ফকর উদ্দিন মানিক
রাষ্ট্র কখনো কখনো এমন এক নাট্যমঞ্চ, যেখানে আলোকসজ্জা থাকে ঝলমলে, কিন্তু মঞ্চের পাটাতন কাঁপে। শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস যখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আসনে বসলেন, মানুষ ভেবেছিল- এবার বুঝি আলোটা স্থায়ী হবে। “থ্রি জিরো”-র স্বপ্নে শূন্য দারিদ্র, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বনের পাশাপাশি হয়তো যোগ হবে আরেকটি শূন্য-শূন্য ভয়। ১৮ মাস পর দেখা গেল, শূন্যের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে যোগ-বিয়োগে কোথাও যেন ভুল চিহ্ন বসেছে।
এই সময়ে দেশে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক প্রাণী জন্ম নিল ‘মব’। তারা দল নয়, কিন্তু দল থেকেও শক্তিশালী; তারা আদালত নয়, কিন্তু রায় তাদেরই চূড়ান্ত। রাস্তায় জটলা মানেই যেন ত্বড়িত আদেশ। কোথাও পরীক্ষা বন্ধ, কোথাও তালা ঝুলছে কারখানায়, কোথাও দখল-বদল আইনের বই তখন বুকমার্ক হয়ে শেলফে। সরকার বলেছে, উত্তাল সময়ের রূপান্তর। সমালোচকরা বলেছেন, রূপান্তরের নামে রাস্তাকে রাষ্ট্রে রূপ দেওয়া। গণতন্ত্রে জনতার কণ্ঠ দরকার-কিন্তু জনতার কণ্ঠ যদি কাঁধে আগুন নিয়ে হাঁটে, তবে শব্দ আর শিখার পার্থক্য মুছে যায়।
এই অধ্যায়ে আগুন যেন এক বহুমুখী চরিত্র। গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা-ভিন্নমত কখনো কাঁচের জানালার মতো ভেঙে পড়েছে। সরকার বলেছে, আইন চলেছে নিজের গতিতে; বিরোধীরা বলেছে, আইনের গতি ছিল কচ্ছপের, ভয়ের গতি ছিল হরিণের।
সারাদেশে একের পর এক মাজারে হামলার খবর এসেছে। ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিসরে অস্থিরতার ছায়া লেগেছে। সংস্কৃতির মঞ্চও রেহাই পায়নি-আগুনের আতঙ্ক ঘুরে বেড়িয়েছে সংগীত-নাট্যের আঙিনায়, যার ঐতিহ্য বহন করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও ছায়ানট-এর মতো প্রতিষ্ঠান। আগুন বাস্তবে যতটা জ্বলে, তার চেয়েও বেশি জ্বলে প্রতীকে-যখন সহনশীলতার ছাল পুড়ে যায়। যখন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নামের পাশে ‘আগুন’ শব্দটি জুড়ে যায়, তখন তা কেবল ভবনের ক্ষয় নয়-এটি স্মৃতির ওপর আক্রমণ। রাষ্ট্রের কাজ আগুন নেভানো; আগুনের ব্যাখ্যা দেওয়া নয়। ১৮ মাসে সহনশীলতার থার্মোমিটার কখনো স্বাভাবিক ছিল, কখনো জ্বরজ্বালা। প্রশ্ন হলো-জ্বরের ওষুধ কি সময়মতো দেওয়া হয়েছে?
অর্থনীতিকে বলা হলো ‘সংস্কারের অপারেশন থিয়েটার’। কিন্তু অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়া অস্ত্রোপচার করলে রোগী চিৎকার করে-এটাই স্বাভাবিক। বেসরকারি খাতের একাংশ বলেছে, নীতির অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক চাপ আস্থার শিরা কেটেছে। জ্বালানি সরবরাহের টানাপড়েন, বাজারের ভয়, মূল্যস্ফীতির চাপ-সব মিলিয়ে মধ্যবিত্তের কাঁধে যেন অদৃশ্য বস্তা।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের দরজা খুলতে চাওয়া হয়েছে-সম্মেলন, বক্তব্য, করতালি। কিন্তু বিনিয়োগ আসে নিশ্চয়তার গন্ধে; যদি বাতাসে অনিশ্চয়তার ধোঁয়া থাকে, পুঁজি দূর থেকে হাত নাড়ে, কাছে আসে না। সরকার বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথ কণ্টকাকীর্ণ। সমালোচকরা জিজ্ঞেস করেছেন, কণ্টক যদি বেড়েই চলে, ফুল ফুটবে কবে?
বিশ্বমঞ্চে উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। “ঞযৎবব তবৎড়বং” দর্শন আবার আলোচনায়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে-এ ছিল ‘ব্রান্ড বাংলাদেশ’, নাকি ‘বাংলাদেশের ব্রান্ড’? করতালি রাষ্ট্রিক চুক্তির বিকল্প নয়। ছবির ফ্রেমে হাসি ধরা পড়ে, কিন্তু বাণিজ্য-চুক্তির কালি লাগে নথিতে। ১৮ মাসে সেই নথির ওজন কতটা বাড়ল এ নিয়ে বিতর্ক থেকেই গেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যবই বলে- ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের দূরত্ব যত বেশি, আস্থা তত দৃঢ়। এই সময়ে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, কর-সুবিধা ও কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে এৎধসববহ ইধহশ–এর শেয়ার কাঠামো ও কর অব্যাহতি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সমর্থকদের বক্তব্য এগুলো দীর্ঘদিনের নীতিগত সংশোধন; আইনি প্রক্রিয়াতেই হয়েছে। সমালোচকদের পাল্টা ক্ষমতার আসনে বসে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুবিধা বাড়লে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’-এর ছায়া পড়ে। রাষ্ট্রের নৈতিক উচ্চভূমিতে দাঁড়ানো মানুষের জন্য ছায়াটিও বড় হয়ে দেখা দেয়। নিজের নামে বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও অনুমোদন দ্রুত হওয়া আইনি হলেও নৈতিকতার আদালতে জেরা এড়ায় না। কারণ গণতন্ত্রে শুধু সঠিক হওয়াই যথেষ্ট নয়; সঠিক দেখানোও জরুরি।
ইউনূসের ভাষণ অনুপ্রেরণামূলক-এ নিয়ে দ্বিমত কম। কিন্তু রাষ্ট্র কেবল ভাষণে চলে না; চলে ফাইল, আদেশ, প্রয়োগ ও নজরদারিতে। প্রশাসনিক দৃঢ়তা যদি নরম হয়, নৈতিক ভাষণও বাতাসে ভাসে। একজন সামাজিক উদ্যোক্তার সাফল্য রাষ্ট্র পরিচালনার নিশ্চয়তা নয়-এ শিক্ষা এই অধ্যায় আমাদের দিয়েছে। ক্ষুদ্রঋণের মডেল সমাজে কাজ করে; কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রে দরকার সমন্বিত শক্তি-রাজনীতি, প্রশাসন, নিরাপত্তা, অর্থনীতি-সব কক্ষপথ একসঙ্গে ঘোরানো।
তবু ন্যায়ের খাতায় জমা আছে কিছু পয়েন্ট। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখা, সংস্কারের সাহসী ঘোষণা, তরুণদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার প্রচেষ্টা-এসব উপেক্ষা করা যায় না। দীর্ঘমেয়াদি কিছু নীতিগত উদ্যোগ ভবিষ্যতে ফল দিতে পারে-যদি ধারাবাহিকতা থাকে। কিন্তু রাজনীতিতে ধারাবাহিকতার চেয়ে শক্তিশালী হলো জনমতের স্মৃতি। আর জনমত সংখ্যায় নয়, অনুভূতিতে হিসাব করে।
১৮ মাসের এই অধ্যায়ে আমরা দেখেছি আলোর ভাষণ, আগুনের খবর; দেখেছি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, আস্থার টানাপড়েন; দেখেছি আন্তর্জাতিক করতালি, অভ্যন্তরীণ সংশয়। নোবেলের আলোকবাতি পথ দেখাতে পারে, কিন্তু কুয়াশা কাটাতে লাগে প্রয়োগের উষ্ণতা। রাষ্ট্র এক বিশাল অর্কেস্ট্রা-এখানে একক বেহালার সুর যতই মধুর হোক, তাল মিলাতে না পারলে সিম্ফনি ভেঙে যায়।
ইতিহাস একদিন নিরপেক্ষ অডিট করবে-কতটা ছিল রূপান্তর, কতটা ছিল রূপক; কতটা ছিল সংস্কার, কতটা ছিল সংঘাত। আজকের পাঠ কেবল এতটুকু: নৈতিকতার মুকুট পরা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের মেরুদন্ড বানাতে লাগে কঠোরতা, স্বচ্ছতা ও স্বার্থসংঘাত থেকে দূরত্ব। আর জনগণ? তারা শেষ পর্যন্ত শান্তিই চায়-শিরোনামের নয়, জীবনের। সেই শান্তির অঙ্ক মেলেনি বলেই হয়তো ১৮ মাসের এই অধ্যায় এখন আলো-ছায়ার এক অসমাপ্ত কাব্য।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
ফকর উদ্দিন মানিক
রোববার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
রাষ্ট্র কখনো কখনো এমন এক নাট্যমঞ্চ, যেখানে আলোকসজ্জা থাকে ঝলমলে, কিন্তু মঞ্চের পাটাতন কাঁপে। শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস যখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আসনে বসলেন, মানুষ ভেবেছিল- এবার বুঝি আলোটা স্থায়ী হবে। “থ্রি জিরো”-র স্বপ্নে শূন্য দারিদ্র, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বনের পাশাপাশি হয়তো যোগ হবে আরেকটি শূন্য-শূন্য ভয়। ১৮ মাস পর দেখা গেল, শূন্যের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে যোগ-বিয়োগে কোথাও যেন ভুল চিহ্ন বসেছে।
এই সময়ে দেশে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক প্রাণী জন্ম নিল ‘মব’। তারা দল নয়, কিন্তু দল থেকেও শক্তিশালী; তারা আদালত নয়, কিন্তু রায় তাদেরই চূড়ান্ত। রাস্তায় জটলা মানেই যেন ত্বড়িত আদেশ। কোথাও পরীক্ষা বন্ধ, কোথাও তালা ঝুলছে কারখানায়, কোথাও দখল-বদল আইনের বই তখন বুকমার্ক হয়ে শেলফে। সরকার বলেছে, উত্তাল সময়ের রূপান্তর। সমালোচকরা বলেছেন, রূপান্তরের নামে রাস্তাকে রাষ্ট্রে রূপ দেওয়া। গণতন্ত্রে জনতার কণ্ঠ দরকার-কিন্তু জনতার কণ্ঠ যদি কাঁধে আগুন নিয়ে হাঁটে, তবে শব্দ আর শিখার পার্থক্য মুছে যায়।
এই অধ্যায়ে আগুন যেন এক বহুমুখী চরিত্র। গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা-ভিন্নমত কখনো কাঁচের জানালার মতো ভেঙে পড়েছে। সরকার বলেছে, আইন চলেছে নিজের গতিতে; বিরোধীরা বলেছে, আইনের গতি ছিল কচ্ছপের, ভয়ের গতি ছিল হরিণের।
সারাদেশে একের পর এক মাজারে হামলার খবর এসেছে। ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিসরে অস্থিরতার ছায়া লেগেছে। সংস্কৃতির মঞ্চও রেহাই পায়নি-আগুনের আতঙ্ক ঘুরে বেড়িয়েছে সংগীত-নাট্যের আঙিনায়, যার ঐতিহ্য বহন করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও ছায়ানট-এর মতো প্রতিষ্ঠান। আগুন বাস্তবে যতটা জ্বলে, তার চেয়েও বেশি জ্বলে প্রতীকে-যখন সহনশীলতার ছাল পুড়ে যায়। যখন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নামের পাশে ‘আগুন’ শব্দটি জুড়ে যায়, তখন তা কেবল ভবনের ক্ষয় নয়-এটি স্মৃতির ওপর আক্রমণ। রাষ্ট্রের কাজ আগুন নেভানো; আগুনের ব্যাখ্যা দেওয়া নয়। ১৮ মাসে সহনশীলতার থার্মোমিটার কখনো স্বাভাবিক ছিল, কখনো জ্বরজ্বালা। প্রশ্ন হলো-জ্বরের ওষুধ কি সময়মতো দেওয়া হয়েছে?
অর্থনীতিকে বলা হলো ‘সংস্কারের অপারেশন থিয়েটার’। কিন্তু অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়া অস্ত্রোপচার করলে রোগী চিৎকার করে-এটাই স্বাভাবিক। বেসরকারি খাতের একাংশ বলেছে, নীতির অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক চাপ আস্থার শিরা কেটেছে। জ্বালানি সরবরাহের টানাপড়েন, বাজারের ভয়, মূল্যস্ফীতির চাপ-সব মিলিয়ে মধ্যবিত্তের কাঁধে যেন অদৃশ্য বস্তা।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের দরজা খুলতে চাওয়া হয়েছে-সম্মেলন, বক্তব্য, করতালি। কিন্তু বিনিয়োগ আসে নিশ্চয়তার গন্ধে; যদি বাতাসে অনিশ্চয়তার ধোঁয়া থাকে, পুঁজি দূর থেকে হাত নাড়ে, কাছে আসে না। সরকার বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথ কণ্টকাকীর্ণ। সমালোচকরা জিজ্ঞেস করেছেন, কণ্টক যদি বেড়েই চলে, ফুল ফুটবে কবে?
বিশ্বমঞ্চে উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। “ঞযৎবব তবৎড়বং” দর্শন আবার আলোচনায়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে-এ ছিল ‘ব্রান্ড বাংলাদেশ’, নাকি ‘বাংলাদেশের ব্রান্ড’? করতালি রাষ্ট্রিক চুক্তির বিকল্প নয়। ছবির ফ্রেমে হাসি ধরা পড়ে, কিন্তু বাণিজ্য-চুক্তির কালি লাগে নথিতে। ১৮ মাসে সেই নথির ওজন কতটা বাড়ল এ নিয়ে বিতর্ক থেকেই গেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যবই বলে- ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের দূরত্ব যত বেশি, আস্থা তত দৃঢ়। এই সময়ে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, কর-সুবিধা ও কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে এৎধসববহ ইধহশ–এর শেয়ার কাঠামো ও কর অব্যাহতি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সমর্থকদের বক্তব্য এগুলো দীর্ঘদিনের নীতিগত সংশোধন; আইনি প্রক্রিয়াতেই হয়েছে। সমালোচকদের পাল্টা ক্ষমতার আসনে বসে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুবিধা বাড়লে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’-এর ছায়া পড়ে। রাষ্ট্রের নৈতিক উচ্চভূমিতে দাঁড়ানো মানুষের জন্য ছায়াটিও বড় হয়ে দেখা দেয়। নিজের নামে বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও অনুমোদন দ্রুত হওয়া আইনি হলেও নৈতিকতার আদালতে জেরা এড়ায় না। কারণ গণতন্ত্রে শুধু সঠিক হওয়াই যথেষ্ট নয়; সঠিক দেখানোও জরুরি।
ইউনূসের ভাষণ অনুপ্রেরণামূলক-এ নিয়ে দ্বিমত কম। কিন্তু রাষ্ট্র কেবল ভাষণে চলে না; চলে ফাইল, আদেশ, প্রয়োগ ও নজরদারিতে। প্রশাসনিক দৃঢ়তা যদি নরম হয়, নৈতিক ভাষণও বাতাসে ভাসে। একজন সামাজিক উদ্যোক্তার সাফল্য রাষ্ট্র পরিচালনার নিশ্চয়তা নয়-এ শিক্ষা এই অধ্যায় আমাদের দিয়েছে। ক্ষুদ্রঋণের মডেল সমাজে কাজ করে; কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রে দরকার সমন্বিত শক্তি-রাজনীতি, প্রশাসন, নিরাপত্তা, অর্থনীতি-সব কক্ষপথ একসঙ্গে ঘোরানো।
তবু ন্যায়ের খাতায় জমা আছে কিছু পয়েন্ট। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখা, সংস্কারের সাহসী ঘোষণা, তরুণদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার প্রচেষ্টা-এসব উপেক্ষা করা যায় না। দীর্ঘমেয়াদি কিছু নীতিগত উদ্যোগ ভবিষ্যতে ফল দিতে পারে-যদি ধারাবাহিকতা থাকে। কিন্তু রাজনীতিতে ধারাবাহিকতার চেয়ে শক্তিশালী হলো জনমতের স্মৃতি। আর জনমত সংখ্যায় নয়, অনুভূতিতে হিসাব করে।
১৮ মাসের এই অধ্যায়ে আমরা দেখেছি আলোর ভাষণ, আগুনের খবর; দেখেছি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, আস্থার টানাপড়েন; দেখেছি আন্তর্জাতিক করতালি, অভ্যন্তরীণ সংশয়। নোবেলের আলোকবাতি পথ দেখাতে পারে, কিন্তু কুয়াশা কাটাতে লাগে প্রয়োগের উষ্ণতা। রাষ্ট্র এক বিশাল অর্কেস্ট্রা-এখানে একক বেহালার সুর যতই মধুর হোক, তাল মিলাতে না পারলে সিম্ফনি ভেঙে যায়।
ইতিহাস একদিন নিরপেক্ষ অডিট করবে-কতটা ছিল রূপান্তর, কতটা ছিল রূপক; কতটা ছিল সংস্কার, কতটা ছিল সংঘাত। আজকের পাঠ কেবল এতটুকু: নৈতিকতার মুকুট পরা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের মেরুদন্ড বানাতে লাগে কঠোরতা, স্বচ্ছতা ও স্বার্থসংঘাত থেকে দূরত্ব। আর জনগণ? তারা শেষ পর্যন্ত শান্তিই চায়-শিরোনামের নয়, জীবনের। সেই শান্তির অঙ্ক মেলেনি বলেই হয়তো ১৮ মাসের এই অধ্যায় এখন আলো-ছায়ার এক অসমাপ্ত কাব্য।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]