alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

অপরাধ দমন না অধিকার সুরক্ষা?

জাহাঙ্গীর আলম সরকার

: রোববার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

একটি রাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা শুধু অপরাধ দমন ও শাস্তি প্রদানের একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের নৈতিক চেতনা, রাজনৈতিক দর্শন এবং আইনের শাসনের প্রতি তার বাস্তব অঙ্গীকারের প্রতিফলন। রাষ্ট্র কীভাবে অপরাধ মোকাবিলা করে, তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই প্রক্রিয়ায় নাগরিকের স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা এবং সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকে। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি শুধু কঠোর শাস্তিতে নয়, বরং ন্যায়সংগত ও মানবিক বিচারপ্রক্রিয়ায় নিহিত।

ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অপরাধ দমনের নামে যখন রাষ্ট্র সীমাহীন ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে, তখন তা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ভয়, নিপীড়ন ও স্বেচ্ছাচারের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। বিচারহীন গ্রেপ্তার, নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আইনের অপপ্রয়োগ—এসবই শেষ পর্যন্ত নাগরিক আস্থাকে ভেঙে দিয়েছে এবং রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে দুর্বল করেছে। ফলে অপরাধ দমন যদি মানবাধিকার উপেক্ষা করে পরিচালিত হয়, তবে তা সমাজে শৃঙ্খলা নয়, বরং অনিশ্চয়তা ও অবিচারের পরিবেশ সৃষ্টি করে।

এই প্রেক্ষাপটে ?রাষ্ট্র বনাম নাগরিক’ দ্বন্দ্ব শুধু একটি আইনগত বা প্রশাসনিক টানাপোড়েন নয়; এটি মূলত একটি গভীর নৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা এবং নাগরিকের অধিকার সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় স্থাপন করা হবে—এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে একটি রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী নাকি কর্তৃত্ববাদী পথে অগ্রসর হচ্ছে। অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সেই দমন যদি নাগরিক স্বাধীনতার বিনিময়ে হয়, তবে তা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। কাজেই, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও মানবাধিকার সুরক্ষার মধ্যকার এই সূক্ষ¥ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা নির্ণয় করা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই প্রবন্ধে ‘রাষ্ট্র বনাম নাগরিক: অপরাধ দমন নাকি অধিকার সুরক্ষা’ প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কাঠামো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার বাস্তবতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হবে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রাষ্ট্রের শক্তির প্রতীক হলেও তারা সেই শক্তির মালিক নয়। তারা আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত দায়িত্বশীল মাধ্যম মাত্র। সংবিধান নাগরিককে অপরাধী হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে দেখে—যার জীবন, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়, বরং জন্মগত অধিকার। কিন্তু বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়, অপরাধ দমনের তাড়নায় রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। সন্দেহভাজন নাগরিক মাত্রই অধিকারহীন হয়ে পড়ে, আর তদন্তের সুবিধা ন্যায়বিচারের চেয়ে প্রাধান্য পায়।

রাষ্ট্রের অপরাধ দমন ক্ষমতা অস্বীকারযোগ্য নয়। সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষা, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রকে পুলিশ, তদন্ত সংস্থা ও ফৌজদারি আইন প্রয়োগের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে এই ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায্য হয়ে ওঠে না। আইনের শাসনের মূল দর্শন হলো—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সীমাবদ্ধ, নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক হবে। অপরাধ দমনের নামে সীমাহীন ক্ষমতা প্রয়োগ হলে সেটিই নাগরিক স্বাধীনতার প্রধান হুমকিতে পরিণত হয়।

নাগরিক অধিকার কোনো রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহ নয়; এটি সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধান ব্যক্তিস্বাধীনতা, জীবনের অধিকার, ন্যায্য বিচারের অধিকার এবং নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকার অধিকার নিশ্চিত করেছে। এই অধিকারগুলোই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণ করে। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় এই সীমারেখা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার মুখে পড়ে—গ্রেপ্তার, রিমান্ড, হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ, মামলা দায়ের ও বিচার প্রক্রিয়ায়। প্রতিটি ধাপে নাগরিক অধিকার ক্ষুণœ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

প্রচলিত যুক্তি হলো—অপরাধ দমন জোরদার করতে হলে কিছু অধিকার সাময়িকভাবে শিথিল করা প্রয়োজন। তবে এটি বিপজ্জনক বিভ্রান্তি। প্রকৃতপক্ষে অপরাধ দমন ও অধিকার সুরক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। যেখানে অধিকার সুরক্ষা নেই, সেখানে অপরাধ দমনও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয় না। নির্যাতন, বেআইনি গ্রেপ্তার বা জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘সাফল্য’ শেষ পর্যন্ত বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় অপরাধ দমনের নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ প্রায়ই নাগরিক অধিকারের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। বেআইনি গ্রেপ্তার, দীর্ঘ রিমান্ড, হেফাজতে নির্যাতন, মামলা দিয়ে হয়রানি—এসব চর্চা ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত করে। বিশেষত দরিদ্র, প্রান্তিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল নাগরিকেরা এই ক্ষমতার ভারসাম্যহীন প্রয়োগের প্রধান ভুক্তভোগী। ফলে ?আইনের শাসন’ ধারণা অনেকের কাছে কেবল স্লোগান হয়ে পড়ে।

দ্বন্দ্ব নিরসনে বিচার বিভাগের ভূমিকা অপরিহার্য। আদালতই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর শেষ আশ্রয়স্থল। গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিচারিক নজরদারি জোরদার না হলে নাগরিক অধিকার কার্যত সুরক্ষিত থাকে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্যকর শাস্তি ও স্বচ্ছ তদন্ত ব্যবস্থা ছাড়া অধিকার সুরক্ষা কেবল নীতিগত ঘোষণা হয়ে থাকে।

ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় সংস্কার মানে শুধু নতুন আইন প্রণয়ন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দর্শন পুনর্বিবেচনা করা। অপরাধ দমন যদি রাষ্ট্রের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়, নাগরিক অধিকার স্বাভাবিকভাবেই গৌণ হয়ে পড়ে। অথচ একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে অপরাধ দমন নিজেই অধিকার সুরক্ষার একটি উপায়-লক্ষ্য নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ছাড়া আইন সংস্কার অর্থহীন।

?রাষ্ট্র বনাম নাগরিক’ প্রশ্নটি আদতে কোনো খালি দ্বন্দ্ব নয়, যেখানে একপক্ষের শক্তি বৃদ্ধির অর্থ অপর পক্ষের দুর্বলতা। অপরাধ দমন ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষা—এই দুই লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি অন্যটির শর্ত ও পরিপূরক। প্রকৃত দ্বন্দ্ব তখনই জন্ম নেয়, যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ন্যায়বিচার ও সংবিধানিক সীমারেখা অতিক্রম করে, আর অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা ক্ষমতার অপব্যবহারকে বৈধতা দেয়ার অজুহাতে পরিণত হয়।

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রভা-ার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোরতা কিংবা বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন আইনের বিস্তারে নয়; বরং সেই শক্তি নিহিত থাকে নাগরিকের আস্থা, বিচারব্যবস্থার নৈতিক দৃঢ়তা এবং আইনের শাসনের প্রতি রাষ্ট্রের অবিচল ও আন্তরিক অঙ্গীকারে। রাষ্ট্র যখন নাগরিককে অধিকারহীন সন্দেহভাজন হিসেবে নয়, বরং সংবিধানস্বীকৃত মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করে, তখনই অপরাধ দমন নৈতিক বৈধতা অর্জন করে।

ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় এই দ্বন্দ্ব গ্রেপ্তার, রিমান্ড, বিচার-পূর্ব আটক ও বিশেষ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট। রাষ্ট্র যদি সংবিধান, মানবাধিকার ও বিচারিক নজরদারির সীমা মেনে চলে, নাগরিক রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়, বরং আইনের অংশীদার হয়। অন্যথায়, রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক শক্তি হিসেবে প্রতিভাত হয়।

ন্যায়বিচারের প্রকৃত প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব, যখন ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হয়, যেখানে অপরাধ দমন নাগরিক অধিকার ক্ষুণœ করে নয়, বরং অধিকার সুরক্ষার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি জবাবদিহিমূলক ও মানবিক পুলিশিং ব্যবস্থা, স্বাধীন ও কার্যকর বিচারিক তত্ত্বাবধান, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়া এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রতি রাষ্ট্রের শূন্য সহনশীল নীতি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা যত শক্তিশালী হবে, ততটাই শক্তিশালী হতে হবে তাদের দায়বদ্ধতা ও নৈতিক মানদ-।

রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক কখনোই শাসক ও অধীনস্তের বৈরী সম্পর্ক হতে পারে না; বরং তা হওয়া উচিত দায়িত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক চুক্তি। যে রাষ্ট্র নাগরিকের ভয়কে শাসনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, সে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়ে; আর যে রাষ্ট্র ন্যায়বিচারকে শাসনের ভিত্তি করে তোলে, সে রাষ্ট্রই টেকসই শক্তির অধিকারী হয়। অপরাধ দমন তখনই কার্যকর ও ন্যায্য হয়, যখন তা মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের সীমার ভেতরে পরিচালিত হয়।

ফলে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা যদি দমনের যন্ত্রে পরিণত হয়, তবে তা সমাজে ন্যায়বিচার নয়, বরং অবিশ্বাস ও ভয়ের সংস্কৃতি জন্ম দেয়। কিন্তু যখন এই ব্যবস্থা ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও অধিকারবান্ধব কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই তা নাগরিক স্বাধীনতার রক্ষাকবচ এবং অপরাধ দমনের শক্তিশালী হাতিয়ারে রূপ নেয়। এই নীতিগত উপলব্ধিই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার রাষ্ট্রের শক্তি কমায় না, বরং তাকে নৈতিকভাবে আরও দৃঢ় ও স্থিতিশীল করে তোলে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: আইনজীবী]

গুরু রবিদাস: সমতার বার্তা ও মানবতাবাদী শিক্ষার প্রতিধ্বনি

ভোটের মাস, ভাষার মাস

ব্যর্থতা নৈতিক নয় কাঠামোগত: দুর্নীতি ও বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা

জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে সহজে ফেরত আনবেন কীভাবে?

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

মন্ত্রীদের জন্য বিলাসী ফ্ল্যাট

ধর্মান্ধ আর প্রতিযোগিতা: দুই সাম্প্রদায়িকের খেলা

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী: সমাজের নতুন ব্যাধি

ছবি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

‘খাল কেটে কুমির আনা...’

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

অধিকারহীনতার বৃত্তে আদিবাসী জীবন

স্লোগানে ফ্যাসিবাদ, ভোটের মাঠে আশির্বাদ!

ভাঙা-গড়া সমাজের আমূল পরিবর্তন আনে

শান্তির বৃত্তে বাঁধা বাঘ

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

ছবি

জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রিনল্যান্ড: নতুন ভূ-রাজনীতির ইঙ্গিত

ব্যাংকিং খাত: সংকট, সংস্কার ও আস্থার সন্ধান

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

কুষ্ঠ-সম্পর্কিত কুসংস্কার ও বৈষম্য

ব্যাংক ধসের দায় কার?

পশ্চিমবঙ্গে অহেতুক হয়রানির মূল টার্গেট মুসলমানেরাই

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান

নির্বাচনের আগেই জানা গেল আংশিক ফল!

শীতকালীন অসুখ-বিসুখ

দিশাহীন অর্থনীতি, নিষ্ক্রিয় অন্তর্বর্তী সরকার

নরসুন্দরের পোয়াবারো

জামায়াতের ‘অক্টোপাস পলিসি’ কৌশল নাকি রাজনৈতিক বিভ্রান্তি?

ছবি

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও গোলক ধাঁধা

আগুনের ছাইয়ে কলমের আলো

বিগ বাউন্স শেষে বিগ ক্রাঞ্চের পথে ব্রহ্মাণ্ড

সংস্কৃতি চর্চা: শিকড়, সংকট ও আগ্রাসন

শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত কারাব্যবস্থার প্রত্যাশা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

অপরাধ দমন না অধিকার সুরক্ষা?

জাহাঙ্গীর আলম সরকার

রোববার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

একটি রাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা শুধু অপরাধ দমন ও শাস্তি প্রদানের একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের নৈতিক চেতনা, রাজনৈতিক দর্শন এবং আইনের শাসনের প্রতি তার বাস্তব অঙ্গীকারের প্রতিফলন। রাষ্ট্র কীভাবে অপরাধ মোকাবিলা করে, তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই প্রক্রিয়ায় নাগরিকের স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা এবং সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকে। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি শুধু কঠোর শাস্তিতে নয়, বরং ন্যায়সংগত ও মানবিক বিচারপ্রক্রিয়ায় নিহিত।

ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অপরাধ দমনের নামে যখন রাষ্ট্র সীমাহীন ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে, তখন তা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ভয়, নিপীড়ন ও স্বেচ্ছাচারের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। বিচারহীন গ্রেপ্তার, নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আইনের অপপ্রয়োগ—এসবই শেষ পর্যন্ত নাগরিক আস্থাকে ভেঙে দিয়েছে এবং রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে দুর্বল করেছে। ফলে অপরাধ দমন যদি মানবাধিকার উপেক্ষা করে পরিচালিত হয়, তবে তা সমাজে শৃঙ্খলা নয়, বরং অনিশ্চয়তা ও অবিচারের পরিবেশ সৃষ্টি করে।

এই প্রেক্ষাপটে ?রাষ্ট্র বনাম নাগরিক’ দ্বন্দ্ব শুধু একটি আইনগত বা প্রশাসনিক টানাপোড়েন নয়; এটি মূলত একটি গভীর নৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা এবং নাগরিকের অধিকার সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় স্থাপন করা হবে—এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে একটি রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী নাকি কর্তৃত্ববাদী পথে অগ্রসর হচ্ছে। অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সেই দমন যদি নাগরিক স্বাধীনতার বিনিময়ে হয়, তবে তা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। কাজেই, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও মানবাধিকার সুরক্ষার মধ্যকার এই সূক্ষ¥ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা নির্ণয় করা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই প্রবন্ধে ‘রাষ্ট্র বনাম নাগরিক: অপরাধ দমন নাকি অধিকার সুরক্ষা’ প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কাঠামো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার বাস্তবতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হবে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রাষ্ট্রের শক্তির প্রতীক হলেও তারা সেই শক্তির মালিক নয়। তারা আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত দায়িত্বশীল মাধ্যম মাত্র। সংবিধান নাগরিককে অপরাধী হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে দেখে—যার জীবন, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়, বরং জন্মগত অধিকার। কিন্তু বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়, অপরাধ দমনের তাড়নায় রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। সন্দেহভাজন নাগরিক মাত্রই অধিকারহীন হয়ে পড়ে, আর তদন্তের সুবিধা ন্যায়বিচারের চেয়ে প্রাধান্য পায়।

রাষ্ট্রের অপরাধ দমন ক্ষমতা অস্বীকারযোগ্য নয়। সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষা, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রকে পুলিশ, তদন্ত সংস্থা ও ফৌজদারি আইন প্রয়োগের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে এই ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায্য হয়ে ওঠে না। আইনের শাসনের মূল দর্শন হলো—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সীমাবদ্ধ, নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক হবে। অপরাধ দমনের নামে সীমাহীন ক্ষমতা প্রয়োগ হলে সেটিই নাগরিক স্বাধীনতার প্রধান হুমকিতে পরিণত হয়।

নাগরিক অধিকার কোনো রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহ নয়; এটি সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধান ব্যক্তিস্বাধীনতা, জীবনের অধিকার, ন্যায্য বিচারের অধিকার এবং নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকার অধিকার নিশ্চিত করেছে। এই অধিকারগুলোই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণ করে। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় এই সীমারেখা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার মুখে পড়ে—গ্রেপ্তার, রিমান্ড, হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ, মামলা দায়ের ও বিচার প্রক্রিয়ায়। প্রতিটি ধাপে নাগরিক অধিকার ক্ষুণœ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

প্রচলিত যুক্তি হলো—অপরাধ দমন জোরদার করতে হলে কিছু অধিকার সাময়িকভাবে শিথিল করা প্রয়োজন। তবে এটি বিপজ্জনক বিভ্রান্তি। প্রকৃতপক্ষে অপরাধ দমন ও অধিকার সুরক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। যেখানে অধিকার সুরক্ষা নেই, সেখানে অপরাধ দমনও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয় না। নির্যাতন, বেআইনি গ্রেপ্তার বা জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘সাফল্য’ শেষ পর্যন্ত বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় অপরাধ দমনের নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ প্রায়ই নাগরিক অধিকারের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। বেআইনি গ্রেপ্তার, দীর্ঘ রিমান্ড, হেফাজতে নির্যাতন, মামলা দিয়ে হয়রানি—এসব চর্চা ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত করে। বিশেষত দরিদ্র, প্রান্তিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল নাগরিকেরা এই ক্ষমতার ভারসাম্যহীন প্রয়োগের প্রধান ভুক্তভোগী। ফলে ?আইনের শাসন’ ধারণা অনেকের কাছে কেবল স্লোগান হয়ে পড়ে।

দ্বন্দ্ব নিরসনে বিচার বিভাগের ভূমিকা অপরিহার্য। আদালতই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর শেষ আশ্রয়স্থল। গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিচারিক নজরদারি জোরদার না হলে নাগরিক অধিকার কার্যত সুরক্ষিত থাকে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্যকর শাস্তি ও স্বচ্ছ তদন্ত ব্যবস্থা ছাড়া অধিকার সুরক্ষা কেবল নীতিগত ঘোষণা হয়ে থাকে।

ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় সংস্কার মানে শুধু নতুন আইন প্রণয়ন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দর্শন পুনর্বিবেচনা করা। অপরাধ দমন যদি রাষ্ট্রের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়, নাগরিক অধিকার স্বাভাবিকভাবেই গৌণ হয়ে পড়ে। অথচ একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে অপরাধ দমন নিজেই অধিকার সুরক্ষার একটি উপায়-লক্ষ্য নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ছাড়া আইন সংস্কার অর্থহীন।

?রাষ্ট্র বনাম নাগরিক’ প্রশ্নটি আদতে কোনো খালি দ্বন্দ্ব নয়, যেখানে একপক্ষের শক্তি বৃদ্ধির অর্থ অপর পক্ষের দুর্বলতা। অপরাধ দমন ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষা—এই দুই লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি অন্যটির শর্ত ও পরিপূরক। প্রকৃত দ্বন্দ্ব তখনই জন্ম নেয়, যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ন্যায়বিচার ও সংবিধানিক সীমারেখা অতিক্রম করে, আর অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা ক্ষমতার অপব্যবহারকে বৈধতা দেয়ার অজুহাতে পরিণত হয়।

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রভা-ার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোরতা কিংবা বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন আইনের বিস্তারে নয়; বরং সেই শক্তি নিহিত থাকে নাগরিকের আস্থা, বিচারব্যবস্থার নৈতিক দৃঢ়তা এবং আইনের শাসনের প্রতি রাষ্ট্রের অবিচল ও আন্তরিক অঙ্গীকারে। রাষ্ট্র যখন নাগরিককে অধিকারহীন সন্দেহভাজন হিসেবে নয়, বরং সংবিধানস্বীকৃত মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করে, তখনই অপরাধ দমন নৈতিক বৈধতা অর্জন করে।

ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় এই দ্বন্দ্ব গ্রেপ্তার, রিমান্ড, বিচার-পূর্ব আটক ও বিশেষ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট। রাষ্ট্র যদি সংবিধান, মানবাধিকার ও বিচারিক নজরদারির সীমা মেনে চলে, নাগরিক রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়, বরং আইনের অংশীদার হয়। অন্যথায়, রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক শক্তি হিসেবে প্রতিভাত হয়।

ন্যায়বিচারের প্রকৃত প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব, যখন ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হয়, যেখানে অপরাধ দমন নাগরিক অধিকার ক্ষুণœ করে নয়, বরং অধিকার সুরক্ষার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি জবাবদিহিমূলক ও মানবিক পুলিশিং ব্যবস্থা, স্বাধীন ও কার্যকর বিচারিক তত্ত্বাবধান, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়া এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রতি রাষ্ট্রের শূন্য সহনশীল নীতি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতা যত শক্তিশালী হবে, ততটাই শক্তিশালী হতে হবে তাদের দায়বদ্ধতা ও নৈতিক মানদ-।

রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক কখনোই শাসক ও অধীনস্তের বৈরী সম্পর্ক হতে পারে না; বরং তা হওয়া উচিত দায়িত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক চুক্তি। যে রাষ্ট্র নাগরিকের ভয়কে শাসনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, সে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়ে; আর যে রাষ্ট্র ন্যায়বিচারকে শাসনের ভিত্তি করে তোলে, সে রাষ্ট্রই টেকসই শক্তির অধিকারী হয়। অপরাধ দমন তখনই কার্যকর ও ন্যায্য হয়, যখন তা মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের সীমার ভেতরে পরিচালিত হয়।

ফলে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা যদি দমনের যন্ত্রে পরিণত হয়, তবে তা সমাজে ন্যায়বিচার নয়, বরং অবিশ্বাস ও ভয়ের সংস্কৃতি জন্ম দেয়। কিন্তু যখন এই ব্যবস্থা ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও অধিকারবান্ধব কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই তা নাগরিক স্বাধীনতার রক্ষাকবচ এবং অপরাধ দমনের শক্তিশালী হাতিয়ারে রূপ নেয়। এই নীতিগত উপলব্ধিই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার রাষ্ট্রের শক্তি কমায় না, বরং তাকে নৈতিকভাবে আরও দৃঢ় ও স্থিতিশীল করে তোলে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: আইনজীবী]

back to top