমানা দুর্নীতিকে ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে, কিন্তু সেই প্রণোদনাগুলো বদলায় না যেগুলো দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখে। ফলে মানুষের মধ্যে একধরনের গভীর হতাশা তৈরি হয়। মানুষ দুর্নীতিকে সমাধানযোগ্য সমস্যা নয়, বরং নিয়তির অংশ হিসেবে মেনে নিতে শেখে।
দুর্নীতি যদি একটি সামাজিক ব্যবস্থা হয়, তবে তার সমাধান কেবল কয়েকজন ব্যক্তির শাস্তি নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক ও সামষ্টিক সংস্কার। নৈতিক আহ্বান জরুরি, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। আমাদের প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে। যখন মানুষ রাষ্ট্রকে নিজের শত্রু বা দূরের কিছু মনে করে, তখন তারা অনানুষ্ঠানিক পথই বেছে নেয়। ডিজিটাল সেবার প্রসার (যেমন- ই-মিউটেশন বা অনলাইন পাসপোর্ট) কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমিয়ে থাকলেও প্রযুক্তি একা রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না।
সততাকে পুরস্কৃত করা এবং অসততাকে ব্যয়বহুল করা-এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো দুর্নীতিকে কেবল নৈতিক বিপর্যয় হিসেবে নয়, একটি কাঠামোগত বাস্তব হিসেবে তুলে ধরা।
পরিশেষে, দুর্নীতিকে শুধু নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে আমরা ক্ষমতা, বৈষম্য ও শাসনব্যবস্থার গভীর সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাই। বাংলাদেশের দুর্নীতির স্থায়িত্ব প্রমাণ করে যে এই সরল ব্যাখ্যা আর কার্যকর নয়। দুর্নীতি যদি একটি সামাজিক ব্যবস্থা হয়, তবে তার সংস্কারও হতে হবে আমূল ও কাঠামোগত। এতে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা অস্বীকার করা হয় না, বরং স্বীকার করা হয় যে একজন মানুষ তখনই সৎ থাকতে পারে, যখন তার চারপাশের পরিবেশ ও ব্যবস্থা তাকে সৎ থাকার জন্য সহায়তা করে। যতদিন সেই অবকাঠামো গড়ে না উঠবে, ততদিন দুর্নীতি থাকবে-নৈতিকতার অভাবে নয়, বরং ব্যবস্থার চাপে।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]