রেজাউল করিম খোকন
পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা টাকাকে চাঁদাবাজি বলে মনে করেন না সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এই অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছেন, তারা এই টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তুলছে। জোর করে আদায় করছে না। এ জন্য চাঁদা বলা যাচ্ছে না। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে শেখ রবিউল আলম বলেন, সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়। মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয়, সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে। কিন্তু তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করে থাকে। শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ অনেক সংস্থা আছে। তারা সমঝোতার ভিত্তিতে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা তোলে। সেখানে আবার প্রাধান্য পায় যখন যার প্রভাব থাকে, এমন মালিকদের বা দলের প্রভাব থাকে। যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের একটা আধিপত্য থাকে। কিন্তু এটা চাঁদা আকারে আমাদের কাছে দেখার সুযোগ হচ্ছে না। কারণ, তারা সমঝোতার ভিত্তিতে করছে।
তাহলে কি নবগঠিত সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর মাধ্যমে চাঁদাকে জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়া হলো? তাহলে কীভাবে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা হবে? বক্তব্যের শুরুতেই যেন বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে- এ প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিকভাবেই।
দায়িত্ব গ্রহণ করে নতুন সরকারের একজন মন্ত্রীর মুখে এমন কথা শুনে দেশবাসী অবাক হয়েছেন। অনেকেই হতাশ হয়েছেন। সবার মনে প্রশ্ন জেগেছে, তাহলে কি চাঁদাবাজিতে লিপ্ত মানুষ বৈধতা পেয়ে গেল? কয়েক দিন আগে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে একজন টেম্পু চালক চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এলে চাঁদাবাজি নির্মূল হবে। যদিও ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। তারা দখলদারিত্বের মহোৎসব শুরু করেছে- বিভিন্ন হাটবাজার, ট্রাক স্ট্যান্ড, বাস টার্মিনাল, টেম্পু স্ট্যান্ড দখল করে দেদারসে চাঁদাবাজি করেছে। প্রায়ই খবরের কাগজে এসব প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ড বিব্রত হলেও তাদের কতিপয় নেতাকর্মীর বেপরোয়া চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি।
সদ্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি চেয়ারে বসতেই চাঁদাবাজির যে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা শুনে অনেকে হতবাক হয়েছেন। দুর্নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান টিআইবি শঙ্কা প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চাঁদাবাজির মতো একটি অপরাধকে ভিন্ন ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করে বৈধতার আবরণ দেয়ার চেষ্টা দুর্নীতিবিরোধী ঘোষিত অবস্থানের পরিপন্থী। এতে শুধু পরিবহন খাত নয়, রাষ্ট্রীয় সেবা ও উন্নয়নব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও দুর্নীতিকে ন্যায্যতা দেয়ার প্রবণতা শক্তিশালী হতে পারে।
টিআইবি জোর দিয়ে জানিয়েছে, নবগঠিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু সেই ঘোষণার অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবহন খাতে বহুল আলোচিত চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা সরকারের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অসহনীয় চাঁদাবাজি ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে যে হারে চাঁদা দিতে হতো, ২০২৪ সালের ৬ আগস্টের পরও ব্যবসায়ীদের একই হারে চাঁদা দিতে হচ্ছে; ক্ষেত্রবিশেষে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দিতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেনি, এমনকি সরকারি দপ্তরে এক দিনের জন্যও দুর্নীতি কমেনি। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার হুমকিও দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবগঠিত সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। নতুন সরকার এমন সময়ে ক্ষমতায় এসেছে, যখন অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন, বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি তলানিতে ঠেকেছে। এসব সমস্যার মূলে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং অস্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, চাঁদাবাজি ও তীব্র জ্বালানি সংকটে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এখন কারখানায় চাঁদা দেয়া যেন আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
সাধারণত দেখা যায়, চাঁদাবাজরা এসে নিজেদের সরকারি দলের লোক পরিচয় দেয়। যখন যে সরকার আসে, তখনই তারা বলে- আমরা সরকারি দলের লোক; আমাদের চাঁদা দিতে হবে। এভাবে পাড়া-মহল্লার নানা অজুহাতে চাঁদা আদায় করা হয়। সড়ক পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অনেক ব্যবসায়ীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। নিজেদের কারখানায় ঢুকতেও শিল্পমালিকদের চাঁদা দিতে হয়। অফিস ও রাস্তায় চাঁদা দিতে হয়।
বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে জনসমালোচনার মুখে পড়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা ছিল, দেশ চাঁদাবাজিমুক্ত হবে। কিন্তু পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলার কার্যকর উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং চাঁদাবাজি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা। সরকারি খাতে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা জরুরি। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নন, তাদের প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিয়ে ব্যবসায় ফিরিয়ে আনা এবং ঋণের সুদের হার যুক্তিসংগত পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। এ প্রেক্ষাপটে সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বক্তব্য সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে হয়। চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা নাগরিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
সড়ক পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা নাগরিকদের দুর্ভোগের বড় কারণ। প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের বেশি মানুষ সড়কে নিহত হন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। ট্রাক ও পণ্যবাহী যান থেকেও বিপুল অর্থ আদায় করা হয়। রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল, অসাধু পুলিশ ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের আঁতাতের ফলে এ দুর্নীতিপুষ্ট ব্যবস্থা টিকে আছে।
পরিবহন খাতে পরিচালন ব্যয়ের বাইরে চাঁদা বা কল্যাণের নামে যেভাবেই টাকা তোলা হোক না কেন, তার চাপ পড়ে জনগণের ওপর। পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। আইন অনুযায়ী চালক-সহকারীদের নিয়োগপত্র ও মাসিক বেতন নিশ্চিত করাই প্রকৃত শ্রমিক কল্যাণ।
পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সরকারের বড় দায়িত্ব। এ খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে কোনো পদক্ষেপই ফলপ্রসূ হবে না। শুরু থেকেই শক্ত বার্তা দেয়ার বিকল্প নেই। আমরা নতুন সরকারের কাছে চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত অর্থনীতির প্রত্যাশা করছি।
[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
রেজাউল করিম খোকন
রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬
পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা টাকাকে চাঁদাবাজি বলে মনে করেন না সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এই অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছেন, তারা এই টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তুলছে। জোর করে আদায় করছে না। এ জন্য চাঁদা বলা যাচ্ছে না। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে শেখ রবিউল আলম বলেন, সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়। মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয়, সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে। কিন্তু তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করে থাকে। শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ অনেক সংস্থা আছে। তারা সমঝোতার ভিত্তিতে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা তোলে। সেখানে আবার প্রাধান্য পায় যখন যার প্রভাব থাকে, এমন মালিকদের বা দলের প্রভাব থাকে। যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের একটা আধিপত্য থাকে। কিন্তু এটা চাঁদা আকারে আমাদের কাছে দেখার সুযোগ হচ্ছে না। কারণ, তারা সমঝোতার ভিত্তিতে করছে।
তাহলে কি নবগঠিত সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর মাধ্যমে চাঁদাকে জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়া হলো? তাহলে কীভাবে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা হবে? বক্তব্যের শুরুতেই যেন বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে- এ প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিকভাবেই।
দায়িত্ব গ্রহণ করে নতুন সরকারের একজন মন্ত্রীর মুখে এমন কথা শুনে দেশবাসী অবাক হয়েছেন। অনেকেই হতাশ হয়েছেন। সবার মনে প্রশ্ন জেগেছে, তাহলে কি চাঁদাবাজিতে লিপ্ত মানুষ বৈধতা পেয়ে গেল? কয়েক দিন আগে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে একজন টেম্পু চালক চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এলে চাঁদাবাজি নির্মূল হবে। যদিও ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। তারা দখলদারিত্বের মহোৎসব শুরু করেছে- বিভিন্ন হাটবাজার, ট্রাক স্ট্যান্ড, বাস টার্মিনাল, টেম্পু স্ট্যান্ড দখল করে দেদারসে চাঁদাবাজি করেছে। প্রায়ই খবরের কাগজে এসব প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ড বিব্রত হলেও তাদের কতিপয় নেতাকর্মীর বেপরোয়া চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি।
সদ্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি চেয়ারে বসতেই চাঁদাবাজির যে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা শুনে অনেকে হতবাক হয়েছেন। দুর্নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান টিআইবি শঙ্কা প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চাঁদাবাজির মতো একটি অপরাধকে ভিন্ন ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করে বৈধতার আবরণ দেয়ার চেষ্টা দুর্নীতিবিরোধী ঘোষিত অবস্থানের পরিপন্থী। এতে শুধু পরিবহন খাত নয়, রাষ্ট্রীয় সেবা ও উন্নয়নব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও দুর্নীতিকে ন্যায্যতা দেয়ার প্রবণতা শক্তিশালী হতে পারে।
টিআইবি জোর দিয়ে জানিয়েছে, নবগঠিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু সেই ঘোষণার অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবহন খাতে বহুল আলোচিত চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা সরকারের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অসহনীয় চাঁদাবাজি ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে যে হারে চাঁদা দিতে হতো, ২০২৪ সালের ৬ আগস্টের পরও ব্যবসায়ীদের একই হারে চাঁদা দিতে হচ্ছে; ক্ষেত্রবিশেষে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দিতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেনি, এমনকি সরকারি দপ্তরে এক দিনের জন্যও দুর্নীতি কমেনি। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার হুমকিও দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবগঠিত সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। নতুন সরকার এমন সময়ে ক্ষমতায় এসেছে, যখন অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন, বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি তলানিতে ঠেকেছে। এসব সমস্যার মূলে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং অস্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, চাঁদাবাজি ও তীব্র জ্বালানি সংকটে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এখন কারখানায় চাঁদা দেয়া যেন আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
সাধারণত দেখা যায়, চাঁদাবাজরা এসে নিজেদের সরকারি দলের লোক পরিচয় দেয়। যখন যে সরকার আসে, তখনই তারা বলে- আমরা সরকারি দলের লোক; আমাদের চাঁদা দিতে হবে। এভাবে পাড়া-মহল্লার নানা অজুহাতে চাঁদা আদায় করা হয়। সড়ক পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অনেক ব্যবসায়ীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। নিজেদের কারখানায় ঢুকতেও শিল্পমালিকদের চাঁদা দিতে হয়। অফিস ও রাস্তায় চাঁদা দিতে হয়।
বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে জনসমালোচনার মুখে পড়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা ছিল, দেশ চাঁদাবাজিমুক্ত হবে। কিন্তু পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলার কার্যকর উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং চাঁদাবাজি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা। সরকারি খাতে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা জরুরি। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নন, তাদের প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিয়ে ব্যবসায় ফিরিয়ে আনা এবং ঋণের সুদের হার যুক্তিসংগত পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। এ প্রেক্ষাপটে সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বক্তব্য সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে হয়। চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা নাগরিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
সড়ক পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা নাগরিকদের দুর্ভোগের বড় কারণ। প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের বেশি মানুষ সড়কে নিহত হন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। ট্রাক ও পণ্যবাহী যান থেকেও বিপুল অর্থ আদায় করা হয়। রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল, অসাধু পুলিশ ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের আঁতাতের ফলে এ দুর্নীতিপুষ্ট ব্যবস্থা টিকে আছে।
পরিবহন খাতে পরিচালন ব্যয়ের বাইরে চাঁদা বা কল্যাণের নামে যেভাবেই টাকা তোলা হোক না কেন, তার চাপ পড়ে জনগণের ওপর। পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। আইন অনুযায়ী চালক-সহকারীদের নিয়োগপত্র ও মাসিক বেতন নিশ্চিত করাই প্রকৃত শ্রমিক কল্যাণ।
পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সরকারের বড় দায়িত্ব। এ খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে কোনো পদক্ষেপই ফলপ্রসূ হবে না। শুরু থেকেই শক্ত বার্তা দেয়ার বিকল্প নেই। আমরা নতুন সরকারের কাছে চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত অর্থনীতির প্রত্যাশা করছি।
[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]