জিয়াউদ্দীন আহমেদ
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত গণভোটসহ স্বাধীনতার পর অদ্যাবধি বাংলাদেশে চারবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৭ সনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে প্রথম গণভোট হয়, ১৯৮৫ সনে দ্বিতীয় গণভোট হয় রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়ে এবং ১৯৯১ সনে তৃতীয়টি হয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে।
গণভোটে ৭৪ লাখের বেশি ভোট বাতিল হয়েছে। হতে পারে ইচ্ছাকৃত ভুল, অথবা ভোটারের অজ্ঞতা। ব্যালটপেপারে ‘হ্যাঁ’- এর পাশে দেওয়া আছে টিক চিহ্ন এবং ‘না’-এর পাশে ছিল ক্রস। হ্যাঁ-এর পক্ষে এত কৌশলে ব্যালটপেপার ছাপানোর পরও ভোটার ভুল করলো !
জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দুইজনই সেনাপ্রধান ছিলেন এবং জনগণের ভোট না নিয়েই ক্ষমতায় বসেছিলেন, তাই দুইজনই তাদের শাসনকে বৈধতা দিতে গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। ভোটকেন্দ্রে ভোটার না গেলেও তারা দুইজনই প্রায় শতভাগ ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়ে ক্ষমতা গ্রহণকে জায়েজ করে নিয়েছিলেন। অতি সম্প্রতি ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে আরেকটি গণভোট হয়েছে, সেই ভোটে ৪৮টি প্রস্তাব-সংবলিত ‘জাতীয় জুলাই সনদ’ পাস হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই তারিখে গণভোট হওয়ায় নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো গণভোটের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারেনি, তারা তাদের এমপি নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। গণভোটের আলাদা নির্বাচন হলে এই গণভোটের ফলাফলও আগের গণভোটের মতো একচেটিয়া হতো। গণভোটে পোলিং এজেন্ট থাকে না, পোলিং কর্মকর্তারাই ব্যালটপেপারে সিল দিয়ে বাক্সে ভরেন।
জুলাই সনদকে বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি সমর্থন করেছে, এই তিন দলের নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করে এই সনদ তৈরি করেছে। এই জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব আছে, এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সংশ্লিষ্ট। এই ৪৮টি প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’-ভোট জয়ী হয়েছে। তবে এই ৪৮টি প্রস্তাবের সবগুলোতে সব দলের ঐকমত্য ছিল না, কোন কোন প্রস্তাবে কোন কোন দলের ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। মতের ভিন্নতাকে গুরুত্ব না দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের প্রস্তাবগুলো হুবহু গণভোটে দিয়ে দিয়েছে। বিএনপি জোর প্রতিবাদ করেনি, কারণ তাদের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় সংসদের নির্বাচন, গণভোট নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা ছিল না। বিএনপির ধারণা ছিল, গণভোট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বাদানুবাদ লেগে থাকলে যে কোন উছিলায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভ-ুল হয়ে যেতে পারে। বিএনপির কিছু অংশ ‘হ্যাঁ-ভোট’, কিছু অংশ ‘না-ভোট’ দিয়েছে; যারা আওয়ামী লীগ ও ভারতের কট্টর বিরোধী তারা হ্যাঁ-ভোট দিয়েছে, যারা কিছুটা লিবারেল তারা না-ভোট দিয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যারা ভোট দিয়েছে তারাও সম্ভবত ‘না-ভোট’ দিয়েছে। যারা ‘না-ভোট’ দিয়েছে তারাও জানতো ‘হ্যাঁ’ জিতবে।
রাজশাহী-৪ আসনে নাকি একটি অদ্ভুত কা- ঘটেছে, এই আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯০৯, অথচ ‘হ্যাঁ-না’তে নাকি ভোট পড়েছে ৭ লাখ ৮১ হাজার ৫২৩। এর ফলে কাস্টিং ভোটের হার দাঁড়ায় ২৪৪ শতাংশ। ১৯৭৭ সনের গণভোটেও জিয়াউর রহমানের পক্ষে কোন কোন কেন্দ্রে শতভাগের বেশি ভোট পড়েছিল, কিন্তু এত বেশি নয়। তাই ২৪৪ শতাংশ ভোট কাস্টিং বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে এবারের নির্বাচনেও কারচুপি হয়েছে, কিন্তু এত জঘন্য কারচুপি হওয়ার কথা নয়। এত ব্যালটপেপার ওখানে এলো কোত্থেকে ? তাহলে কি ব্যালটপেপার ছাড়াই হিসাব করা হয়েছে? এমন ভুতুড়ে কা- নেত্রকোনার তিনটি আসনেও হয়েছে, ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা ওই আসনগুলোর মোট ভোটারের চেয়েও বেশি দেখানো হয়েছে। ভোটারের চেয়ে ভোট পড়েছে বেশি, যারা অবৈধ পথে সিল মেরে ব্যালটপেপার বাক্সে ফেলে তাদের হিসাব করার হুঁশ থাকে না। কোন কালেই হিসাব করে কারচুপি হয়নি, হিসাব করে কারচুপি করা যায়ও না। এবার কারচুপির হিসাব করতে হয়েছে নানা আঙ্গিকে, ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের সংখ্যার সঙ্গে সাজুয্য রাখতে হয়েছে এমপির ভোটের। নির্বাচন কমিশন সিরাজগঞ্জ এবং রাজশাহীর উক্ত দুটি আসনের গণভোটের ফলাফল সংশোধন করলেও নেত্রকোনার তিনটি আসনের ফলাফল অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।রাজশাহী এবং সিরাজগঞ্জের ভুল সংশোধন করা হলেও গণভোটের মোট ফলাফল ও শতকরা হিসাব অপরিবর্তিত থেকে গেছে।
আরও একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে, সিরাজগঞ্জ-১ আসনে গণভোট পড়ার হার মাত্র ৭ শতাংশ, অথচ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে ভোট পড়েছে ৬০.৮৩ শতাংশ। মনে হয় ভোটার ভোট দেয়নি, ভোট দিলে ইস্যু করা ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের ব্যালটপেপার গেল কই? ভোটের বাক্স থাকে পোলিং কর্মকর্তার সম্মুখে, এত বিপুল সংখ্যক ভোটার ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের ব্যালটপেপার পকেটে করে নিয়ে যেতে পারে না, নেওয়ার চেষ্টা করলে তা পোলিং কর্মকর্তার নজরে পড়ত। গোপালগঞ্জ আসন হলে হিসাবটি বিশ্বাসযোগ্য হতো, সিরাজগঞ্জ আসনে এত কম ভোট পড়বে কেন? দেশে মোট ২৯৯টি আসনের মধ্যে শুধু ১১টি আসনে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে এবং এই ১১টি সংসদীয় আসনের ১০টিতেই জিতেছে বিএনপির প্রার্থী। এতেই প্রমাণিত হয়, বিএনপির সব ভোটার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ছিল না। দলীয় নির্দেশনার ভিত্তিতে বিএনপির হ্যাঁ-না ভোট হয়নি, হয়েছে বিএনপির কর্মী ও সমর্থকদের নিজস্ব অভিরুচি অনুযায়ী। গণভোটে ৭৪ লাখের বেশি ভোট বাতিল হয়েছে। হতে পারে ইচ্ছাকৃত ভুল, অথবা ভোটারের অজ্ঞতা। ব্যালটপেপারে ‘হ্যাঁ’- এর পাশে দেওয়া আছে টিক চিহ্ন এবং ‘না’-এর পাশে ছিল ক্রস। হ্যাঁ-এর পক্ষে এত কৌশলে ব্যালটপেপার ছাপানোর পরও ভোটার ভুল করলো !
বিভিন্ন সংস্থার লোকজন নির্বাচন কমিশনের অনুমতি নিয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে, তারমধ্যে কিছুটা নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষক হচ্ছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি; টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ছিলেন মুহাম্মদ ইউনূসের ‘দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনে’র প্রধান। তারা ৭০টি আসনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৪৬.৪ শতাংশ আসনে ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেওয়া হয়নি, ৩৫.৭ শতাংশ আসনে ভোটারদের জোর করে ‘নির্দিষ্ট মার্কায়’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে, ২১.৪ শতাংশ আসনে জাল ভোট দেওয়া হয়েছে, ১৪.৩ শতাংশ আসনে বুথ দখল করা হয়েছে, প্রতিপক্ষের ১৪.৩ শতাংশ পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, ১৪.৩ শতাংশ আসনে ভোট গ্রহণের আগেই ব্যালটে সিল মারার ঘটনা ঘটেছে এবং ৭.১ শতাংশ আসনে ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভোট কারচুপির নানাবিধ ঘটনার অনেকগুলো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে। শুধু অনুমোদিত পর্যবেক্ষক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়, বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপির নেতারাও ভোট কারচুপির কথা বলেছেন। অবশ্য পরাজিত বিএনপির প্রার্থীরাই ভোট কারচুপির অভিযোগ করেছেন। কারচুপি করে ৩২টি আসনে জামায়াত জোটকে হারিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছে ১১ দল, গণনার সময় ১০ শতাংশ ভোট কারচুপি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম, অনেক আসনের ফলাফল-শিটে ঘষামাজার অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। এবার জালভোট দেওয়া কিছুটা সহজ ছিল, ভোট প্রদানে আইডি কার্ডের দরকার ছিল না, কম্পিউটারে রক্ষিত ছবির সঙ্গে ভোটারের চেহারার মিল খোঁজা হয়নি, এমনকি ভোটারের চেহারা দেখার গরজ বোধও করা হয়নি।
প্রায় প্রতিটি আসনে কম ভোট পেয়ে কম মার্জিনে প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। চরমোনাই পীরের ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’ জোট থেকে বেরিয়ে না গেলে জামায়াতভুক্ত জোটের অঘটন ঘটিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। এছাড়া ভোট প্রদানে অনাগ্রহীরাও জামায়াতবিরোধী ভোট দিয়েছে; এর কারণ কয়েকটি- এক, আধুনিকতার নামে ঘরের বাইর হওয়া নারীদের ‘বেশ্যা’ বলায় ইসলামপন্থী ব্যতীত দল-মত নির্বিশেষে সব নারী জামায়াতের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে; দুই, টাকা দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার ঘটনাগুলো জামায়াতের বিরুদ্ধে বেশি প্রচার হয়েছে; তিন, জামায়াতের জান্নাতের টিকেট বিক্রির বক্তব্য ভোটারদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগ ভোট বর্জন করলেও তা নিয়ে প্রচারণা চালায়নি; ‘ধানের শীষে’ ভোট দিতে আওয়ামী লীগের মৌন সম্মতি ছিল বলে মনে হয়; তবে প্রবীণ লীগ সমর্থকদের অনেকে ‘দাঁড়িপল্লায়’ও ভোট দিয়েছে। লীগের লোকজন কেন ভোটকেন্দ্রে গেল? কারণ ভোটের আগে তারেক রহমানের ওপর ভারতের আশীর্বাদ থাকার সংবাদটি প্রচার হয়েছে। নির্বাচন চলাকালীন বিএনপি থেকে একটি বারের জন্যও ভারতবিরোধী কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি। অবশ্য নির্যাতিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেও লীগ সমর্থকরা বিএনপি বা জামায়াতকে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছে। লীগের কর্মীদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আরও একটি কারণ রয়েছে এবং তা হচ্ছে ইউনূসের যাঁতাকল থেকে মুক্তিলাভ। সাংবাদিক নুরুল কবিরের মতে, ভোটারেরা জামায়াত ঠেকাতে নাকে রুমাল বেঁধে ‘ধানের শীষে’ ভোট দিয়েছে, নাকে রুমাল বাঁধার কারণ বিএনপির সমর্থকদের চাঁদাবাজি।
ভোটের পক্ষের সবাই মনে করে, কিছু কারচুপি হবেই। এটা সত্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও কোন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে নিখুঁত বলে কিছু নেই, সবকিছুতেই একটা টলারেন্স জনগণ মেনে নেয়। আন্তর্জাতিক মহলেও এই নির্বাচন গৃহীত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেনি। কারণ জামায়াত হেরেও জয়ী হয়েছেÑ স্বাধীনতার পর যে জামায়াতের মৃত্যু হয়েছিল, সেই জামায়াত এবার সংসদে বিরোধী দল। উচ্চ কক্ষে জামায়াত জোটের আসন হবে ৪৪টি, বিএনপির ৪৬টি। দুই তৃতীয়াংশ আসন পেয়েও বিএনপি সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না, উচ্চকক্ষে জামায়াতের সমর্থন লাগবে। তবে আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির সঙ্গে বিরোধে জড়াতে চাইবে না।
ধর্মনিরপেক্ষ মুহাম্মদ ইউনূসের দেড় বছরের রাজত্বে দেশে যে বিশাল উগ্রপন্থা ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উন্মেষ ঘটেছে তাকে ম্যানেজ করতে না পারলে ২১৩ আসন নিয়ে বিএনপিও তাদের পতাকাতলে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত গণভোটসহ স্বাধীনতার পর অদ্যাবধি বাংলাদেশে চারবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৭ সনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে প্রথম গণভোট হয়, ১৯৮৫ সনে দ্বিতীয় গণভোট হয় রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়ে এবং ১৯৯১ সনে তৃতীয়টি হয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে।
গণভোটে ৭৪ লাখের বেশি ভোট বাতিল হয়েছে। হতে পারে ইচ্ছাকৃত ভুল, অথবা ভোটারের অজ্ঞতা। ব্যালটপেপারে ‘হ্যাঁ’- এর পাশে দেওয়া আছে টিক চিহ্ন এবং ‘না’-এর পাশে ছিল ক্রস। হ্যাঁ-এর পক্ষে এত কৌশলে ব্যালটপেপার ছাপানোর পরও ভোটার ভুল করলো !
জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দুইজনই সেনাপ্রধান ছিলেন এবং জনগণের ভোট না নিয়েই ক্ষমতায় বসেছিলেন, তাই দুইজনই তাদের শাসনকে বৈধতা দিতে গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। ভোটকেন্দ্রে ভোটার না গেলেও তারা দুইজনই প্রায় শতভাগ ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়ে ক্ষমতা গ্রহণকে জায়েজ করে নিয়েছিলেন। অতি সম্প্রতি ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে আরেকটি গণভোট হয়েছে, সেই ভোটে ৪৮টি প্রস্তাব-সংবলিত ‘জাতীয় জুলাই সনদ’ পাস হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই তারিখে গণভোট হওয়ায় নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো গণভোটের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারেনি, তারা তাদের এমপি নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। গণভোটের আলাদা নির্বাচন হলে এই গণভোটের ফলাফলও আগের গণভোটের মতো একচেটিয়া হতো। গণভোটে পোলিং এজেন্ট থাকে না, পোলিং কর্মকর্তারাই ব্যালটপেপারে সিল দিয়ে বাক্সে ভরেন।
জুলাই সনদকে বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি সমর্থন করেছে, এই তিন দলের নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করে এই সনদ তৈরি করেছে। এই জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব আছে, এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সংশ্লিষ্ট। এই ৪৮টি প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’-ভোট জয়ী হয়েছে। তবে এই ৪৮টি প্রস্তাবের সবগুলোতে সব দলের ঐকমত্য ছিল না, কোন কোন প্রস্তাবে কোন কোন দলের ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। মতের ভিন্নতাকে গুরুত্ব না দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের প্রস্তাবগুলো হুবহু গণভোটে দিয়ে দিয়েছে। বিএনপি জোর প্রতিবাদ করেনি, কারণ তাদের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় সংসদের নির্বাচন, গণভোট নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা ছিল না। বিএনপির ধারণা ছিল, গণভোট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বাদানুবাদ লেগে থাকলে যে কোন উছিলায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভ-ুল হয়ে যেতে পারে। বিএনপির কিছু অংশ ‘হ্যাঁ-ভোট’, কিছু অংশ ‘না-ভোট’ দিয়েছে; যারা আওয়ামী লীগ ও ভারতের কট্টর বিরোধী তারা হ্যাঁ-ভোট দিয়েছে, যারা কিছুটা লিবারেল তারা না-ভোট দিয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যারা ভোট দিয়েছে তারাও সম্ভবত ‘না-ভোট’ দিয়েছে। যারা ‘না-ভোট’ দিয়েছে তারাও জানতো ‘হ্যাঁ’ জিতবে।
রাজশাহী-৪ আসনে নাকি একটি অদ্ভুত কা- ঘটেছে, এই আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯০৯, অথচ ‘হ্যাঁ-না’তে নাকি ভোট পড়েছে ৭ লাখ ৮১ হাজার ৫২৩। এর ফলে কাস্টিং ভোটের হার দাঁড়ায় ২৪৪ শতাংশ। ১৯৭৭ সনের গণভোটেও জিয়াউর রহমানের পক্ষে কোন কোন কেন্দ্রে শতভাগের বেশি ভোট পড়েছিল, কিন্তু এত বেশি নয়। তাই ২৪৪ শতাংশ ভোট কাস্টিং বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে এবারের নির্বাচনেও কারচুপি হয়েছে, কিন্তু এত জঘন্য কারচুপি হওয়ার কথা নয়। এত ব্যালটপেপার ওখানে এলো কোত্থেকে ? তাহলে কি ব্যালটপেপার ছাড়াই হিসাব করা হয়েছে? এমন ভুতুড়ে কা- নেত্রকোনার তিনটি আসনেও হয়েছে, ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা ওই আসনগুলোর মোট ভোটারের চেয়েও বেশি দেখানো হয়েছে। ভোটারের চেয়ে ভোট পড়েছে বেশি, যারা অবৈধ পথে সিল মেরে ব্যালটপেপার বাক্সে ফেলে তাদের হিসাব করার হুঁশ থাকে না। কোন কালেই হিসাব করে কারচুপি হয়নি, হিসাব করে কারচুপি করা যায়ও না। এবার কারচুপির হিসাব করতে হয়েছে নানা আঙ্গিকে, ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের সংখ্যার সঙ্গে সাজুয্য রাখতে হয়েছে এমপির ভোটের। নির্বাচন কমিশন সিরাজগঞ্জ এবং রাজশাহীর উক্ত দুটি আসনের গণভোটের ফলাফল সংশোধন করলেও নেত্রকোনার তিনটি আসনের ফলাফল অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।রাজশাহী এবং সিরাজগঞ্জের ভুল সংশোধন করা হলেও গণভোটের মোট ফলাফল ও শতকরা হিসাব অপরিবর্তিত থেকে গেছে।
আরও একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে, সিরাজগঞ্জ-১ আসনে গণভোট পড়ার হার মাত্র ৭ শতাংশ, অথচ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে ভোট পড়েছে ৬০.৮৩ শতাংশ। মনে হয় ভোটার ভোট দেয়নি, ভোট দিলে ইস্যু করা ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের ব্যালটপেপার গেল কই? ভোটের বাক্স থাকে পোলিং কর্মকর্তার সম্মুখে, এত বিপুল সংখ্যক ভোটার ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের ব্যালটপেপার পকেটে করে নিয়ে যেতে পারে না, নেওয়ার চেষ্টা করলে তা পোলিং কর্মকর্তার নজরে পড়ত। গোপালগঞ্জ আসন হলে হিসাবটি বিশ্বাসযোগ্য হতো, সিরাজগঞ্জ আসনে এত কম ভোট পড়বে কেন? দেশে মোট ২৯৯টি আসনের মধ্যে শুধু ১১টি আসনে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে এবং এই ১১টি সংসদীয় আসনের ১০টিতেই জিতেছে বিএনপির প্রার্থী। এতেই প্রমাণিত হয়, বিএনপির সব ভোটার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ছিল না। দলীয় নির্দেশনার ভিত্তিতে বিএনপির হ্যাঁ-না ভোট হয়নি, হয়েছে বিএনপির কর্মী ও সমর্থকদের নিজস্ব অভিরুচি অনুযায়ী। গণভোটে ৭৪ লাখের বেশি ভোট বাতিল হয়েছে। হতে পারে ইচ্ছাকৃত ভুল, অথবা ভোটারের অজ্ঞতা। ব্যালটপেপারে ‘হ্যাঁ’- এর পাশে দেওয়া আছে টিক চিহ্ন এবং ‘না’-এর পাশে ছিল ক্রস। হ্যাঁ-এর পক্ষে এত কৌশলে ব্যালটপেপার ছাপানোর পরও ভোটার ভুল করলো !
বিভিন্ন সংস্থার লোকজন নির্বাচন কমিশনের অনুমতি নিয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে, তারমধ্যে কিছুটা নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষক হচ্ছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি; টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ছিলেন মুহাম্মদ ইউনূসের ‘দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনে’র প্রধান। তারা ৭০টি আসনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৪৬.৪ শতাংশ আসনে ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেওয়া হয়নি, ৩৫.৭ শতাংশ আসনে ভোটারদের জোর করে ‘নির্দিষ্ট মার্কায়’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে, ২১.৪ শতাংশ আসনে জাল ভোট দেওয়া হয়েছে, ১৪.৩ শতাংশ আসনে বুথ দখল করা হয়েছে, প্রতিপক্ষের ১৪.৩ শতাংশ পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, ১৪.৩ শতাংশ আসনে ভোট গ্রহণের আগেই ব্যালটে সিল মারার ঘটনা ঘটেছে এবং ৭.১ শতাংশ আসনে ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভোট কারচুপির নানাবিধ ঘটনার অনেকগুলো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে। শুধু অনুমোদিত পর্যবেক্ষক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়, বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপির নেতারাও ভোট কারচুপির কথা বলেছেন। অবশ্য পরাজিত বিএনপির প্রার্থীরাই ভোট কারচুপির অভিযোগ করেছেন। কারচুপি করে ৩২টি আসনে জামায়াত জোটকে হারিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছে ১১ দল, গণনার সময় ১০ শতাংশ ভোট কারচুপি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম, অনেক আসনের ফলাফল-শিটে ঘষামাজার অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। এবার জালভোট দেওয়া কিছুটা সহজ ছিল, ভোট প্রদানে আইডি কার্ডের দরকার ছিল না, কম্পিউটারে রক্ষিত ছবির সঙ্গে ভোটারের চেহারার মিল খোঁজা হয়নি, এমনকি ভোটারের চেহারা দেখার গরজ বোধও করা হয়নি।
প্রায় প্রতিটি আসনে কম ভোট পেয়ে কম মার্জিনে প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। চরমোনাই পীরের ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’ জোট থেকে বেরিয়ে না গেলে জামায়াতভুক্ত জোটের অঘটন ঘটিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। এছাড়া ভোট প্রদানে অনাগ্রহীরাও জামায়াতবিরোধী ভোট দিয়েছে; এর কারণ কয়েকটি- এক, আধুনিকতার নামে ঘরের বাইর হওয়া নারীদের ‘বেশ্যা’ বলায় ইসলামপন্থী ব্যতীত দল-মত নির্বিশেষে সব নারী জামায়াতের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে; দুই, টাকা দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার ঘটনাগুলো জামায়াতের বিরুদ্ধে বেশি প্রচার হয়েছে; তিন, জামায়াতের জান্নাতের টিকেট বিক্রির বক্তব্য ভোটারদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগ ভোট বর্জন করলেও তা নিয়ে প্রচারণা চালায়নি; ‘ধানের শীষে’ ভোট দিতে আওয়ামী লীগের মৌন সম্মতি ছিল বলে মনে হয়; তবে প্রবীণ লীগ সমর্থকদের অনেকে ‘দাঁড়িপল্লায়’ও ভোট দিয়েছে। লীগের লোকজন কেন ভোটকেন্দ্রে গেল? কারণ ভোটের আগে তারেক রহমানের ওপর ভারতের আশীর্বাদ থাকার সংবাদটি প্রচার হয়েছে। নির্বাচন চলাকালীন বিএনপি থেকে একটি বারের জন্যও ভারতবিরোধী কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি। অবশ্য নির্যাতিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেও লীগ সমর্থকরা বিএনপি বা জামায়াতকে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছে। লীগের কর্মীদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আরও একটি কারণ রয়েছে এবং তা হচ্ছে ইউনূসের যাঁতাকল থেকে মুক্তিলাভ। সাংবাদিক নুরুল কবিরের মতে, ভোটারেরা জামায়াত ঠেকাতে নাকে রুমাল বেঁধে ‘ধানের শীষে’ ভোট দিয়েছে, নাকে রুমাল বাঁধার কারণ বিএনপির সমর্থকদের চাঁদাবাজি।
ভোটের পক্ষের সবাই মনে করে, কিছু কারচুপি হবেই। এটা সত্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও কোন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে নিখুঁত বলে কিছু নেই, সবকিছুতেই একটা টলারেন্স জনগণ মেনে নেয়। আন্তর্জাতিক মহলেও এই নির্বাচন গৃহীত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেনি। কারণ জামায়াত হেরেও জয়ী হয়েছেÑ স্বাধীনতার পর যে জামায়াতের মৃত্যু হয়েছিল, সেই জামায়াত এবার সংসদে বিরোধী দল। উচ্চ কক্ষে জামায়াত জোটের আসন হবে ৪৪টি, বিএনপির ৪৬টি। দুই তৃতীয়াংশ আসন পেয়েও বিএনপি সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না, উচ্চকক্ষে জামায়াতের সমর্থন লাগবে। তবে আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির সঙ্গে বিরোধে জড়াতে চাইবে না।
ধর্মনিরপেক্ষ মুহাম্মদ ইউনূসের দেড় বছরের রাজত্বে দেশে যে বিশাল উগ্রপন্থা ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উন্মেষ ঘটেছে তাকে ম্যানেজ করতে না পারলে ২১৩ আসন নিয়ে বিএনপিও তাদের পতাকাতলে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]