বশীর আহমেদ
অতিশয় ছোট্ট এক উক্তি, করেছেন একজন বয়স্ক জামায়াতী নেতা। এটা বলা হয়েছিল প্রায় মাসখানেক আগে। আকারে ছোট হলেও বিরাজমান পরিস্থিতিতে তা গুরুত্ববহ বলতেই হবে। তিনি কর্মী সমর্থকদের আহবান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘বিগত চুয়ান্ন বচ্ছরের প্রতিশোধ ইনশাআল্লাহ আগামী ফেব্রুয়ারিতে নেওয়ার সুযোগ আছে, তোমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যাও।’
পরের ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনা করলে স্পষ্ট হবে যে, এটা নিছক বলার জন্য বলা হয়নি; বরং তা সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত ছিল। হ্যাঁ, প্রতিশোধের প্রস্তুতি জামায়াত যথেষ্টই নিয়েছে। সেটা কেবল দেশে নয়, দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশ ভূমিতেও। সম্প্রতি পোস্টাল ব্যালট নিয়ে যে বিস্ময়কর জালিয়াতি চাউর হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের নিরবতা ও দায়সারা ব্যাখ্যা এসেছে, তা জামায়াতের পরিকল্পিত প্রতিশোধ প্রস্তুতির নিরেট প্রমান বহন করে।
সাধারণ জনগণের সচেতন নজরদারীতে ধরা পড়ে যাওয়া সেই অচিন্ত্যনীয় ‘প্রতিশোধ প্রস্তুতি’র আরও যেসব বেআইনী নমুনা সামনে এসেছে তা সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সহায়ক না হলেও নির্বাচন কমিশন যথারীতি নিশ্চুপ। যেমন, জামায়াতের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের প্রলুব্ধ এবং এনআইডি নাম্বার, মোবাইলের বিকাশ নাম্বার সংগ্রহ করছে। কোরআন মাজিদ ছুঁইয়ে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করছে। নগদ অর্থসহ পরকালে জান্নাত প্রাপ্তির লোভ দেখাচ্ছে। এগুলো করা হচ্ছে প্রকাশ্যে, অনেকটাই দাপটের সাথেই। কয়দিন আগে এই নিয়ে ঢাকার মিরপুরে এলাকাবাসীর সাথে জামায়াত কর্মীদের তুমুল দাঙ্গা হাঙ্গামাও হয়ে গেছে। তথাপি নজিরবিহীন এমন অনাসৃষ্টি অব্যাহতই আছে। সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন আইটেম। সেটা হলো, জামায়াত তার কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচনের দিন ফজরের নামাজ ভোটকেন্দ্রে আদায় করতে। এর অন্তরালবর্তী মোজেজা তারাই ভালো বলতে পারবে। উপস্থিত এটুকু অন্তত ধারণা করা যায়, এই নবতর উদ্যোগ ভালো কিছুর আলামত হতেই পারে না।
এই মুহুর্তে দেশবাসীর ঘাড়ের উপর অনিশ্চিতির খড়গ ঠিক যেন ডেমোক্লিসের তরবারির মত ঝুলে আছে। প্রতি মুহুর্তে আসছে মন খারাপ করা সব খবর। চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বের এতো সমাহার আগে কখনো দেখা বা শোনা যায়নি। কি হচ্ছে আসলে? বিগত ১৭ বছর ভোট বঞ্চিত জনগণের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণে যে নির্বাচনটি হওয়ার কথা ছিল আনন্দ উৎসব মুখর, তা ক্রমান্বয়ে মরুভূমির বুকে যেন বিষাদসিন্ধুর পরিণতি বরণ করতে চাইছে। অথচ নির্বাচন কমিশনের কোন নড়ন-চড়ন নেই। কেন? তারা কি দন্তনখরবিহীন? এই তো গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরে দুইটি তাজা প্রাণ অকালে নিভে গেল! সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সেনা প্রহরার ভেতর কিছু মানুষ গোঁ ধরে থেকে হাঙ্গামা করার এতো সাহস পেল কীভাবে? এ অবস্থায়, সাধারণ মানুষ তাদের জান মাল নিরাপদ ভাববে আর কোন ভরসায়?
শুধু কি তাই? অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাও যারপর নাই প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যসব বাদ দিলেও নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোট নিয়ে সরকারের অবস্থান তীব্র সমালোচিত। সরকার গণভোটের কার্যকারণ উপস্হাপন করতে পারে; নিজে একটি পক্ষ হতে পারে না। অথচ তাই করা হয়েছে এবং হ্যাঁ এর পক্ষ সমর্থনে প্রচার প্রচারণায় জনগণের কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে। এখন সরকারি দপ্তরগুলো হ্যাঁ ভোটের বেআইনি প্রচারণায় সরব। গণভোট তো ভোটই, এবং তাতে মতামত দেওয়া কেবলমাত্র ভোটারের একান্ত বিবেচনার বিষয়। সরকার নিজে একটি পক্ষ হলে তাকে ভোট বলার অবকাশ থাকে না। এই অযাচিত সরকারি হস্তক্ষেপে গণভোট বাস্তবে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। এতে সাধারণ মানুষ সংক্ষুব্ধ। কী হবে এর ভবিষ্যৎ, তা জানেন একমাত্র ভবিতব্য।
গণসমাজের এই উদ্বেগ, বহু অঘটন সত্ত্বেও নির্বাচন ঘোষনার মধ্য দিয়ে সুস্থির হতে আরম্ভ করেছিল। কিন্তু হঠাৎ করে ইনকিলাব মঞ্চের হাদি হত্যাকাণ্ডে দ্রুতই গণহিস্টিরিয়ায় পরিণত হয়। অতপর বুড়িগঙ্গায় গড়িয়ে যায় অনেক পানি। বহু চেনা মুখের অতি উৎসাহী তৎপরতা দেখেন দেশবাসী। আহা, কি যে পেরেশানি! কেউ লাফিয়ে হাদির কবরে পর্যন্ত নেমে পড়েন। যেন পারলে কবরেই থেকে যাওয়ার উপক্রম। মাতম আর মাতম উঠানো হলো চারিদিকে। শোকের আতিশয্য এমন করার চেষ্টা চললো, নিহত হাদি যেন বঙ্গবন্ধু অথবা শহীদ জিয়ার মতই একজন অকালপ্রয়াত জননন্দিত জাতীয় নেতা। যড়যন্ত্র তত্ত্বমতে, সেদিন জানাযা শেষে হাদিকে কবরে রেখে এসে এমন কিছু ঘটানোর পরিকল্পনা ছিল, যার ফলশ্রুতি হতে পারতো হতবাক করার মত। সবাই দেখলেন, হাদির জানাযা শেষ হওয়ামাত্র মবস্রোত ছুটে গেল জাতীয় সংসদ ভবনে। তারা প্রায় ঢুকেই পড়েছিল। সতর্ক সেনা কমান্ডোরা মবক্রেসি কার্যকরভাবে নিষ্ক্রীয় করলে সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। তথাপি পাল্টা হামলায় প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ভবন ধ্বংস ঠিকই রক্ষা করা যায়নি। আর এই চক্রের প্রধান কুশিলব প্রচুর হম্বতম্বি শেষে এখন প্রায় মৌনব্রতে।
এতো কিছু যার মৃত্যু নিয়ে, সেই ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে প্রথমে খেই হারালেও পুলিশের পেশাদারিত্বই বিজয়ী হয়েছে। পরে ওই হত্যায় জড়িত সন্দেহে সামনে এসেছে এক জামায়াত নেতার ছেলের নাম। এটি প্রথম আলোচনায় আসে ১৪ জানুয়ারি ইনকিলাব মঞ্চ ঢাবি শাখার মুখপাত্র জুমার এক পোস্টের মাধ্যমে। তাতে দাবি করা হয়, হত্যার পরিকল্পকরা জানাজা নামাজে সামনের কাতারেই ছিল। জুমা বলেন, চার্জশিটে মাসুদ আর বাপ্পিকে হত্যায় সরাসরি জড়িত বলা হয়েছে। আর আছে ঘটনার পরে ঘটা সবকিছু। এই মাস্টারমাইন্ডদের বের করা কি পসিবল নয়, নাকি ইচ্ছে করেই করতে দেয়া হচ্ছে না তিনি বলেছেন, এরা কারা, কী এমন শক্তি যে তাদের সামনে আনা যায় না এমন ভয়ানক উক্তির পরও হাদি হত্যার পরিণতি নিহত সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা মামলার মতোই থমকে আছে মনে করা যায়। এদিকে, সরকার হাদির ভাইকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি এবং কোটি টাকার গৃহায়ন সুবিধার আওতায় এনেছে। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে এই সুবিধাদি পাইয়ে দেবার কারণ কী? ষড়যন্ত্র তত্ত্বের নিরীখে, চলমান রাজনীতির গুরুতর কিছু অজানা পরিকল্পনা জড়িয়ে থাকায় হাদি হত্যা মামলা হিমায়িত থাকলে আপাত স্বস্তি। কারণ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ অন্ধকার হাতড়িয়ে প্রায় জায়গামত পৌঁছে গেছে বলে জানা যায়।
‘আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের চিত্র পাল্টে যাবে’- বলেছেন জামায়াত আমীর শফিকুর রহমান। আর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ইতিবাচক।’ নির্বাচনী ক্ষণগণনার প্রায় শেষপ্রান্তে এসে এমন উক্তির অন্তরালবর্তী অর্থ কী হতে পারে সেই প্রশ্ন এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। আমেরিকা জামায়াতের প্রতি অতীতে বিরূপ মনোভাব দেখিয়ে এসেছে। জামায়াতের কারণে বিএনপিকে বছরের পর বছর মৌলবাদীর তকমা দিয়ে রেখেছিল মার্কিনীরা। ২০১৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে সহিংস ও তৎপর সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রথম তিনটির একটি চিহ্নিত হয়েছিল জামায়াতের অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির। এটি নির্ধারণ করেছিল বিশ্বে সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক
এখন সেই জামায়াত, যারা প্রকাশ্যেই নারীর ক্ষমতায়ন সহ্য করে না, তারা অর্ধেক নারী ভোটারের এই দেশে কীভাবে গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বিবেচিত হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দেশের ওয়াকেবহাল মহলে নানা উপাত্ত আলোচিত হচ্ছে। তার ভেতর সম্ভাব্য একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব তীব্রভাবে মানুষের শান্তি হরণের কারণ হয়েছে। চাপের মুখে চাপিয়ে দেওয়া সামরিক ছত্রছায়ায় একটি গণতান্ত্রিক সরকার, যা নিয়ন্ত্রণ করবে জামায়াত। এমন কিছু সত্যই যদি পাকিয়ে ওঠে তার পরিণতি ভাবলে অবশ্যই শিউরে উঠতে হয়। মাত্র চুয়ান্ন বছর আগে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী এই জাতির নেতৃত্ব দেবে সেই যুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি চরম বিতর্কিত এক ধর্মাশ্রয়ী গোষ্ঠি! আর এই দেশের মুক্ত নাগরিক সমাজ যাদের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ; তারা সেই নেতৃত্ব মেনে নেবে? তেমন ক্ষেত্রে এই দেশ অজানা কোন অন্ধকার গহব্বরে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতিতে অগ্রসর হলে হয়তো মোটেই অবাক হওয়া যাবে না।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, প্রবন্ধকার]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
বশীর আহমেদ
সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
অতিশয় ছোট্ট এক উক্তি, করেছেন একজন বয়স্ক জামায়াতী নেতা। এটা বলা হয়েছিল প্রায় মাসখানেক আগে। আকারে ছোট হলেও বিরাজমান পরিস্থিতিতে তা গুরুত্ববহ বলতেই হবে। তিনি কর্মী সমর্থকদের আহবান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘বিগত চুয়ান্ন বচ্ছরের প্রতিশোধ ইনশাআল্লাহ আগামী ফেব্রুয়ারিতে নেওয়ার সুযোগ আছে, তোমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যাও।’
পরের ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনা করলে স্পষ্ট হবে যে, এটা নিছক বলার জন্য বলা হয়নি; বরং তা সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত ছিল। হ্যাঁ, প্রতিশোধের প্রস্তুতি জামায়াত যথেষ্টই নিয়েছে। সেটা কেবল দেশে নয়, দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশ ভূমিতেও। সম্প্রতি পোস্টাল ব্যালট নিয়ে যে বিস্ময়কর জালিয়াতি চাউর হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের নিরবতা ও দায়সারা ব্যাখ্যা এসেছে, তা জামায়াতের পরিকল্পিত প্রতিশোধ প্রস্তুতির নিরেট প্রমান বহন করে।
সাধারণ জনগণের সচেতন নজরদারীতে ধরা পড়ে যাওয়া সেই অচিন্ত্যনীয় ‘প্রতিশোধ প্রস্তুতি’র আরও যেসব বেআইনী নমুনা সামনে এসেছে তা সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সহায়ক না হলেও নির্বাচন কমিশন যথারীতি নিশ্চুপ। যেমন, জামায়াতের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের প্রলুব্ধ এবং এনআইডি নাম্বার, মোবাইলের বিকাশ নাম্বার সংগ্রহ করছে। কোরআন মাজিদ ছুঁইয়ে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করছে। নগদ অর্থসহ পরকালে জান্নাত প্রাপ্তির লোভ দেখাচ্ছে। এগুলো করা হচ্ছে প্রকাশ্যে, অনেকটাই দাপটের সাথেই। কয়দিন আগে এই নিয়ে ঢাকার মিরপুরে এলাকাবাসীর সাথে জামায়াত কর্মীদের তুমুল দাঙ্গা হাঙ্গামাও হয়ে গেছে। তথাপি নজিরবিহীন এমন অনাসৃষ্টি অব্যাহতই আছে। সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন আইটেম। সেটা হলো, জামায়াত তার কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচনের দিন ফজরের নামাজ ভোটকেন্দ্রে আদায় করতে। এর অন্তরালবর্তী মোজেজা তারাই ভালো বলতে পারবে। উপস্থিত এটুকু অন্তত ধারণা করা যায়, এই নবতর উদ্যোগ ভালো কিছুর আলামত হতেই পারে না।
এই মুহুর্তে দেশবাসীর ঘাড়ের উপর অনিশ্চিতির খড়গ ঠিক যেন ডেমোক্লিসের তরবারির মত ঝুলে আছে। প্রতি মুহুর্তে আসছে মন খারাপ করা সব খবর। চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বের এতো সমাহার আগে কখনো দেখা বা শোনা যায়নি। কি হচ্ছে আসলে? বিগত ১৭ বছর ভোট বঞ্চিত জনগণের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণে যে নির্বাচনটি হওয়ার কথা ছিল আনন্দ উৎসব মুখর, তা ক্রমান্বয়ে মরুভূমির বুকে যেন বিষাদসিন্ধুর পরিণতি বরণ করতে চাইছে। অথচ নির্বাচন কমিশনের কোন নড়ন-চড়ন নেই। কেন? তারা কি দন্তনখরবিহীন? এই তো গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরে দুইটি তাজা প্রাণ অকালে নিভে গেল! সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সেনা প্রহরার ভেতর কিছু মানুষ গোঁ ধরে থেকে হাঙ্গামা করার এতো সাহস পেল কীভাবে? এ অবস্থায়, সাধারণ মানুষ তাদের জান মাল নিরাপদ ভাববে আর কোন ভরসায়?
শুধু কি তাই? অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাও যারপর নাই প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যসব বাদ দিলেও নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোট নিয়ে সরকারের অবস্থান তীব্র সমালোচিত। সরকার গণভোটের কার্যকারণ উপস্হাপন করতে পারে; নিজে একটি পক্ষ হতে পারে না। অথচ তাই করা হয়েছে এবং হ্যাঁ এর পক্ষ সমর্থনে প্রচার প্রচারণায় জনগণের কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে। এখন সরকারি দপ্তরগুলো হ্যাঁ ভোটের বেআইনি প্রচারণায় সরব। গণভোট তো ভোটই, এবং তাতে মতামত দেওয়া কেবলমাত্র ভোটারের একান্ত বিবেচনার বিষয়। সরকার নিজে একটি পক্ষ হলে তাকে ভোট বলার অবকাশ থাকে না। এই অযাচিত সরকারি হস্তক্ষেপে গণভোট বাস্তবে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। এতে সাধারণ মানুষ সংক্ষুব্ধ। কী হবে এর ভবিষ্যৎ, তা জানেন একমাত্র ভবিতব্য।
গণসমাজের এই উদ্বেগ, বহু অঘটন সত্ত্বেও নির্বাচন ঘোষনার মধ্য দিয়ে সুস্থির হতে আরম্ভ করেছিল। কিন্তু হঠাৎ করে ইনকিলাব মঞ্চের হাদি হত্যাকাণ্ডে দ্রুতই গণহিস্টিরিয়ায় পরিণত হয়। অতপর বুড়িগঙ্গায় গড়িয়ে যায় অনেক পানি। বহু চেনা মুখের অতি উৎসাহী তৎপরতা দেখেন দেশবাসী। আহা, কি যে পেরেশানি! কেউ লাফিয়ে হাদির কবরে পর্যন্ত নেমে পড়েন। যেন পারলে কবরেই থেকে যাওয়ার উপক্রম। মাতম আর মাতম উঠানো হলো চারিদিকে। শোকের আতিশয্য এমন করার চেষ্টা চললো, নিহত হাদি যেন বঙ্গবন্ধু অথবা শহীদ জিয়ার মতই একজন অকালপ্রয়াত জননন্দিত জাতীয় নেতা। যড়যন্ত্র তত্ত্বমতে, সেদিন জানাযা শেষে হাদিকে কবরে রেখে এসে এমন কিছু ঘটানোর পরিকল্পনা ছিল, যার ফলশ্রুতি হতে পারতো হতবাক করার মত। সবাই দেখলেন, হাদির জানাযা শেষ হওয়ামাত্র মবস্রোত ছুটে গেল জাতীয় সংসদ ভবনে। তারা প্রায় ঢুকেই পড়েছিল। সতর্ক সেনা কমান্ডোরা মবক্রেসি কার্যকরভাবে নিষ্ক্রীয় করলে সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। তথাপি পাল্টা হামলায় প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ভবন ধ্বংস ঠিকই রক্ষা করা যায়নি। আর এই চক্রের প্রধান কুশিলব প্রচুর হম্বতম্বি শেষে এখন প্রায় মৌনব্রতে।
এতো কিছু যার মৃত্যু নিয়ে, সেই ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে প্রথমে খেই হারালেও পুলিশের পেশাদারিত্বই বিজয়ী হয়েছে। পরে ওই হত্যায় জড়িত সন্দেহে সামনে এসেছে এক জামায়াত নেতার ছেলের নাম। এটি প্রথম আলোচনায় আসে ১৪ জানুয়ারি ইনকিলাব মঞ্চ ঢাবি শাখার মুখপাত্র জুমার এক পোস্টের মাধ্যমে। তাতে দাবি করা হয়, হত্যার পরিকল্পকরা জানাজা নামাজে সামনের কাতারেই ছিল। জুমা বলেন, চার্জশিটে মাসুদ আর বাপ্পিকে হত্যায় সরাসরি জড়িত বলা হয়েছে। আর আছে ঘটনার পরে ঘটা সবকিছু। এই মাস্টারমাইন্ডদের বের করা কি পসিবল নয়, নাকি ইচ্ছে করেই করতে দেয়া হচ্ছে না তিনি বলেছেন, এরা কারা, কী এমন শক্তি যে তাদের সামনে আনা যায় না এমন ভয়ানক উক্তির পরও হাদি হত্যার পরিণতি নিহত সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা মামলার মতোই থমকে আছে মনে করা যায়। এদিকে, সরকার হাদির ভাইকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি এবং কোটি টাকার গৃহায়ন সুবিধার আওতায় এনেছে। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে এই সুবিধাদি পাইয়ে দেবার কারণ কী? ষড়যন্ত্র তত্ত্বের নিরীখে, চলমান রাজনীতির গুরুতর কিছু অজানা পরিকল্পনা জড়িয়ে থাকায় হাদি হত্যা মামলা হিমায়িত থাকলে আপাত স্বস্তি। কারণ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ অন্ধকার হাতড়িয়ে প্রায় জায়গামত পৌঁছে গেছে বলে জানা যায়।
‘আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের চিত্র পাল্টে যাবে’- বলেছেন জামায়াত আমীর শফিকুর রহমান। আর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ইতিবাচক।’ নির্বাচনী ক্ষণগণনার প্রায় শেষপ্রান্তে এসে এমন উক্তির অন্তরালবর্তী অর্থ কী হতে পারে সেই প্রশ্ন এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। আমেরিকা জামায়াতের প্রতি অতীতে বিরূপ মনোভাব দেখিয়ে এসেছে। জামায়াতের কারণে বিএনপিকে বছরের পর বছর মৌলবাদীর তকমা দিয়ে রেখেছিল মার্কিনীরা। ২০১৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে সহিংস ও তৎপর সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রথম তিনটির একটি চিহ্নিত হয়েছিল জামায়াতের অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির। এটি নির্ধারণ করেছিল বিশ্বে সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক
এখন সেই জামায়াত, যারা প্রকাশ্যেই নারীর ক্ষমতায়ন সহ্য করে না, তারা অর্ধেক নারী ভোটারের এই দেশে কীভাবে গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বিবেচিত হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দেশের ওয়াকেবহাল মহলে নানা উপাত্ত আলোচিত হচ্ছে। তার ভেতর সম্ভাব্য একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব তীব্রভাবে মানুষের শান্তি হরণের কারণ হয়েছে। চাপের মুখে চাপিয়ে দেওয়া সামরিক ছত্রছায়ায় একটি গণতান্ত্রিক সরকার, যা নিয়ন্ত্রণ করবে জামায়াত। এমন কিছু সত্যই যদি পাকিয়ে ওঠে তার পরিণতি ভাবলে অবশ্যই শিউরে উঠতে হয়। মাত্র চুয়ান্ন বছর আগে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী এই জাতির নেতৃত্ব দেবে সেই যুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি চরম বিতর্কিত এক ধর্মাশ্রয়ী গোষ্ঠি! আর এই দেশের মুক্ত নাগরিক সমাজ যাদের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ; তারা সেই নেতৃত্ব মেনে নেবে? তেমন ক্ষেত্রে এই দেশ অজানা কোন অন্ধকার গহব্বরে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতিতে অগ্রসর হলে হয়তো মোটেই অবাক হওয়া যাবে না।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, প্রবন্ধকার]