alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নিরাপদ সড়কের দাবি

তরিকুল ইসলাম

: মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সড়ক দুর্ঘটনা বা রোডক্র্যাশ বাংলাদেশে মৃত্যু ও আহত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ । সড়ক দুর্ঘটনা দেশের স্বাস্থ্য খাত ও অর্থনীতির ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বর্তমানে দেশে এমন কোনো আইন নেই, যা সামগ্রিকভাবে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সড়ক নিরাপত্তার জন্য একটি আইন প্রণয়নের জরুরি প্রয়োজন রয়েছে, যা সামগ্রিক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কভার করবে বিশেষ করে অতিরিক্ত গতি, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং হেলমেট, সিটবেল্ট ও শিশু সুরক্ষা বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ নির্ভর মূল আচরণগত ঝুঁকির কারণগুলো নিরসন করবে।

সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২৫ সালে দেশে ৫ হাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ তথ্য দেশের সড়ক পরিবহন খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)। সংস্থাটির হিসাবে দেশের সড়কে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে গত বছর। পরিবহন অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বাংলাদেশের জিডিপি’র প্রায় ৩ শতাংশ ক্ষতি হয়। প্রস্তাবিত আইনে বিদ্যমান আইন ও নীতির ঘাটতি পূরণ করা উচিত।

সঠিক আইনের অভাব বা দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা শেষ হচ্ছে না। এতে দেশের সড়কগুলো দিন দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। প্রতি বছর হাজারো মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে বা আহত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, প্রতি বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে বিআরটিএর হিসাব মতে, প্রতিবছর দেশে গড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ মারা যায় ও ১০ হাজারের বেশি বিভিন্ন মাত্রায় আহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০২৩’-এ আরও বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২১ হাজার ৩১৬ জনের। তবে, পুলিশের রিপোর্টে বলা হয়েছে মৃত্যু হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৩৭৬ জনের। একইভাবে ২০১৮ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে ২৪ হাজার ৯৪৪ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও পুলিশের রিপোর্টে বলা হয়েছে মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৬৩৫ জনের। ২০২১ সালের রিপোর্টে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে মৃত্যু হয়েছে ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০১৬ সালে প্রতি লাখে মৃত্যুহার ছিল ১৫.৩ শতাংশ এবং ২০২১ সালে এই মৃত্যুহার ছিল প্রতি লাখে ১৯ জনের মতো।

গত বছরের জানুয়ারিতে ‘রোড সেফটি অ্যাক্ট’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর লক্ষ্য জাতিসংঘ অনুমোদিত সেফ সিস্টেমের পাঁচটি স্থম্ভ- নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর কার্যকর সাড়া গ্রহণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা। প্রস্তাবিত আইনটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। বিদ্যমান ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন (আরটিএ) কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাধান করতে ব্যর্থ হওয়ায় অংশীজনদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০১৮ সালে ছাত্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আরটিএ প্রণয়ন করা হয়। আইনটি মূলত পরিবহন ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণের ওপর কেন্দ্রীভূত। আরটিএ-২০১৮ পথচারী, সাইকেল আরোহী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং শিশুদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর অধিকার যথাযথভাবে সুরক্ষিত করে না। বিদ্যমান আইনে দুর্ঘটনার পর কার্যকর প্রতিক্রিয়ার বিধান নেই, অথচ এটি জাতিসংঘের গ্লোবাল প্ল্যান ফর রোড সেফটির একটি প্রধান কর্মক্ষেত্র। দুর্ঘটনা তদন্তের জন্য মানসম্মত প্রক্রিয়া বা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সঠিক রেকর্ড রাখার কোনো স্পষ্ট পদ্ধতি নেই। তাই নতুন আইনে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৩.৬ ও ১১.২ এবং সড়ক দুর্ঘটনা থেকে মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে জাতিসংঘের গ্লোবাল প্ল্যান টার্গেট পূরণের জন্য বাংলাদেশকে দ্রুত সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমাতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে এমন কোনো আইন নেই, যা গ্লোবাল প্ল্যানে সুপারিশ করা পাঁচটি কর্মক্ষেত্র- বহুমাধ্যম পরিবহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, নিরাপদ অবকাঠামো, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার এবং দুর্ঘটনার পর প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি মানা হয়। সরকার এমনভাবে আইন প্রণয়ন করবে যাতে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়।

দ্রুত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে। আইনটিতে সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের আওতায় তথ্য প্রমাণ-ভিত্তিক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা গ্লোবাল প্ল্যান ফর রোড সেফটিতে সুপারিশ করা পাঁচটি ক্ষেত্রই কভার করবে। নতুন আইন অবশ্যই বৈশ্বিক সেরা চর্চার প্রতিফলন ঘটাবে। সর্বোচ্চ গতি সীমা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। আইনটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজন অনুযায়ী গতি সীমা কমানোর ক্ষমতা দেবে এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো কমাতে চালকদের রক্তে অ্যালকোহলের ঘনত্বের সীমা (বিএসি) বৈশ্বিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

এছাড়াও মোটরযানে শিশুদের জন্য সুরক্ষিত আসন বাধ্যতামূলক করতে হবে। আইনটিতে মোটরসাইকেলের চালক ও পিছনের আরোহী উভয়ের জন্য মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। হেলমেট সঠিকভাবে বাঁধা নিশ্চিত করতে হবে এবং জাতিসংঘ অনুমোদিত মান অনুযায়ী হেলমেটের গুণগত মান নির্ধারণ করতে হবে। আইনটিতে অবশ্যই মোটরযানের সব চালক ও যাত্রীদের জন্য সিটবেল্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ প্রস্তাবিত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর আলোকে একটি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন জরুরি। এই পদ্ধতির লক্ষ্য হলো, সড়ক ব্যবহারকারীর ভুল হলেও সড়ক ব্যবস্থা এমন হবে যাতে মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের মতো চরম পরিণতি না ঘটে। বিশ্বের অনেক দেশ এ পদ্ধতি অনুসরণ করে সড়কে মৃত্যুহার উল্লেখ যোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে।

[লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন), স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন]

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

ফুলের নিচে চাপা পড়া ভাষার আর্তনাদ

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

বাঙালিরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে কী দিল

ভালোবাসা, সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা

ভালোবাসার দিনে সুন্দরবন: উদযাপনের আড়ালে অস্তিত্বের সংকট

ছবি

তিরাশির সেই দিন

অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে

সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয়

গণতন্ত্র: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা

‘ভোট দিছি ভাই, ছিল দিছি...’

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নিরাপদ সড়কের দাবি

তরিকুল ইসলাম

মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সড়ক দুর্ঘটনা বা রোডক্র্যাশ বাংলাদেশে মৃত্যু ও আহত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ । সড়ক দুর্ঘটনা দেশের স্বাস্থ্য খাত ও অর্থনীতির ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বর্তমানে দেশে এমন কোনো আইন নেই, যা সামগ্রিকভাবে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সড়ক নিরাপত্তার জন্য একটি আইন প্রণয়নের জরুরি প্রয়োজন রয়েছে, যা সামগ্রিক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কভার করবে বিশেষ করে অতিরিক্ত গতি, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং হেলমেট, সিটবেল্ট ও শিশু সুরক্ষা বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ নির্ভর মূল আচরণগত ঝুঁকির কারণগুলো নিরসন করবে।

সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২৫ সালে দেশে ৫ হাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ তথ্য দেশের সড়ক পরিবহন খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)। সংস্থাটির হিসাবে দেশের সড়কে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে গত বছর। পরিবহন অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বাংলাদেশের জিডিপি’র প্রায় ৩ শতাংশ ক্ষতি হয়। প্রস্তাবিত আইনে বিদ্যমান আইন ও নীতির ঘাটতি পূরণ করা উচিত।

সঠিক আইনের অভাব বা দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা শেষ হচ্ছে না। এতে দেশের সড়কগুলো দিন দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। প্রতি বছর হাজারো মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে বা আহত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, প্রতি বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে বিআরটিএর হিসাব মতে, প্রতিবছর দেশে গড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ মারা যায় ও ১০ হাজারের বেশি বিভিন্ন মাত্রায় আহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০২৩’-এ আরও বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২১ হাজার ৩১৬ জনের। তবে, পুলিশের রিপোর্টে বলা হয়েছে মৃত্যু হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৩৭৬ জনের। একইভাবে ২০১৮ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে ২৪ হাজার ৯৪৪ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও পুলিশের রিপোর্টে বলা হয়েছে মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৬৩৫ জনের। ২০২১ সালের রিপোর্টে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে মৃত্যু হয়েছে ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০১৬ সালে প্রতি লাখে মৃত্যুহার ছিল ১৫.৩ শতাংশ এবং ২০২১ সালে এই মৃত্যুহার ছিল প্রতি লাখে ১৯ জনের মতো।

গত বছরের জানুয়ারিতে ‘রোড সেফটি অ্যাক্ট’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর লক্ষ্য জাতিসংঘ অনুমোদিত সেফ সিস্টেমের পাঁচটি স্থম্ভ- নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর কার্যকর সাড়া গ্রহণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা। প্রস্তাবিত আইনটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। বিদ্যমান ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন (আরটিএ) কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাধান করতে ব্যর্থ হওয়ায় অংশীজনদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০১৮ সালে ছাত্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আরটিএ প্রণয়ন করা হয়। আইনটি মূলত পরিবহন ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণের ওপর কেন্দ্রীভূত। আরটিএ-২০১৮ পথচারী, সাইকেল আরোহী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং শিশুদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর অধিকার যথাযথভাবে সুরক্ষিত করে না। বিদ্যমান আইনে দুর্ঘটনার পর কার্যকর প্রতিক্রিয়ার বিধান নেই, অথচ এটি জাতিসংঘের গ্লোবাল প্ল্যান ফর রোড সেফটির একটি প্রধান কর্মক্ষেত্র। দুর্ঘটনা তদন্তের জন্য মানসম্মত প্রক্রিয়া বা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সঠিক রেকর্ড রাখার কোনো স্পষ্ট পদ্ধতি নেই। তাই নতুন আইনে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৩.৬ ও ১১.২ এবং সড়ক দুর্ঘটনা থেকে মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে জাতিসংঘের গ্লোবাল প্ল্যান টার্গেট পূরণের জন্য বাংলাদেশকে দ্রুত সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমাতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে এমন কোনো আইন নেই, যা গ্লোবাল প্ল্যানে সুপারিশ করা পাঁচটি কর্মক্ষেত্র- বহুমাধ্যম পরিবহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, নিরাপদ অবকাঠামো, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার এবং দুর্ঘটনার পর প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি মানা হয়। সরকার এমনভাবে আইন প্রণয়ন করবে যাতে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়।

দ্রুত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে। আইনটিতে সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের আওতায় তথ্য প্রমাণ-ভিত্তিক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা গ্লোবাল প্ল্যান ফর রোড সেফটিতে সুপারিশ করা পাঁচটি ক্ষেত্রই কভার করবে। নতুন আইন অবশ্যই বৈশ্বিক সেরা চর্চার প্রতিফলন ঘটাবে। সর্বোচ্চ গতি সীমা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। আইনটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজন অনুযায়ী গতি সীমা কমানোর ক্ষমতা দেবে এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো কমাতে চালকদের রক্তে অ্যালকোহলের ঘনত্বের সীমা (বিএসি) বৈশ্বিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

এছাড়াও মোটরযানে শিশুদের জন্য সুরক্ষিত আসন বাধ্যতামূলক করতে হবে। আইনটিতে মোটরসাইকেলের চালক ও পিছনের আরোহী উভয়ের জন্য মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। হেলমেট সঠিকভাবে বাঁধা নিশ্চিত করতে হবে এবং জাতিসংঘ অনুমোদিত মান অনুযায়ী হেলমেটের গুণগত মান নির্ধারণ করতে হবে। আইনটিতে অবশ্যই মোটরযানের সব চালক ও যাত্রীদের জন্য সিটবেল্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ প্রস্তাবিত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর আলোকে একটি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন জরুরি। এই পদ্ধতির লক্ষ্য হলো, সড়ক ব্যবহারকারীর ভুল হলেও সড়ক ব্যবস্থা এমন হবে যাতে মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের মতো চরম পরিণতি না ঘটে। বিশ্বের অনেক দেশ এ পদ্ধতি অনুসরণ করে সড়কে মৃত্যুহার উল্লেখ যোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে।

[লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন), স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন]

back to top