বাবুল রবিদাস
আগের দিনে বিয়ে সাধারণত রেজিস্ট্রি হতো না। এতে সমাজে নানা ঝামেলা তৈরি হতো। মামলা-মোকদ্দমা বাড়ত। অনেক সময় একজনের স্ত্রী আরেকজনের সঙ্গে চলে যেত। বিয়ের কোনো কাগজপত্র না থাকায় আদালতে সঠিক বিচার পাওয়া কঠিন হতো। খুন-খারাবি ও অশান্তিও বাড়ত; এমনই একটি ঘটনার কথা এখানে তুলে ধরা হলো।
অনেকে কাজের জন্য স্ত্রীকে বাড়ি বা শ্বশুরবাড়িতে রেখে বিদেশে যেতেন। পরে দেশে ফিরে দেখতেন, তার স্ত্রী অন্য একজনের সঙ্গে সংসার করছেন। তখন তিনি আদালতে গিয়ে স্ত্রীকে ফিরে পেতে মামলা করতেন। কিন্তু আদালতে স্ত্রী ও তার নতুন স্বামী বলতেন, বাদীর সঙ্গে তার কোনো বিয়ে হয়নি। কাবিননামা বা রেজিস্ট্রির কাগজ না থাকায় বিয়ে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ত।
একজন আইনজীবী তখন কৌশল নেন। তিনি আদালতের অনুমতি নিয়ে ওই নারীকে কিছু প্রশ্ন করতে চান। তিনি তাকে বলেন, ভয় নেই, শুধু আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। তিনি আরও বলেন, আমার মক্কেল খুব সহজ-সরল মানুষ। তিনি আপনার কাছে কোনো দাবি করবেন না। আপনি শুধু তার মোহরানার টাকা মাফ করে দিন।
তখন ওই নারী আদালতে বলেন, তিনি মোহরানা মাফ করে দিলেন। তখন আইনজীবী আদালতকে বলেন, যদি বিয়েই না হয়ে থাকে, তাহলে মোহরানা মাফ করার প্রশ্ন আসে কীভাবে? বিয়ে না হলে মোহরানা হয় না। এভাবেই তিনি প্রমাণ করেন, তাদের মধ্যে বিয়ে হয়েছিল। পরে আদালত রায় দেন এবং স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরে পান।
আগের দিনে এমন অনেক ঘটনা ঘটত। এই বাস্তবতা থেকেই বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আগে মানুষ অনেক চুক্তিই মুখে মুখে করত-জমি বন্ধক, জমি বিক্রি, বিয়ে ইত্যাদি। এতে পরে ঝামেলা হতো। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও কলহ দেখা দিত। সম্পর্ক নষ্ট হতো। এসব সমস্যা কমাতে আইন করে বিয়ে রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা এখন মুসলিম সমাজে প্রচলিত।
হিন্দু সমাজেও আগে শুধু ধর্মীয় নিয়ম মেনে বিয়ে হতো। কিন্তু অনেক বিয়ে বেশি দিন টিকত না। আদালতে মামলা হতো, অনেকে বিয়েই অস্বীকার করত। এ পরিস্থিতিতে ‘হিন্দু ম্যারেজ রেজিস্ট্রার’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যা সারাদেশে কার্যকর। কারণ মানুষ মিথ্যা বলতে পারে, কিন্তু রেজিস্ট্রি করা কাগজ মিথ্যা বলে না। আইনে একটি কথা আছে-অনেক মৌখিক সাক্ষীর চেয়ে একটি রেজিস্ট্রি করা কাগজের মূল্য বেশি।
তাই সবারই আইন জানা দরকার। অজ্ঞতার অজুহাতে কেউ আইনের বাইরে থাকতে পারে না। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখন রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন। এছাড়া ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে যে এফিডেভিট পদ্ধতি আছে, সেটিকে আরও স্পষ্ট আইনি স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। এতে কম খরচে বিয়ে করা সম্ভব হবে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের জন্য।
হিন্দু সমাজে বিয়ে বিচ্ছেদের আইনি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলেও মনে করা যায়। সমাজে শান্তি ও ন্যায্যতা বজায় রাখতে সময়ের সঙ্গে কিছু আইন সংস্কার করা দরকার। যে কর্তৃপক্ষ বিয়ে রেজিস্ট্রির দায়িত্বে আছেন, প্রয়োজনে তাকে বিচ্ছেদ-সংক্রান্ত দায়িত্বও দেওয়া যেতে পারে, যাতে ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য বিষয় দ্রুত সমাধান করা যায়।
সমাজে শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিয়ে রেজিস্ট্রি অত্যন্ত জরুরি। লিখিত কাগজ ভবিষ্যতের ঝামেলা কমায় এবং আইনি সুরক্ষা দেয়।
[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
বাবুল রবিদাস
শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
আগের দিনে বিয়ে সাধারণত রেজিস্ট্রি হতো না। এতে সমাজে নানা ঝামেলা তৈরি হতো। মামলা-মোকদ্দমা বাড়ত। অনেক সময় একজনের স্ত্রী আরেকজনের সঙ্গে চলে যেত। বিয়ের কোনো কাগজপত্র না থাকায় আদালতে সঠিক বিচার পাওয়া কঠিন হতো। খুন-খারাবি ও অশান্তিও বাড়ত; এমনই একটি ঘটনার কথা এখানে তুলে ধরা হলো।
অনেকে কাজের জন্য স্ত্রীকে বাড়ি বা শ্বশুরবাড়িতে রেখে বিদেশে যেতেন। পরে দেশে ফিরে দেখতেন, তার স্ত্রী অন্য একজনের সঙ্গে সংসার করছেন। তখন তিনি আদালতে গিয়ে স্ত্রীকে ফিরে পেতে মামলা করতেন। কিন্তু আদালতে স্ত্রী ও তার নতুন স্বামী বলতেন, বাদীর সঙ্গে তার কোনো বিয়ে হয়নি। কাবিননামা বা রেজিস্ট্রির কাগজ না থাকায় বিয়ে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ত।
একজন আইনজীবী তখন কৌশল নেন। তিনি আদালতের অনুমতি নিয়ে ওই নারীকে কিছু প্রশ্ন করতে চান। তিনি তাকে বলেন, ভয় নেই, শুধু আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। তিনি আরও বলেন, আমার মক্কেল খুব সহজ-সরল মানুষ। তিনি আপনার কাছে কোনো দাবি করবেন না। আপনি শুধু তার মোহরানার টাকা মাফ করে দিন।
তখন ওই নারী আদালতে বলেন, তিনি মোহরানা মাফ করে দিলেন। তখন আইনজীবী আদালতকে বলেন, যদি বিয়েই না হয়ে থাকে, তাহলে মোহরানা মাফ করার প্রশ্ন আসে কীভাবে? বিয়ে না হলে মোহরানা হয় না। এভাবেই তিনি প্রমাণ করেন, তাদের মধ্যে বিয়ে হয়েছিল। পরে আদালত রায় দেন এবং স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরে পান।
আগের দিনে এমন অনেক ঘটনা ঘটত। এই বাস্তবতা থেকেই বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আগে মানুষ অনেক চুক্তিই মুখে মুখে করত-জমি বন্ধক, জমি বিক্রি, বিয়ে ইত্যাদি। এতে পরে ঝামেলা হতো। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও কলহ দেখা দিত। সম্পর্ক নষ্ট হতো। এসব সমস্যা কমাতে আইন করে বিয়ে রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা এখন মুসলিম সমাজে প্রচলিত।
হিন্দু সমাজেও আগে শুধু ধর্মীয় নিয়ম মেনে বিয়ে হতো। কিন্তু অনেক বিয়ে বেশি দিন টিকত না। আদালতে মামলা হতো, অনেকে বিয়েই অস্বীকার করত। এ পরিস্থিতিতে ‘হিন্দু ম্যারেজ রেজিস্ট্রার’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যা সারাদেশে কার্যকর। কারণ মানুষ মিথ্যা বলতে পারে, কিন্তু রেজিস্ট্রি করা কাগজ মিথ্যা বলে না। আইনে একটি কথা আছে-অনেক মৌখিক সাক্ষীর চেয়ে একটি রেজিস্ট্রি করা কাগজের মূল্য বেশি।
তাই সবারই আইন জানা দরকার। অজ্ঞতার অজুহাতে কেউ আইনের বাইরে থাকতে পারে না। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখন রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন। এছাড়া ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে যে এফিডেভিট পদ্ধতি আছে, সেটিকে আরও স্পষ্ট আইনি স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। এতে কম খরচে বিয়ে করা সম্ভব হবে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের জন্য।
হিন্দু সমাজে বিয়ে বিচ্ছেদের আইনি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলেও মনে করা যায়। সমাজে শান্তি ও ন্যায্যতা বজায় রাখতে সময়ের সঙ্গে কিছু আইন সংস্কার করা দরকার। যে কর্তৃপক্ষ বিয়ে রেজিস্ট্রির দায়িত্বে আছেন, প্রয়োজনে তাকে বিচ্ছেদ-সংক্রান্ত দায়িত্বও দেওয়া যেতে পারে, যাতে ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য বিষয় দ্রুত সমাধান করা যায়।
সমাজে শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিয়ে রেজিস্ট্রি অত্যন্ত জরুরি। লিখিত কাগজ ভবিষ্যতের ঝামেলা কমায় এবং আইনি সুরক্ষা দেয়।
[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]