আনোয়ারুল হক

১৯৭১ সনে এই শহীদ মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে মসজিদ প্রতিষ্ঠার সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল
জুলাই আন্দোলনের দেড় বছর পার হওয়ার পরেও পথ চলার সময় এখনও রাস্তার পাশের দেওয়ালে আঁকা গ্রাফিতির দিকে তাকিয়ে থাকি। মগবাজার মোড়ে ইস্পাহানী মহিলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে একটা গ্রাফিতির লেখা দেখে মনে হয় তরুণ তরুণীরা সেই শৈশবকালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া কবিতার লাইন শুধু মনে রাখেনি তার মর্মবস্তুও তাদের মনোজগতে প্রভাব ফেলেছে। তাই রক্তস্নাত জুলাই আন্দোলনে বিজয়ী হয়ে সেদিন তারা উচ্চারণ করেছিল ‘মানুষ হইতে হবে’? এই মোদের পণ।
জীবনানন্দ দাশের নাম তো আমরা সবাই জানি। ধানসিঁড়ি নদীটি আর চোখ ছিল যার পাখির নীড়ের মতো- সেই নাটোরের বনলতা সেনকে তিনি আমাদের সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছেন। জীবনানন্দ দাশের মা ছিলেন আরেক কবি। নাম তার কুসুম কুমারী দাশ। তার নামের সঙ্গে আমরা বিশেষ পরিচিত না হলেও তার একটি কবিতার লাইনের সঙ্গে আমরা সবাই শিশুকাল থেকে পরিচিত। ‘আদর্শ ছেলে’ নামক কবিতার সেই প্রথম বাক্যটি হলো, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’। তবে এ কবিতার মাঝে অন্তর্নিহিত যে কথা তা প্রকাশ পেয়েছে ‘মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন’ বাক্যটিতে। ইস্পাহানী স্কুল ও কলেজের ছাত্রীরা এ প্রতিজ্ঞাই ফুটিয়ে তুলেছেন জুলাই আন্দোলনে আঁকা গ্রাফিতিতে।
যে আশা ও প্রতিজ্ঞা নিয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা এই গ্রাফিতি এঁকেছিলেন, জুলাই আন্দোলনের সামনের সারিতে বা নেতৃত্বে যে তরুণরা ছিলেন তারা কি এ আকাক্সক্ষাকে সম্মান জানাতে পেরেছেন? আন্দোলনের দিনগুলোতে ছাত্র নেতৃত্বের বা সমন্বয়কদের তাদের দাবির প্রশ্নে দৃঢ়, বক্তব্য বিবৃতিতে যুক্তিপূর্ণ ও উপস্থাপনায় বিনয়ী মনে হতো। কিন্তু জুলাই আন্দোলন বিজয়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মুখের ভাষা ও শারিরীক ভাষায় এক ঔদ্ধত্য প্রকাশ পেতে থাকে। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা ক্যাম্পাসে ক্লাস রুমে ফিরে যেতেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে পুরোপুরি দখলে নিয়ে নেয় উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তি। হুংকার ছাড়তে থাকে বাংলাদেশের জন্মবিরোধী শক্তি। বৈষম্যমুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এক গণতান্ত্রিক সমাজের যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিলেন তার বিপরীতে উল্টো যাত্রা শুরু হলো।
অবশেষে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার আগমুহূর্তে মানুষের মুখোশ উন্মোচন করে জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির অনেক মুখ তাদের রাজনৈতিক দলকে নিয়ে আশ্রয় নিলেন জামায়াত ইসলামের ছায়াতলে। দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে তারা বললেন জাতীয় সংসদে আসন লাভের জন্য এটা নিছক নির্বাচনী ঐক্য। আদর্শগত ঐক্য নয়। নির্বাচনের পরে ‘বাউন্স ব্যাক’ করবেন। এখন কি দেখছি? এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জামায়াতের নায়েবে আমির ও বিরোধী দলের উপনেতা বেচারা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের সাহেবের স্থান দখল করে নিয়েছেন। ইতোপূর্বে জোটের প্রেস ব্রিফিং করতেন মো. তাহের, এখন করছেন নাহিদ ইসলাম। এটাই হলো বাউন্স ব্যাক!
চার মাস আগেও নাহিদ ইসলাম তার ফেসবুক পোস্টে বলেছিলেন, ‘জামায়াত ইসলাম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রতি কোনো অঙ্গীকার দেখায়নি। সংস্কারবাদের ছদ্মবেশে তারা রাজনৈতিক অন্তর্ঘাতে শামিল। এনসিপি যাতে শাপলা প্রতীক না পায়, সেক্ষেত্রে জামায়াতও বাধা সৃষ্টি করছে।’ আরো আগে নাহিদ ইসলামসহ অনেক এনসিপি নেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াত ইসলামের ভূমিকার সমালোচনা করেছিলেন। এনসিপি নেতা ও বর্তমানে জামায়াতের অঘোষিত সদস্য নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছিলেন, ‘জামায়াতের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাদের রাজনৈতিক দর্শন ও অতীত আচরণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মানচিত্র ও জাতীয় চেতনার পরিপন্থি। এই দেশকে আর অন্ধকারে ফেরানো যাবে না।’
এনসিপি নেতাদের জামায়াতবিরোধী বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত সেক্রেটারি গোলাম পরওয়ার যেই বললেন ‘জন্ম নিয়েই বাপের সাথে পাল্লা দিয়ো না’ তখন পাল্লা দেয়া বাদ দিয়ে বাপ-বেটা একত্রে নির্বাচনী মঞ্চে হাজির হলো। নির্বাচনী প্রচারণায় এবং নির্বাচনের পরেও যে ভাষায়, যে দেহভংগীতে নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী, আবুল হাসনাত, সারজিস আলমরা কথা বলছেন তা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ বলতে পারেন না। তাহলে কি ’২৪-এর ওই দেয়াললিখন ‘মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন’ শুধু দেয়ালেই রয়ে যাবে? ভাষা প্রতিবাদী হতে পারে কিন্তু অবমাননাকর হবে না। ভাষা কড়া হতে পারে কিন্তু কদর্য হবে কেন? কদর্য ভাষা ব্যবহারের এই প্রবণতা নতুন দলের তরুণ নেতাদের মধ্যে বেড়েই চলেছে। তাদের দলের প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেল লরিয়েট কি ভাষা শিক্ষা দিয়ে গেলেন?
যা-ই হোক বাপ-ব্যাটারা এবার একসঙ্গে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে হাজির হলেন। তবে ভাষাশহীদ দিবসে জামায়াতের শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার কোনো কর্মসূচি আগে কখনো ছিল না। এবারও দলীয়ভাবে ছিল না। জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে বলা হয় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবসে’ জাতীয় সংসদের মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাবেন।’ আগে কখনো আসেননি, কী মনে করে প্রথমবার ফুল দিতে এলেন-এক সাংবাদিকের এ প্রশ্নে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এবার রাষ্ট্রীয় আচার হিসেবে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে আমাকে আসতে হবে আমার সঙ্গীদের নিয়ে। তাই আমি এসেছি।’ তার কথায় সুস্পষ্ট তিনি জামায়াত হিসেবে বা ব্যক্তিগতভাবেও শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি। বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় আচারে বাধ্য হয়ে এসেছেন।
শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক দেওয়ার পরে মোনাজাতের আয়োজন করে একুশের শহীদদের প্রতি পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনকে একটা ধর্মীয় চেহারা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বিগত সময়গুলোতে শহীদ মিনারে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। সাধারণভাবে শহীদদের জন্য দোয়া বা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান মসজিদ ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনা স্থানে করা হয়ে থাকে। শহীদ মিনার ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো ও শহীদদের নামে শপথ নেয়ার স্থান। আর মসজিদ মন্দির গীর্জা প্যাগোডা হচ্ছে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী প্রার্থনা করার স্থান। ভাষা আন্দোলনের শহীদ মিনারকে কি ইসলামী করন করা যায়? দায়িত্বে যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, তাই জামায়াতি ভিসি মহোদয়ই এর যথাযথ ব্যখ্যা দিতে পারবেন। শহীদ মিনার বা এ ধরনের প্রতীকের সামনে মোনাজাত করাকেও অনেক আলেম অনুত্তম বা বিদআত বলে মনে করেন।
তৎকালীন জামায়াত আমির গোলাম আজম কিন্তু ঘোষণা করেই গেছেন, ‘মুসলমানদের তমুদ্দীন ও ধর্মীয় জ্ঞানের ভান্ডার উর্দু ভাষায় সংরক্ষিত রহিয়াছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ হইতে বাংলা ভাষা আন্দোলন সঠিক হয় নাই।’ আর তাই ‘জামায়াতি পাকিস্তান’ আমলে ১৯৭১ সনে এই শহীদ মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে মসজিদ প্রতিষ্ঠার সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল। তরুণদের দল যত চেষ্টাই করুক জামায়াত ২১ ফেব্রুয়ারি, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ মেনে নিতে পারবে না, মানিয়ে নিতেও পারবে না। পশুত্ব নিয়ে যারা ৭১ এ গোটা জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল সেই জামাতের ছায়াতলে থেকে কিভাবে উচ্চারিত হবে ‘মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন’!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
আনোয়ারুল হক

১৯৭১ সনে এই শহীদ মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে মসজিদ প্রতিষ্ঠার সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
জুলাই আন্দোলনের দেড় বছর পার হওয়ার পরেও পথ চলার সময় এখনও রাস্তার পাশের দেওয়ালে আঁকা গ্রাফিতির দিকে তাকিয়ে থাকি। মগবাজার মোড়ে ইস্পাহানী মহিলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে একটা গ্রাফিতির লেখা দেখে মনে হয় তরুণ তরুণীরা সেই শৈশবকালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া কবিতার লাইন শুধু মনে রাখেনি তার মর্মবস্তুও তাদের মনোজগতে প্রভাব ফেলেছে। তাই রক্তস্নাত জুলাই আন্দোলনে বিজয়ী হয়ে সেদিন তারা উচ্চারণ করেছিল ‘মানুষ হইতে হবে’? এই মোদের পণ।
জীবনানন্দ দাশের নাম তো আমরা সবাই জানি। ধানসিঁড়ি নদীটি আর চোখ ছিল যার পাখির নীড়ের মতো- সেই নাটোরের বনলতা সেনকে তিনি আমাদের সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছেন। জীবনানন্দ দাশের মা ছিলেন আরেক কবি। নাম তার কুসুম কুমারী দাশ। তার নামের সঙ্গে আমরা বিশেষ পরিচিত না হলেও তার একটি কবিতার লাইনের সঙ্গে আমরা সবাই শিশুকাল থেকে পরিচিত। ‘আদর্শ ছেলে’ নামক কবিতার সেই প্রথম বাক্যটি হলো, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’। তবে এ কবিতার মাঝে অন্তর্নিহিত যে কথা তা প্রকাশ পেয়েছে ‘মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন’ বাক্যটিতে। ইস্পাহানী স্কুল ও কলেজের ছাত্রীরা এ প্রতিজ্ঞাই ফুটিয়ে তুলেছেন জুলাই আন্দোলনে আঁকা গ্রাফিতিতে।
যে আশা ও প্রতিজ্ঞা নিয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা এই গ্রাফিতি এঁকেছিলেন, জুলাই আন্দোলনের সামনের সারিতে বা নেতৃত্বে যে তরুণরা ছিলেন তারা কি এ আকাক্সক্ষাকে সম্মান জানাতে পেরেছেন? আন্দোলনের দিনগুলোতে ছাত্র নেতৃত্বের বা সমন্বয়কদের তাদের দাবির প্রশ্নে দৃঢ়, বক্তব্য বিবৃতিতে যুক্তিপূর্ণ ও উপস্থাপনায় বিনয়ী মনে হতো। কিন্তু জুলাই আন্দোলন বিজয়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মুখের ভাষা ও শারিরীক ভাষায় এক ঔদ্ধত্য প্রকাশ পেতে থাকে। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা ক্যাম্পাসে ক্লাস রুমে ফিরে যেতেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে পুরোপুরি দখলে নিয়ে নেয় উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তি। হুংকার ছাড়তে থাকে বাংলাদেশের জন্মবিরোধী শক্তি। বৈষম্যমুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এক গণতান্ত্রিক সমাজের যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিলেন তার বিপরীতে উল্টো যাত্রা শুরু হলো।
অবশেষে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার আগমুহূর্তে মানুষের মুখোশ উন্মোচন করে জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির অনেক মুখ তাদের রাজনৈতিক দলকে নিয়ে আশ্রয় নিলেন জামায়াত ইসলামের ছায়াতলে। দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে তারা বললেন জাতীয় সংসদে আসন লাভের জন্য এটা নিছক নির্বাচনী ঐক্য। আদর্শগত ঐক্য নয়। নির্বাচনের পরে ‘বাউন্স ব্যাক’ করবেন। এখন কি দেখছি? এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জামায়াতের নায়েবে আমির ও বিরোধী দলের উপনেতা বেচারা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের সাহেবের স্থান দখল করে নিয়েছেন। ইতোপূর্বে জোটের প্রেস ব্রিফিং করতেন মো. তাহের, এখন করছেন নাহিদ ইসলাম। এটাই হলো বাউন্স ব্যাক!
চার মাস আগেও নাহিদ ইসলাম তার ফেসবুক পোস্টে বলেছিলেন, ‘জামায়াত ইসলাম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রতি কোনো অঙ্গীকার দেখায়নি। সংস্কারবাদের ছদ্মবেশে তারা রাজনৈতিক অন্তর্ঘাতে শামিল। এনসিপি যাতে শাপলা প্রতীক না পায়, সেক্ষেত্রে জামায়াতও বাধা সৃষ্টি করছে।’ আরো আগে নাহিদ ইসলামসহ অনেক এনসিপি নেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াত ইসলামের ভূমিকার সমালোচনা করেছিলেন। এনসিপি নেতা ও বর্তমানে জামায়াতের অঘোষিত সদস্য নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছিলেন, ‘জামায়াতের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাদের রাজনৈতিক দর্শন ও অতীত আচরণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মানচিত্র ও জাতীয় চেতনার পরিপন্থি। এই দেশকে আর অন্ধকারে ফেরানো যাবে না।’
এনসিপি নেতাদের জামায়াতবিরোধী বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত সেক্রেটারি গোলাম পরওয়ার যেই বললেন ‘জন্ম নিয়েই বাপের সাথে পাল্লা দিয়ো না’ তখন পাল্লা দেয়া বাদ দিয়ে বাপ-বেটা একত্রে নির্বাচনী মঞ্চে হাজির হলো। নির্বাচনী প্রচারণায় এবং নির্বাচনের পরেও যে ভাষায়, যে দেহভংগীতে নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী, আবুল হাসনাত, সারজিস আলমরা কথা বলছেন তা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ বলতে পারেন না। তাহলে কি ’২৪-এর ওই দেয়াললিখন ‘মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন’ শুধু দেয়ালেই রয়ে যাবে? ভাষা প্রতিবাদী হতে পারে কিন্তু অবমাননাকর হবে না। ভাষা কড়া হতে পারে কিন্তু কদর্য হবে কেন? কদর্য ভাষা ব্যবহারের এই প্রবণতা নতুন দলের তরুণ নেতাদের মধ্যে বেড়েই চলেছে। তাদের দলের প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেল লরিয়েট কি ভাষা শিক্ষা দিয়ে গেলেন?
যা-ই হোক বাপ-ব্যাটারা এবার একসঙ্গে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে হাজির হলেন। তবে ভাষাশহীদ দিবসে জামায়াতের শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার কোনো কর্মসূচি আগে কখনো ছিল না। এবারও দলীয়ভাবে ছিল না। জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে বলা হয় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবসে’ জাতীয় সংসদের মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাবেন।’ আগে কখনো আসেননি, কী মনে করে প্রথমবার ফুল দিতে এলেন-এক সাংবাদিকের এ প্রশ্নে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এবার রাষ্ট্রীয় আচার হিসেবে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে আমাকে আসতে হবে আমার সঙ্গীদের নিয়ে। তাই আমি এসেছি।’ তার কথায় সুস্পষ্ট তিনি জামায়াত হিসেবে বা ব্যক্তিগতভাবেও শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি। বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় আচারে বাধ্য হয়ে এসেছেন।
শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক দেওয়ার পরে মোনাজাতের আয়োজন করে একুশের শহীদদের প্রতি পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনকে একটা ধর্মীয় চেহারা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বিগত সময়গুলোতে শহীদ মিনারে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। সাধারণভাবে শহীদদের জন্য দোয়া বা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান মসজিদ ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনা স্থানে করা হয়ে থাকে। শহীদ মিনার ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো ও শহীদদের নামে শপথ নেয়ার স্থান। আর মসজিদ মন্দির গীর্জা প্যাগোডা হচ্ছে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী প্রার্থনা করার স্থান। ভাষা আন্দোলনের শহীদ মিনারকে কি ইসলামী করন করা যায়? দায়িত্বে যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, তাই জামায়াতি ভিসি মহোদয়ই এর যথাযথ ব্যখ্যা দিতে পারবেন। শহীদ মিনার বা এ ধরনের প্রতীকের সামনে মোনাজাত করাকেও অনেক আলেম অনুত্তম বা বিদআত বলে মনে করেন।
তৎকালীন জামায়াত আমির গোলাম আজম কিন্তু ঘোষণা করেই গেছেন, ‘মুসলমানদের তমুদ্দীন ও ধর্মীয় জ্ঞানের ভান্ডার উর্দু ভাষায় সংরক্ষিত রহিয়াছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ হইতে বাংলা ভাষা আন্দোলন সঠিক হয় নাই।’ আর তাই ‘জামায়াতি পাকিস্তান’ আমলে ১৯৭১ সনে এই শহীদ মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে মসজিদ প্রতিষ্ঠার সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল। তরুণদের দল যত চেষ্টাই করুক জামায়াত ২১ ফেব্রুয়ারি, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ মেনে নিতে পারবে না, মানিয়ে নিতেও পারবে না। পশুত্ব নিয়ে যারা ৭১ এ গোটা জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল সেই জামাতের ছায়াতলে থেকে কিভাবে উচ্চারিত হবে ‘মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন’!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]