শেখর ভট্টাচার্য

সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বাস্তবতা যে চেতনার ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি ছিল বাঙালির রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে কোন বিচ্যুতি ঘটলে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন প্রতি বছর, প্রতিদিন বাঙালিকে সতর্কতা সংকেত প্রদান করে যায়। রূপক অর্থে ভ্যানগার্ড শব্দটি যেমন রাজনীতি বা শিল্পের অগ্রদূত বা নেতৃত্বদানকারী কোন কিছুকে বোঝায়, আমাদের ‘একুশ’, ‘আমাদের ভাষা আন্দোলন’ ঠিক সেরকম একটি মহৎ আন্দোলন যা সতত বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করতে আমাদের চেতনা জাগ্রত করে তুলে। পৃথিবীর কোন জাতির ইতিহাসে এরকম কোন দিন আছে কিনা আমরা জানিনা যে দিনটি সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক বিচ্যুতির ভ্যান গার্ড হিসেবে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ সাড়ে সাত দশক ধরে। আত্মপরিচয়ের এই আন্দোলন জাতির সামনে আয়না ধরে থাকে আত্মরূপ দেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। ‘একুশ’ আমাদের বিচ্যুতি, নিম্নগামিতাকে তুলে ধরে সতর্কতা সাইরেন বাজিয়ে যায় নিয়ত। বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রাম ও বিপ্লবের ইতিহাসে ১৯৫২ সাল এ কারণেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদানের দাবিতে যে অধিকারের সংগ্রাম, তা ছিল চেতনায় প্রোজ্জ্বল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের দুটো চরিত্র আছে-একটি সাংস্কৃতিক, অন্যটি রাজনৈতিক। প্রথম দিকে এর সাংস্কৃতিক দিকটি বেশ স্পষ্ট প্রতীয়মান হলেও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রবাহটি সামনে এসেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্তর্গত শক্তির উৎস কোথায়। মধ্য যুগ থেকে বাঙালি ভাষার প্রতি মমতা দেখিয়েছে নানাভাবে। বিস্ময়কর হলেও সত্য মধ্য যুগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বাঙালি সুনির্দিষ্ট ভূখ-ে স্বাধীনভাবে বসবাসের জন্য উল্লেখযোগ্য আন্দোলন করতে দেখা না গেলেও ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বাঙালির প্রচেষ্টা এবং ত্যাগে জাতির ইতিহাসে দৃশ্যমান ছিল।
বিষয়টির অন্তর্নিহিত চেতনার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করতে, সাতচল্লিশের পর বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের প্রয়োজন কেন হয়েছিল, এর প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ১৯৪৮-এর মার্চে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হলে পাকিস্তান নিয়ে বাঙালির যে স্বপ্ন ছিল সে স্বপ্নটির অপমৃত্যু ঘটে। এই দহন কালে হতাশ না-হয়ে বাঙালি তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের শেকড়ের অন্বেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এই শেকড় অনুসন্ধান বা আত্মানুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় বাংলা ভাষাকে অবহেলা করার যে প্রবণতা, তা যে শুধু ব্রিটিশশাসিত ঔপনিবেশিক কাল এবং পাকিস্তানশাসিত অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক যুগে সম্প্রসারিত হয়েছিল তা নয়। এর বহু আগে থেকে, বিশেষ করে তুর্কি শাসনের সময় থেকেই বাংলা ভাষার প্রতি বিরূপ ধারণা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। মধ্যযুগে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠাকল্পে কবি আবদুল হাকিম তার ‘বঙ্গবাণী’ শীর্ষক এক কবিতায় লিখেছেন : ‘যে সব বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জনম নির্ণয় ন জানি।’ এটি যে শুধু একটি ব্যঙ্গার্থক কথোপকথন বা কোনো রচনার পঙ্ক্তি ছিল তা নয়, এই কবিতাটি ছিল অপশাসন এবং বাংলা ভাষা অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ, যন্ত্রণা ও প্রতিবাদের সহজ প্রকাশ। এই কবিতাটির প্রতিটি পঙ্ক্তিতে বাঙালির ভাষাপ্রীতি, ভাষাকে লালন করার ইচ্ছার মাধ্যমেই জাতি হিসেবে সংহত হওয়ার আকাক্সক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এই ইচ্ছার শক্তিতেই কালক্রমে বহু সংগ্রাম, বহু আন্দোলন সফল করার শক্তি লাভ করে। মধ্যযুগ থেকে ব্রিটিশ উপনিবেশ, ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে যখন বাঙালি স্বপ্নের পাকিস্তানে প্রবেশ করে তখন রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক চরিত্র দ্রুত বাঙালির সামনে উন্মোচিত হয় ভাষার প্রশ্নে। পাকিস্তান নামক অলীক স্বপ্ন ভঙ্গ এবং জাতিসত্তার ঐতিহ্য অন্বেষণের পরে বাঙালি সাংস্কৃতিকভাবে স্বভূমে ফিরে আসে। বাঙালি জাতি সত্তার স্বরূপ স্ফটিক স্বচ্ছভাবে নিজেদের সামনে উপস্থিত হওয়ার ফলে জাতি হিসেবে বাঙালি আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। জাতিসত্তার গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে ফিরে আসাকেই ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে বড় গবেষক বদরুদ্দীন উমর বলেছেন বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বাস্তবতা যে চেতনার ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি ছিল বাঙালির রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। কোনো রাখঢাক নাই, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বক্তব্যকে কুয়াশাচ্ছন্ন করার প্রচেষ্টা ছিল না তার। সরাসরি তিনি তার বক্তব্য তুলে ধরেন এভাবে, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।’ ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর তার এই ঐতিহাসিক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সত্যিকার রূপটি তিনি প্রকাশ করেছিলেন। সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে ভাষার প্রশ্নে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল সে বিষয়ে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি এ সময়ে ‘...নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রে জনগণ প্রমাণ করবে যে তারাই রাজা, উপাধিধারীদের জনশোষণ আর বেশি দিন চলবে না। বর্তমানে যদি গায়ের জোরে উর্দুকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের ওপর রাষ্ট্রভাষা রূপে চালাবার চেষ্টা হয়, তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হবে।’ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অনুমান অনুযায়ী অনেক চেষ্টাই চলেছিল। অনেকে অনেক তত্ত্ব, অনেক উপায় বাতলে দিয়েছিলেন। ভাষার প্রশ্ন যখন সংস্কৃতির অভ্যন্তরে প্রবেশ করল তখন উদ্ভট অনেক প্রচেষ্টা চলেছে। সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে হাস্যকর সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। তদানীন্তন পাকিস্তানে শতকরা ৫৬ জনের মুখের ভাষা বাংলা হলেও শতকরা ৭ জনের মুখের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বাঙালি সংস্কৃতির উদারতা, অসাম্প্রদায়িকতা, বিশ্বজননীতার মতো এর কুঠোরে আছে আত্মপরিচয়কে নিরাপদ রাখার এক অপূর্ব শক্তি। সে শক্তি থেকেই জোরালো হয়ে ওঠা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জত হয়, রাষ্ট্রভাষার দাবি। দাবি মেনে নিলেও ভেতরে ভেতরে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে জোর করে পাকিস্তানিকরণের চেষ্টা চালানো হয় নানাভাবে।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভাষার মর্যাদা রক্ষার এই আন্দোলন বাঙালিকে প্রবল আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে সমর্থ হয়েছে। বদরুদ্দীন উমরের ভাষায় ‘বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ মূলত ছিল চেতনাগত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের চেতনা বহ্নিশিখার মতো প্রজ্বলিত ছিল। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রথমত বাঁশের লাঠি দিয়ে পৃথিবীর সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রকে সফলভাবে প্রতিহত করে স্বাধীন ভূখ- সৃষ্টি এই চেতনারই শক্তি থেকে উৎসারিত হয়েছে।
প্রশ্ন হলো ভাষা শহীদদের এই আত্মত্যাগকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য আমাদের প্রয়োজন ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে অন্তত বাংলাকে যথাযথ ব্যবহারকে নিশ্চিত করা যা অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবারকে শক্তিশালী কড়ে তুলতে পারত। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শুধু প্রান্তিক কিংবা সাধারণের জন্য বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করার ব্যবস্থা আছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই যে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খল অবস্থা, তা কিন্তু আমাদের ভাষা আন্দোলনের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভাষা আন্দোলনের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়ন করার জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনেক নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একুশের চেতনাকে সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের কার্যক্রমের ওপর জাতীয় চেতনা বিকাশের প্রশ্ন জড়িত। একইভাবে বাংলা ভাষাকে শিক্ষা কার্যক্রম এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং দৃঢ়তা দুটোরই প্রয়োজন আছে। এসব কার্যক্রম যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৃণমূলকে যুক্ত করে সম্পাদন করা হয় এ বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।
মনে রাখতে হবে একুশে ফেব্রুয়ারি এখন ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সমগ্র বিশ্বে আজ এই দিনটি গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হয়। একুশের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে নিজ দেশে সফলভাবে বাস্তবায়নের নৈতিক দায়কে আরো জোরালো করে তুলেছে। ভাষা আন্দোলনের অঙ্গীকারকে পূরণের মাধ্যমে আমরা জাতীয়ভাবে যেমন এগিয়ে যেতে পারি একইভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সূতিকাগার হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তিকে সারাবিশ্বের সামনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেতে পারি। এসব কর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা সম্ভব যদি আমার আবার জাতীয়তাবাদী চেতনায় নিজেদের উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হই।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
শেখর ভট্টাচার্য

সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বাস্তবতা যে চেতনার ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি ছিল বাঙালির রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
রোববার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে কোন বিচ্যুতি ঘটলে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন প্রতি বছর, প্রতিদিন বাঙালিকে সতর্কতা সংকেত প্রদান করে যায়। রূপক অর্থে ভ্যানগার্ড শব্দটি যেমন রাজনীতি বা শিল্পের অগ্রদূত বা নেতৃত্বদানকারী কোন কিছুকে বোঝায়, আমাদের ‘একুশ’, ‘আমাদের ভাষা আন্দোলন’ ঠিক সেরকম একটি মহৎ আন্দোলন যা সতত বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করতে আমাদের চেতনা জাগ্রত করে তুলে। পৃথিবীর কোন জাতির ইতিহাসে এরকম কোন দিন আছে কিনা আমরা জানিনা যে দিনটি সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক বিচ্যুতির ভ্যান গার্ড হিসেবে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ সাড়ে সাত দশক ধরে। আত্মপরিচয়ের এই আন্দোলন জাতির সামনে আয়না ধরে থাকে আত্মরূপ দেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। ‘একুশ’ আমাদের বিচ্যুতি, নিম্নগামিতাকে তুলে ধরে সতর্কতা সাইরেন বাজিয়ে যায় নিয়ত। বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রাম ও বিপ্লবের ইতিহাসে ১৯৫২ সাল এ কারণেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদানের দাবিতে যে অধিকারের সংগ্রাম, তা ছিল চেতনায় প্রোজ্জ্বল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের দুটো চরিত্র আছে-একটি সাংস্কৃতিক, অন্যটি রাজনৈতিক। প্রথম দিকে এর সাংস্কৃতিক দিকটি বেশ স্পষ্ট প্রতীয়মান হলেও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রবাহটি সামনে এসেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্তর্গত শক্তির উৎস কোথায়। মধ্য যুগ থেকে বাঙালি ভাষার প্রতি মমতা দেখিয়েছে নানাভাবে। বিস্ময়কর হলেও সত্য মধ্য যুগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বাঙালি সুনির্দিষ্ট ভূখ-ে স্বাধীনভাবে বসবাসের জন্য উল্লেখযোগ্য আন্দোলন করতে দেখা না গেলেও ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বাঙালির প্রচেষ্টা এবং ত্যাগে জাতির ইতিহাসে দৃশ্যমান ছিল।
বিষয়টির অন্তর্নিহিত চেতনার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করতে, সাতচল্লিশের পর বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের প্রয়োজন কেন হয়েছিল, এর প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ১৯৪৮-এর মার্চে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হলে পাকিস্তান নিয়ে বাঙালির যে স্বপ্ন ছিল সে স্বপ্নটির অপমৃত্যু ঘটে। এই দহন কালে হতাশ না-হয়ে বাঙালি তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের শেকড়ের অন্বেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এই শেকড় অনুসন্ধান বা আত্মানুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় বাংলা ভাষাকে অবহেলা করার যে প্রবণতা, তা যে শুধু ব্রিটিশশাসিত ঔপনিবেশিক কাল এবং পাকিস্তানশাসিত অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক যুগে সম্প্রসারিত হয়েছিল তা নয়। এর বহু আগে থেকে, বিশেষ করে তুর্কি শাসনের সময় থেকেই বাংলা ভাষার প্রতি বিরূপ ধারণা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। মধ্যযুগে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠাকল্পে কবি আবদুল হাকিম তার ‘বঙ্গবাণী’ শীর্ষক এক কবিতায় লিখেছেন : ‘যে সব বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জনম নির্ণয় ন জানি।’ এটি যে শুধু একটি ব্যঙ্গার্থক কথোপকথন বা কোনো রচনার পঙ্ক্তি ছিল তা নয়, এই কবিতাটি ছিল অপশাসন এবং বাংলা ভাষা অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ, যন্ত্রণা ও প্রতিবাদের সহজ প্রকাশ। এই কবিতাটির প্রতিটি পঙ্ক্তিতে বাঙালির ভাষাপ্রীতি, ভাষাকে লালন করার ইচ্ছার মাধ্যমেই জাতি হিসেবে সংহত হওয়ার আকাক্সক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এই ইচ্ছার শক্তিতেই কালক্রমে বহু সংগ্রাম, বহু আন্দোলন সফল করার শক্তি লাভ করে। মধ্যযুগ থেকে ব্রিটিশ উপনিবেশ, ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে যখন বাঙালি স্বপ্নের পাকিস্তানে প্রবেশ করে তখন রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক চরিত্র দ্রুত বাঙালির সামনে উন্মোচিত হয় ভাষার প্রশ্নে। পাকিস্তান নামক অলীক স্বপ্ন ভঙ্গ এবং জাতিসত্তার ঐতিহ্য অন্বেষণের পরে বাঙালি সাংস্কৃতিকভাবে স্বভূমে ফিরে আসে। বাঙালি জাতি সত্তার স্বরূপ স্ফটিক স্বচ্ছভাবে নিজেদের সামনে উপস্থিত হওয়ার ফলে জাতি হিসেবে বাঙালি আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। জাতিসত্তার গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে ফিরে আসাকেই ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে বড় গবেষক বদরুদ্দীন উমর বলেছেন বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বাস্তবতা যে চেতনার ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি ছিল বাঙালির রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। কোনো রাখঢাক নাই, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বক্তব্যকে কুয়াশাচ্ছন্ন করার প্রচেষ্টা ছিল না তার। সরাসরি তিনি তার বক্তব্য তুলে ধরেন এভাবে, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।’ ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর তার এই ঐতিহাসিক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সত্যিকার রূপটি তিনি প্রকাশ করেছিলেন। সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে ভাষার প্রশ্নে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল সে বিষয়ে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি এ সময়ে ‘...নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রে জনগণ প্রমাণ করবে যে তারাই রাজা, উপাধিধারীদের জনশোষণ আর বেশি দিন চলবে না। বর্তমানে যদি গায়ের জোরে উর্দুকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের ওপর রাষ্ট্রভাষা রূপে চালাবার চেষ্টা হয়, তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হবে।’ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অনুমান অনুযায়ী অনেক চেষ্টাই চলেছিল। অনেকে অনেক তত্ত্ব, অনেক উপায় বাতলে দিয়েছিলেন। ভাষার প্রশ্ন যখন সংস্কৃতির অভ্যন্তরে প্রবেশ করল তখন উদ্ভট অনেক প্রচেষ্টা চলেছে। সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে হাস্যকর সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। তদানীন্তন পাকিস্তানে শতকরা ৫৬ জনের মুখের ভাষা বাংলা হলেও শতকরা ৭ জনের মুখের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বাঙালি সংস্কৃতির উদারতা, অসাম্প্রদায়িকতা, বিশ্বজননীতার মতো এর কুঠোরে আছে আত্মপরিচয়কে নিরাপদ রাখার এক অপূর্ব শক্তি। সে শক্তি থেকেই জোরালো হয়ে ওঠা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জত হয়, রাষ্ট্রভাষার দাবি। দাবি মেনে নিলেও ভেতরে ভেতরে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে জোর করে পাকিস্তানিকরণের চেষ্টা চালানো হয় নানাভাবে।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভাষার মর্যাদা রক্ষার এই আন্দোলন বাঙালিকে প্রবল আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে সমর্থ হয়েছে। বদরুদ্দীন উমরের ভাষায় ‘বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ মূলত ছিল চেতনাগত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের চেতনা বহ্নিশিখার মতো প্রজ্বলিত ছিল। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রথমত বাঁশের লাঠি দিয়ে পৃথিবীর সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রকে সফলভাবে প্রতিহত করে স্বাধীন ভূখ- সৃষ্টি এই চেতনারই শক্তি থেকে উৎসারিত হয়েছে।
প্রশ্ন হলো ভাষা শহীদদের এই আত্মত্যাগকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য আমাদের প্রয়োজন ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে অন্তত বাংলাকে যথাযথ ব্যবহারকে নিশ্চিত করা যা অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবারকে শক্তিশালী কড়ে তুলতে পারত। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শুধু প্রান্তিক কিংবা সাধারণের জন্য বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করার ব্যবস্থা আছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই যে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খল অবস্থা, তা কিন্তু আমাদের ভাষা আন্দোলনের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভাষা আন্দোলনের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়ন করার জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনেক নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একুশের চেতনাকে সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের কার্যক্রমের ওপর জাতীয় চেতনা বিকাশের প্রশ্ন জড়িত। একইভাবে বাংলা ভাষাকে শিক্ষা কার্যক্রম এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং দৃঢ়তা দুটোরই প্রয়োজন আছে। এসব কার্যক্রম যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৃণমূলকে যুক্ত করে সম্পাদন করা হয় এ বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।
মনে রাখতে হবে একুশে ফেব্রুয়ারি এখন ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সমগ্র বিশ্বে আজ এই দিনটি গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হয়। একুশের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে নিজ দেশে সফলভাবে বাস্তবায়নের নৈতিক দায়কে আরো জোরালো করে তুলেছে। ভাষা আন্দোলনের অঙ্গীকারকে পূরণের মাধ্যমে আমরা জাতীয়ভাবে যেমন এগিয়ে যেতে পারি একইভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সূতিকাগার হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তিকে সারাবিশ্বের সামনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেতে পারি। এসব কর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা সম্ভব যদি আমার আবার জাতীয়তাবাদী চেতনায় নিজেদের উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হই।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]