alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

জাহাঙ্গীর আলম সরকার

: বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আজকের বাংলাদেশ এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক পালাবদল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; এটি মানুষের প্রত্যাশা, আশঙ্কা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের পুনর্গঠনের মুহূর্ত। সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক টানাপড়েন মিলিয়ে দেশের সামনে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা নিছক প্রশাসনিক রদবদলের মাধ্যমে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল দেখতে চায়; শুধুই প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর নীতির প্রতিফলন প্রত্যাশা করে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে তার অভিঘাত প্রথমে পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ঘরে। আয় স্থির, কিন্তু ব্যয় অনবরত বাড়ছে-এই বৈপরীত্য মানুষের মধ্যে অস্বস্তি ও অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। ফলে অর্থনীতি আজ কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতারও প্রশ্ন।

একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হলে বিচ্ছিন্ন উত্তেজনা দ্রুত বৃহত্তর অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা-এসব কেবল নীতিগত আদর্শ নয়, বরং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার মৌলিক শর্ত।

অন্যদিকে, বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক জটিল। বৈশ্বিক অর্থনীতি পারস্পরিক নির্ভরশীল; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কূটনৈতিক সমীকরণ-সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেমন আন্তর্জাতিক আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে, তেমনি বিচক্ষণ কূটনৈতিক ভারসাম্য অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিতে পারে। তাই নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধুই অভ্যন্তরীণ সংকট ব্যবস্থাপনা নয়, বরং বৈশ্বিক বাস্তবতায় দেশের স্বার্থ রক্ষা করে একটি স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান গড়ে তোলা।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা নয়; বরং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, অর্থনীতির ভিত মজবুত করা এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা। ক্ষমতায় আসা সহজ; কিন্তু সংকটের সময় নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন। আর সেই কঠিন সমীকরণই আজকের বাংলাদেশের সামনে প্রধান বাস্তবতা।

বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী। খাদ্যপণ্য, তেল, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রীর দাম ক্রমেই বেড়ে চলেছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পরিবারের জন্য এই ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের কারণ। মানুষের আয়ের সীমাবদ্ধতা এবং ক্রয়ক্ষমতার সীমা বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাজারের এই পরিস্থিতি তাদের জীবনের মানকে হ্রাস করছে।

অর্থনীতিবিদ এবং বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় কারণ। বাজারে কৃত্রিম দামের সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেট, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং তথ্যের অভাব-এসব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা একটি জটিল কাজ। ফলে সরকারকে শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পদক্ষেপও নিতে হবে।

নতুন সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং বাজারে স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য, যাতে কৃত্রিম দাম বৃদ্ধির সুযোগ বন্ধ করা যায়। সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে তথ্যভিত্তিক নীতি কার্যকর করলে পণ্যের সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা উচিত, যে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা পাবে এবং সামাজিক অসন্তোষের পরিবেশ সৃষ্টি হবে না। নাহলে দ্রব্যমূল্যের ধারাবাহিক বৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক চাপই সৃষ্টি করবে না, বরং সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপে ওজনও বাড়াবে। তাই নতুন সরকারকে এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্তি ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে মানিয়ে চলতে হবে, যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

বাংলাদেশের সমাজে মব বা জনসাধারণের উগ্র প্রতিক্রিয়া একটি প্রায়শই নজরকাড়া বাস্তবতা। কখনো কখনো সাধারণ মানুষের আশা, নিরাপত্তা ও আস্থা যদি পূরণ না হয়, তখন ক্ষোভ একত্রিত হয়ে আচরণগত মব-উত্তেজনার রূপ নিতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সামাজিক অসন্তোষ ছোটখাটো সংঘর্ষ থেকে বড় রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। অর্থনৈতিক চাপ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো প্রায়শই জনমনের অসন্তোষকে তীব্র করে এবং তা অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলার সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

নতুন সরকারের জন্য এই পরিস্থিতি একটি চ্যালেঞ্জ। শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং সরকারের উচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক শান্তি বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে মব-সংক্রান্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা। এতে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। সামাজিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় নীতি, তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ এবং সহমতভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সংলাপ তৈরি করতে হবে।

এভাবে মব নিয়ন্ত্রণ শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, বরং সরকারের ক্ষমতা এবং দক্ষতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জনগণের আস্থা অর্জনই একমাত্র উপায়, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলার ভিত্তি স্থাপন করে। এই প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক চাপের সঙ্গে যুক্তি এবং সচেতন নেতৃত্বের সমন্বয় ছাড়া মব-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সচল রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার বৈশ্বিক সম্পর্ক স্থাপন ও বজায় রাখাও সমান জরুরি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, বাণিজ্য সহজীকরণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কার্যকর সমন্বয় করা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের অর্থনীতি শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবাহ, রপ্তানি-আমদানি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ওপরও নির্ভরশীল। তাই সঠিক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে চলমান বিতর্ক এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। এই বিতর্ক দেখায়, কিভাবে আন্তর্জাতিক চাপ, সামরিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈদেশিক নীতি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সরকারি সিদ্ধান্ত শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারকে প্রভাবিত করে না, বরং আন্তর্জাতিক আস্থা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কেরও প্রতিফলন ঘটায়। তাই সরকারের সামনে রয়েছে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করার কাজ-একদিকে দেশের স্বার্থ রক্ষা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বজায় রাখা।

সফল কূটনীতির মাধ্যমে সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারবে, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের পথ খুলে দিতে পারবে এবং বৈদেশিক চাপের মুখে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হবে। এই প্রক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চিত্র ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে বৈদেশিক নীতি ও কূটনীতি একত্রিত হওয়া অপরিহার্য। নতুন সরকারের জন্য এই জটিল সমীকরণ সমাধান করা সহজ নয়, কিন্তু এর সঠিক বাস্তবায়নই দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি স্থাপন করবে।

বাংলাদেশের নতুন সরকার এখন এক উচ্চদাবি ও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। সরকারের ওপর জনগণের প্রত্যাশা শুধু ক্ষমতা গ্রহণ বা প্রশাসনিক পদসমূহে নিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনীতি সচল রাখা, দুর্নীতি কমানো এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা-এই তিনটি প্রধান চাপই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনা স্থিতির রাজনীতির ভিত্তি ক্ষয় করতে পারে, এবং রাজনৈতিক সুনাম ও জনগণের আস্থা ঠিক রাখার জন্য সরকারকে এগুলো সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সরকারের তরফ থেকে সম্প্রতি এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি সচল রাখা এবং দুর্নীতি হ্রাস করা আগামী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই বাস্তবতার মধ্যে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি বৃদ্ধি-এসব কৌশলগত পদক্ষেপ সুস্থ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য। একদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি শক্তি প্রদান করতে হবে।

নতুন সরকারের জন্য এই চ্যালেঞ্জগুলো একত্রিতভাবে সমাধান করা সহজ নয়। সরকারি নীতি-নির্ধারণ, দক্ষ প্রশাসন এবং স্বচ্ছ নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রতিটি স্তরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার মূল কৌশল। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভাবনা সীমিত থাকবে। তাই বর্তমান বাস্তবতা নতুন সরকারকে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতার নয়, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশ পরিচালনার জন্যও পরীক্ষা নিচ্ছে।

বাংলাদেশের সামনে এখন এমন একটি জটিল বাস্তবতা বিরাজ করছে, যা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন বা প্রশাসনিক রদবদলের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়। সামাজিক প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভারসাম্য-এসব একত্রিতভাবে সরকারকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা করছে। জনগণ দ্রুত ফলাফল দেখতে চায়; ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য, সামাজিক অসন্তোষ এবং বৈদেশিক চাপে সরকারের কার্যকারিতা সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে।

একটি সফল সরকার শুধু নির্বাচিত হওয়া বা সরকারি পদ পূর্ণ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারবে না। বরং এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে নাগরিকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক শান্তি রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরির সক্ষমতার ওপর। এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সরকারের প্রয়োজন ধৈর্য, সুচিন্তিত কৌশল এবং সুসংগত নীতি-নির্ধারণ।

অর্থাৎ, নতুন সরকারের জন্য বর্তমান বাস্তবতা একটি সমীকরণ, যেখানে অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের চাপ একসঙ্গে প্রতিফলিত হচ্ছে। এই সমীকরণের সঠিক সমাধানই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক আস্থার ভিত্তি স্থাপন করবে। এজন্য যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শুধু অস্থায়ী সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতি-নির্ধারণে স্থিতিশীলতা এবং জনগণের সঙ্গে সংলাপ নিশ্চিত করতে হবে। এই সমন্বিত প্রচেষ্টাই আগামী সরকারের জন্য চূড়ান্ত পরীক্ষা এবং দেশের সুসংহত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি।

[লেখক: আইনজীবী]

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

ফুলের নিচে চাপা পড়া ভাষার আর্তনাদ

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

বাঙালিরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে কী দিল

ভালোবাসা, সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা

ভালোবাসার দিনে সুন্দরবন: উদযাপনের আড়ালে অস্তিত্বের সংকট

ছবি

তিরাশির সেই দিন

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

জাহাঙ্গীর আলম সরকার

বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আজকের বাংলাদেশ এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক পালাবদল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; এটি মানুষের প্রত্যাশা, আশঙ্কা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের পুনর্গঠনের মুহূর্ত। সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক টানাপড়েন মিলিয়ে দেশের সামনে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা নিছক প্রশাসনিক রদবদলের মাধ্যমে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল দেখতে চায়; শুধুই প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর নীতির প্রতিফলন প্রত্যাশা করে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে তার অভিঘাত প্রথমে পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ঘরে। আয় স্থির, কিন্তু ব্যয় অনবরত বাড়ছে-এই বৈপরীত্য মানুষের মধ্যে অস্বস্তি ও অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। ফলে অর্থনীতি আজ কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতারও প্রশ্ন।

একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হলে বিচ্ছিন্ন উত্তেজনা দ্রুত বৃহত্তর অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা-এসব কেবল নীতিগত আদর্শ নয়, বরং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার মৌলিক শর্ত।

অন্যদিকে, বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক জটিল। বৈশ্বিক অর্থনীতি পারস্পরিক নির্ভরশীল; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কূটনৈতিক সমীকরণ-সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেমন আন্তর্জাতিক আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে, তেমনি বিচক্ষণ কূটনৈতিক ভারসাম্য অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিতে পারে। তাই নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধুই অভ্যন্তরীণ সংকট ব্যবস্থাপনা নয়, বরং বৈশ্বিক বাস্তবতায় দেশের স্বার্থ রক্ষা করে একটি স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান গড়ে তোলা।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা নয়; বরং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, অর্থনীতির ভিত মজবুত করা এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা। ক্ষমতায় আসা সহজ; কিন্তু সংকটের সময় নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন। আর সেই কঠিন সমীকরণই আজকের বাংলাদেশের সামনে প্রধান বাস্তবতা।

বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী। খাদ্যপণ্য, তেল, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রীর দাম ক্রমেই বেড়ে চলেছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পরিবারের জন্য এই ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের কারণ। মানুষের আয়ের সীমাবদ্ধতা এবং ক্রয়ক্ষমতার সীমা বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাজারের এই পরিস্থিতি তাদের জীবনের মানকে হ্রাস করছে।

অর্থনীতিবিদ এবং বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় কারণ। বাজারে কৃত্রিম দামের সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেট, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং তথ্যের অভাব-এসব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা একটি জটিল কাজ। ফলে সরকারকে শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পদক্ষেপও নিতে হবে।

নতুন সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং বাজারে স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য, যাতে কৃত্রিম দাম বৃদ্ধির সুযোগ বন্ধ করা যায়। সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে তথ্যভিত্তিক নীতি কার্যকর করলে পণ্যের সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা উচিত, যে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা পাবে এবং সামাজিক অসন্তোষের পরিবেশ সৃষ্টি হবে না। নাহলে দ্রব্যমূল্যের ধারাবাহিক বৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক চাপই সৃষ্টি করবে না, বরং সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপে ওজনও বাড়াবে। তাই নতুন সরকারকে এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্তি ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে মানিয়ে চলতে হবে, যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

বাংলাদেশের সমাজে মব বা জনসাধারণের উগ্র প্রতিক্রিয়া একটি প্রায়শই নজরকাড়া বাস্তবতা। কখনো কখনো সাধারণ মানুষের আশা, নিরাপত্তা ও আস্থা যদি পূরণ না হয়, তখন ক্ষোভ একত্রিত হয়ে আচরণগত মব-উত্তেজনার রূপ নিতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সামাজিক অসন্তোষ ছোটখাটো সংঘর্ষ থেকে বড় রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। অর্থনৈতিক চাপ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো প্রায়শই জনমনের অসন্তোষকে তীব্র করে এবং তা অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলার সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

নতুন সরকারের জন্য এই পরিস্থিতি একটি চ্যালেঞ্জ। শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং সরকারের উচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক শান্তি বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে মব-সংক্রান্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা। এতে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। সামাজিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় নীতি, তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ এবং সহমতভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সংলাপ তৈরি করতে হবে।

এভাবে মব নিয়ন্ত্রণ শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, বরং সরকারের ক্ষমতা এবং দক্ষতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জনগণের আস্থা অর্জনই একমাত্র উপায়, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলার ভিত্তি স্থাপন করে। এই প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক চাপের সঙ্গে যুক্তি এবং সচেতন নেতৃত্বের সমন্বয় ছাড়া মব-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সচল রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার বৈশ্বিক সম্পর্ক স্থাপন ও বজায় রাখাও সমান জরুরি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, বাণিজ্য সহজীকরণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কার্যকর সমন্বয় করা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের অর্থনীতি শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবাহ, রপ্তানি-আমদানি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ওপরও নির্ভরশীল। তাই সঠিক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে চলমান বিতর্ক এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। এই বিতর্ক দেখায়, কিভাবে আন্তর্জাতিক চাপ, সামরিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈদেশিক নীতি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সরকারি সিদ্ধান্ত শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারকে প্রভাবিত করে না, বরং আন্তর্জাতিক আস্থা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কেরও প্রতিফলন ঘটায়। তাই সরকারের সামনে রয়েছে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করার কাজ-একদিকে দেশের স্বার্থ রক্ষা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বজায় রাখা।

সফল কূটনীতির মাধ্যমে সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারবে, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের পথ খুলে দিতে পারবে এবং বৈদেশিক চাপের মুখে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হবে। এই প্রক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চিত্র ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে বৈদেশিক নীতি ও কূটনীতি একত্রিত হওয়া অপরিহার্য। নতুন সরকারের জন্য এই জটিল সমীকরণ সমাধান করা সহজ নয়, কিন্তু এর সঠিক বাস্তবায়নই দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি স্থাপন করবে।

বাংলাদেশের নতুন সরকার এখন এক উচ্চদাবি ও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। সরকারের ওপর জনগণের প্রত্যাশা শুধু ক্ষমতা গ্রহণ বা প্রশাসনিক পদসমূহে নিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনীতি সচল রাখা, দুর্নীতি কমানো এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা-এই তিনটি প্রধান চাপই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনা স্থিতির রাজনীতির ভিত্তি ক্ষয় করতে পারে, এবং রাজনৈতিক সুনাম ও জনগণের আস্থা ঠিক রাখার জন্য সরকারকে এগুলো সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সরকারের তরফ থেকে সম্প্রতি এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি সচল রাখা এবং দুর্নীতি হ্রাস করা আগামী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই বাস্তবতার মধ্যে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি বৃদ্ধি-এসব কৌশলগত পদক্ষেপ সুস্থ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য। একদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি শক্তি প্রদান করতে হবে।

নতুন সরকারের জন্য এই চ্যালেঞ্জগুলো একত্রিতভাবে সমাধান করা সহজ নয়। সরকারি নীতি-নির্ধারণ, দক্ষ প্রশাসন এবং স্বচ্ছ নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রতিটি স্তরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার মূল কৌশল। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভাবনা সীমিত থাকবে। তাই বর্তমান বাস্তবতা নতুন সরকারকে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতার নয়, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশ পরিচালনার জন্যও পরীক্ষা নিচ্ছে।

বাংলাদেশের সামনে এখন এমন একটি জটিল বাস্তবতা বিরাজ করছে, যা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন বা প্রশাসনিক রদবদলের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়। সামাজিক প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভারসাম্য-এসব একত্রিতভাবে সরকারকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা করছে। জনগণ দ্রুত ফলাফল দেখতে চায়; ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য, সামাজিক অসন্তোষ এবং বৈদেশিক চাপে সরকারের কার্যকারিতা সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে।

একটি সফল সরকার শুধু নির্বাচিত হওয়া বা সরকারি পদ পূর্ণ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারবে না। বরং এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে নাগরিকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক শান্তি রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরির সক্ষমতার ওপর। এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সরকারের প্রয়োজন ধৈর্য, সুচিন্তিত কৌশল এবং সুসংগত নীতি-নির্ধারণ।

অর্থাৎ, নতুন সরকারের জন্য বর্তমান বাস্তবতা একটি সমীকরণ, যেখানে অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের চাপ একসঙ্গে প্রতিফলিত হচ্ছে। এই সমীকরণের সঠিক সমাধানই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক আস্থার ভিত্তি স্থাপন করবে। এজন্য যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শুধু অস্থায়ী সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতি-নির্ধারণে স্থিতিশীলতা এবং জনগণের সঙ্গে সংলাপ নিশ্চিত করতে হবে। এই সমন্বিত প্রচেষ্টাই আগামী সরকারের জন্য চূড়ান্ত পরীক্ষা এবং দেশের সুসংহত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি।

[লেখক: আইনজীবী]

back to top