সমীর কুমার সাহা
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল না; এটি ছিল আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার লড়াই এবং বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্বের প্রশ্ন। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে একমাত্র স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে গণঅভ্যুত্থান গড়ে উঠেছিল, তার পেছনে ছাত্রসমাজের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তৎকালীন লেখক, কবি, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকরা। তাদের কলম ছিল প্রতিবাদের মশাল, তাদের লেখা ছিল চেতনার বারুদ।
ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষাপটে সাহিত্যের শক্তি নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয়। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, সংবাদ ও সম্পাদকীয়- সবকিছুই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। সেই সময়ের সাহিত্যিকরা কেবল পর্যবেক্ষক ছিলেন না; তারা ছিলেন সংগ্রামের সক্রিয় অংশীদার।
ভাষা আন্দোলনের সময়কার অন্যতম শক্তিশালী সাহিত্যিক কণ্ঠ ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। তার ব্যঙ্গ-রচনা ও প্রবন্ধে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বৈষম্য তীব্রভাবে উঠে আসে। একইভাবে শওকত ওসমান তার সাহিত্যে বাঙালির আত্মমর্যাদা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে জাগ্রত করেন। তাদের লেখনী ভাষা আন্দোলনের দর্শনকে জনমানসে প্রোথিত করে।
কবিতার ক্ষেত্রে আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমানের কবিতা ভাষা, মাটি ও মানুষের টানকে গভীর আবেগে তুলে ধরে। যদিও তাদের অনেক রচনা পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত, তবু ভাষা আন্দোলনের চেতনা তাদের সৃষ্টিতে অনুরণিত হয়েছে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহসী ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সরকারি সেন্সরশিপ, হুমকি ও দমন-পীড়নের মাঝেও সংবাদপত্রে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাওয়া যেত।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর রচনা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’। এই গান ভাষা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। এটি কেবল একটি গান নয়; এটি শোক, বেদনা ও অঙ্গীকারের সম্মিলিত সুর। শহীদদের রক্ত যেন এই গানের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ধ্বনিত হয়।
ভাষা আন্দোলনের সময় লেখক-সাংবাদিকদের বাস্তবতা ছিল কঠিন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল সীমিত, রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল কঠোর। তবু তারা আপস করেননি। তাদের লেখনী ছিল সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে। অনেকেই হয়রানি, কারাবরণ ও নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- সত্যের কলম শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসে আমরা ভিন্ন এক বাস্তবতা দেখি। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অর্জিত হয়েছে; ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের গৌরব। কিন্তু প্রশ্ন হলো- আজকের লেখক, কবি ও সাংবাদিকরা কি ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সেই ত্যাগী মানসিকতা ধারণ করছেন?
বর্তমান সময়ের লেখক-সাহিত্যিকদের সামনে চ্যালেঞ্জ ভিন্নধর্মী। এখন আর রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন নেই; আছে ভাষার শুদ্ধতা, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বাংলার টিকে থাকার লড়াই। সামাজিক মাধ্যমের ভূার, দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহ এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাব বাংলার ব্যবহারকে নতুন বস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে। ইংরেজি শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার, বানান ও ব্যাকরণগত শৈথিল্য, সংক্ষিপ্ত বার্তার সংস্কৃতি এসবের মাঝে শুদ্ধ ও সাহিত্যসমৃদ্ধ বাংলা চর্চা অনেক সময় অবহেলিত হচ্ছে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন প্রজন্মের কবি-লেখকরা সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন। অনলাইন পত্রিকা, ব্লগ, ই-বুক- সবকিছু মিলিয়ে বাংলা সাহিত্যের পরিসর প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এই বিস্তারের সঙ্গে দায়িত্ববোধও জরুরি। ভাষা আন্দোলনের সময়কার সাহিত্যিকরা যেমন জাতিসত্তার প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন, তেমনই আজকের প্রজন্মের লেখকদেরও ভাষার সৌন্দর্য ও শুদ্ধতা রক্ষায় সচেতন হতে হবে।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। আগে সংবাদপত্র ছিল প্রধান মাধ্যম; এখন টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক মাধ্যম সংবাদ পরিবেশনের বড় প্ল্যাটফর্ম। দ্রুততা অনেক সময় গভীরতাকে গ্রাস করে। যাচাই-বাছাই ছাড়া খবর প্রচার, চটকদার শিরোনামের প্রতিযোগিতা- এসব প্রবণতা ভাষার মর্যাদা ও সাংবাদিকতার নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভাষা আন্দোলনের চেতনা আমাদের নতুন করে পথ দেখাতে পারে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ধারক। ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা মানে জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা।
বর্তমান লেখক-সাহিত্যিকদের আরেকটি বাস্তবতা হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন। স্বাধীন দেশে থেকেও নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ অনুভূত হয়। ভিন্নমত প্রকাশে কখনও সামাজিক প্রতিক্রিয়া, কখনও আইনি জটিলতা- এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লেখা সহজ নয়। তবু ইতিহাস আমাদের শেখায়, সাহসী কলমই পরিবর্তনের সূচনা করে।
ভাষা আন্দোলনের সময়কার সাহিত্যিকদের অবদান ছিল চেতনা জাগরণের। তারা জাতিকে আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব সেই চেতনাকে সমকালীন বাস্তবতায় প্রয়োগ করা। প্রযুক্তির যুগে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করা, গবেষণাধর্মী লেখা বৃদ্ধি, বিশ্বমানের সাহিত্য সৃষ্টি এবং তরুণদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা- এসবই আজকের করণীয়।
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় নতুন উদ্যম প্রয়োজন। কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, গবেষণা, সৃজনশীল লেখা ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের চর্চা বাড়াতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম- সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
ভাষা আন্দোলনের শহীদরা রক্ত দিয়ে যে অধিকার অর্জন করেছেন, তা কেবল একটি দিবস পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রতিদিনের ভাষা ব্যবহার, সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতার নৈতিকতায় সেই চেতনার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
আজ যখন আমরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করি, তখন কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি সেই সব লেখক, কবি ও সাংবাদিকদের, যাদের কলম আমাদের আত্মপরিচয় রক্ষায় পথ দেখিয়েছে। তাদের অনুভূতি ছিল বেদনার, কিন্তু সেই বেদনা থেকেই জন্ম নিয়েছিল শক্তি। বর্তমান প্রজন্মের লেখকদের অনুভূতিও হতে হবে দায়বদ্ধতারÑ ভাষার প্রতি, সত্যের প্রতি, মানুষের প্রতি।
অতএব, ভাষা আন্দোলন কেবল অতীতের গৌরব নয়; এটি বর্তমানের প্রেরণা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ। রক্তে লেখা ইতিহাসকে কলমে রক্ষা করা- এই দায়িত্ব আজও আমাদের। ভাষার মর্যাদা, সাহিত্যিক সততা ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা বজায় রেখে আমরা যদি এগিয়ে যেতে পারি, তবে ভাষা আন্দোলনের চেতনা চিরজাগরুক থাকবে।
বাংলা ভাষা আমাদের আত্মার স্পন্দন। এই স্পন্দন যেন কখনও ম্লান না হয়Ñ সেটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
[লেখক : প্রাবন্ধিক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
সমীর কুমার সাহা
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল না; এটি ছিল আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার লড়াই এবং বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্বের প্রশ্ন। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে একমাত্র স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে গণঅভ্যুত্থান গড়ে উঠেছিল, তার পেছনে ছাত্রসমাজের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তৎকালীন লেখক, কবি, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকরা। তাদের কলম ছিল প্রতিবাদের মশাল, তাদের লেখা ছিল চেতনার বারুদ।
ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষাপটে সাহিত্যের শক্তি নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয়। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, সংবাদ ও সম্পাদকীয়- সবকিছুই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। সেই সময়ের সাহিত্যিকরা কেবল পর্যবেক্ষক ছিলেন না; তারা ছিলেন সংগ্রামের সক্রিয় অংশীদার।
ভাষা আন্দোলনের সময়কার অন্যতম শক্তিশালী সাহিত্যিক কণ্ঠ ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। তার ব্যঙ্গ-রচনা ও প্রবন্ধে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বৈষম্য তীব্রভাবে উঠে আসে। একইভাবে শওকত ওসমান তার সাহিত্যে বাঙালির আত্মমর্যাদা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে জাগ্রত করেন। তাদের লেখনী ভাষা আন্দোলনের দর্শনকে জনমানসে প্রোথিত করে।
কবিতার ক্ষেত্রে আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমানের কবিতা ভাষা, মাটি ও মানুষের টানকে গভীর আবেগে তুলে ধরে। যদিও তাদের অনেক রচনা পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত, তবু ভাষা আন্দোলনের চেতনা তাদের সৃষ্টিতে অনুরণিত হয়েছে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহসী ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সরকারি সেন্সরশিপ, হুমকি ও দমন-পীড়নের মাঝেও সংবাদপত্রে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাওয়া যেত।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর রচনা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’। এই গান ভাষা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। এটি কেবল একটি গান নয়; এটি শোক, বেদনা ও অঙ্গীকারের সম্মিলিত সুর। শহীদদের রক্ত যেন এই গানের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ধ্বনিত হয়।
ভাষা আন্দোলনের সময় লেখক-সাংবাদিকদের বাস্তবতা ছিল কঠিন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল সীমিত, রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল কঠোর। তবু তারা আপস করেননি। তাদের লেখনী ছিল সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে। অনেকেই হয়রানি, কারাবরণ ও নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- সত্যের কলম শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসে আমরা ভিন্ন এক বাস্তবতা দেখি। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অর্জিত হয়েছে; ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের গৌরব। কিন্তু প্রশ্ন হলো- আজকের লেখক, কবি ও সাংবাদিকরা কি ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সেই ত্যাগী মানসিকতা ধারণ করছেন?
বর্তমান সময়ের লেখক-সাহিত্যিকদের সামনে চ্যালেঞ্জ ভিন্নধর্মী। এখন আর রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন নেই; আছে ভাষার শুদ্ধতা, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বাংলার টিকে থাকার লড়াই। সামাজিক মাধ্যমের ভূার, দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহ এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাব বাংলার ব্যবহারকে নতুন বস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে। ইংরেজি শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার, বানান ও ব্যাকরণগত শৈথিল্য, সংক্ষিপ্ত বার্তার সংস্কৃতি এসবের মাঝে শুদ্ধ ও সাহিত্যসমৃদ্ধ বাংলা চর্চা অনেক সময় অবহেলিত হচ্ছে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন প্রজন্মের কবি-লেখকরা সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন। অনলাইন পত্রিকা, ব্লগ, ই-বুক- সবকিছু মিলিয়ে বাংলা সাহিত্যের পরিসর প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এই বিস্তারের সঙ্গে দায়িত্ববোধও জরুরি। ভাষা আন্দোলনের সময়কার সাহিত্যিকরা যেমন জাতিসত্তার প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন, তেমনই আজকের প্রজন্মের লেখকদেরও ভাষার সৌন্দর্য ও শুদ্ধতা রক্ষায় সচেতন হতে হবে।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। আগে সংবাদপত্র ছিল প্রধান মাধ্যম; এখন টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক মাধ্যম সংবাদ পরিবেশনের বড় প্ল্যাটফর্ম। দ্রুততা অনেক সময় গভীরতাকে গ্রাস করে। যাচাই-বাছাই ছাড়া খবর প্রচার, চটকদার শিরোনামের প্রতিযোগিতা- এসব প্রবণতা ভাষার মর্যাদা ও সাংবাদিকতার নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভাষা আন্দোলনের চেতনা আমাদের নতুন করে পথ দেখাতে পারে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ধারক। ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা মানে জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা।
বর্তমান লেখক-সাহিত্যিকদের আরেকটি বাস্তবতা হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন। স্বাধীন দেশে থেকেও নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ অনুভূত হয়। ভিন্নমত প্রকাশে কখনও সামাজিক প্রতিক্রিয়া, কখনও আইনি জটিলতা- এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লেখা সহজ নয়। তবু ইতিহাস আমাদের শেখায়, সাহসী কলমই পরিবর্তনের সূচনা করে।
ভাষা আন্দোলনের সময়কার সাহিত্যিকদের অবদান ছিল চেতনা জাগরণের। তারা জাতিকে আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব সেই চেতনাকে সমকালীন বাস্তবতায় প্রয়োগ করা। প্রযুক্তির যুগে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করা, গবেষণাধর্মী লেখা বৃদ্ধি, বিশ্বমানের সাহিত্য সৃষ্টি এবং তরুণদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা- এসবই আজকের করণীয়।
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় নতুন উদ্যম প্রয়োজন। কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, গবেষণা, সৃজনশীল লেখা ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের চর্চা বাড়াতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম- সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
ভাষা আন্দোলনের শহীদরা রক্ত দিয়ে যে অধিকার অর্জন করেছেন, তা কেবল একটি দিবস পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রতিদিনের ভাষা ব্যবহার, সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতার নৈতিকতায় সেই চেতনার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
আজ যখন আমরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করি, তখন কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি সেই সব লেখক, কবি ও সাংবাদিকদের, যাদের কলম আমাদের আত্মপরিচয় রক্ষায় পথ দেখিয়েছে। তাদের অনুভূতি ছিল বেদনার, কিন্তু সেই বেদনা থেকেই জন্ম নিয়েছিল শক্তি। বর্তমান প্রজন্মের লেখকদের অনুভূতিও হতে হবে দায়বদ্ধতারÑ ভাষার প্রতি, সত্যের প্রতি, মানুষের প্রতি।
অতএব, ভাষা আন্দোলন কেবল অতীতের গৌরব নয়; এটি বর্তমানের প্রেরণা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ। রক্তে লেখা ইতিহাসকে কলমে রক্ষা করা- এই দায়িত্ব আজও আমাদের। ভাষার মর্যাদা, সাহিত্যিক সততা ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা বজায় রেখে আমরা যদি এগিয়ে যেতে পারি, তবে ভাষা আন্দোলনের চেতনা চিরজাগরুক থাকবে।
বাংলা ভাষা আমাদের আত্মার স্পন্দন। এই স্পন্দন যেন কখনও ম্লান না হয়Ñ সেটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
[লেখক : প্রাবন্ধিক]