alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

: রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬

কারও ধন-দৌলত, সম্মান, ভালো ফল বা উচ্চ মর্যাদা দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়া এবং তার ধ্বংস কামনা করাকে পরশ্রীকাতরতা বলে। পরশ্রীকাতরতা হলো মানব চরিত্রের একটি নিন্দনীয় স্বভাব। এর অর্থ হলো অন্যের উন্নতি ও সৌভাগ্য দেখে ঈর্ষা প্রকাশ করা। আবার এভাবে বলা যায়, পরশ্রীকাতরতা হলো অন্যের সুখ, উন্নতি, ধন-সম্পদ, সম্মান বা সাফল্য দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়া এবং মনে কষ্ট পাওয়া। পরশ্রীকাতর ব্যক্তিদের মনের মধ্যে যে বিষয়গুলো থাকে তা হলো- অন্যের ধ্বংস কামনা করা, পরনিন্দা ও পরচর্চা করা, নিজের হীনমন্যতায় ভোগা, অন্যের সফলতায় অখুশি হওয়া এবং সারাক্ষণ প্রতিযোগিতার মানসিকতায় থাকা। মূলত, পরশ্রীকাতরতা একটি মানসিক ব্যাধি, যা মানুষের সুখ ও সামাজিক প্রশান্তি নষ্ট করে।

পরশ্রীকাতরতার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাব মারাত্মক। পরশ্রীকাতর ব্যক্তি শুধু নিজের ক্ষতি করে না, অন্য মানুষের ক্ষতিও করে। কখনও কখনও মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। পরশ্রীকাতর ব্যক্তিরা এমন সব কথা তৈরি করে, যার কারণে পারিবারিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।

পরশ্রীকাতরতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হলো আমিত্ব। ‘আমিত্ব’ বলতে নিজের অস্তিত্ব, অহমিকা বা আমি-বোধকে বোঝায়। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে কেন্দ্র করে চিন্তা করে; যা অনেক সময় অহংকার বা পশুত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমিত্বের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো- ১. অহমিকা ও স্বার্থপরতা; আমিত্ববাদীরা মনে করে, আমিই সব, আমার মতই ঠিক- এই ধরনের চিন্তাভাবনা তাদের মধ্যে কাজ করে। ২. অহংবোধ তাদের আচরণে প্রবল থাকে, যাকে নিজত্ব বা অহমিকা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। ৩. অতিরিক্ত আমিত্ব মানুষকে অন্ধ করে এবং পাশবিকতাকে উৎসাহিত করে। ৪. ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বড় অশান্তি সৃষ্টি করে এই আমিত্ব।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব-বিরোধ সৃষ্টি হয় পরশ্রীকাতরতা এবং আমিত্বের কারণে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরিবর্তিত আর্থসামাজিক পরিস্থিতিই আমিত্ব ও পরশ্রীকাতর ব্যক্তি তৈরির অন্যতম কারণ। কিছু মানুষ দীর্ঘ সময় কাজকর্ম না করে বেকার বসে থাকে। এরা বিভিন্ন দোকানে আড্ডা দেয়। এদের বেশিরভাগ সময় কাটে অন্যের নেতিবাচক সমালোচনা করে। এদের এক কথায় কুয়োর ব্যাঙও বলা যায়। বর্তমানে তারা ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ইন্টারনেটের অশোভন দিকটাই এদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। তথ্যপ্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে এরা অমানুষ ও নৃশংস হয়ে ওঠে।

এই অমানুষ হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে এরা একটি খারাপ পরিবেশে বেড়ে উঠেছে। নিষ্ঠুরতা হলো ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কষ্ট দেয়া। এই ধরনের মানুষের নিষ্ঠুরতার প্রথম পর্যায় শুরু হয় শৈশবে কুকুর বা অন্য প্রাণী নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তারা অন্যকে মারধরের দিকে এগিয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়া, নানা অপকর্ম করা এবং এক পর্যায়ে ডাকাতি, প্রলোভন ও হত্যার মতো কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে।

আমিত্ব বা অহংবোধ সমাজে অশান্তি, নৈতিক অবক্ষয় এবং দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ। যখন মানুষ নিজের স্বার্থ ও আত্মপ্রাধান্যকে সবার ওপরে রাখে, তখন ন্যায়-অন্যায়বোধ লোপ পায়; ফলে সুদ, ঘুষ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এই অহমিকা পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে এবং যৌথ অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে।

আমিত্ব ও পরশ্রীকাতরতা সামাজিক ব্যাধি। এর ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়, দ্বন্দ্ব-সংঘাত বৃদ্ধি পায় এবং সমাজের নৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়। আমিত্ববাদী ও পরশ্রীকাতররা বেশিরভাগ সময় কুৎসা রটনা, মিথ্যা দোষারোপ এবং প্রতিহিংসার মাধ্যমে সামাজিক শান্তি ও ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট করে। সমাজে এরা- ১. অন্যের সাফল্য সহ্য করতে না পেরে পরিবার ও সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে। ২. পারস্পরিক বিশ্বাস কমিয়ে দেয়, যা আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীদের মধ্যে বিচ্ছেদের কারণ হয়। ৩. ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে মিথ্যা দোষারোপ বা কুৎসা রটনার মতো জঘন্য অপরাধে জড়ায়। ৪. সামাজিক ঐক্য নষ্ট করে, যা সামগ্রিক অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। ৫. অসাধু উপায় অবলম্বনে প্ররোচিত করে, ফলে সমাজের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়। ৬. হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে।

জাতীয়ভাবে ভাবলে দেখা যায়, আমিত্বের কারণেই দেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুশীলন হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের আমিত্বের কারণে দলের ভেতরে গণতন্ত্রচর্চা হয় না। নেতাদের মধ্যে রয়েছে পরশ্রীকাতরতা। দলের ভেতর বা বাইরে তারা একে অন্যের মতামত সহ্য করতে পারে না। অন্য মতাদর্শধারীদের মত তারা মেনে নিতে চায় না। ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমায় গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে আমিত্ব ও পরশ্রীকাতরতার কারণে।

রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে নিউমার্কেট বা প্রত্যন্ত গ্রামের মোড়ে আড্ডা দেয়া কিছু মানুষও আমিত্ব ও পরশ্রীকাতরতার মতো ব্যাধিতে ভুগছেন। তারা নিজেরাও জানেন না যে তারা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। এরা এক ধরনের মানসিক রোগী। সমাজে উন্মাদ, পাগল বা নেশাখোরদের চেয়ে এরা বেশি ক্ষতিকর। কারণ অন্যান্য মানসিক রোগের চিকিৎসা আছে, কিন্তু পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ববোধ ধারণকারীদের পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে এরা সমাজে বেশি অশান্তি ছড়ায়।

এদের অশান্তি রোধ করতে হলে প্রথমে সচেতনতা প্রয়োজন। যে যে স্থানে তারা আড্ডা দেয়, সেই স্থানগুলোর মালিকদের সচেতন হতে হবে এবং কৌশলে এই আড্ডা নিরুৎসাহিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ অবস্থার পরিবর্তন চাইলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়াতে হবে।

পরশ্রীকাতর ও আমিত্ববোধ ধারণকারী ব্যক্তিরা মাত্রাগত ভেদে ভয়ংকর ঘটনা ঘটাতে পারে। তাই সমাজকে এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। প্রত্যেকের উচিত পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ববোধ থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং এ ধরনের মানসিকতা এড়িয়ে চলা।

[লেখক : উন্নয়নকর্মী]

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

ফুলের নিচে চাপা পড়া ভাষার আর্তনাদ

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬

কারও ধন-দৌলত, সম্মান, ভালো ফল বা উচ্চ মর্যাদা দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়া এবং তার ধ্বংস কামনা করাকে পরশ্রীকাতরতা বলে। পরশ্রীকাতরতা হলো মানব চরিত্রের একটি নিন্দনীয় স্বভাব। এর অর্থ হলো অন্যের উন্নতি ও সৌভাগ্য দেখে ঈর্ষা প্রকাশ করা। আবার এভাবে বলা যায়, পরশ্রীকাতরতা হলো অন্যের সুখ, উন্নতি, ধন-সম্পদ, সম্মান বা সাফল্য দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়া এবং মনে কষ্ট পাওয়া। পরশ্রীকাতর ব্যক্তিদের মনের মধ্যে যে বিষয়গুলো থাকে তা হলো- অন্যের ধ্বংস কামনা করা, পরনিন্দা ও পরচর্চা করা, নিজের হীনমন্যতায় ভোগা, অন্যের সফলতায় অখুশি হওয়া এবং সারাক্ষণ প্রতিযোগিতার মানসিকতায় থাকা। মূলত, পরশ্রীকাতরতা একটি মানসিক ব্যাধি, যা মানুষের সুখ ও সামাজিক প্রশান্তি নষ্ট করে।

পরশ্রীকাতরতার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাব মারাত্মক। পরশ্রীকাতর ব্যক্তি শুধু নিজের ক্ষতি করে না, অন্য মানুষের ক্ষতিও করে। কখনও কখনও মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। পরশ্রীকাতর ব্যক্তিরা এমন সব কথা তৈরি করে, যার কারণে পারিবারিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।

পরশ্রীকাতরতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হলো আমিত্ব। ‘আমিত্ব’ বলতে নিজের অস্তিত্ব, অহমিকা বা আমি-বোধকে বোঝায়। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে কেন্দ্র করে চিন্তা করে; যা অনেক সময় অহংকার বা পশুত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমিত্বের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো- ১. অহমিকা ও স্বার্থপরতা; আমিত্ববাদীরা মনে করে, আমিই সব, আমার মতই ঠিক- এই ধরনের চিন্তাভাবনা তাদের মধ্যে কাজ করে। ২. অহংবোধ তাদের আচরণে প্রবল থাকে, যাকে নিজত্ব বা অহমিকা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। ৩. অতিরিক্ত আমিত্ব মানুষকে অন্ধ করে এবং পাশবিকতাকে উৎসাহিত করে। ৪. ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বড় অশান্তি সৃষ্টি করে এই আমিত্ব।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব-বিরোধ সৃষ্টি হয় পরশ্রীকাতরতা এবং আমিত্বের কারণে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরিবর্তিত আর্থসামাজিক পরিস্থিতিই আমিত্ব ও পরশ্রীকাতর ব্যক্তি তৈরির অন্যতম কারণ। কিছু মানুষ দীর্ঘ সময় কাজকর্ম না করে বেকার বসে থাকে। এরা বিভিন্ন দোকানে আড্ডা দেয়। এদের বেশিরভাগ সময় কাটে অন্যের নেতিবাচক সমালোচনা করে। এদের এক কথায় কুয়োর ব্যাঙও বলা যায়। বর্তমানে তারা ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ইন্টারনেটের অশোভন দিকটাই এদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। তথ্যপ্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে এরা অমানুষ ও নৃশংস হয়ে ওঠে।

এই অমানুষ হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে এরা একটি খারাপ পরিবেশে বেড়ে উঠেছে। নিষ্ঠুরতা হলো ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কষ্ট দেয়া। এই ধরনের মানুষের নিষ্ঠুরতার প্রথম পর্যায় শুরু হয় শৈশবে কুকুর বা অন্য প্রাণী নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তারা অন্যকে মারধরের দিকে এগিয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়া, নানা অপকর্ম করা এবং এক পর্যায়ে ডাকাতি, প্রলোভন ও হত্যার মতো কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে।

আমিত্ব বা অহংবোধ সমাজে অশান্তি, নৈতিক অবক্ষয় এবং দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ। যখন মানুষ নিজের স্বার্থ ও আত্মপ্রাধান্যকে সবার ওপরে রাখে, তখন ন্যায়-অন্যায়বোধ লোপ পায়; ফলে সুদ, ঘুষ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এই অহমিকা পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে এবং যৌথ অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে।

আমিত্ব ও পরশ্রীকাতরতা সামাজিক ব্যাধি। এর ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়, দ্বন্দ্ব-সংঘাত বৃদ্ধি পায় এবং সমাজের নৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়। আমিত্ববাদী ও পরশ্রীকাতররা বেশিরভাগ সময় কুৎসা রটনা, মিথ্যা দোষারোপ এবং প্রতিহিংসার মাধ্যমে সামাজিক শান্তি ও ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট করে। সমাজে এরা- ১. অন্যের সাফল্য সহ্য করতে না পেরে পরিবার ও সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে। ২. পারস্পরিক বিশ্বাস কমিয়ে দেয়, যা আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীদের মধ্যে বিচ্ছেদের কারণ হয়। ৩. ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে মিথ্যা দোষারোপ বা কুৎসা রটনার মতো জঘন্য অপরাধে জড়ায়। ৪. সামাজিক ঐক্য নষ্ট করে, যা সামগ্রিক অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। ৫. অসাধু উপায় অবলম্বনে প্ররোচিত করে, ফলে সমাজের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়। ৬. হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে।

জাতীয়ভাবে ভাবলে দেখা যায়, আমিত্বের কারণেই দেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুশীলন হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের আমিত্বের কারণে দলের ভেতরে গণতন্ত্রচর্চা হয় না। নেতাদের মধ্যে রয়েছে পরশ্রীকাতরতা। দলের ভেতর বা বাইরে তারা একে অন্যের মতামত সহ্য করতে পারে না। অন্য মতাদর্শধারীদের মত তারা মেনে নিতে চায় না। ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমায় গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে আমিত্ব ও পরশ্রীকাতরতার কারণে।

রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে নিউমার্কেট বা প্রত্যন্ত গ্রামের মোড়ে আড্ডা দেয়া কিছু মানুষও আমিত্ব ও পরশ্রীকাতরতার মতো ব্যাধিতে ভুগছেন। তারা নিজেরাও জানেন না যে তারা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। এরা এক ধরনের মানসিক রোগী। সমাজে উন্মাদ, পাগল বা নেশাখোরদের চেয়ে এরা বেশি ক্ষতিকর। কারণ অন্যান্য মানসিক রোগের চিকিৎসা আছে, কিন্তু পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ববোধ ধারণকারীদের পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে এরা সমাজে বেশি অশান্তি ছড়ায়।

এদের অশান্তি রোধ করতে হলে প্রথমে সচেতনতা প্রয়োজন। যে যে স্থানে তারা আড্ডা দেয়, সেই স্থানগুলোর মালিকদের সচেতন হতে হবে এবং কৌশলে এই আড্ডা নিরুৎসাহিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ অবস্থার পরিবর্তন চাইলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়াতে হবে।

পরশ্রীকাতর ও আমিত্ববোধ ধারণকারী ব্যক্তিরা মাত্রাগত ভেদে ভয়ংকর ঘটনা ঘটাতে পারে। তাই সমাজকে এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। প্রত্যেকের উচিত পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ববোধ থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং এ ধরনের মানসিকতা এড়িয়ে চলা।

[লেখক : উন্নয়নকর্মী]

back to top