আনোয়ার হোসেন
একটি জাতির টিকে থাকার জন্য মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য ও ওষুধ অন্যতম। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে এই দুটি জীবন রক্ষাকারী উপাদানে ভেজালের অনুপ্রবেশ এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যা কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং সুপরিকল্পিত গণহত্যার শামিল। জনস্বাস্থ্যের এই চরম সংকটে শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্য আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এক মুমূর্ষু মানবতার আর্তনাদ। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের ওপর যে বিষাক্ত থাবা বিস্তার করেছে, তা হলো খাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল। জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য মৌলিক উপাদানগুলো যখন মৃত্যুর পরোয়ানায় পরিণত হয়, তখন তা কেবল অপরাধ নয়, বরং মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক চরম নিষ্ঠুরতা হিসেবে গণ্য হয়। গুঁড়ো দুধ থেকে শুরু করে চাল, ডাল, তেল এবং অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ- সবকিছুই আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
শিশুরা একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ, অথচ বাংলাদেশে গুঁড়ো দুধ ও বেবি সিরিয়ালের মতো খাদ্যে ভেজাল মেশানো হচ্ছে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে। গুঁড়ো দুধে মেলামাইন, ডিটারজেন্ট কিংবা হোয়াইটনার ব্যবহারের ফলে শিশুদের কিডনি বিকল হওয়া থেকে শুরু করে লিভারের স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে। যখন একটি শিশু তার জীবনের শুরুতেই পুষ্টির বদলে বিষ গ্রহণ করে, তখন সেই জাতির মেধাবী ও সুস্থ ভবিষ্যৎ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। এটি কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং একটি মানবিক বিপর্যয়।
তরল দুধকে দীর্ঘক্ষণ তাজা রাখতে এবং ঘন দেখাতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, ফরমালিন এবং সোডার মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি দুধে পানি মিশিয়ে তার ঘনত্ব বাড়াতে স্টার্চ বা আটা ব্যবহারের প্রমাণও মিলছে। এই দুধ থেকে তৈরি মিষ্টি ও মিষ্টান্নগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ের বিষাক্ত রং ও কৃত্রিম সুগন্ধি। যখন ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবে পরিবেশিত মিষ্টিতে এই বিষ থাকে, তখন তা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে।
পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত এটিই সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম অধ্যায় যখন জীবন রক্ষাকারী ওষুধেই ভেজাল দেওয়া হয়। অ্যান্টিবায়োটিক থেকে শুরু করে আজ বাংলাদেশে সাধারণ প্যারাসিটামল-সবই আজ নকল ও নিম্নমানের উপাদানে সয়লাব। এই ভেজাল ওষুধের কারণে রোগীর রোগ তো সারে-ই না, বরং হার্ট, কিডনি ও লিভার অকেজো হয়ে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। এটি একটি চরম মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি করে, যেখানে মানুষ ডাক্তার বা হাসপাতালের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের সঙ্গে এমন প্রতারণা কোনোভাবেই মার্জনাযোগ্য নয়।
বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ খাদ্যপণ্য কোনো না কোনোভাবে ভেজালের শিকার। সমাধান হিসেবে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; বরং উৎপাদক থেকে বিক্রেতা পর্যন্ত একটি শক্তিশালী নৈতিক কাঠামো এবং কঠোর তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের সচেতনতা এই মহাবিপদ থেকে বাঁচার একমাত্র পথ।
বাংলাদেশে খাদ্য ও ওষুধের এই স্পর্শকাতর ভেজাল পরিস্থিতি আজ এক জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। এটি কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, বরং এটি একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। গুঁড়ো দুধ থেকে শুরু করে চাল-ডাল পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে বিষের উপস্থিতি আমাদের আগামী প্রজন্মকে এক পঙ্গু ও রুগ্ন ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অশুভ চক্র ভাঙতে হলে রাষ্ট্রের কঠোর হস্তক্ষেপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। জীবন রক্ষাকারী দ্রব্যাদিতে ভেজাল মেশানোর এই অমানবিক নজির বন্ধ না হলে, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সকল গল্প শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়বে। একটি সুস্থ, সবল ও মেধাবী জাতি বিনির্মাণে বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
[লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
আনোয়ার হোসেন
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
একটি জাতির টিকে থাকার জন্য মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য ও ওষুধ অন্যতম। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে এই দুটি জীবন রক্ষাকারী উপাদানে ভেজালের অনুপ্রবেশ এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যা কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং সুপরিকল্পিত গণহত্যার শামিল। জনস্বাস্থ্যের এই চরম সংকটে শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্য আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এক মুমূর্ষু মানবতার আর্তনাদ। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের ওপর যে বিষাক্ত থাবা বিস্তার করেছে, তা হলো খাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল। জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য মৌলিক উপাদানগুলো যখন মৃত্যুর পরোয়ানায় পরিণত হয়, তখন তা কেবল অপরাধ নয়, বরং মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক চরম নিষ্ঠুরতা হিসেবে গণ্য হয়। গুঁড়ো দুধ থেকে শুরু করে চাল, ডাল, তেল এবং অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ- সবকিছুই আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
শিশুরা একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ, অথচ বাংলাদেশে গুঁড়ো দুধ ও বেবি সিরিয়ালের মতো খাদ্যে ভেজাল মেশানো হচ্ছে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে। গুঁড়ো দুধে মেলামাইন, ডিটারজেন্ট কিংবা হোয়াইটনার ব্যবহারের ফলে শিশুদের কিডনি বিকল হওয়া থেকে শুরু করে লিভারের স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে। যখন একটি শিশু তার জীবনের শুরুতেই পুষ্টির বদলে বিষ গ্রহণ করে, তখন সেই জাতির মেধাবী ও সুস্থ ভবিষ্যৎ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। এটি কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং একটি মানবিক বিপর্যয়।
তরল দুধকে দীর্ঘক্ষণ তাজা রাখতে এবং ঘন দেখাতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, ফরমালিন এবং সোডার মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি দুধে পানি মিশিয়ে তার ঘনত্ব বাড়াতে স্টার্চ বা আটা ব্যবহারের প্রমাণও মিলছে। এই দুধ থেকে তৈরি মিষ্টি ও মিষ্টান্নগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ের বিষাক্ত রং ও কৃত্রিম সুগন্ধি। যখন ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবে পরিবেশিত মিষ্টিতে এই বিষ থাকে, তখন তা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে।
পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত এটিই সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম অধ্যায় যখন জীবন রক্ষাকারী ওষুধেই ভেজাল দেওয়া হয়। অ্যান্টিবায়োটিক থেকে শুরু করে আজ বাংলাদেশে সাধারণ প্যারাসিটামল-সবই আজ নকল ও নিম্নমানের উপাদানে সয়লাব। এই ভেজাল ওষুধের কারণে রোগীর রোগ তো সারে-ই না, বরং হার্ট, কিডনি ও লিভার অকেজো হয়ে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। এটি একটি চরম মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি করে, যেখানে মানুষ ডাক্তার বা হাসপাতালের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের সঙ্গে এমন প্রতারণা কোনোভাবেই মার্জনাযোগ্য নয়।
বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ খাদ্যপণ্য কোনো না কোনোভাবে ভেজালের শিকার। সমাধান হিসেবে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; বরং উৎপাদক থেকে বিক্রেতা পর্যন্ত একটি শক্তিশালী নৈতিক কাঠামো এবং কঠোর তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের সচেতনতা এই মহাবিপদ থেকে বাঁচার একমাত্র পথ।
বাংলাদেশে খাদ্য ও ওষুধের এই স্পর্শকাতর ভেজাল পরিস্থিতি আজ এক জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। এটি কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, বরং এটি একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। গুঁড়ো দুধ থেকে শুরু করে চাল-ডাল পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে বিষের উপস্থিতি আমাদের আগামী প্রজন্মকে এক পঙ্গু ও রুগ্ন ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অশুভ চক্র ভাঙতে হলে রাষ্ট্রের কঠোর হস্তক্ষেপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। জীবন রক্ষাকারী দ্রব্যাদিতে ভেজাল মেশানোর এই অমানবিক নজির বন্ধ না হলে, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সকল গল্প শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়বে। একটি সুস্থ, সবল ও মেধাবী জাতি বিনির্মাণে বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
[লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল]