alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

মিহির কুমার রায়

: সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

সরকারের উন্নয়ন দর্শন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ হলেও এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়? স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেয়ার আবেদন করেছে বাংলাদেশ। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে এ আবেদন করা হয়েছে, যেখানে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে অর্থনীতি, সমাজনীতি ও সৃজনশীলতার সব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উত্তরণ পিছিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। কাজেই এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দিয়ে মৌলিক চ্যালেঞ্জ এড়ানো যাবে না। অন্যান্য দেশ যদি উত্তরণ করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না?

সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারম্যানের কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়েছেন।

কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ব্যবসায়ী মহল অনেক দিন ধরেই এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও অন্তত তিন বছর বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এলডিসির জন্য থাকা সুবিধা উঠে গেলে রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্প, চাপের মুখে পড়তে পারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার জাতিসংঘের সিডিপিতে সময় বাড়ানোর কোনো আবেদন করেনি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়-বাংলাদেশ উত্তরণের তিনটি মানদণ্ড পূরণ করেছে। কিন্তু ধারাবাহিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় প্রস্তুতি প্রচণ্ডভাবে ব্যাহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কোভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও ধীরগতির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এর প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যের বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতির চাপ, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলে সংঘাত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরে বিগত সময়ে আর্থিক খাতে অনিয়ম, গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের প্রভাব, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিষ্পন্ন থাকা এবং এ কারণে জাতীয় বাজেট থেকে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

এসব কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগ ও কর-জিডিপি অনুপাতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা দারিদ্র্যে হ্রাসের প্রবণতাকে উল্টো দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে নীতিগত মনোযোগ স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সংকট ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীভূত করতে হয়েছে। এতে মসৃণ এলডিসি উত্তরণ কৌশলের (এসটিএস) অগ্রাধিকারমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন সীমিত হয়েছে। কাঠামোবদ্ধ প্রস্তুতির জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে সংকট মোকাবিলায়।

এছাড়া এলডিসি পরবর্তী বাণিজ্য ও বাজার সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়ে সম্ভাব্য জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ ইত্যাদি কারণে এ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী উত্তরণ এগিয়ে নিলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাসে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সরকার মনে করছে। এ অবস্থায় চলমান অর্থনৈতিক সমস্যা কাটিয়ে ওঠা ও সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে আরও সময় ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় নির্ধারিত রয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে সিডিপির ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। সূচকগুলো হলো মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। ২০২১ সালের সুপারিশ অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনার কারণে উত্তরণ দুই বছর পিছিয়ে দেয়া হয়। গত বছর মার্চে সিদ্ধান্ত হয় নির্ধারিত সময়েই উত্তরণ হবে। এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সিডিপির বার্ষিক প্লেনারি সভা ২৩ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে, যা ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। সভার একটি সেশনে বাংলাদেশের আবেদন নিয়ে আলোচনা হবে। আলোচনা হবে এনহান্সড মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) কাঠামোর অধীনে, যার প্রধান বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো এবং সিডিপির সদস্য। কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে তিনি নিউইয়র্কে রয়েছেন।

২০১৮ সাল থেকে তিনি সিডিপির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের মাধ্যমে তিন বছর করে তিন দফায় নিয়োগ পাওয়া তার বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এলডিসি থেকে উত্তরণ বিলম্বিত করার বিষয়ে নতুন বাণিজ্যমন্ত্রীর উদ্যোগের কথা জানানো হলে তিনি বলেন, এটি শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; গোটা সরকারের বিষয়। বাংলাদেশ নির্ধারিত সূচকের অনেক ওপরে রয়েছে। পেছাতে গেলে সরকারের পূর্বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হবে। গত বছরের মার্চে উত্তরণের যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা পাল্টাতে হলে অভাবিত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ঘটনার যুক্তি তুলে ধরতে হবে। প্রয়োজনে সিডিপিতে পাঠানো প্রতিবেদন প্রত্যাহার এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটির জন্য আবেদনও প্রয়োজন হতে পারে।

অনেকে মনে করেন, যত দ্রুত আমরা এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েট করব, তত দ্রুত উন্নয়ন সক্ষমতা তৈরি হবে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে অর্থনীতি, সমাজনীতি ও সৃজনশীলতার সব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উত্তরণ পিছিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। কাজেই এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দিয়ে মৌলিক চ্যালেঞ্জ এড়ানো যাবে না। অন্যান্য দেশ যদি উত্তরণ করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? উৎপাদন সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এলডিসি সুবিধা না থাকলেও টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে হলে সক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

এখনও সময় আছে। কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশীয় ও বিদেশি সহায়তা কাজে লাগিয়ে দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। যত দ্রুত আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হব, তত দ্রুত অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হবে।

[লেখক: সাবেক ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা]

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

ফুলের নিচে চাপা পড়া ভাষার আর্তনাদ

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

মিহির কুমার রায়

সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

সরকারের উন্নয়ন দর্শন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ হলেও এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়? স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেয়ার আবেদন করেছে বাংলাদেশ। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে এ আবেদন করা হয়েছে, যেখানে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে অর্থনীতি, সমাজনীতি ও সৃজনশীলতার সব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উত্তরণ পিছিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। কাজেই এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দিয়ে মৌলিক চ্যালেঞ্জ এড়ানো যাবে না। অন্যান্য দেশ যদি উত্তরণ করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না?

সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারম্যানের কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়েছেন।

কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ব্যবসায়ী মহল অনেক দিন ধরেই এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও অন্তত তিন বছর বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এলডিসির জন্য থাকা সুবিধা উঠে গেলে রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্প, চাপের মুখে পড়তে পারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার জাতিসংঘের সিডিপিতে সময় বাড়ানোর কোনো আবেদন করেনি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়-বাংলাদেশ উত্তরণের তিনটি মানদণ্ড পূরণ করেছে। কিন্তু ধারাবাহিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় প্রস্তুতি প্রচণ্ডভাবে ব্যাহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কোভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও ধীরগতির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এর প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যের বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতির চাপ, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলে সংঘাত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরে বিগত সময়ে আর্থিক খাতে অনিয়ম, গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের প্রভাব, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিষ্পন্ন থাকা এবং এ কারণে জাতীয় বাজেট থেকে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

এসব কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগ ও কর-জিডিপি অনুপাতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা দারিদ্র্যে হ্রাসের প্রবণতাকে উল্টো দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে নীতিগত মনোযোগ স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সংকট ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীভূত করতে হয়েছে। এতে মসৃণ এলডিসি উত্তরণ কৌশলের (এসটিএস) অগ্রাধিকারমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন সীমিত হয়েছে। কাঠামোবদ্ধ প্রস্তুতির জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে সংকট মোকাবিলায়।

এছাড়া এলডিসি পরবর্তী বাণিজ্য ও বাজার সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়ে সম্ভাব্য জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ ইত্যাদি কারণে এ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী উত্তরণ এগিয়ে নিলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাসে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সরকার মনে করছে। এ অবস্থায় চলমান অর্থনৈতিক সমস্যা কাটিয়ে ওঠা ও সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে আরও সময় ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় নির্ধারিত রয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে সিডিপির ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। সূচকগুলো হলো মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। ২০২১ সালের সুপারিশ অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনার কারণে উত্তরণ দুই বছর পিছিয়ে দেয়া হয়। গত বছর মার্চে সিদ্ধান্ত হয় নির্ধারিত সময়েই উত্তরণ হবে। এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সিডিপির বার্ষিক প্লেনারি সভা ২৩ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে, যা ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। সভার একটি সেশনে বাংলাদেশের আবেদন নিয়ে আলোচনা হবে। আলোচনা হবে এনহান্সড মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) কাঠামোর অধীনে, যার প্রধান বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো এবং সিডিপির সদস্য। কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে তিনি নিউইয়র্কে রয়েছেন।

২০১৮ সাল থেকে তিনি সিডিপির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের মাধ্যমে তিন বছর করে তিন দফায় নিয়োগ পাওয়া তার বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এলডিসি থেকে উত্তরণ বিলম্বিত করার বিষয়ে নতুন বাণিজ্যমন্ত্রীর উদ্যোগের কথা জানানো হলে তিনি বলেন, এটি শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; গোটা সরকারের বিষয়। বাংলাদেশ নির্ধারিত সূচকের অনেক ওপরে রয়েছে। পেছাতে গেলে সরকারের পূর্বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হবে। গত বছরের মার্চে উত্তরণের যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা পাল্টাতে হলে অভাবিত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ঘটনার যুক্তি তুলে ধরতে হবে। প্রয়োজনে সিডিপিতে পাঠানো প্রতিবেদন প্রত্যাহার এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটির জন্য আবেদনও প্রয়োজন হতে পারে।

অনেকে মনে করেন, যত দ্রুত আমরা এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েট করব, তত দ্রুত উন্নয়ন সক্ষমতা তৈরি হবে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে অর্থনীতি, সমাজনীতি ও সৃজনশীলতার সব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উত্তরণ পিছিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। কাজেই এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দিয়ে মৌলিক চ্যালেঞ্জ এড়ানো যাবে না। অন্যান্য দেশ যদি উত্তরণ করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? উৎপাদন সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এলডিসি সুবিধা না থাকলেও টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে হলে সক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

এখনও সময় আছে। কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশীয় ও বিদেশি সহায়তা কাজে লাগিয়ে দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। যত দ্রুত আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হব, তত দ্রুত অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হবে।

[লেখক: সাবেক ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা]

back to top