alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

আনোয়ারুল হক

: শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের পর ’৫২-এর ভাষা সংগ্রাম শুধু পূর্ববাংলা নয়, গোটা পাকিস্তানের জন্য ছিল সবচেয়ে বড় ঘটনা। ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে সূচিত এ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শুধু ছাত্র সমাজই নয়, দেশবাসীরও একটা বড় অংশের ‘পেয়ারা পাকিস্তান’ থেকে মোহমুক্তি ঘটে। উড়ন্ত পাখি দেখে যেমন মুক্তির অনুভূতি জেগে ওঠে, তেমনি ভাষা সংগ্রাম আরও বিস্তৃত স্বাধীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। ভাষা সংগ্রামের গর্ভে স্বাধীনতার যে ভ্রুণ সৃষ্টি হয়েছিল তা আমাদেরকে নিয়ে যায় স্বাধীনতার পথে। আর ভাষা সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে এবং তার প্রতিটি বাঁকে এদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

একদিকে মধ্যডানপন্থী বিএনপি জোট এবং অপরদিকে উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর জোটকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ দাঁড়িয়েছিল সেখানে অর্থ ও জনবলে দুর্বল বিভক্ত বাম শিবির প্রথমেই ভোটের লড়াই থেকে ছিটকে পড়েছে

তাই দেশের বামপন্থী রাজনীতি নিয়ে আলোচনা আসলেই তার অতীত গৌরব গাথা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আর জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বামপন্থা এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। কমিউনিস্ট আন্দোলনকে পাকিস্তানি শাসকরা বেআইনি ঘোষণা করার পরেও নতুন করে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকারের সংগ্রামে বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। ভাষা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্বেই মিশে আছে কত শত কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের শ্রম, ঘাম আর রক্ত! এ সব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের সঙ্গে গড়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং সে আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে ঐক্য ও মৈত্রী। আর ভাষা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধীরা ওই ঐক্যকে আজ অব্দি মুজিববাদী ঐক্যের ট্যাগ দিয়ে আসছে। তবে একথা ঠিক স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা পর্বে বামপন্থীদের প্রধান দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে ঐক্য ও সংগ্রামের নীতিতে যথাযথ ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারায় এবং একপর্যায়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থার অংশীদার হওয়ায় ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হয়।

তবে আশির দশকজুড়ে একদিকে শ্রেণী আন্দোলন ও সমান্তরালভাবে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে শামিল থেকে বাম আন্দোলন এক আশাজাগানিয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। তারপরেও কেন তৃতীয় কোনো ধারা সৃষ্টি করা গেল না? প্রথমত, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয় বামপন্থীদের মাঝে ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি করে। সেই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়ে। দেশের প্রায় সব বাম দলেও বিভক্তি সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত, পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের কোন্দল দলটির সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে ফেলে। এমনকি ‘২৪- এর জুলাই আন্দোলনের পরে যখন উগ্র ধর্মান্ধ ডানপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটলো এবং দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও নানা মঞ্চের নামে সিপিবি অফিস গুঁড়িয়ে দেয়ার উসকানি দেয়া হলো তখনো পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ মনে হয়নি। বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে ঐক্যবদ্ধতার মধ্য দিয়ে মোকাবিলা করার চেয়ে একপক্ষ অপর পক্ষকে বাক্যবাণে জর্জরিত করতে ব্যস্ত থেকেছে। এ ধরনের নানা পরিস্থিতিই জাতীয় রাজনীতিতে বামপন্থীদের ভূমিকাকে ক্রমাগত দুর্বল করে ফেলেছে। অন্যদিকে দ্বিদলীয় মেরুকরণের ধারাকে শক্তিশালী করেছে।

অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনীতির তৃতীয় শক্তি বিকাশের ক্ষেত্রে কার্যত দেশের বুকে এক শূন্যতা রয়েছে। অনেকে আশা করেছিলেন তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দলটি হয়তোবা মধ্যপন্থী একটি শক্তি হিসেবে রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান নিতে পারে। সে ধরনের আকাক্সক্ষা তরুণ দলের থাকলেও দেশি-বিদেশি যেসব শক্তির রাজনৈতিক খেলায় তারা যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন তা তাদেরকে শেষ পর্যন্ত উগ্র ডানপন্থী ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির সাথে জোটবদ্ধ হতে বাধ্য করে। শূন্যতার সুযোগের সদ্ব্যবহার নানা প্রতিকূলতায় বামপন্থীরা করতে পারেননি। দেশের বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিসমূহ পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় যুক্তিনির্ভর আকর্ষণীয় বক্তব্য ও যুঁতসই কর্মসূচি হাজির করতে পারছে না। বিশেষত ছাত্র-তরুণ এবং মধ্যবিত্তের মাঝে এক উদার ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের যে আকাক্সক্ষা জাগরিত হয়েছিল তাকে ধারণ করে অগ্রসর হওয়ার মত পথবিকল্প রচনা করার কাজটি অগ্রসর করা যায়নি। অথচ পুঁজির শৃঙ্খল আর লুণ্ঠন মানুষের জীবনকে যেভাবে রক্তাক্ত করে, তার বিপরীতে জীবনের সমস্ত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতেই তো রাজনীতিতে বামপন্থার আবির্ভাব। তাহলে কেন ছাত্র তরুণদের দেয়ালে দেয়ালে আঁকা স্বপ্নগুলোর সৌন্দর্যকে বামপন্থীরা ফুটিয়ে তুলতে পারছেন না?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বলাকা কাব্যে বলেছেন পুরনো অভ্যাস বা জ্ঞান নিয়ে বেচাকেনা করতে থাকলে বিকাশ সম্ভব নয়। পুরোনোকে আঁকড়ে রাখা ও গতানুগতিক ধারার বিপরীতে নতুন সত্যের সন্ধান করতে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের বামপন্থীদেরও সেই লক্ষ্যে গভীর আত্মানুসন্ধান প্রয়োজন। দূর থেকে মনে হয়েছে এবারের মতো এতটা অপ্রস্তুত অবস্থায় বামপন্থীরা ইতোপূর্বে কোনো জাতীয় নির্বাচনে শামিল হননি। তাড়াহুড়ো করে যে গনতান্ত্রিক ঐক্য জোট করা হলো তা নির্বাচনের মাঠে কার্যকর করা গেলো না, অপরদিকে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টকেও কিছুটা দুর্বল করে ফেলা হয়েছে বলে মনে হয়। জোট করার পরে সব আসনে জোটের একক প্রার্থী দিতে না পারা বা না চাওয়ার মধ্যেই জোটের ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। জোট করার পরেও অনেক আসনেই তিনজন বামপন্থী প্রার্থী পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচনী এলাকার মানুষকে, বামপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের কী বার্তা দিলেন? একদিকে মধ্যডানপন্থী বিএনপি জোট এবং অপরদিকে উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর জোটকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ দাঁড়িয়েছিল সেখানে অর্থ ও জনবলে দুর্বল বিভক্ত বাম শিবির প্রথমেই ভোটের লড়াই থেকে ছিটকে পড়েছে।

সিপিবি এবং বামপন্থী প্রার্থীদের সংগঠন শক্তির তুলনায় কম ভোটপ্রাপ্তির কৃতিত্ব জামায়াত ইসলামকেও অনেকাংশে দেওয়া যেতে পারে। পশ্চিমা দুনিয়া জামায়াতকে নিয়ে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নেমেছে তার ফলাফল হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই পশ্চিমা দেশের দূতাবাসের প্রতিনিধিরা জামায়াতের আমিরের সঙ্গে বৈঠক করতে থাকেন।

জামায়াত তাদের সংগঠন শক্তি ও বিপুল অর্থবিত্তের সদ্ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি মিডিয়ার সহযোগিতা নিয়ে এমন একটি হাইপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় যে নির্বাচনের রাত পোহালেই জাতি ‘জিন্নাহ টুপি’ পরিহিত এক মন্ত্রী সভা দেখতে পাবে। সব মিলিয়ে সমাজের একাংশে এক ধরনের জামায়াত ভীতির সৃষ্টি হয়। জীবনে কোনো দিন ধানের শীষে ভোট দেননি, এমনকি ভোটের এক সপ্তাহ আগেও কল্পনা করেননি যে ধানের শীষে ভোট দেবেন এমন বিপুলসংখ্যক উদার গনতন্ত্রী, প্রগতিমনা, নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও বামপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষ এবং একচেটিয়াভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। বামপন্থীদের ভোট-ব্যাংক তছনছ করে তারা নীরবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ‘কিসের কাস্তে কিসের মই, দেশ বাঁচাতে ধানের শীষই এবার সই’। এ ধরনের মেরুকরণ দেশের এক বিশেষ পরিস্থিতিতে ইউনুস সরকারের ১৮ মাস যাবত লাগাতার মদতেই সৃষ্টি হয়েছে। ইউনূস সরকারের বিদায়ের মধ্য দিয়ে সামনের দিনগুলোতে নতুন ধরনের মেরুকরণ সৃষ্টির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বামপন্থীদের লাগাতার সে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

জাতীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমান ও অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হলে বাম শক্তিকে আরো দৃঢ়ভাবে একমঞ্চে সমবেত হতে হবে এবং সম্ভবমত অপরাপর গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গেও গড়ে তুলতে হবে সমঝোতা। কিন্তু তাত্ত্বিক রাজনীতির চর্চাকারীদের বড় অংশের ইতিহাসচর্চা অতিমাত্রায় অতীত নির্ভর হওয়ায় বৃহত্তর বাম ঐক্য গঠনে তা বাধা সৃষ্টি করে। এ ক্ষেত্রে বিরাজমান পরিস্থিতি ও বাম রাজনৈতিক দলগুলোর নানামুখী অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান পর্যায়ে বাম ঐক্য এমন একটি জোটের চরিত্র নিয়ে দাঁড় করানো সম্ভব হতে পারে, যেখানে প্রতিটি দলেরই তাদের নিজস্ব কৌশলগত লাইন অনুসরণের স্বাধীনতা থাকবে। আবার অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একসঙ্গে চলার জন্য সকলে দৃঢ় প্রত্যয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। প্রাথমিকভাবে এ ধরনের নমনীয় কৌশল গ্রহণ করেই সব বামপন্থী দল/গ্রুপকে এক ছাতার নিচে এক রাখা সম্ভব হতে পারে। আর নেতৃত্ব চাপিয়ে না দিয়ে তা আন্দোলন সংগ্রামের মাঠেই গড়ে উঠবে।

তবে সবার আগে প্রয়োজন বামপন্থী দল হিসেবে সবচেয়ে পরিচিত, কৃষক ক্ষেতমজুর শ্রমিক আন্দোলনে পোড় খাওয়া, ছাত্র যুব নারী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখা, এক সময়ের শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে কোন্দলমুক্ত একটি গতিশীল দল হিসেবে পরিচালনার পদ্ধতি আয়ত্ব করা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সিপিবিতে বিভক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতৃবৃন্দ সহ বিভক্ত একটি অংশ অবশেষে নিজেদেরকে বিলুপ্ত করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ায় পার্টির ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সাধিত হয়। ওই সময়ের পার্টির সংখ্যালঘিষ্ট অংশ সংখ্যাগুরু কর্মীদের সমর্থন নিয়ে পার্টিকে পুনরায় সংগঠিত করতে সফল হলেও পূর্বের সেই শক্তি, ধার, প্রভাব আর নেই।রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে খুব একটা সংহত মনে না হলেও সিপিবি বামপন্থীদের প্রধান দল।

কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সাথে একমত নন এমন বামপন্থী দল ও ব্যক্তিরা অনেক সময় পার্টির কট্টর সমালোচনা করেন। আবার তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় দেখা যায় তারা এখনো ভরসা করেন সিপিবি যথাযথ উদ্যোগ নিলে গড়ে উঠতে পারে ঐক্যবদ্ধ বামপন্থী আন্দোলন। তাই সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাহিদা মাফিক সিপিবির পূনর্গঠন ও নবায়ন। এ পূনর্গঠন ও নবায়ন মানে মনোজগতে পরিবর্তন ও নবায়ন। কর্মপন্থা ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন। ‘উইনার্স টেক অল’- এর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মত ও নেতৃত্ব একতরফা চাপিয়ে না দিয়ে ভিন্নমতকেও গুরুত্ব দিয়ে সম্ভবমত ‘একোমোডেট’ করা, নেতৃত্বে জায়গা করে দেওয়া। নিজেদেরকে বামপন্থার একমাত্র জিম্মাদারীর মনোভাব যেনো কখনো আচ্ছন্ন করে না ফেলে। সিপিবির নতুন নেতৃত্বকে সার্বজনীন ভাবমূর্তি নিয়ে পার্টি কর্মীদের মুখোমুখি হতে হবে।

সংগঠন শক্তি অনুযায়ী বামপন্থী বা কমিউনিস্টদের অবস্থান ভোটের মাঠে দুর্বল হলেও আন্দোলনের মাঠে বামপন্থীরা অতটা দুর্বল নয়। শ্রমিক কৃষকের আন্দোলনে বামপন্থীরাই অগ্রণী। সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরের যে সংগ্রামে বামপন্থীরা নিয়োজিত সে সংগ্রামকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পার্লামেন্টের অভ্যন্তরেও বামপন্থীদের সরব উপস্থিতি জরুরি। সেজন্য দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া দরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এটা তো সবার জানা দেশে ৪৫০০ ইউনিয়ন কাউন্সিলে ১জন করে চেয়ারম্যান আর ৫৫০০০ ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ৪৯৫ টি উপজেলায় ৪৯৫ জন চেয়ারম্যান, ৯৯০ জন ভাইস চেয়ারম্যান, ৩৩০টি পৌর সভায় প্রতিটিতে একজন করে মেয়র এবং ৩০০০ এর বেশি ওয়ার্ড কমিশনার, ১৩টি সিটি করপোরেশনে ১৩ জন মেয়র ছাড়াও রয়েছে ৬৬৮টি কাউন্সিলর পদ। এই বিশাল স্থানীয় সরকার কাঠামোতে বামপন্থীরা শূন্য বা প্রায় শূন্য উপস্থিতি নিয়ে ভবিষ্যতেও জাতীয় নির্বাচনে আশাপ্রদ ফল করা খুবই কঠিন হবে। এ সকল নির্বাচনে একক বামপন্থী প্রার্থী রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত এখনই নিয়ে সে লক্ষ্যে স্থানীয় নেতৃত্বকে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করার নির্দেশ দেয়া প্রয়োজন। ছাড়াও এলাকার সৎ ও জনদরদি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাথেও সংযোগ স্থাপন ও সমর্থন দেয়ার পরিকল্পনা থাকতে হবে। জাতীয়ভাবে নেতৃত্বে বা দায়িত্বে আসীন বামপন্থী নেতৃত্বের পক্ষে সম্ভব না হলেও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বকে, সার্বক্ষণিক কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পড়ে আছেন অথচ স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখ এ ধরনের নেতা কর্মীদের এবং এবারের সংসদ নির্বাচনে স্থানীয় নেতৃত্ব যারাই প্রার্থী হয়েছিলেন সবারই স্থানীয় সরকারের যুঁতসই পদে নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। পার্টি শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে এ ধরনের সমালোচনা আছে যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘মেয়র’ পদে প্রার্থী পাওয়া যায় কিন্তু কাউন্সিলর পদে পাওয়া যায় না। তাহলে কি পার্টি সংগঠন উল্টো পিরামিড আকারে গড়ে উঠছে? বিকাশের স্বার্থে এ ধারার পরিবর্তন জরুরি।

পুরুষকে নারীর পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে প্রয়াস চলছে এবং নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, বাঙালির শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে আজ উগ্র ধর্মান্ধ শক্তির যে উল্লম্ফন চলছে, ক্রোধ প্রতিহিংসা ও ঘৃণার সংস্কৃতি যেভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তাঁর বিপরীতেও বামপন্থী শক্তিকে শুভবুদ্ধি ও মানবিকতাবোধ সম্পন্ন ব্যাপকতর মানুষের জমায়েত গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মানুষের জীবন ও জীবিকার সংগ্রামের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার যে সমস্ত দেশবিরোধী চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বা চুক্তি প্রক্রিয়া অগ্রসর করে রেখেছে তা বাতিল বা পুনর্মূল্যায়ন করার দাবি নিয়েও জাতীয়ভাবে দেশপ্রেমিক সকল শক্তির সমাবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বামপন্থীদেরই নিতে হবে। এ ধরনের নানামুখী কর্মপ্রয়াসের মধ্য দিয়েই বামপন্থী ও গনতান্ত্রিক শক্তি সমূহ পরষ্পরের আরো কাছাকাছি আসবে এবং জাতীয়ভাবেও দৃশ্যমান শক্তি হয়ে উঠবে।

আমাদের দেশটাতো ছাত্র আন্দোলনের দেশ। ভাষা সংগ্রাম, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯ এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র সমাজ নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আয়োজনপর্বে, স্বাধীন দেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গনসংগ্রাম এবং ’৯০ এর গণঅভ্যুত্থানেও ছাত্র আন্দোলন সূচনা পর্ব থেকেই অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। আর এ সকল সংগ্রামে ব্যাপক ছাত্র সমাজের সমর্থন নিয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন সমূহ বিশেষত ছাত্র ইউনিয়ন গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। ‘২৪ এর জুলাই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ভুল হাতে পড়লেও ছাত্র সমাজ মরণজয়ী এ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বামপন্থী প্রায় সকল ছাত্র সংগঠনে দুঃখজনক বিভক্তি তাদের প্রতিটি সংগঠনকেই দুর্বল করে দিয়েছে। আর বিভক্ত হওয়ার পর তাদের সময় কাটে সংগঠন বিকাশের কার্যক্রম বাদ দিয়ে দুই অংশের একে অপরের থেকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার হাস্যকর প্রতিযোগিতায় এবং পারস্পরিক ব্যক্তি আক্রমণ ও সমালোচনায়। ছাত্র ইউনিয়নের কিছু সংখ্যক প্রাক্তনীরাও এ দলাদলিতে যুক্ত হয়ে কি সুখ অনুভব করেন বোধগম্য নয়। পরিচিতজনদের নিকট থেকে বাম ছাত্র সংগঠন বিশেষত ছাত্র ইউনিয়ন সম্পর্কে যা শুনি তা আশাপ্রদ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ হলে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো নেই বা থাকলেও না থাকার মতো। সাংগঠনিক কাজ এবং সংগঠনের সমর্থক সংখ্যা ও বলয় বৃদ্ধির জন্য লেগে থেকে হলে, ক্যাম্পাসে যে ধরনের কাজ করতে হয় তা অপেক্ষা মাঝেমধ্যে স্বল্প শক্তির অ্যাক্টিভিজম তাদের পছন্দ। নেতৃত্বের প্রতি শুভানুধ্যায়ীদের সমালোচনা যে, তারা বিভাগে, ক্লাসে, লাইব্রেরিতে ও পরীক্ষায় নিয়মিত নন। সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে তাই নিয়মিত সংযোগও নেই। ভিন্ন মত ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে ধৈর্য নিয়ে জানা-বোঝার চেষ্টা না করা, জীবনাচরণের ক্ষেত্রে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির প্রতি এক ধরনের উন্নাসিকতা এবং স্থান-কাল বিবেচনায় না নিয়ে নানা ইস্যুতে বিরূপ মন্তব্য করা, সংগঠন গড়ে তোলা ও বিস্তৃত করার পথে অন্তরায়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এবং চিন্তাভাবনা নবায়ন করে সংগঠন গড়ার কাজে ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করার পর ছাত্রদল থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে; এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে মিলিত হওয়ায় তারাও আর ‘নতুন রাজনীতির’ স্বপ্নের প্রতিনিধি নয়, বরং ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার খেলায় মত্ত একটি গোষ্ঠী মাত্র। এ পরিস্থিতিতে উপযুক্ত কর্মসূচি নিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে অগ্রসর হতে পারলে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের দ্রুত বিকাশ লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভক্তির রাজনীতি ত্যাগ করে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র ইউনিয়ন কি এই সুযোগ গ্রহণ করবে?

উগ্র মৌলবাদ পরিবেশ-পরিস্থিতিতে কখনো পাখনা মেলে ধরে, কখনো গুটিয়ে রাখে। আজ হয়তোবা পরিস্থিতির সুযোগে তারা পূর্ণ পাখনা মেলে ধরায় কারো কারো কাছে মনে হচ্ছে এ কোন সকাল, রাতের থেকেও অন্ধকার! হ্যাঁ, অন্ধকার তো বটেই। কিন্তু এটাও মনে রাখা প্রয়োজন বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্ধকার সত্য, তবে শেষ সত্য নয়! সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য - “নূতন সমুদ্রতীরে / তরী নিয়ে দিতে হবে পাড়ি / ডাকিছে কাণ্ডারী / এসেছে আদেশ / বন্দরে বন্ধনকাল এবারের মতো হল শেষ / পুরানো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না।” দূর হতে মৃত্যুর গর্জন না শুনে, তুফানের মাঝে নতুন সমুদ্রতীরে পাড়ি দেওয়ার সাহসিকতা নিয়ে, নতুন স্বর্ণদ্বার খোলার জন্য শুরু হোক নতুন প্রস্তুতি।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

ফুলের নিচে চাপা পড়া ভাষার আর্তনাদ

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

আনোয়ারুল হক

শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের পর ’৫২-এর ভাষা সংগ্রাম শুধু পূর্ববাংলা নয়, গোটা পাকিস্তানের জন্য ছিল সবচেয়ে বড় ঘটনা। ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে সূচিত এ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শুধু ছাত্র সমাজই নয়, দেশবাসীরও একটা বড় অংশের ‘পেয়ারা পাকিস্তান’ থেকে মোহমুক্তি ঘটে। উড়ন্ত পাখি দেখে যেমন মুক্তির অনুভূতি জেগে ওঠে, তেমনি ভাষা সংগ্রাম আরও বিস্তৃত স্বাধীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। ভাষা সংগ্রামের গর্ভে স্বাধীনতার যে ভ্রুণ সৃষ্টি হয়েছিল তা আমাদেরকে নিয়ে যায় স্বাধীনতার পথে। আর ভাষা সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে এবং তার প্রতিটি বাঁকে এদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

একদিকে মধ্যডানপন্থী বিএনপি জোট এবং অপরদিকে উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর জোটকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ দাঁড়িয়েছিল সেখানে অর্থ ও জনবলে দুর্বল বিভক্ত বাম শিবির প্রথমেই ভোটের লড়াই থেকে ছিটকে পড়েছে

তাই দেশের বামপন্থী রাজনীতি নিয়ে আলোচনা আসলেই তার অতীত গৌরব গাথা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আর জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বামপন্থা এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। কমিউনিস্ট আন্দোলনকে পাকিস্তানি শাসকরা বেআইনি ঘোষণা করার পরেও নতুন করে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকারের সংগ্রামে বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। ভাষা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্বেই মিশে আছে কত শত কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের শ্রম, ঘাম আর রক্ত! এ সব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের সঙ্গে গড়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং সে আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে ঐক্য ও মৈত্রী। আর ভাষা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধীরা ওই ঐক্যকে আজ অব্দি মুজিববাদী ঐক্যের ট্যাগ দিয়ে আসছে। তবে একথা ঠিক স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা পর্বে বামপন্থীদের প্রধান দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে ঐক্য ও সংগ্রামের নীতিতে যথাযথ ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারায় এবং একপর্যায়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থার অংশীদার হওয়ায় ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হয়।

তবে আশির দশকজুড়ে একদিকে শ্রেণী আন্দোলন ও সমান্তরালভাবে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে শামিল থেকে বাম আন্দোলন এক আশাজাগানিয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। তারপরেও কেন তৃতীয় কোনো ধারা সৃষ্টি করা গেল না? প্রথমত, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয় বামপন্থীদের মাঝে ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি করে। সেই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়ে। দেশের প্রায় সব বাম দলেও বিভক্তি সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত, পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের কোন্দল দলটির সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে ফেলে। এমনকি ‘২৪- এর জুলাই আন্দোলনের পরে যখন উগ্র ধর্মান্ধ ডানপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটলো এবং দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও নানা মঞ্চের নামে সিপিবি অফিস গুঁড়িয়ে দেয়ার উসকানি দেয়া হলো তখনো পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ মনে হয়নি। বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে ঐক্যবদ্ধতার মধ্য দিয়ে মোকাবিলা করার চেয়ে একপক্ষ অপর পক্ষকে বাক্যবাণে জর্জরিত করতে ব্যস্ত থেকেছে। এ ধরনের নানা পরিস্থিতিই জাতীয় রাজনীতিতে বামপন্থীদের ভূমিকাকে ক্রমাগত দুর্বল করে ফেলেছে। অন্যদিকে দ্বিদলীয় মেরুকরণের ধারাকে শক্তিশালী করেছে।

অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনীতির তৃতীয় শক্তি বিকাশের ক্ষেত্রে কার্যত দেশের বুকে এক শূন্যতা রয়েছে। অনেকে আশা করেছিলেন তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দলটি হয়তোবা মধ্যপন্থী একটি শক্তি হিসেবে রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান নিতে পারে। সে ধরনের আকাক্সক্ষা তরুণ দলের থাকলেও দেশি-বিদেশি যেসব শক্তির রাজনৈতিক খেলায় তারা যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন তা তাদেরকে শেষ পর্যন্ত উগ্র ডানপন্থী ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির সাথে জোটবদ্ধ হতে বাধ্য করে। শূন্যতার সুযোগের সদ্ব্যবহার নানা প্রতিকূলতায় বামপন্থীরা করতে পারেননি। দেশের বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিসমূহ পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় যুক্তিনির্ভর আকর্ষণীয় বক্তব্য ও যুঁতসই কর্মসূচি হাজির করতে পারছে না। বিশেষত ছাত্র-তরুণ এবং মধ্যবিত্তের মাঝে এক উদার ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের যে আকাক্সক্ষা জাগরিত হয়েছিল তাকে ধারণ করে অগ্রসর হওয়ার মত পথবিকল্প রচনা করার কাজটি অগ্রসর করা যায়নি। অথচ পুঁজির শৃঙ্খল আর লুণ্ঠন মানুষের জীবনকে যেভাবে রক্তাক্ত করে, তার বিপরীতে জীবনের সমস্ত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতেই তো রাজনীতিতে বামপন্থার আবির্ভাব। তাহলে কেন ছাত্র তরুণদের দেয়ালে দেয়ালে আঁকা স্বপ্নগুলোর সৌন্দর্যকে বামপন্থীরা ফুটিয়ে তুলতে পারছেন না?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বলাকা কাব্যে বলেছেন পুরনো অভ্যাস বা জ্ঞান নিয়ে বেচাকেনা করতে থাকলে বিকাশ সম্ভব নয়। পুরোনোকে আঁকড়ে রাখা ও গতানুগতিক ধারার বিপরীতে নতুন সত্যের সন্ধান করতে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের বামপন্থীদেরও সেই লক্ষ্যে গভীর আত্মানুসন্ধান প্রয়োজন। দূর থেকে মনে হয়েছে এবারের মতো এতটা অপ্রস্তুত অবস্থায় বামপন্থীরা ইতোপূর্বে কোনো জাতীয় নির্বাচনে শামিল হননি। তাড়াহুড়ো করে যে গনতান্ত্রিক ঐক্য জোট করা হলো তা নির্বাচনের মাঠে কার্যকর করা গেলো না, অপরদিকে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টকেও কিছুটা দুর্বল করে ফেলা হয়েছে বলে মনে হয়। জোট করার পরে সব আসনে জোটের একক প্রার্থী দিতে না পারা বা না চাওয়ার মধ্যেই জোটের ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। জোট করার পরেও অনেক আসনেই তিনজন বামপন্থী প্রার্থী পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচনী এলাকার মানুষকে, বামপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের কী বার্তা দিলেন? একদিকে মধ্যডানপন্থী বিএনপি জোট এবং অপরদিকে উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর জোটকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ দাঁড়িয়েছিল সেখানে অর্থ ও জনবলে দুর্বল বিভক্ত বাম শিবির প্রথমেই ভোটের লড়াই থেকে ছিটকে পড়েছে।

সিপিবি এবং বামপন্থী প্রার্থীদের সংগঠন শক্তির তুলনায় কম ভোটপ্রাপ্তির কৃতিত্ব জামায়াত ইসলামকেও অনেকাংশে দেওয়া যেতে পারে। পশ্চিমা দুনিয়া জামায়াতকে নিয়ে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নেমেছে তার ফলাফল হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই পশ্চিমা দেশের দূতাবাসের প্রতিনিধিরা জামায়াতের আমিরের সঙ্গে বৈঠক করতে থাকেন।

জামায়াত তাদের সংগঠন শক্তি ও বিপুল অর্থবিত্তের সদ্ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি মিডিয়ার সহযোগিতা নিয়ে এমন একটি হাইপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় যে নির্বাচনের রাত পোহালেই জাতি ‘জিন্নাহ টুপি’ পরিহিত এক মন্ত্রী সভা দেখতে পাবে। সব মিলিয়ে সমাজের একাংশে এক ধরনের জামায়াত ভীতির সৃষ্টি হয়। জীবনে কোনো দিন ধানের শীষে ভোট দেননি, এমনকি ভোটের এক সপ্তাহ আগেও কল্পনা করেননি যে ধানের শীষে ভোট দেবেন এমন বিপুলসংখ্যক উদার গনতন্ত্রী, প্রগতিমনা, নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও বামপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষ এবং একচেটিয়াভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। বামপন্থীদের ভোট-ব্যাংক তছনছ করে তারা নীরবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ‘কিসের কাস্তে কিসের মই, দেশ বাঁচাতে ধানের শীষই এবার সই’। এ ধরনের মেরুকরণ দেশের এক বিশেষ পরিস্থিতিতে ইউনুস সরকারের ১৮ মাস যাবত লাগাতার মদতেই সৃষ্টি হয়েছে। ইউনূস সরকারের বিদায়ের মধ্য দিয়ে সামনের দিনগুলোতে নতুন ধরনের মেরুকরণ সৃষ্টির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বামপন্থীদের লাগাতার সে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

জাতীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমান ও অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হলে বাম শক্তিকে আরো দৃঢ়ভাবে একমঞ্চে সমবেত হতে হবে এবং সম্ভবমত অপরাপর গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গেও গড়ে তুলতে হবে সমঝোতা। কিন্তু তাত্ত্বিক রাজনীতির চর্চাকারীদের বড় অংশের ইতিহাসচর্চা অতিমাত্রায় অতীত নির্ভর হওয়ায় বৃহত্তর বাম ঐক্য গঠনে তা বাধা সৃষ্টি করে। এ ক্ষেত্রে বিরাজমান পরিস্থিতি ও বাম রাজনৈতিক দলগুলোর নানামুখী অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান পর্যায়ে বাম ঐক্য এমন একটি জোটের চরিত্র নিয়ে দাঁড় করানো সম্ভব হতে পারে, যেখানে প্রতিটি দলেরই তাদের নিজস্ব কৌশলগত লাইন অনুসরণের স্বাধীনতা থাকবে। আবার অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একসঙ্গে চলার জন্য সকলে দৃঢ় প্রত্যয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। প্রাথমিকভাবে এ ধরনের নমনীয় কৌশল গ্রহণ করেই সব বামপন্থী দল/গ্রুপকে এক ছাতার নিচে এক রাখা সম্ভব হতে পারে। আর নেতৃত্ব চাপিয়ে না দিয়ে তা আন্দোলন সংগ্রামের মাঠেই গড়ে উঠবে।

তবে সবার আগে প্রয়োজন বামপন্থী দল হিসেবে সবচেয়ে পরিচিত, কৃষক ক্ষেতমজুর শ্রমিক আন্দোলনে পোড় খাওয়া, ছাত্র যুব নারী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখা, এক সময়ের শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে কোন্দলমুক্ত একটি গতিশীল দল হিসেবে পরিচালনার পদ্ধতি আয়ত্ব করা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সিপিবিতে বিভক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতৃবৃন্দ সহ বিভক্ত একটি অংশ অবশেষে নিজেদেরকে বিলুপ্ত করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ায় পার্টির ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সাধিত হয়। ওই সময়ের পার্টির সংখ্যালঘিষ্ট অংশ সংখ্যাগুরু কর্মীদের সমর্থন নিয়ে পার্টিকে পুনরায় সংগঠিত করতে সফল হলেও পূর্বের সেই শক্তি, ধার, প্রভাব আর নেই।রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে খুব একটা সংহত মনে না হলেও সিপিবি বামপন্থীদের প্রধান দল।

কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সাথে একমত নন এমন বামপন্থী দল ও ব্যক্তিরা অনেক সময় পার্টির কট্টর সমালোচনা করেন। আবার তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় দেখা যায় তারা এখনো ভরসা করেন সিপিবি যথাযথ উদ্যোগ নিলে গড়ে উঠতে পারে ঐক্যবদ্ধ বামপন্থী আন্দোলন। তাই সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাহিদা মাফিক সিপিবির পূনর্গঠন ও নবায়ন। এ পূনর্গঠন ও নবায়ন মানে মনোজগতে পরিবর্তন ও নবায়ন। কর্মপন্থা ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন। ‘উইনার্স টেক অল’- এর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মত ও নেতৃত্ব একতরফা চাপিয়ে না দিয়ে ভিন্নমতকেও গুরুত্ব দিয়ে সম্ভবমত ‘একোমোডেট’ করা, নেতৃত্বে জায়গা করে দেওয়া। নিজেদেরকে বামপন্থার একমাত্র জিম্মাদারীর মনোভাব যেনো কখনো আচ্ছন্ন করে না ফেলে। সিপিবির নতুন নেতৃত্বকে সার্বজনীন ভাবমূর্তি নিয়ে পার্টি কর্মীদের মুখোমুখি হতে হবে।

সংগঠন শক্তি অনুযায়ী বামপন্থী বা কমিউনিস্টদের অবস্থান ভোটের মাঠে দুর্বল হলেও আন্দোলনের মাঠে বামপন্থীরা অতটা দুর্বল নয়। শ্রমিক কৃষকের আন্দোলনে বামপন্থীরাই অগ্রণী। সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরের যে সংগ্রামে বামপন্থীরা নিয়োজিত সে সংগ্রামকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পার্লামেন্টের অভ্যন্তরেও বামপন্থীদের সরব উপস্থিতি জরুরি। সেজন্য দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া দরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এটা তো সবার জানা দেশে ৪৫০০ ইউনিয়ন কাউন্সিলে ১জন করে চেয়ারম্যান আর ৫৫০০০ ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ৪৯৫ টি উপজেলায় ৪৯৫ জন চেয়ারম্যান, ৯৯০ জন ভাইস চেয়ারম্যান, ৩৩০টি পৌর সভায় প্রতিটিতে একজন করে মেয়র এবং ৩০০০ এর বেশি ওয়ার্ড কমিশনার, ১৩টি সিটি করপোরেশনে ১৩ জন মেয়র ছাড়াও রয়েছে ৬৬৮টি কাউন্সিলর পদ। এই বিশাল স্থানীয় সরকার কাঠামোতে বামপন্থীরা শূন্য বা প্রায় শূন্য উপস্থিতি নিয়ে ভবিষ্যতেও জাতীয় নির্বাচনে আশাপ্রদ ফল করা খুবই কঠিন হবে। এ সকল নির্বাচনে একক বামপন্থী প্রার্থী রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত এখনই নিয়ে সে লক্ষ্যে স্থানীয় নেতৃত্বকে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করার নির্দেশ দেয়া প্রয়োজন। ছাড়াও এলাকার সৎ ও জনদরদি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাথেও সংযোগ স্থাপন ও সমর্থন দেয়ার পরিকল্পনা থাকতে হবে। জাতীয়ভাবে নেতৃত্বে বা দায়িত্বে আসীন বামপন্থী নেতৃত্বের পক্ষে সম্ভব না হলেও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বকে, সার্বক্ষণিক কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পড়ে আছেন অথচ স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখ এ ধরনের নেতা কর্মীদের এবং এবারের সংসদ নির্বাচনে স্থানীয় নেতৃত্ব যারাই প্রার্থী হয়েছিলেন সবারই স্থানীয় সরকারের যুঁতসই পদে নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। পার্টি শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে এ ধরনের সমালোচনা আছে যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘মেয়র’ পদে প্রার্থী পাওয়া যায় কিন্তু কাউন্সিলর পদে পাওয়া যায় না। তাহলে কি পার্টি সংগঠন উল্টো পিরামিড আকারে গড়ে উঠছে? বিকাশের স্বার্থে এ ধারার পরিবর্তন জরুরি।

পুরুষকে নারীর পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে প্রয়াস চলছে এবং নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, বাঙালির শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে আজ উগ্র ধর্মান্ধ শক্তির যে উল্লম্ফন চলছে, ক্রোধ প্রতিহিংসা ও ঘৃণার সংস্কৃতি যেভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তাঁর বিপরীতেও বামপন্থী শক্তিকে শুভবুদ্ধি ও মানবিকতাবোধ সম্পন্ন ব্যাপকতর মানুষের জমায়েত গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মানুষের জীবন ও জীবিকার সংগ্রামের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার যে সমস্ত দেশবিরোধী চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বা চুক্তি প্রক্রিয়া অগ্রসর করে রেখেছে তা বাতিল বা পুনর্মূল্যায়ন করার দাবি নিয়েও জাতীয়ভাবে দেশপ্রেমিক সকল শক্তির সমাবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বামপন্থীদেরই নিতে হবে। এ ধরনের নানামুখী কর্মপ্রয়াসের মধ্য দিয়েই বামপন্থী ও গনতান্ত্রিক শক্তি সমূহ পরষ্পরের আরো কাছাকাছি আসবে এবং জাতীয়ভাবেও দৃশ্যমান শক্তি হয়ে উঠবে।

আমাদের দেশটাতো ছাত্র আন্দোলনের দেশ। ভাষা সংগ্রাম, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯ এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র সমাজ নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আয়োজনপর্বে, স্বাধীন দেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গনসংগ্রাম এবং ’৯০ এর গণঅভ্যুত্থানেও ছাত্র আন্দোলন সূচনা পর্ব থেকেই অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। আর এ সকল সংগ্রামে ব্যাপক ছাত্র সমাজের সমর্থন নিয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন সমূহ বিশেষত ছাত্র ইউনিয়ন গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। ‘২৪ এর জুলাই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ভুল হাতে পড়লেও ছাত্র সমাজ মরণজয়ী এ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বামপন্থী প্রায় সকল ছাত্র সংগঠনে দুঃখজনক বিভক্তি তাদের প্রতিটি সংগঠনকেই দুর্বল করে দিয়েছে। আর বিভক্ত হওয়ার পর তাদের সময় কাটে সংগঠন বিকাশের কার্যক্রম বাদ দিয়ে দুই অংশের একে অপরের থেকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার হাস্যকর প্রতিযোগিতায় এবং পারস্পরিক ব্যক্তি আক্রমণ ও সমালোচনায়। ছাত্র ইউনিয়নের কিছু সংখ্যক প্রাক্তনীরাও এ দলাদলিতে যুক্ত হয়ে কি সুখ অনুভব করেন বোধগম্য নয়। পরিচিতজনদের নিকট থেকে বাম ছাত্র সংগঠন বিশেষত ছাত্র ইউনিয়ন সম্পর্কে যা শুনি তা আশাপ্রদ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ হলে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো নেই বা থাকলেও না থাকার মতো। সাংগঠনিক কাজ এবং সংগঠনের সমর্থক সংখ্যা ও বলয় বৃদ্ধির জন্য লেগে থেকে হলে, ক্যাম্পাসে যে ধরনের কাজ করতে হয় তা অপেক্ষা মাঝেমধ্যে স্বল্প শক্তির অ্যাক্টিভিজম তাদের পছন্দ। নেতৃত্বের প্রতি শুভানুধ্যায়ীদের সমালোচনা যে, তারা বিভাগে, ক্লাসে, লাইব্রেরিতে ও পরীক্ষায় নিয়মিত নন। সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে তাই নিয়মিত সংযোগও নেই। ভিন্ন মত ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে ধৈর্য নিয়ে জানা-বোঝার চেষ্টা না করা, জীবনাচরণের ক্ষেত্রে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির প্রতি এক ধরনের উন্নাসিকতা এবং স্থান-কাল বিবেচনায় না নিয়ে নানা ইস্যুতে বিরূপ মন্তব্য করা, সংগঠন গড়ে তোলা ও বিস্তৃত করার পথে অন্তরায়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এবং চিন্তাভাবনা নবায়ন করে সংগঠন গড়ার কাজে ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করার পর ছাত্রদল থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে; এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে মিলিত হওয়ায় তারাও আর ‘নতুন রাজনীতির’ স্বপ্নের প্রতিনিধি নয়, বরং ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার খেলায় মত্ত একটি গোষ্ঠী মাত্র। এ পরিস্থিতিতে উপযুক্ত কর্মসূচি নিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে অগ্রসর হতে পারলে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের দ্রুত বিকাশ লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভক্তির রাজনীতি ত্যাগ করে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র ইউনিয়ন কি এই সুযোগ গ্রহণ করবে?

উগ্র মৌলবাদ পরিবেশ-পরিস্থিতিতে কখনো পাখনা মেলে ধরে, কখনো গুটিয়ে রাখে। আজ হয়তোবা পরিস্থিতির সুযোগে তারা পূর্ণ পাখনা মেলে ধরায় কারো কারো কাছে মনে হচ্ছে এ কোন সকাল, রাতের থেকেও অন্ধকার! হ্যাঁ, অন্ধকার তো বটেই। কিন্তু এটাও মনে রাখা প্রয়োজন বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্ধকার সত্য, তবে শেষ সত্য নয়! সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য - “নূতন সমুদ্রতীরে / তরী নিয়ে দিতে হবে পাড়ি / ডাকিছে কাণ্ডারী / এসেছে আদেশ / বন্দরে বন্ধনকাল এবারের মতো হল শেষ / পুরানো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না।” দূর হতে মৃত্যুর গর্জন না শুনে, তুফানের মাঝে নতুন সমুদ্রতীরে পাড়ি দেওয়ার সাহসিকতা নিয়ে, নতুন স্বর্ণদ্বার খোলার জন্য শুরু হোক নতুন প্রস্তুতি।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

back to top