alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

আল শাহারিয়া

: সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আধুনিক সভ্যতাকে যদি একটি মাত্র উপাদানে সংজ্ঞায়িত করতে বলা হয় তবে সেটি নিঃসন্দেহে প্লাস্টিক। সকালের ঘুম থেকে ওঠার পর টুথব্রাশটি হাতে নেয়া থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগে পানির বোতলটি পর্যন্ত আমাদের দিনের প্রতিটি মুহূর্ত প্লাস্টিকের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। একসময় যা ছিল বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার আজ তা মানবসভ্যতার জন্য এক অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এমন এক জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলেছি যেখানে প্লাস্টিক ছাড়া একটি দিন কল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সহজলভ্য ও সস্তা উপাদানটি আমাদের অজান্তেই শরীরের ভেতর এক ভয়াবহ বিষক্রিয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণকে আমরা এতদিন কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখে এসেছি। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে এটি এখন আর কেবল পরিবেশের ক্ষতি করছে না বরং সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানছে।

প্লাস্টিকের ওপর আমাদের এই নির্ভরতা একদিনে তৈরি হয়নি। এর স্থায়িত্ব এবং কম খরচের কারণে এটি দ্রুতই কাচ বা মাটির মতো প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা বাজার করতে গেলে পলিথিন চাই এবং পানি খেতে গেলে প্লাস্টিকের বোতল খুঁজি। এই স্বাচ্ছন্দ্য আমাদের অন্ধ করে রেখেছে। আমরা ভুলে গেছি যে প্লাস্টিক পচনশীল নয়। এটি প্রকৃতিতে মিশে যেতে শত শত বছর সময় নেয়। কিন্তু আসল ভয়ের কারণ দৃশ্যমান প্লাস্টিক বর্জ্য নয় বরং অদৃশ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক। বড় প্লাস্টিক ভেঙে যখন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয় তখন তাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এই কণাগুলো এতটাই ছোট যে তা খালি চোখে দেখা যায় না। বাতাসের মাধ্যমে বা পানির সঙ্গে মিশে এগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় মানুষের রক্তে- এমনকি মাতৃগর্ভে থাকা ভ্রণের প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো জন্মের আগেই একটি শিশু প্লাস্টিক দূষণের শিকার হচ্ছে, যা মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত।

খাদ্যশৃঙ্খলে প্লাস্টিকের অনুপ্রবেশ এখন এক প্রমাণিত সত্য। আমরা যেসব সামুদ্রিক মাছ বা মিঠা পানির মাছ খাই সেগুলোর পেটে প্লাস্টিকের কণা পাওয়া যাচ্ছে। নদী ও সাগরে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য মাছের শরীরে ঢুকছে এবং মাছের মাধ্যমে তা মানুষের শরীরে আসছে। এছাড়া লবণের দানা থেকে শুরু করে বোতলজাত পানীয় জলেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব মিলেছে। আমরা যখন প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার খাই বা প্লাস্টিকের কাপে চা পান করি তখন তাপের সংস্পর্শে এসে প্লাস্টিক থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ খাবারের সঙ্গে মিশে যায়। বিসফেনল-এ বা বিপিএ এবং থ্যালেটস নামক রাসায়নিকগুলো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। চিকিৎসকরা বলছেন বর্তমান সময়ে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং থাইরয়েডের সমস্যার পেছনে এই রাসায়নিকগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এসব রাসায়নিক ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আমাদের দেশে প্লাস্টিক ব্যবহারের ধরনটি জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। রেস্তোরাঁ থেকে গরম ঝোল বা তরকারি পলিথিনে করে বাড়িতে নিয়ে আসার দৃশ্য খুবই সাধারণ। নিম্নমানের পলিথিনে গরম খাবার রাখার ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে যা খাবারকে বিষাক্ত করে তোলে। এছাড়া ওয়ান-টাইম প্লেট ও গ্লাসের ব্যবহার মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো ব্যবহারের পর যত্রতত্র ফেলা হয়। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ এই প্লাস্টিক বর্জ্য। যখনই একটু বৃষ্টি হয় তখনই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং নোংরা পানি রাস্তায় উঠে আসে। এই জমা পানিতে মশা জন্মায় যা ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ায়। অর্থাৎ প্লাস্টিক বর্জ্য পরোক্ষভাবে সংক্রামক ব্যাধি বিস্তারেও সহায়তা করছে। জলাবদ্ধতার কারণে পানির সঙ্গে পয়ঃবর্জ্য মিশে টাইফয়েড ও কলেরার মতো পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। শহরের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে এই প্লাস্টিক জট বা বর্জ্য অব্যবস্থাপনা সরাসরি দায়ী।

অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের কথা ভেবে আমরা প্লাস্টিক ব্যবহার করি কিন্তু এর স্বাস্থ্যগত মূল্য অনেক বেশি। একজন ক্যানসার বা কিডনি রোগীর চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। প্লাস্টিক দূষণজনিত রোগের কারণে জাতীয় স্বাস্থ্য খাতে যে চাপ পড়ে তা অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বোঝা। সস্তা প্লাস্টিকের খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের শরীর ও সম্পদ দিয়ে। অথচ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই স্বাস্থ্যব্যয়ের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায় না। প্লাস্টিক শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়িক স্বার্থ অনেক সময় জনস্বাস্থ্যের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে আমরা একটি অসুস্থ প্রজন্ম তৈরি করব যারা জন্মগতভাবেই নানা শারীরিক জটিলতা বহন করবে।

এটি স্পষ্ট যে প্লাস্টিক সংকট এখন আর কেবল পরিবেশবাদীদের আলোচনার বিষয় নয়। এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। আমাদের শরীর ও রক্তে প্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে আমরা বিপদসীমা অতিক্রম করে ফেলেছি। এখন আর সতর্ক হওয়ার সময় নেই বরং এখন সময় প্রতিরোধের। জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন করা কঠিন হতে পারে কিন্তু অসম্ভব নয়। কাচ, মাটি, পাট ও ধাতব পণ্যের ব্যবহার ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে আমরা প্লাস্টিকের শিকল ভাঙতে পারি। একটি সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবীর জন্য প্লাস্টিকমুক্ত জীবনযাপন কেবল একটি স্লোগান নয় বরং এটি বাঁচার একমাত্র উপায়। নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের এই প্লাস্টিক মহামারী থেকে রক্ষা করতে। আসুন আমরা প্লাস্টিককে না বলি এবং জীবনের জয়গান গাই।

[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

চক্রে চক্রে আন্ধাচক্র

‘বাংলাদেশপন্থী’ এক অস্পষ্ট ধারণা: রাষ্ট্র না মানুষ আগে

গুরু রবিদাস: সমতার বার্তা ও মানবতাবাদী শিক্ষার প্রতিধ্বনি

অপরাধ দমন না অধিকার সুরক্ষা?

ভোটের মাস, ভাষার মাস

ব্যর্থতা নৈতিক নয় কাঠামোগত: দুর্নীতি ও বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা

জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে সহজে ফেরত আনবেন কীভাবে?

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

মন্ত্রীদের জন্য বিলাসী ফ্ল্যাট

ধর্মান্ধ আর প্রতিযোগিতা: দুই সাম্প্রদায়িকের খেলা

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী: সমাজের নতুন ব্যাধি

ছবি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

‘খাল কেটে কুমির আনা...’

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

অধিকারহীনতার বৃত্তে আদিবাসী জীবন

স্লোগানে ফ্যাসিবাদ, ভোটের মাঠে আশির্বাদ!

ভাঙা-গড়া সমাজের আমূল পরিবর্তন আনে

শান্তির বৃত্তে বাঁধা বাঘ

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

ছবি

জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রিনল্যান্ড: নতুন ভূ-রাজনীতির ইঙ্গিত

ব্যাংকিং খাত: সংকট, সংস্কার ও আস্থার সন্ধান

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

কুষ্ঠ-সম্পর্কিত কুসংস্কার ও বৈষম্য

ব্যাংক ধসের দায় কার?

পশ্চিমবঙ্গে অহেতুক হয়রানির মূল টার্গেট মুসলমানেরাই

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান

নির্বাচনের আগেই জানা গেল আংশিক ফল!

শীতকালীন অসুখ-বিসুখ

দিশাহীন অর্থনীতি, নিষ্ক্রিয় অন্তর্বর্তী সরকার

নরসুন্দরের পোয়াবারো

জামায়াতের ‘অক্টোপাস পলিসি’ কৌশল নাকি রাজনৈতিক বিভ্রান্তি?

ছবি

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও গোলক ধাঁধা

আগুনের ছাইয়ে কলমের আলো

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

আল শাহারিয়া

সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আধুনিক সভ্যতাকে যদি একটি মাত্র উপাদানে সংজ্ঞায়িত করতে বলা হয় তবে সেটি নিঃসন্দেহে প্লাস্টিক। সকালের ঘুম থেকে ওঠার পর টুথব্রাশটি হাতে নেয়া থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগে পানির বোতলটি পর্যন্ত আমাদের দিনের প্রতিটি মুহূর্ত প্লাস্টিকের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। একসময় যা ছিল বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার আজ তা মানবসভ্যতার জন্য এক অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এমন এক জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলেছি যেখানে প্লাস্টিক ছাড়া একটি দিন কল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সহজলভ্য ও সস্তা উপাদানটি আমাদের অজান্তেই শরীরের ভেতর এক ভয়াবহ বিষক্রিয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণকে আমরা এতদিন কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখে এসেছি। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে এটি এখন আর কেবল পরিবেশের ক্ষতি করছে না বরং সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানছে।

প্লাস্টিকের ওপর আমাদের এই নির্ভরতা একদিনে তৈরি হয়নি। এর স্থায়িত্ব এবং কম খরচের কারণে এটি দ্রুতই কাচ বা মাটির মতো প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা বাজার করতে গেলে পলিথিন চাই এবং পানি খেতে গেলে প্লাস্টিকের বোতল খুঁজি। এই স্বাচ্ছন্দ্য আমাদের অন্ধ করে রেখেছে। আমরা ভুলে গেছি যে প্লাস্টিক পচনশীল নয়। এটি প্রকৃতিতে মিশে যেতে শত শত বছর সময় নেয়। কিন্তু আসল ভয়ের কারণ দৃশ্যমান প্লাস্টিক বর্জ্য নয় বরং অদৃশ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক। বড় প্লাস্টিক ভেঙে যখন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয় তখন তাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এই কণাগুলো এতটাই ছোট যে তা খালি চোখে দেখা যায় না। বাতাসের মাধ্যমে বা পানির সঙ্গে মিশে এগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় মানুষের রক্তে- এমনকি মাতৃগর্ভে থাকা ভ্রণের প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো জন্মের আগেই একটি শিশু প্লাস্টিক দূষণের শিকার হচ্ছে, যা মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত।

খাদ্যশৃঙ্খলে প্লাস্টিকের অনুপ্রবেশ এখন এক প্রমাণিত সত্য। আমরা যেসব সামুদ্রিক মাছ বা মিঠা পানির মাছ খাই সেগুলোর পেটে প্লাস্টিকের কণা পাওয়া যাচ্ছে। নদী ও সাগরে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য মাছের শরীরে ঢুকছে এবং মাছের মাধ্যমে তা মানুষের শরীরে আসছে। এছাড়া লবণের দানা থেকে শুরু করে বোতলজাত পানীয় জলেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব মিলেছে। আমরা যখন প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার খাই বা প্লাস্টিকের কাপে চা পান করি তখন তাপের সংস্পর্শে এসে প্লাস্টিক থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ খাবারের সঙ্গে মিশে যায়। বিসফেনল-এ বা বিপিএ এবং থ্যালেটস নামক রাসায়নিকগুলো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। চিকিৎসকরা বলছেন বর্তমান সময়ে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং থাইরয়েডের সমস্যার পেছনে এই রাসায়নিকগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এসব রাসায়নিক ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আমাদের দেশে প্লাস্টিক ব্যবহারের ধরনটি জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। রেস্তোরাঁ থেকে গরম ঝোল বা তরকারি পলিথিনে করে বাড়িতে নিয়ে আসার দৃশ্য খুবই সাধারণ। নিম্নমানের পলিথিনে গরম খাবার রাখার ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে যা খাবারকে বিষাক্ত করে তোলে। এছাড়া ওয়ান-টাইম প্লেট ও গ্লাসের ব্যবহার মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো ব্যবহারের পর যত্রতত্র ফেলা হয়। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ এই প্লাস্টিক বর্জ্য। যখনই একটু বৃষ্টি হয় তখনই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং নোংরা পানি রাস্তায় উঠে আসে। এই জমা পানিতে মশা জন্মায় যা ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ায়। অর্থাৎ প্লাস্টিক বর্জ্য পরোক্ষভাবে সংক্রামক ব্যাধি বিস্তারেও সহায়তা করছে। জলাবদ্ধতার কারণে পানির সঙ্গে পয়ঃবর্জ্য মিশে টাইফয়েড ও কলেরার মতো পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। শহরের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে এই প্লাস্টিক জট বা বর্জ্য অব্যবস্থাপনা সরাসরি দায়ী।

অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের কথা ভেবে আমরা প্লাস্টিক ব্যবহার করি কিন্তু এর স্বাস্থ্যগত মূল্য অনেক বেশি। একজন ক্যানসার বা কিডনি রোগীর চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। প্লাস্টিক দূষণজনিত রোগের কারণে জাতীয় স্বাস্থ্য খাতে যে চাপ পড়ে তা অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বোঝা। সস্তা প্লাস্টিকের খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের শরীর ও সম্পদ দিয়ে। অথচ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই স্বাস্থ্যব্যয়ের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায় না। প্লাস্টিক শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়িক স্বার্থ অনেক সময় জনস্বাস্থ্যের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে আমরা একটি অসুস্থ প্রজন্ম তৈরি করব যারা জন্মগতভাবেই নানা শারীরিক জটিলতা বহন করবে।

এটি স্পষ্ট যে প্লাস্টিক সংকট এখন আর কেবল পরিবেশবাদীদের আলোচনার বিষয় নয়। এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। আমাদের শরীর ও রক্তে প্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে আমরা বিপদসীমা অতিক্রম করে ফেলেছি। এখন আর সতর্ক হওয়ার সময় নেই বরং এখন সময় প্রতিরোধের। জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন করা কঠিন হতে পারে কিন্তু অসম্ভব নয়। কাচ, মাটি, পাট ও ধাতব পণ্যের ব্যবহার ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে আমরা প্লাস্টিকের শিকল ভাঙতে পারি। একটি সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবীর জন্য প্লাস্টিকমুক্ত জীবনযাপন কেবল একটি স্লোগান নয় বরং এটি বাঁচার একমাত্র উপায়। নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের এই প্লাস্টিক মহামারী থেকে রক্ষা করতে। আসুন আমরা প্লাস্টিককে না বলি এবং জীবনের জয়গান গাই।

[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

back to top