ফকর উদ্দিন মানিক
ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের কণ্ঠে হঠাৎ করে এক ধরনের আধ্যাত্মিক কম্পন শুরু হয়। বাতাসে ভেসে বেড়ায় শব্দ-“অমর একুশে”, “ভাষার মাস”, “চেতনার দীপশিখা”। ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাতে আমরা খালি পায়ে হেঁটে যাই শহীদ মিনারের দিকে। হাতে ফুল, চোখে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, মুখে গাম্ভীর্য। মনে হয়, ভাষার জন্য আমাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস যেন আবারও পুনর্জন্ম নিচ্ছে।কিন্তু প্রশ্ন হলো-পুনর্জন্মটা কোথায়? ভাষায়, নাকি আচার-অনুষ্ঠানে?
১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০০০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হচ্ছে। বিশ্বের প্রায় ৭,০০০ ভাষার মধ্যে বহু ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে- এই বাস্তবতা তুলে ধরতেই এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। অর্থাৎ, এটি কেবল আমাদের গৌরবের স্মারক নয়; এটি ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার বৈশ্বিক আহ্বান। কিন্তু আমরা এই আহ্বানকে কীভাবে গ্রহণ করেছি?
আমরা ভাষাকে সম্মান জানাতে গিয়ে তাকে মূর্তির আসনে বসিয়েছি। মূর্তি সম্মানের প্রতীক, কিন্তু মূর্তি কথা বলে না। আমরা বাংলা ভাষাকে জীবন্ত সংলাপ থেকে সরিয়ে এনে স্মৃতিস্তম্ভে বসিয়ে দিয়েছি। সেখানে ফুল দেয়া যায়, কিন্তু ফাইল লেখা যায় না।
১৯৫২ সালে ভাষার দাবিতে যে রক্ত ঝরেছিল, তা কেবল একটি ভাষার প্রশাসনিক স্বীকৃতির জন্য ছিল না; ছিল আত্মপরিচয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বাঙালির জীবনদান ছিল উপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। ভাষা তখন ছিল প্রতিরোধের অস্ত্র, আত্মমর্যাদার ঘোষণা। আজ সেই ভাষা কোথায় দাঁড়িয়ে?
আমাদের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষা। সরকারি দপ্তরে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ফাইল ইংরেজিতে, চুক্তিপত্র ইংরেজিতে, আদালতের রায় ইংরেজিতে। উচ্চশিক্ষার পাঠ্যপুস্তক অধিকাংশই ইংরেজিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাপত্র ইংরেজিতে না লিখলে আন্তর্জাতিক জার্নালে ছাপা কঠিন। ফলে বাংলা ভাষা ধীরে ধীরে প্রশাসন ও জ্ঞানচর্চার প্রান্তিক দর্শকে পরিণত হচ্ছে।
আমরা যেন ভাষাকে দুই ভাগে ভাগ করেছি-একটি আবেগের বাংলা, অন্যটি কাজের ইংরেজি। আবেগের বাংলা কবিতায়, গানে, বক্তৃতায়। কাজের ইংরেজি অফিসে, আদালতে, গবেষণাগারে। যেন বাংলা হৃদয়ের, ইংরেজি মস্তিষ্কের। এই বিভাজনই আমাদের সবচেয়ে বড় আত্মপ্রতারণা।
ভাষা কেবল অনুভূতির বাহন নয়; ভাষা জ্ঞানের কাঠামো। যে ভাষায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন, অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয় না, সে ভাষা ধীরে ধীরে অলংকারে পরিণত হয়। আমরা কি বাংলাকে অলংকার বানাতে চাই?
২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানমালায় বক্তৃতা হয়-“মাতৃভাষা আমাদের অস্তিত্ব।” কিন্তু বক্তৃতার শেষ লাইনটি প্রায়শই ইংরেজিতে: Thank you সবাইকে। এই মিশ্র উচ্চারণে আমরা গ্লোবাল নাগরিকত্বের আনন্দ পাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো-গ্লোবাল হওয়া মানে কি নিজস্ব ভাষাকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া?
বিশ্বের বহু উন্নত দেশ তাদের মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চা করে বিশ্বমানে পৌঁছেছে। জাপান, ফ্রান্স, কোরিয়া-তারা নিজস্ব ভাষায় প্রযুক্তি ও গবেষণা এগিয়ে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি শিখেছে, কিন্তু নিজেদের জ্ঞানভিত্তি গড়েছে মাতৃভাষায়। আমরা বরং উল্টো পথে হাঁটছি-আমরা আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষাকেই জ্ঞানের একমাত্র ভাষা বানিয়ে ফেলেছি।
ফলে জন্ম নিচ্ছে এক অদ্ভুত সামাজিক বৈষম্য। ইংরেজি-মাধ্যমে শিক্ষিত এক শ্রেণি দ্রুত উপরে উঠছে, আর বাংলা-মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভুগছে। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; সামাজিক শ্রেণিবিভাজনের হাতিয়ার। মাতৃভাষা দিবসের মঞ্চে আমরা সমতার কথা বলি, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষার ভিত্তিতে অসমতার কাঠামো টিকিয়ে রাখি।
আমাদের শহীদ মিনার তাই এক গভীর রূপক। সেখানে আমরা ফুল দিই, কিন্তু ভাষানীতি নিয়ে সারা বছর তেমন কোনো জনআলোচনা দেখি না। বাংলা ভাষায় মানসম্মত বিজ্ঞানপাঠ, প্রযুক্তি-শব্দভাণ্ডার, অনুবাদ-প্রকল্প-এসব নিয়ে রাষ্ট্র বা সমাজের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা খুব সীমিত। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আছে, কিন্তু তা বিচ্ছিন্ন। ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে যে ধারাবাহিক নীতি ও বিনিয়োগ দরকার, তা প্রায়শই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এখানে আমাদের ভাষাপ্রেম অনেকটা বসন্তের কোকিলের মতো। ঋতু এলেই ডাকে, ঋতু গেলেই নীরব। ফেব্রুয়ারিতে আমরা বাংলা বানানের শুদ্ধতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হই; মার্চে এসে সেই উদ্বেগ মিলিয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা ‘বাংলা বাঁচাও’ পোস্ট দিই, কিন্তু দৈনন্দিন লেখায় বানান ও ব্যাকরণকে গুরুত্ব দিই না। ভাষা যেন আমাদের কাছে উৎসবের শাড়ি-বিশেষ দিনে পরা যায়, প্রতিদিনের কাজে নয়।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল দর্শন ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা। বিশ্বের বহু আদিবাসী ও সংখ্যালঘু ভাষা বিলুপ্তির পথে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলার অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী-কোটি কোটি মানুষের ভাষা। কিন্তু সংখ্যার জোরে ভাষা টিকে থাকে না; টিকে থাকে ব্যবহারের বিস্তারে, জ্ঞানের গভীরতায়, প্রজন্মান্তরে সংক্রমণে।
আমরা যদি সত্যিই ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করতে চাই, তবে আমাদের চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাকে আধুনিক জ্ঞানের বাহন করা। প্রযুক্তিতে বাংলা ইন্টারফেস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাংলা তথ্যভা-ার, উচ্চশিক্ষায় মানসম্মত বাংলা পাঠ্য-এসব ছাড়া ভাষার মর্যাদা কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ থাকবে। ভাষা তখন ইতিহাসের গর্ব হবে, বর্তমানের শক্তি নয়।
২১ ফেব্রুয়ারি তাই আমাদের জন্য আত্মসমালোচনার দিন হওয়া উচিত। আমরা কি ভাষাকে জীবনের কেন্দ্রে রেখেছি, নাকি মঞ্চের কেন্দ্রে? আমরা কি সন্তানদের শেখাচ্ছি যে মাতৃভাষা দুর্বলতার চিহ্ন নয়, বরং আত্মপরিচয়ের ভিত্তি? আমরা কি নীতিনির্ধারণে ভাষার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিচ্ছি?
ভাষা কোনো একদিনের শোকানুষ্ঠান নয়; এটি প্রতিদিনের অনুশীলন। ফুল দেওয়া সহজ, ভাষায় জ্ঞানচর্চা কঠিন। বক্তৃতা দেওয়া সহজ, ভাষানীতি বাস্তবায়ন কঠিন। কিন্তু কঠিন পথেই টিকে থাকে ইতিহাসের অর্জন।
অতএব, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের সামনে এক আয়না ধরে। সেই আয়নায় আমরা দেখিÑআমাদের গর্ব, আমাদের দ্বিচারিতা, আমাদের সম্ভাবনা। প্রশ্ন কেবল একটাই: আমরা কি ফুলের নিচে ভাষাকে চাপা দিয়ে রাখব, নাকি তাকে প্রতিদিনের জীবনে মুক্ত বাতাসে হাঁটতে দেব?
যদি দ্বিতীয় পথ বেছে নিতে পারি, তবে ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল স্মৃতির দিন থাকবে না; হয়ে উঠবে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতিজ্ঞা। আর যদি না পারি, তবে প্রতি বছর একই ফুল, একই বক্তৃতা, একই আবেগ-আর ভাষা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবে, আমাদের অক্ষমতার সাক্ষী হয়ে।
[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
ফকর উদ্দিন মানিক
শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের কণ্ঠে হঠাৎ করে এক ধরনের আধ্যাত্মিক কম্পন শুরু হয়। বাতাসে ভেসে বেড়ায় শব্দ-“অমর একুশে”, “ভাষার মাস”, “চেতনার দীপশিখা”। ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাতে আমরা খালি পায়ে হেঁটে যাই শহীদ মিনারের দিকে। হাতে ফুল, চোখে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, মুখে গাম্ভীর্য। মনে হয়, ভাষার জন্য আমাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস যেন আবারও পুনর্জন্ম নিচ্ছে।কিন্তু প্রশ্ন হলো-পুনর্জন্মটা কোথায়? ভাষায়, নাকি আচার-অনুষ্ঠানে?
১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০০০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হচ্ছে। বিশ্বের প্রায় ৭,০০০ ভাষার মধ্যে বহু ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে- এই বাস্তবতা তুলে ধরতেই এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। অর্থাৎ, এটি কেবল আমাদের গৌরবের স্মারক নয়; এটি ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার বৈশ্বিক আহ্বান। কিন্তু আমরা এই আহ্বানকে কীভাবে গ্রহণ করেছি?
আমরা ভাষাকে সম্মান জানাতে গিয়ে তাকে মূর্তির আসনে বসিয়েছি। মূর্তি সম্মানের প্রতীক, কিন্তু মূর্তি কথা বলে না। আমরা বাংলা ভাষাকে জীবন্ত সংলাপ থেকে সরিয়ে এনে স্মৃতিস্তম্ভে বসিয়ে দিয়েছি। সেখানে ফুল দেয়া যায়, কিন্তু ফাইল লেখা যায় না।
১৯৫২ সালে ভাষার দাবিতে যে রক্ত ঝরেছিল, তা কেবল একটি ভাষার প্রশাসনিক স্বীকৃতির জন্য ছিল না; ছিল আত্মপরিচয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বাঙালির জীবনদান ছিল উপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। ভাষা তখন ছিল প্রতিরোধের অস্ত্র, আত্মমর্যাদার ঘোষণা। আজ সেই ভাষা কোথায় দাঁড়িয়ে?
আমাদের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষা। সরকারি দপ্তরে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ফাইল ইংরেজিতে, চুক্তিপত্র ইংরেজিতে, আদালতের রায় ইংরেজিতে। উচ্চশিক্ষার পাঠ্যপুস্তক অধিকাংশই ইংরেজিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাপত্র ইংরেজিতে না লিখলে আন্তর্জাতিক জার্নালে ছাপা কঠিন। ফলে বাংলা ভাষা ধীরে ধীরে প্রশাসন ও জ্ঞানচর্চার প্রান্তিক দর্শকে পরিণত হচ্ছে।
আমরা যেন ভাষাকে দুই ভাগে ভাগ করেছি-একটি আবেগের বাংলা, অন্যটি কাজের ইংরেজি। আবেগের বাংলা কবিতায়, গানে, বক্তৃতায়। কাজের ইংরেজি অফিসে, আদালতে, গবেষণাগারে। যেন বাংলা হৃদয়ের, ইংরেজি মস্তিষ্কের। এই বিভাজনই আমাদের সবচেয়ে বড় আত্মপ্রতারণা।
ভাষা কেবল অনুভূতির বাহন নয়; ভাষা জ্ঞানের কাঠামো। যে ভাষায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন, অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয় না, সে ভাষা ধীরে ধীরে অলংকারে পরিণত হয়। আমরা কি বাংলাকে অলংকার বানাতে চাই?
২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানমালায় বক্তৃতা হয়-“মাতৃভাষা আমাদের অস্তিত্ব।” কিন্তু বক্তৃতার শেষ লাইনটি প্রায়শই ইংরেজিতে: Thank you সবাইকে। এই মিশ্র উচ্চারণে আমরা গ্লোবাল নাগরিকত্বের আনন্দ পাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো-গ্লোবাল হওয়া মানে কি নিজস্ব ভাষাকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া?
বিশ্বের বহু উন্নত দেশ তাদের মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চা করে বিশ্বমানে পৌঁছেছে। জাপান, ফ্রান্স, কোরিয়া-তারা নিজস্ব ভাষায় প্রযুক্তি ও গবেষণা এগিয়ে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি শিখেছে, কিন্তু নিজেদের জ্ঞানভিত্তি গড়েছে মাতৃভাষায়। আমরা বরং উল্টো পথে হাঁটছি-আমরা আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষাকেই জ্ঞানের একমাত্র ভাষা বানিয়ে ফেলেছি।
ফলে জন্ম নিচ্ছে এক অদ্ভুত সামাজিক বৈষম্য। ইংরেজি-মাধ্যমে শিক্ষিত এক শ্রেণি দ্রুত উপরে উঠছে, আর বাংলা-মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভুগছে। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; সামাজিক শ্রেণিবিভাজনের হাতিয়ার। মাতৃভাষা দিবসের মঞ্চে আমরা সমতার কথা বলি, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষার ভিত্তিতে অসমতার কাঠামো টিকিয়ে রাখি।
আমাদের শহীদ মিনার তাই এক গভীর রূপক। সেখানে আমরা ফুল দিই, কিন্তু ভাষানীতি নিয়ে সারা বছর তেমন কোনো জনআলোচনা দেখি না। বাংলা ভাষায় মানসম্মত বিজ্ঞানপাঠ, প্রযুক্তি-শব্দভাণ্ডার, অনুবাদ-প্রকল্প-এসব নিয়ে রাষ্ট্র বা সমাজের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা খুব সীমিত। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আছে, কিন্তু তা বিচ্ছিন্ন। ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে যে ধারাবাহিক নীতি ও বিনিয়োগ দরকার, তা প্রায়শই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এখানে আমাদের ভাষাপ্রেম অনেকটা বসন্তের কোকিলের মতো। ঋতু এলেই ডাকে, ঋতু গেলেই নীরব। ফেব্রুয়ারিতে আমরা বাংলা বানানের শুদ্ধতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হই; মার্চে এসে সেই উদ্বেগ মিলিয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা ‘বাংলা বাঁচাও’ পোস্ট দিই, কিন্তু দৈনন্দিন লেখায় বানান ও ব্যাকরণকে গুরুত্ব দিই না। ভাষা যেন আমাদের কাছে উৎসবের শাড়ি-বিশেষ দিনে পরা যায়, প্রতিদিনের কাজে নয়।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল দর্শন ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা। বিশ্বের বহু আদিবাসী ও সংখ্যালঘু ভাষা বিলুপ্তির পথে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলার অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী-কোটি কোটি মানুষের ভাষা। কিন্তু সংখ্যার জোরে ভাষা টিকে থাকে না; টিকে থাকে ব্যবহারের বিস্তারে, জ্ঞানের গভীরতায়, প্রজন্মান্তরে সংক্রমণে।
আমরা যদি সত্যিই ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করতে চাই, তবে আমাদের চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাকে আধুনিক জ্ঞানের বাহন করা। প্রযুক্তিতে বাংলা ইন্টারফেস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাংলা তথ্যভা-ার, উচ্চশিক্ষায় মানসম্মত বাংলা পাঠ্য-এসব ছাড়া ভাষার মর্যাদা কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ থাকবে। ভাষা তখন ইতিহাসের গর্ব হবে, বর্তমানের শক্তি নয়।
২১ ফেব্রুয়ারি তাই আমাদের জন্য আত্মসমালোচনার দিন হওয়া উচিত। আমরা কি ভাষাকে জীবনের কেন্দ্রে রেখেছি, নাকি মঞ্চের কেন্দ্রে? আমরা কি সন্তানদের শেখাচ্ছি যে মাতৃভাষা দুর্বলতার চিহ্ন নয়, বরং আত্মপরিচয়ের ভিত্তি? আমরা কি নীতিনির্ধারণে ভাষার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিচ্ছি?
ভাষা কোনো একদিনের শোকানুষ্ঠান নয়; এটি প্রতিদিনের অনুশীলন। ফুল দেওয়া সহজ, ভাষায় জ্ঞানচর্চা কঠিন। বক্তৃতা দেওয়া সহজ, ভাষানীতি বাস্তবায়ন কঠিন। কিন্তু কঠিন পথেই টিকে থাকে ইতিহাসের অর্জন।
অতএব, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের সামনে এক আয়না ধরে। সেই আয়নায় আমরা দেখিÑআমাদের গর্ব, আমাদের দ্বিচারিতা, আমাদের সম্ভাবনা। প্রশ্ন কেবল একটাই: আমরা কি ফুলের নিচে ভাষাকে চাপা দিয়ে রাখব, নাকি তাকে প্রতিদিনের জীবনে মুক্ত বাতাসে হাঁটতে দেব?
যদি দ্বিতীয় পথ বেছে নিতে পারি, তবে ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল স্মৃতির দিন থাকবে না; হয়ে উঠবে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতিজ্ঞা। আর যদি না পারি, তবে প্রতি বছর একই ফুল, একই বক্তৃতা, একই আবেগ-আর ভাষা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবে, আমাদের অক্ষমতার সাক্ষী হয়ে।
[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]