alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

উজ্জ্বলেন্দু চাকমা

: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

প্রথমেই বিএনপি কর্তৃক নবগঠিত মন্ত্রিপরিষদকে মৈত্রীময় অভিনন্দন জানাই। আমাদেরও অনেক দুঃখ-বেদনা, হাহুতাশ রয়েছে। এজন্য অনেক সময় আমার মন কাঁদে সেই সাথে নীরবে পাহাড়ও কাঁদে। আমরা ছোটকাল হতে পাহাড়ে বড় হয়েছি, পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রেক্ষাপটের সব করুণ চিত্র অবলোকন করেছি নিজেও ভুক্তভোগী হয়েছি। পাহাড়ের দুঃখ বেদনার কথাগুলো যদি বলি তা কখনও বলে শেষ করা যাবে না। পাহাড়ের প্রেক্ষাপটের বিষয়ে নতুন করে কিছুই বলার প্রয়োজনবোধ মনে করি না কারণ পাহাড় এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দুঃখটা কোথায় সবকিছু সবাই অবগত রয়েছেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তার নতুন সংসদ সদস্যদের নিয়ে নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে। তার উপর বর্তমান সদাশয় সরকারের অনেক দূরদর্শী চিন্তা চেতনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তির অধিকারী যোগ্য নেতৃত্বেই বিভিন্ন দপ্তর বণ্টন করা হয়েছে । পাহাড়বাসী মনে প্রাণে বিশ্বাস করে এবার বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, বিশ্বে দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। কিন্তু পার্বত্যবাসী একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না বিএনপি সরকার নতুন সরকারে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাহাড়ি একজন মন্ত্রীর সঙ্গে একজন বাঙালি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন। পূর্বে ২৮ বছর আগে মন্ত্রণালয়টি গঠনের পর এই প্রথম কোনো নির্বাচিত সরকারের আমলে এমন ঘটনা ঘটল। পাহাড়ের অনেক নীতিনির্ধারক মনে করছেন এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করা হচ্ছে এবং এটি পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে। দীপেন দেওয়ান পার্বত্যাঞ্চলের চাকমা জাতিসত্তার হলেও মীর হেলাল ওই এলাকার বাসিন্দাও নন, পাহাড়িও নন। পাহাড়ের অনেকেই অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে দেখে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কোনো সরকারের আমলেই এমন ঘটনা ঘটেনি। সেজন্য পার্বত্য চুক্তির সুস্পষ্ট একটি লঙ্ঘন। এর আগে কখনো নজির নেই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একসঙ্গে একাধিক মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেননি। নির্বাচিত সরকার আমলে যে একজন করে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তারা পাহাড়িই ছিলেন। কিন্তু এবার এর ব্যতিক্রম ঘটনায় তা নিয়ে জনমেন উঠেছে প্রশ্ন। কিন্তু কেনই বা করা হলো। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করে ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই। এর আগের বছর সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্তানুসারে এই মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। পাহাড়ে সংঘাত পেরিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনাই ছিল সেই চুক্তির লক্ষ্য।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে স্পষ্ট নিহিত আছে ক, খ, গ ও ঘ খণ্ডে ৭২টি ধারা রয়েছে। এর বেশির ভাগই জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ গঠনসংক্রান্ত। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের কথা বলা আছে। ওই ধারায় লেখা আছে, ‘উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’

যদিও এর আগে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তবে তারা ছিলেন পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্টির। সেই চুক্তিই বলে দেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি মধ্যে প্রায় তিন দশক আগে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের সঙ্গে ওই চুক্তিপত্রে সই করেছিলেন। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ‘অবশ্যই উপজাতীয়’ হবেন বলে চুক্তির ‘গ’-এর ২ ধারায় উল্লেখ রয়েছে। ২২ সদস্যের এই পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ ‘উপজাতীয়দের’ জন্য সংরক্ষিত থাকলেও ‘অউপজাতীয়’দের জন্য সাতটি সদস্য পদ (ছয়জন পুরুষ ও একজন নারী) রাখা হয়েছে। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের বিষয়টি চুক্তিতে রয়েছে। ১৪ সদস্যের ওই কমিটিতে পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দা তিনজন ‘অউপজাতীয়’কে রাখার কথা বলা আছে। এ কমিটিতে মন্ত্রীর সঙ্গে আরও সদস্য থাকেন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, তিন জেলা (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান) পরিষদের তিন চেয়ারম্যান, পার্বত্য তিন জেলার তিন সংসদ সদস্য এবং চাকমা রাজা, বোমাং রাজা ও মং রাজা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছে। কিন্তু বিএনপি একসময় এই চুক্তির বিরোধিতা করলেও ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সময় এমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অতীতে অনেক সরকার মুখে ঠিকই বলেন আর যখন ক্ষমতায় বসে আর মনে থাকে না। এজন্য অবশ্যই সদিচ্ছা থাকা দরকার। সত্যিকার অর্থে সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই শান্তিপূর্ণ ও সুমধুর সমাধান সম্ভব। তবে আমার মত ক্ষুদ্রজ্ঞানে মতামত হলো- যদি বিএনপি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে চায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই তা করা দরকার। তার আগে একজন অপাহাড়িকে দায়িত্ব দিয়ে পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হচ্ছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। পার্বত্য চুক্তির ফলে জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের গঠন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। পার্বত্য চুক্তির ফলে গঠিত এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ও গঠিত হয়। এখন যেভাবে এখানে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ হলো, আগে এর নজির নেই। এতে অনেকেই যুক্তি দিতে পারে যে মন্ত্রী তো পাহাড়ি রাখা হয়েছে। সেক্ষেত্রে চুক্তিকে অগ্রাহ্য করে পাহাড়ের বাইরের প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব দিতে পারবে না কেন? আসলে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজনই তো মন্ত্রিসভার সদস্য। তাছাড়া প্রতিমন্ত্রী পাহাড়ের বাসিন্দাও নয়। সার্বিক বিচারে এখানে আইন নয়, রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মিলেমিশে থাকার জন্য আস্থা অর্জন আনতে হবে ও সদিচ্ছাবোধ জাগ্রত করতে হবে। সেজন্য সদাশয় সরকার টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে পাহাড়ের সম্ভাবনাময় পূর্ণ বিকাশ ঘটাবে এমনটাই প্রত্যাশা করছে পাহাড়বাসী।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (পাঠাগার), রাঙামাটি]

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

ফুলের নিচে চাপা পড়া ভাষার আর্তনাদ

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

বাঙালিরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে কী দিল

ভালোবাসা, সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা

ভালোবাসার দিনে সুন্দরবন: উদযাপনের আড়ালে অস্তিত্বের সংকট

ছবি

তিরাশির সেই দিন

অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে

সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয়

গণতন্ত্র: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা

‘ভোট দিছি ভাই, ছিল দিছি...’

নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

উজ্জ্বলেন্দু চাকমা

সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

প্রথমেই বিএনপি কর্তৃক নবগঠিত মন্ত্রিপরিষদকে মৈত্রীময় অভিনন্দন জানাই। আমাদেরও অনেক দুঃখ-বেদনা, হাহুতাশ রয়েছে। এজন্য অনেক সময় আমার মন কাঁদে সেই সাথে নীরবে পাহাড়ও কাঁদে। আমরা ছোটকাল হতে পাহাড়ে বড় হয়েছি, পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রেক্ষাপটের সব করুণ চিত্র অবলোকন করেছি নিজেও ভুক্তভোগী হয়েছি। পাহাড়ের দুঃখ বেদনার কথাগুলো যদি বলি তা কখনও বলে শেষ করা যাবে না। পাহাড়ের প্রেক্ষাপটের বিষয়ে নতুন করে কিছুই বলার প্রয়োজনবোধ মনে করি না কারণ পাহাড় এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দুঃখটা কোথায় সবকিছু সবাই অবগত রয়েছেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তার নতুন সংসদ সদস্যদের নিয়ে নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে। তার উপর বর্তমান সদাশয় সরকারের অনেক দূরদর্শী চিন্তা চেতনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তির অধিকারী যোগ্য নেতৃত্বেই বিভিন্ন দপ্তর বণ্টন করা হয়েছে । পাহাড়বাসী মনে প্রাণে বিশ্বাস করে এবার বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, বিশ্বে দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। কিন্তু পার্বত্যবাসী একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না বিএনপি সরকার নতুন সরকারে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাহাড়ি একজন মন্ত্রীর সঙ্গে একজন বাঙালি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন। পূর্বে ২৮ বছর আগে মন্ত্রণালয়টি গঠনের পর এই প্রথম কোনো নির্বাচিত সরকারের আমলে এমন ঘটনা ঘটল। পাহাড়ের অনেক নীতিনির্ধারক মনে করছেন এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করা হচ্ছে এবং এটি পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে। দীপেন দেওয়ান পার্বত্যাঞ্চলের চাকমা জাতিসত্তার হলেও মীর হেলাল ওই এলাকার বাসিন্দাও নন, পাহাড়িও নন। পাহাড়ের অনেকেই অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে দেখে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কোনো সরকারের আমলেই এমন ঘটনা ঘটেনি। সেজন্য পার্বত্য চুক্তির সুস্পষ্ট একটি লঙ্ঘন। এর আগে কখনো নজির নেই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একসঙ্গে একাধিক মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেননি। নির্বাচিত সরকার আমলে যে একজন করে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তারা পাহাড়িই ছিলেন। কিন্তু এবার এর ব্যতিক্রম ঘটনায় তা নিয়ে জনমেন উঠেছে প্রশ্ন। কিন্তু কেনই বা করা হলো। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করে ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই। এর আগের বছর সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্তানুসারে এই মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। পাহাড়ে সংঘাত পেরিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনাই ছিল সেই চুক্তির লক্ষ্য।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে স্পষ্ট নিহিত আছে ক, খ, গ ও ঘ খণ্ডে ৭২টি ধারা রয়েছে। এর বেশির ভাগই জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ গঠনসংক্রান্ত। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের কথা বলা আছে। ওই ধারায় লেখা আছে, ‘উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’

যদিও এর আগে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তবে তারা ছিলেন পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্টির। সেই চুক্তিই বলে দেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি মধ্যে প্রায় তিন দশক আগে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের সঙ্গে ওই চুক্তিপত্রে সই করেছিলেন। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ‘অবশ্যই উপজাতীয়’ হবেন বলে চুক্তির ‘গ’-এর ২ ধারায় উল্লেখ রয়েছে। ২২ সদস্যের এই পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ ‘উপজাতীয়দের’ জন্য সংরক্ষিত থাকলেও ‘অউপজাতীয়’দের জন্য সাতটি সদস্য পদ (ছয়জন পুরুষ ও একজন নারী) রাখা হয়েছে। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের বিষয়টি চুক্তিতে রয়েছে। ১৪ সদস্যের ওই কমিটিতে পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দা তিনজন ‘অউপজাতীয়’কে রাখার কথা বলা আছে। এ কমিটিতে মন্ত্রীর সঙ্গে আরও সদস্য থাকেন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, তিন জেলা (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান) পরিষদের তিন চেয়ারম্যান, পার্বত্য তিন জেলার তিন সংসদ সদস্য এবং চাকমা রাজা, বোমাং রাজা ও মং রাজা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছে। কিন্তু বিএনপি একসময় এই চুক্তির বিরোধিতা করলেও ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সময় এমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অতীতে অনেক সরকার মুখে ঠিকই বলেন আর যখন ক্ষমতায় বসে আর মনে থাকে না। এজন্য অবশ্যই সদিচ্ছা থাকা দরকার। সত্যিকার অর্থে সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই শান্তিপূর্ণ ও সুমধুর সমাধান সম্ভব। তবে আমার মত ক্ষুদ্রজ্ঞানে মতামত হলো- যদি বিএনপি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে চায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই তা করা দরকার। তার আগে একজন অপাহাড়িকে দায়িত্ব দিয়ে পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হচ্ছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। পার্বত্য চুক্তির ফলে জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের গঠন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। পার্বত্য চুক্তির ফলে গঠিত এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ও গঠিত হয়। এখন যেভাবে এখানে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ হলো, আগে এর নজির নেই। এতে অনেকেই যুক্তি দিতে পারে যে মন্ত্রী তো পাহাড়ি রাখা হয়েছে। সেক্ষেত্রে চুক্তিকে অগ্রাহ্য করে পাহাড়ের বাইরের প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব দিতে পারবে না কেন? আসলে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজনই তো মন্ত্রিসভার সদস্য। তাছাড়া প্রতিমন্ত্রী পাহাড়ের বাসিন্দাও নয়। সার্বিক বিচারে এখানে আইন নয়, রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মিলেমিশে থাকার জন্য আস্থা অর্জন আনতে হবে ও সদিচ্ছাবোধ জাগ্রত করতে হবে। সেজন্য সদাশয় সরকার টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে পাহাড়ের সম্ভাবনাময় পূর্ণ বিকাশ ঘটাবে এমনটাই প্রত্যাশা করছে পাহাড়বাসী।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (পাঠাগার), রাঙামাটি]

back to top