মাহরুফ চৌধুরী
রাষ্ট্রকে অনেকেই কোনো বিমূর্ত, সর্বশক্তিমান সত্তা কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক যন্ত্র হিসেবে কল্পনা করেন। অথচ রাষ্ট্র মূলত একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিসরে বসবাসকারী মানুষের সামষ্টিক কল্যাণের রাজনৈতিক ও নৈতিক কাঠামো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিকের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার মতো মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধন করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মানুষ রাষ্ট্রের উপকরণ নয়; বরং রাষ্ট্রই মানুষের কল্যাণের জন্য গঠিত একটি উপায়মাত্র
আমাদের দেশের অধিকাংশ নাগরিকের কাছেই এমনকি বহু রাজনৈতিক নেতার কাছেও ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটি এখনো সুস্পষ্ট ও পরিপক্বভাবে গড়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রকে অনেকেই কোনো বিমূর্ত, সর্বশক্তিমান সত্তা কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক যন্ত্র হিসেবে কল্পনা করেন। অথচ রাষ্ট্র মূলত একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিসরে বসবাসকারী মানুষের সামষ্টিক কল্যাণের রাজনৈতিক ও নৈতিক কাঠামো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিকের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার মতো মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধন করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মানুষ রাষ্ট্রের উপকরণ নয়; বরং রাষ্ট্রই মানুষের কল্যাণের জন্য গঠিত একটি উপায়মাত্র। মানুষের অস্তিত্ব ও মর্যাদাকে পাশ কাটিয়ে বা মানুষের ওপর রাষ্ট্রকে প্রাধান্য দেওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্রের নামে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর ইচ্ছামতো আচরণ করার বৈধতা তৈরি করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এমন ধারণাই রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে আইন শাসকের হাতিয়ার হয়ে ওঠে এবং নাগরিক রাষ্ট্রের মালিক নয়, বরং তার অধীন প্রজায় পরিণত হয়। এটি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি, যেখানে রাষ্ট্রের বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষমতা থেকেই।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভাষ্যে ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটি ক্রমেই একটি বহুল ব্যবহৃত অভিধায় পরিণত হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ‘বাংলাদেশপন্থী’ ধারণাটির কোনো সুস্পষ্ট তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, নৈতিক মানদণ্ড বা রাষ্ট্রদর্শনভিত্তিক সংজ্ঞা রাজনৈতিক আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শনের দৃষ্টিতে যে কোনো ‘পন্থা’ অর্থবহ হতে হলে তার সঙ্গে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও সামষ্টিক কল্যাণের প্রশ্ন অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকতে হয়। অথচ বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটি অনেক সময় এমনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেন এটি নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও প্রশ্নাতীত সত্য যার ভেতরে কোনো সমালোচনা, নৈতিক যাচাই বা গণতান্ত্রিক প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ নেই।
এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে আসে, ‘বাংলাদেশপন্থী’ কি সত্যিই একটি নৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থান, যেখানে রাষ্ট্রের আগে মানুষ এবং ক্ষমতার আগে মানবিকতা স্থান পায় নাকি এটি আরেকটি অস্পষ্ট ও সুবিধাজনক রাজনৈতিক স্লোগান, যার আড়ালে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয় এবং রাষ্ট্রকে মানুষের ঊর্ধ্বে তুলে ধরার প্রয়াস চলে রাষ্ট্রের কল্পিত কল্যাণের নামে কি মানুষকে ক্রমে তুচ্ছ করে তোলা হচ্ছে এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট ও তাত্ত্বিক জবাব না পাওয়া পর্যন্ত ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটির ব্যবহার রাজনৈতিক আলোচনাকে আলোকিত করার চেয়ে বিভ্রান্তিই বাড়াবে।
এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর অনুসন্ধান করতে হলে ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটিকে ভেঙে গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি। শব্দটির ভেতরেই নিহিত রয়েছে আমাদের আত্মপরিচয়ের একটি ত্রিমাত্রিক কাঠামো তথাবাংলা + দেশ + পন্থী। এই ভাঙনের মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, বাংলাদেশপন্থিতা কোনো আবেগী উচ্চারণ নয়; বরং এটি একটি সুসংহত, বহুমাত্রিক নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান।
প্রথমত, ‘বাংলা’ হলো আমাদের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মৌলভিত্তি। উপনিবেশ-উত্তর চিন্তাবিদ ফ্রাঞ্জ ফ্যাননের (১৯২৫-১৯৬১) ভাষায়, উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর কাছে ভূমি কেবল মাটির একটি খণ্ড নয়; এটি তাদের অস্তিত্ব, সম্মান ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। সেই অর্থে বাংলার নদী, ভূমি, জলাভূমি, প্রকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতি নিছক আবেগী স্মৃতিচিহ্ন নয়; বরং এগুলো আমাদের জীবনের বস্তুগত ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশপন্থী হওয়া মানে তাই এই ভূখণ্ডে তথা বাংলামুলুকে বসবাসকারী মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের পক্ষে সচেতন অবস্থান গ্রহণ করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যে রাজনীতি নির্বিচারে পরিবেশ ধ্বংস করে, ভূমি দখল ও সম্পদ লুটকে উন্নয়নের নামে বৈধতা দেয়, কিংবা জলবায়ু ঝুঁকিকে উপেক্ষা করে ক্ষমতার স্বার্থ রক্ষা করে, সে রাজনীতি যতই মুখে দেশপ্রেমের বুলি আওড়াক না কেন, প্রকৃত অর্থে তা ‘বাংলা’-বিরোধী। কারণ ‘বাংলা’ কেবল একটি মানচিত্র বা ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত একটি বাসযোগ্য জগত এবং তার ভবিষ্যৎ স্থায়িত্বের প্রশ্ন। সেই জগতকে ধ্বংস করে বা তার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়ে কোনোভাবেই বাংলাদেশপন্থী হওয়া যায় না।
দ্বিতীয়ত, ‘দেশ’ হলো আমাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে দেশ কখনোই কেবল একটি নির্দিষ্ট সীমানা বা মানচিত্রের নাম নয়; দেশ মূলত একটি সামাজিক চুক্তি, যার ভিত্তিতে মানুষ কিছু অধিকার রাষ্ট্রকে অর্পণ করে এই প্রত্যাশায় যে রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও কল্যাণ নিশ্চিত করবে। ইংরেজ দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক থমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) রাষ্ট্রকে দেখেছেন অরাজকতার বিরুদ্ধে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে। পরবর্তীতে আরেক ইংরেজ দার্শনিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার জন লক (১৬৩২-১৭০৪) রাষ্ট্রকে কল্পনা করেছেন ব্যক্তিগত অধিকার ও সম্পত্তি রক্ষার মাধ্যম হিসেবে। আর সুইস দার্শনিক জঁ জাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা করেছেন জনগণের ‘সাধারণ ইচ্ছা’র রাজনৈতিক প্রকাশ হিসেবে।
এই তাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা আমাদের স্পষ্টভাবে জানায় রাষ্ট্রের অস্তিত্বের নৈতিক বৈধতা নিহিত থাকে জনগণের কল্যাণে। এই দৃষ্টিতে বাংলাদেশপন্থী হওয়া মানে রাষ্ট্রকে কোনো দল, গোষ্ঠী, পরিবার বা ব্যক্তির স্বার্থে নয়, বরং জনগণের সার্বিক কল্যাণে পরিচালিত করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা, সংবিধানকে ক্ষমতার প্রয়োজন অনুযায়ী বিকৃত করা, কিংবা প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ ও দমননীতির যন্ত্রে পরিণত করা এসব আচরণ রাষ্ট্রপন্থী নয়। বরং এগুলো রাষ্ট্রের ভেতরেই এক ধরনের অন্তর্গত উপনিবেশায়ন সৃষ্টি করে, যেখানে নাগরিক নিজ দেশেই ক্ষমতার অধীন উপনিবেশিত সত্তায় পরিণত হয়। উপনিবেশিক শাসন-পরবর্তী তত্ত্ব এখানে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়। ফিলিস্তিনি তাত্ত্বিক ও একাডেমিক এডওয়ার্ড সাইদের (১৯৩৫-২০০৩) মতে, ক্ষমতা কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং ভাষার মধ্য দিয়েও নিজের বৈধতা নির্মাণ করে। ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটি যদি এমনভাবে ব্যবহৃত হয়, যা ক্ষমতাকে প্রশ্নহীন করে তোলে এবং ভিন্নমতকে দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে, তবে তা রাষ্ট্রকে মুক্ত করার পরিবর্তে নতুন ধরনের দখলদারিত্বের পথই প্রশস্ত করে। ইটালীয় মার্ক্সবাদী দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ আন্তোনিও গ্রামশি (১৮৯১-১৯৩৭) যাকে ‘হেজেমনি’ বলেছেন অর্থাৎ সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এই অস্পষ্ট, আবেগনির্ভর দেশপ্রেমী ভাষাই তার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
তৃতীয়ত, ‘পন্থী’ অংশটিই হলো ‘বাংলাদেশপন্থী’ ধারণার সবচেয়ে রাজনৈতিক ও নৈতিক মাত্রা; সেটা মূলত এসেছে ‘পন্থা’ বা ‘পথ’ থেকে। ‘পন্থী’ হওয়া মানে কেবল একটি পরিচয় বহন করা নয়; বরং সচেতনভাবে একটি অবস্থান গ্রহণ করা এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার অনুকূলে কাজ করা। এখানে তথাকথিত নিরপেক্ষতা কোনো সদগুণ নয়; বরং বহু ক্ষেত্রে তা অন্যায় ও অবিচারের প্রতি নীরব সম্মতিতে পরিণত হয়। রাজনৈতিক ও নৈতিক দর্শন আমাদের বারবার সতর্ক করেছে অন্যায়ের মুখে নীরবতা আসলে ক্ষমতার পক্ষেই কাজ করে। জার্মান বংশোদ্ভুত মার্কিন ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক হান্না আরেন্ট (১৯০৬-১৯৭৫) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, চিন্তাহীন আনুগত্য, প্রশাসনিক আজ্ঞাপালনের সংস্কৃতি এবং সুবিধাবাদী নীরবতাই রাষ্ট্রীয় অপরাধকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশপন্থী হওয়া মানে ক্ষমতার ভাষা মুখস্থ করা নয়; বরং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার নৈতিক সাহস দেখানো।
‘বাংলাদেশপন্থী’ কোনো আবেগতাড়িত পরিচয় বা রাজনৈতিক অলংকার নয়; এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক নির্বাচন। এখানে ভূখণ্ড ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা, রাষ্ট্রের প্রতি নৈতিক আনুগত্য এবং অন্যায়ের বিপরীতে ন্যায়ের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান- এই তিনটি অনিবার্য শর্ত। এসব শর্ত অনুপস্থিত থাকলে ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটি কেবল একটি ফাঁকা বুলি বা ফাঁপা প্রতীকে পরিণত হয়, যা মানুষের কল্যাণের বদলে ক্ষমতার সুবিধাভোগীদের স্বার্থই রক্ষা করে।
আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য হলো ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটিকে রাজনৈতিক বাজারের চটকদার স্লোগান থেকে উদ্ধার করে একটি জনস্বীকৃত নৈতিক মানদণ্ডে রূপান্তর করা। এই শব্দের ভেতরে যে মানবিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অর্থ নিহিত আছে, তা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না হলে ‘বাংলাদেশপন্থী’ ধারণাটি ক্রমেই ক্ষমতার সুবিধাজনক ভাষায় পরিণত হবে যার মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থকে দেশপ্রেমের মোড়কে বৈধতা দিতে পারবে।
‘রাষ্ট্রের আগে মানুষ’ এই মৌলিক নীতিকে রাজনৈতিক ভাষ্য ও প্রশাসনিক চর্চার কেন্দ্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে না পারলে, এবং নাগরিকের অধিকার, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে বাংলাদেশপন্থিতার অপরিহার্য মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হলে, ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটি আবারও জনগণের সঙ্গে প্রতারণার এক কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হবে। তখন এই শব্দের উচ্চারণে প্রতিধ্বনিত হবে কেবল ক্ষমতার স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় আত্মপ্রশংসা। সেখানে অনুপস্থিত থাকবে ‘বাংলা’র জীবন্ত ভূখণ্ড, তার মানুষ ও প্রকৃতি, অনুপস্থিত থাকবে ‘দেশ’ নামক স্থানিক কাঠামোর নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তা, এবং অনুপস্থিত থাকবে অন্যায়ের বিপরীতে দাঁড়ানোর কোনো ন্যায়সঙ্গত ‘পন্থা’।
এমন পরিস্থিতিতে ‘বাংলাদেশপন্থী’ আর একটি নৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থান থাকবে না; তা রূপ নেবে প্রশ্নহীন আনুগত্য, সুবিধাবাদী নীরবতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক ভাষার আরেকটি মোড়কে। ইতিহাস আমাদের বারবার দেখিয়েছে যে, রাষ্ট্রের কল্পিত কল্যাণের নামে মানুষকে আড়াল করে রাখার যে প্রবণতা তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই মানবিকত নিয়মনীতি ও নৈতিক বৈধতার দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। অতএব, আমরা যদি ‘বাংলাদেশপন্থী’ রাজনীতিকে অর্থবহ করে তুলতে চাই, তবে আমাদের রাজনীতির মূলে অবশ্যই থাকতে হবে রাষ্ট্রের শক্তির ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদা, ক্ষমতার ভাষার ঊর্ধ্বে নৈতিক সাহস, এবং স্লোগান বা প্রতিশ্রুতির রাজনীতির ঊর্ধ্বে জনগণের কাছে জবাবদিহি। আজকের বাংলাদেশের অন্যতম বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো এই ‘রাজনীতির ভাষা’র ফাঁকা-ফোকর থেকে ‘ভাষার রাজনীতি’কে আলাদা করে চিহ্নিত করা এবং ভাষার অপব্যবহারের কবল থেকে মুক্তি পাওয়া। ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটিকে তাই আবেগী উচ্চারণ বা ক্ষমতার অলংকার থেকে মুক্ত করে একটি সুস্পষ্ট নৈতিক মানদণ্ডে রূপান্তর করাই এখন সময়ের দাবি। কারণ রাষ্ট্র মানুষের জন্য; মানুষ রাষ্ট্রের জন্য নয়। এই সত্য অস্বীকার করে কোনো রাজনৈতিক ভাষ্যই শেষ পর্যন্ত দেশ, মানুষ কিংবা ভবিষ্যৎ-এই তিনটির কোনোটির পক্ষেই দাঁড়াতে পারে না।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মাহরুফ চৌধুরী
সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
রাষ্ট্রকে অনেকেই কোনো বিমূর্ত, সর্বশক্তিমান সত্তা কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক যন্ত্র হিসেবে কল্পনা করেন। অথচ রাষ্ট্র মূলত একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিসরে বসবাসকারী মানুষের সামষ্টিক কল্যাণের রাজনৈতিক ও নৈতিক কাঠামো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিকের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার মতো মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধন করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মানুষ রাষ্ট্রের উপকরণ নয়; বরং রাষ্ট্রই মানুষের কল্যাণের জন্য গঠিত একটি উপায়মাত্র
আমাদের দেশের অধিকাংশ নাগরিকের কাছেই এমনকি বহু রাজনৈতিক নেতার কাছেও ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটি এখনো সুস্পষ্ট ও পরিপক্বভাবে গড়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রকে অনেকেই কোনো বিমূর্ত, সর্বশক্তিমান সত্তা কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক যন্ত্র হিসেবে কল্পনা করেন। অথচ রাষ্ট্র মূলত একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিসরে বসবাসকারী মানুষের সামষ্টিক কল্যাণের রাজনৈতিক ও নৈতিক কাঠামো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিকের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার মতো মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধন করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মানুষ রাষ্ট্রের উপকরণ নয়; বরং রাষ্ট্রই মানুষের কল্যাণের জন্য গঠিত একটি উপায়মাত্র। মানুষের অস্তিত্ব ও মর্যাদাকে পাশ কাটিয়ে বা মানুষের ওপর রাষ্ট্রকে প্রাধান্য দেওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্রের নামে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর ইচ্ছামতো আচরণ করার বৈধতা তৈরি করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এমন ধারণাই রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে আইন শাসকের হাতিয়ার হয়ে ওঠে এবং নাগরিক রাষ্ট্রের মালিক নয়, বরং তার অধীন প্রজায় পরিণত হয়। এটি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি, যেখানে রাষ্ট্রের বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষমতা থেকেই।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভাষ্যে ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটি ক্রমেই একটি বহুল ব্যবহৃত অভিধায় পরিণত হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ‘বাংলাদেশপন্থী’ ধারণাটির কোনো সুস্পষ্ট তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, নৈতিক মানদণ্ড বা রাষ্ট্রদর্শনভিত্তিক সংজ্ঞা রাজনৈতিক আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শনের দৃষ্টিতে যে কোনো ‘পন্থা’ অর্থবহ হতে হলে তার সঙ্গে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও সামষ্টিক কল্যাণের প্রশ্ন অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকতে হয়। অথচ বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটি অনেক সময় এমনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেন এটি নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও প্রশ্নাতীত সত্য যার ভেতরে কোনো সমালোচনা, নৈতিক যাচাই বা গণতান্ত্রিক প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ নেই।
এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে আসে, ‘বাংলাদেশপন্থী’ কি সত্যিই একটি নৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থান, যেখানে রাষ্ট্রের আগে মানুষ এবং ক্ষমতার আগে মানবিকতা স্থান পায় নাকি এটি আরেকটি অস্পষ্ট ও সুবিধাজনক রাজনৈতিক স্লোগান, যার আড়ালে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয় এবং রাষ্ট্রকে মানুষের ঊর্ধ্বে তুলে ধরার প্রয়াস চলে রাষ্ট্রের কল্পিত কল্যাণের নামে কি মানুষকে ক্রমে তুচ্ছ করে তোলা হচ্ছে এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট ও তাত্ত্বিক জবাব না পাওয়া পর্যন্ত ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটির ব্যবহার রাজনৈতিক আলোচনাকে আলোকিত করার চেয়ে বিভ্রান্তিই বাড়াবে।
এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর অনুসন্ধান করতে হলে ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটিকে ভেঙে গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি। শব্দটির ভেতরেই নিহিত রয়েছে আমাদের আত্মপরিচয়ের একটি ত্রিমাত্রিক কাঠামো তথাবাংলা + দেশ + পন্থী। এই ভাঙনের মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, বাংলাদেশপন্থিতা কোনো আবেগী উচ্চারণ নয়; বরং এটি একটি সুসংহত, বহুমাত্রিক নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান।
প্রথমত, ‘বাংলা’ হলো আমাদের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মৌলভিত্তি। উপনিবেশ-উত্তর চিন্তাবিদ ফ্রাঞ্জ ফ্যাননের (১৯২৫-১৯৬১) ভাষায়, উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর কাছে ভূমি কেবল মাটির একটি খণ্ড নয়; এটি তাদের অস্তিত্ব, সম্মান ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। সেই অর্থে বাংলার নদী, ভূমি, জলাভূমি, প্রকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতি নিছক আবেগী স্মৃতিচিহ্ন নয়; বরং এগুলো আমাদের জীবনের বস্তুগত ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশপন্থী হওয়া মানে তাই এই ভূখণ্ডে তথা বাংলামুলুকে বসবাসকারী মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের পক্ষে সচেতন অবস্থান গ্রহণ করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যে রাজনীতি নির্বিচারে পরিবেশ ধ্বংস করে, ভূমি দখল ও সম্পদ লুটকে উন্নয়নের নামে বৈধতা দেয়, কিংবা জলবায়ু ঝুঁকিকে উপেক্ষা করে ক্ষমতার স্বার্থ রক্ষা করে, সে রাজনীতি যতই মুখে দেশপ্রেমের বুলি আওড়াক না কেন, প্রকৃত অর্থে তা ‘বাংলা’-বিরোধী। কারণ ‘বাংলা’ কেবল একটি মানচিত্র বা ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত একটি বাসযোগ্য জগত এবং তার ভবিষ্যৎ স্থায়িত্বের প্রশ্ন। সেই জগতকে ধ্বংস করে বা তার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়ে কোনোভাবেই বাংলাদেশপন্থী হওয়া যায় না।
দ্বিতীয়ত, ‘দেশ’ হলো আমাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে দেশ কখনোই কেবল একটি নির্দিষ্ট সীমানা বা মানচিত্রের নাম নয়; দেশ মূলত একটি সামাজিক চুক্তি, যার ভিত্তিতে মানুষ কিছু অধিকার রাষ্ট্রকে অর্পণ করে এই প্রত্যাশায় যে রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও কল্যাণ নিশ্চিত করবে। ইংরেজ দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক থমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) রাষ্ট্রকে দেখেছেন অরাজকতার বিরুদ্ধে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে। পরবর্তীতে আরেক ইংরেজ দার্শনিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার জন লক (১৬৩২-১৭০৪) রাষ্ট্রকে কল্পনা করেছেন ব্যক্তিগত অধিকার ও সম্পত্তি রক্ষার মাধ্যম হিসেবে। আর সুইস দার্শনিক জঁ জাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা করেছেন জনগণের ‘সাধারণ ইচ্ছা’র রাজনৈতিক প্রকাশ হিসেবে।
এই তাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা আমাদের স্পষ্টভাবে জানায় রাষ্ট্রের অস্তিত্বের নৈতিক বৈধতা নিহিত থাকে জনগণের কল্যাণে। এই দৃষ্টিতে বাংলাদেশপন্থী হওয়া মানে রাষ্ট্রকে কোনো দল, গোষ্ঠী, পরিবার বা ব্যক্তির স্বার্থে নয়, বরং জনগণের সার্বিক কল্যাণে পরিচালিত করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা, সংবিধানকে ক্ষমতার প্রয়োজন অনুযায়ী বিকৃত করা, কিংবা প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ ও দমননীতির যন্ত্রে পরিণত করা এসব আচরণ রাষ্ট্রপন্থী নয়। বরং এগুলো রাষ্ট্রের ভেতরেই এক ধরনের অন্তর্গত উপনিবেশায়ন সৃষ্টি করে, যেখানে নাগরিক নিজ দেশেই ক্ষমতার অধীন উপনিবেশিত সত্তায় পরিণত হয়। উপনিবেশিক শাসন-পরবর্তী তত্ত্ব এখানে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়। ফিলিস্তিনি তাত্ত্বিক ও একাডেমিক এডওয়ার্ড সাইদের (১৯৩৫-২০০৩) মতে, ক্ষমতা কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং ভাষার মধ্য দিয়েও নিজের বৈধতা নির্মাণ করে। ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটি যদি এমনভাবে ব্যবহৃত হয়, যা ক্ষমতাকে প্রশ্নহীন করে তোলে এবং ভিন্নমতকে দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে, তবে তা রাষ্ট্রকে মুক্ত করার পরিবর্তে নতুন ধরনের দখলদারিত্বের পথই প্রশস্ত করে। ইটালীয় মার্ক্সবাদী দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ আন্তোনিও গ্রামশি (১৮৯১-১৯৩৭) যাকে ‘হেজেমনি’ বলেছেন অর্থাৎ সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এই অস্পষ্ট, আবেগনির্ভর দেশপ্রেমী ভাষাই তার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
তৃতীয়ত, ‘পন্থী’ অংশটিই হলো ‘বাংলাদেশপন্থী’ ধারণার সবচেয়ে রাজনৈতিক ও নৈতিক মাত্রা; সেটা মূলত এসেছে ‘পন্থা’ বা ‘পথ’ থেকে। ‘পন্থী’ হওয়া মানে কেবল একটি পরিচয় বহন করা নয়; বরং সচেতনভাবে একটি অবস্থান গ্রহণ করা এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার অনুকূলে কাজ করা। এখানে তথাকথিত নিরপেক্ষতা কোনো সদগুণ নয়; বরং বহু ক্ষেত্রে তা অন্যায় ও অবিচারের প্রতি নীরব সম্মতিতে পরিণত হয়। রাজনৈতিক ও নৈতিক দর্শন আমাদের বারবার সতর্ক করেছে অন্যায়ের মুখে নীরবতা আসলে ক্ষমতার পক্ষেই কাজ করে। জার্মান বংশোদ্ভুত মার্কিন ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক হান্না আরেন্ট (১৯০৬-১৯৭৫) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, চিন্তাহীন আনুগত্য, প্রশাসনিক আজ্ঞাপালনের সংস্কৃতি এবং সুবিধাবাদী নীরবতাই রাষ্ট্রীয় অপরাধকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশপন্থী হওয়া মানে ক্ষমতার ভাষা মুখস্থ করা নয়; বরং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার নৈতিক সাহস দেখানো।
‘বাংলাদেশপন্থী’ কোনো আবেগতাড়িত পরিচয় বা রাজনৈতিক অলংকার নয়; এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক নির্বাচন। এখানে ভূখণ্ড ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা, রাষ্ট্রের প্রতি নৈতিক আনুগত্য এবং অন্যায়ের বিপরীতে ন্যায়ের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান- এই তিনটি অনিবার্য শর্ত। এসব শর্ত অনুপস্থিত থাকলে ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটি কেবল একটি ফাঁকা বুলি বা ফাঁপা প্রতীকে পরিণত হয়, যা মানুষের কল্যাণের বদলে ক্ষমতার সুবিধাভোগীদের স্বার্থই রক্ষা করে।
আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য হলো ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটিকে রাজনৈতিক বাজারের চটকদার স্লোগান থেকে উদ্ধার করে একটি জনস্বীকৃত নৈতিক মানদণ্ডে রূপান্তর করা। এই শব্দের ভেতরে যে মানবিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অর্থ নিহিত আছে, তা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না হলে ‘বাংলাদেশপন্থী’ ধারণাটি ক্রমেই ক্ষমতার সুবিধাজনক ভাষায় পরিণত হবে যার মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থকে দেশপ্রেমের মোড়কে বৈধতা দিতে পারবে।
‘রাষ্ট্রের আগে মানুষ’ এই মৌলিক নীতিকে রাজনৈতিক ভাষ্য ও প্রশাসনিক চর্চার কেন্দ্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে না পারলে, এবং নাগরিকের অধিকার, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে বাংলাদেশপন্থিতার অপরিহার্য মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হলে, ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটি আবারও জনগণের সঙ্গে প্রতারণার এক কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হবে। তখন এই শব্দের উচ্চারণে প্রতিধ্বনিত হবে কেবল ক্ষমতার স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় আত্মপ্রশংসা। সেখানে অনুপস্থিত থাকবে ‘বাংলা’র জীবন্ত ভূখণ্ড, তার মানুষ ও প্রকৃতি, অনুপস্থিত থাকবে ‘দেশ’ নামক স্থানিক কাঠামোর নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তা, এবং অনুপস্থিত থাকবে অন্যায়ের বিপরীতে দাঁড়ানোর কোনো ন্যায়সঙ্গত ‘পন্থা’।
এমন পরিস্থিতিতে ‘বাংলাদেশপন্থী’ আর একটি নৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থান থাকবে না; তা রূপ নেবে প্রশ্নহীন আনুগত্য, সুবিধাবাদী নীরবতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক ভাষার আরেকটি মোড়কে। ইতিহাস আমাদের বারবার দেখিয়েছে যে, রাষ্ট্রের কল্পিত কল্যাণের নামে মানুষকে আড়াল করে রাখার যে প্রবণতা তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই মানবিকত নিয়মনীতি ও নৈতিক বৈধতার দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। অতএব, আমরা যদি ‘বাংলাদেশপন্থী’ রাজনীতিকে অর্থবহ করে তুলতে চাই, তবে আমাদের রাজনীতির মূলে অবশ্যই থাকতে হবে রাষ্ট্রের শক্তির ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদা, ক্ষমতার ভাষার ঊর্ধ্বে নৈতিক সাহস, এবং স্লোগান বা প্রতিশ্রুতির রাজনীতির ঊর্ধ্বে জনগণের কাছে জবাবদিহি। আজকের বাংলাদেশের অন্যতম বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো এই ‘রাজনীতির ভাষা’র ফাঁকা-ফোকর থেকে ‘ভাষার রাজনীতি’কে আলাদা করে চিহ্নিত করা এবং ভাষার অপব্যবহারের কবল থেকে মুক্তি পাওয়া। ‘বাংলাদেশপন্থী’ শব্দটিকে তাই আবেগী উচ্চারণ বা ক্ষমতার অলংকার থেকে মুক্ত করে একটি সুস্পষ্ট নৈতিক মানদণ্ডে রূপান্তর করাই এখন সময়ের দাবি। কারণ রাষ্ট্র মানুষের জন্য; মানুষ রাষ্ট্রের জন্য নয়। এই সত্য অস্বীকার করে কোনো রাজনৈতিক ভাষ্যই শেষ পর্যন্ত দেশ, মানুষ কিংবা ভবিষ্যৎ-এই তিনটির কোনোটির পক্ষেই দাঁড়াতে পারে না।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]