এম এ হোসাইন
ওয়াশিংটনের নির্দিষ্ট কিছু মহলে হয়তো এখন উদযাপন ও উল্লাসের শব্দ কল্পনা করা যায়। পর্দাজুড়ে ভেসে উঠছে ব্রেকিং নিউজ: সমন্বিত মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার সঙ্গে কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার। ভোরের নিস্তব্ধ সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিজয়োল্লাসে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন, ইরানের জনগণকে আহ্বান জানান, তাদের এই মুহূর্তটি কাজে লাগাতে। ট্রাম্পের বার্তায় এটি একটি ‘নির্ণায়ক আঘাত’; ইতিহাস নাকি মোড় নিয়েছে; তেহরানে স্বাধীনতার আগমন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আসলে, ভূরাজনীতি কখনও এতটাই অনুগত নয় যতটা মনে হয়।
মার্কিন রাষ্ট্রনীতিতে এক অদ্ভূত কৌশলের প্রলোভন রয়েছে। তাদের এই বিশ্বাস যে, নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র যা করতে পারে, ধৈর্যশীল রাজনীতি তা পারে না। স্বৈরশাসককে সরিয়ে দাও, শাসনব্যবস্থার উচ্ছেদ করো, তারপর ভরসা রাখো- দীর্ঘদিন দমিত নাগরিক সমাজ ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্সের মতো উঠে দাঁড়াবে এবং কৃতজ্ঞ অশ্রুতে উদার গণতন্ত্রকে আলিঙ্গন করবে। এটি একটি তত্ত্ব। কিন্তু অধিকাংশ সময়ে বাস্তবতার নিরিখে এটি একটি কাল্পনিক অস্তিত্ব।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি কোনো নৈতিক নাটক নয়, যেখানে খলনায়ক মঞ্চ ত্যাগ করে আর নায়ক পর্দার আড়াল থেকে এগিয়ে আসে। এটি শক্তি, ভয়, স্বার্থ এবং গতিশীলতার অঙ্গন। যখন কোনও রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব- বিশেষত ৯ কোটিরও বেশি মানুষের, গভীর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোসমৃদ্ধ, কঠোর নিরাপত্তা যন্ত্রে সজ্জিত এবং শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তিসম্পন্ন একটি রাষ্ট্র ধ্বংস করা হয়, তখন সেখানে দেবদূতেরা ছুটে এসে শূন্যতা পূরণ করে না। বরং সেই শূন্যতা দখলে নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিলিশিয়া, সামরিক গোষ্ঠী এবং সবচেয়ে নির্মম শক্তিগুলো। এই দৃশ্যপটগুলো আমরা আগেও দেখেছি।
ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনকে আরব বিশ্বে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সূচনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা উন্মুক্ত করেছিল সাম্প্রদায়িক রক্তপাতের দ্বার এবং সীমান্ত অতিক্রম করে জিহাদি আন্দোলনের উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল। লিবিয়ায় মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফিকে অপসারণ- যা মানবিক হস্তক্ষেপের ভাষণে মোড়ানো ছিল। কিন্তু ফেলে গিয়েছিল বিভক্ত রাষ্ট্র, প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার এবং প্রকাশ্য দাসবাজারের এক করুণ বাস্তবতা। সিরিয়ায় শাসন-পরিবর্তন একটি অভ্যন্তরীণ গণআন্দোলনকে দীর্ঘস্থায়ী দহনক্ষেত্রে রূপ দিয়েছিল, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো সমানভাবে জড়িয়ে পড়ে।
এগুলো বিশ্বরাজনীতিতে পরিচালিত ছোটখাটো কোনো পরীক্ষা ছিল না। এগুলো ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কৌশলগত বাজি। তাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, গ্রহণযোগ্য ব্যয়ের বিনিময়ে মার্কিন শক্তি রাজনৈতিক ফলাফল বের করে আনতে পারে। এখন বলা হচ্ছে, একই যুক্তি ইরানে সফল হবে। যেখানে ইরান একটি আরও বৃহৎ, অধিক জনবহুল, জাতীয়ভাবে অধিক সংহত রাষ্ট্র, যার প্রতিশোধ নেয়ার সক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী।
তাৎক্ষণিক বাস্তবতা বিবেচনা করা যাক। হরমুজ প্রণালি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক করিডর, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের বাণিজ্যিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার একটি সংকীর্ণ করিডোর। যখন সংঘাত সেই করিডোরকে হুমকির মুখে ফেলে, ট্যাংকারগুলো দ্বিধাগ্রস্ত হয়, বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যায়, নৌপথ শূন্য হয়ে পড়ে তখন তার অভিঘাত পারস্য উপসাগরের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
জ্বালানি বাজার ঝুঁকির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন কেবল আঞ্চলিক অস্বস্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি তেলের উচ্চ মূল্য, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ইতোমধ্যেই সীমিত সম্পদে সংসার চালানো পরিবারগুলোর জন্য অর্থনৈতিক কষ্টের কারণ হবে। যে বৃহৎ কৌশল এমন দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের প্রভাবকে উপেক্ষা করে, তা আদৌ কোনো কৌশল নয়। এটি দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ছদ্মবেশে সাজানো ইচ্ছাপূরণ মাত্র।
এরপর আসে প্রতিশোধের প্রশ্ন। ইরান কেবল একটি প্রচলিত রাষ্ট্র নয়; এটি এক নেটওয়ার্কভিত্তিক শক্তি। ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কয়েক দশক ধরে লেবানন, ইরাক, ইয়েমেনসহ বিস্তৃত অঞ্চলে অংশীদারদের সশস্ত্র ও অর্থায়ন করে প্রভাব গড়ে তুলেছে। শীর্ষনেতৃত্বে আঘাত কিছু ব্যক্তিকে সরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তা প্রতিষ্ঠান মুছে দেয় না। আর অস্তিত্বসংকটে আবদ্ধ কোনো শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার যুক্তিকেও তা নিভিয়ে দিতে পারে না। রাষ্ট্র খুব কমই আত্মহত্যা করে। তারা পাল্টা আঘাত হানে।
এমন পরিস্থিতিতে, ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়, প্রক্সিদের মাধ্যমে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ঘাঁটিতে হামলা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা হবে না; বরং এগুলো হবে পুরোপুরি প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া। আর একবার এই সর্পিল গতি শুরু হলে, তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। যুদ্ধের একটি স্বভাব আছে- তা শুরুকারীদের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে।
এদিকে কৌশলগত মনোযোগ সরে যেতে থাকে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ‘ইন্দো-প্যাসিফিকে ঝোঁক’ নেয়ার কথা বলে আসছেন। যুক্তিটা সরল: যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রকৃত সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হলো চীন। শিল্পক্ষমতার ব্যাপ্তি, প্রযুক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা এবং জনমিতিক শক্তিতে সে এমন এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে, যা কোনো মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির পক্ষে সম্ভব নয়।
কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মনোযোগ, অস্ত্রভান্ডার, গোয়েন্দা সম্পদ এবং রাজনৈতিক পুঁজি গ্রাস করবে। উপসাগরে মোতায়েন করা প্রতিটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিটি বিমানবাহী রণতরী বহর- পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অনুপস্থিত রয়ে যাবে। ওয়াশিংটনের মনোযোগ সরে গেলে বেইজিংকে লাভবান হতে একটি গুলিও ছুড়তে হবে না। সময় ও মনোযোগই হবে তার নীরব মিত্র।
এ ছাড়া আখ্যানের প্রশ্ন রয়েছে। যুদ্ধ প্রায়শই জরুরি দাবি- আসন্ন হুমকি, ছায়াময় ষড়যন্ত্র, টিক টিক করা ঘড়ি দিয়ে বিক্রি করা হয়। ইতিহাস সন্দেহপ্রবণতার পরামর্শ দেয়। ইরাক আক্রমণের আগে, মার্কিন জনগণকে অস্ত্র কর্মসূচির আশ্বাস দেয়া হয়েছিল যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আজ, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বা পারমাণবিক সময়সীমা সম্পর্কে অভিযোগগুলোর প্রশংসাসূচক বক্তব্য নয়, কঠোর যাচাই প্রয়োজন।
যখন নেতারা জনসমক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণের বাইরে গিয়ে হুমকিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করেন, তখন তারা দেশের অভ্যন্তরে আস্থা এবং বিদেশে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেন। প্রজাতন্ত্রকে এর মূল্য দিতে হয় দুবার- প্রথমে রক্ত ও সম্পদে, তারপর গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার ক্ষয়ের মাধ্যমে।
এসব কিছুই ইরানি শাসনব্যবস্থাকে আদর্শায়িত করার জন্য বলছি না। এটি নিজ দেশে দমনমূলক এবং বিদেশে অস্থিতিশীল শক্তি। এর নিরাপত্তা বাহিনী ভিন্নমত দমন করেছে; এর আঞ্চলিক কর্মকান্ড প্রতিবেশী দেশগুলোকে অস্থিতিশীল করেছে। কিন্তু এই বাস্তবতাগুলো স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, নীতিনির্ধারকরা বিচক্ষণতার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবেন।
বিচক্ষণতা মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়। এটি হলো উপায় ও লক্ষ্যের একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সমন্বয়। যদি উদ্দেশ্য শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন হয়, তাহলে একজনকে দখলদারিত্ব, পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের দীর্ঘ, ক্লান্তিকর পরিশ্রমের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি উদ্দেশ্য প্রতিরোধ হয়, তাহলে বলপ্রয়োগকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে সেই অগ্নিকান্ডই সৃষ্টি না হয় যেটি প্রতিরোধ করতে চাওয়া হচ্ছে। যদি উদ্দেশ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর জন্য সম্পদ সংরক্ষণ করতে হবে।
বিপদটি হলো একটি কৌশলগত সাফল্যকে কৌশলগত সমাধান হিসেবে ভুল করা। শীর্ষনেতাদের হত্যা কমান্ড কাঠামোকে বিপর্যস্ত করতে পারে। এটি সমন্বয় নষ্ট করতে পারে ও দৃঢ় সংকল্পের বার্তা দিতে পারে। কিন্তু এটি নিজে থেকে ক্ষমতার অন্তর্নিহিত ভারসাম্যের সমাধান করে না, কিংবা এটি বন্ধুত্বপূর্ণ উত্তরসূরির নিশ্চয়তাও দেয় না।
ইতিহাস নির্দয়। এটি বাড়াবাড়ির শাস্তি দেয় এবং বিভ্রম উন্মোচিত করে। উচ্চপর্যায়ের মহলে যে উল্লাস যদি তা সত্যিই থেকে থাকে- তা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। আঘাতের পরই শুরু হয় কঠিন কাজ: বাজার স্থিতিশীল রাখা, মিত্রদের আশ্বস্ত করা, প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করা এবং উত্তেজনা বিস্তার রোধ করা। এই কাজ যদি সংযম ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে না করা হয়, তবে প্রাথমিক বিজয়োল্লাস দ্রুতই বিবর্ণ হয়ে উঠবে।
মহাশক্তি একক ভুলে ধ্বংস হয় না। তারা ধ্বংস হয় এক ধারাবাহিক প্রবণতায়-কৌশলের স্থলে আবেগ, সারবস্তুর স্থলে প্রদর্শনীকে বারবার প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এখনও অতুলনীয় শক্তি রয়েছে: মিত্রশক্তি, উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক গভীরতা, সামরিক সক্ষমতা। প্রশ্ন তা নয়- এটি আঘাত হানতে পারে কি না। স্পষ্টতই পারে। প্রশ্নটি হলো এটি তার কর্মকা-কে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের একটি সুসংহত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে কি না?
যদি উত্তর ‘না’ হয়- যদি গত তিন দশকের ধারা অব্যাহত থাকে তবে দিনটিতে বিজয়ের ধ্বনি হিসেবে নয়, বরং আরেকটি ব্যয়বহুল শিক্ষার সূচনা হিসেবে স্মরণ করা হবে। শক্তি বাস্তব। সীমাবদ্ধতাও বাস্তব। রাষ্ট্রনায়ক এ দুটির যেকোনো একটিকে উপেক্ষা করে মূলত নিজের বিপদই ডেকে আনেন।
[লেখক : প্রাবন্ধিক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
এম এ হোসাইন
বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬
ওয়াশিংটনের নির্দিষ্ট কিছু মহলে হয়তো এখন উদযাপন ও উল্লাসের শব্দ কল্পনা করা যায়। পর্দাজুড়ে ভেসে উঠছে ব্রেকিং নিউজ: সমন্বিত মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার সঙ্গে কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার। ভোরের নিস্তব্ধ সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিজয়োল্লাসে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন, ইরানের জনগণকে আহ্বান জানান, তাদের এই মুহূর্তটি কাজে লাগাতে। ট্রাম্পের বার্তায় এটি একটি ‘নির্ণায়ক আঘাত’; ইতিহাস নাকি মোড় নিয়েছে; তেহরানে স্বাধীনতার আগমন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আসলে, ভূরাজনীতি কখনও এতটাই অনুগত নয় যতটা মনে হয়।
মার্কিন রাষ্ট্রনীতিতে এক অদ্ভূত কৌশলের প্রলোভন রয়েছে। তাদের এই বিশ্বাস যে, নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র যা করতে পারে, ধৈর্যশীল রাজনীতি তা পারে না। স্বৈরশাসককে সরিয়ে দাও, শাসনব্যবস্থার উচ্ছেদ করো, তারপর ভরসা রাখো- দীর্ঘদিন দমিত নাগরিক সমাজ ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্সের মতো উঠে দাঁড়াবে এবং কৃতজ্ঞ অশ্রুতে উদার গণতন্ত্রকে আলিঙ্গন করবে। এটি একটি তত্ত্ব। কিন্তু অধিকাংশ সময়ে বাস্তবতার নিরিখে এটি একটি কাল্পনিক অস্তিত্ব।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি কোনো নৈতিক নাটক নয়, যেখানে খলনায়ক মঞ্চ ত্যাগ করে আর নায়ক পর্দার আড়াল থেকে এগিয়ে আসে। এটি শক্তি, ভয়, স্বার্থ এবং গতিশীলতার অঙ্গন। যখন কোনও রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব- বিশেষত ৯ কোটিরও বেশি মানুষের, গভীর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোসমৃদ্ধ, কঠোর নিরাপত্তা যন্ত্রে সজ্জিত এবং শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তিসম্পন্ন একটি রাষ্ট্র ধ্বংস করা হয়, তখন সেখানে দেবদূতেরা ছুটে এসে শূন্যতা পূরণ করে না। বরং সেই শূন্যতা দখলে নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিলিশিয়া, সামরিক গোষ্ঠী এবং সবচেয়ে নির্মম শক্তিগুলো। এই দৃশ্যপটগুলো আমরা আগেও দেখেছি।
ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনকে আরব বিশ্বে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সূচনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা উন্মুক্ত করেছিল সাম্প্রদায়িক রক্তপাতের দ্বার এবং সীমান্ত অতিক্রম করে জিহাদি আন্দোলনের উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল। লিবিয়ায় মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফিকে অপসারণ- যা মানবিক হস্তক্ষেপের ভাষণে মোড়ানো ছিল। কিন্তু ফেলে গিয়েছিল বিভক্ত রাষ্ট্র, প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার এবং প্রকাশ্য দাসবাজারের এক করুণ বাস্তবতা। সিরিয়ায় শাসন-পরিবর্তন একটি অভ্যন্তরীণ গণআন্দোলনকে দীর্ঘস্থায়ী দহনক্ষেত্রে রূপ দিয়েছিল, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো সমানভাবে জড়িয়ে পড়ে।
এগুলো বিশ্বরাজনীতিতে পরিচালিত ছোটখাটো কোনো পরীক্ষা ছিল না। এগুলো ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কৌশলগত বাজি। তাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, গ্রহণযোগ্য ব্যয়ের বিনিময়ে মার্কিন শক্তি রাজনৈতিক ফলাফল বের করে আনতে পারে। এখন বলা হচ্ছে, একই যুক্তি ইরানে সফল হবে। যেখানে ইরান একটি আরও বৃহৎ, অধিক জনবহুল, জাতীয়ভাবে অধিক সংহত রাষ্ট্র, যার প্রতিশোধ নেয়ার সক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী।
তাৎক্ষণিক বাস্তবতা বিবেচনা করা যাক। হরমুজ প্রণালি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক করিডর, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের বাণিজ্যিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার একটি সংকীর্ণ করিডোর। যখন সংঘাত সেই করিডোরকে হুমকির মুখে ফেলে, ট্যাংকারগুলো দ্বিধাগ্রস্ত হয়, বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যায়, নৌপথ শূন্য হয়ে পড়ে তখন তার অভিঘাত পারস্য উপসাগরের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
জ্বালানি বাজার ঝুঁকির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন কেবল আঞ্চলিক অস্বস্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি তেলের উচ্চ মূল্য, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ইতোমধ্যেই সীমিত সম্পদে সংসার চালানো পরিবারগুলোর জন্য অর্থনৈতিক কষ্টের কারণ হবে। যে বৃহৎ কৌশল এমন দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের প্রভাবকে উপেক্ষা করে, তা আদৌ কোনো কৌশল নয়। এটি দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ছদ্মবেশে সাজানো ইচ্ছাপূরণ মাত্র।
এরপর আসে প্রতিশোধের প্রশ্ন। ইরান কেবল একটি প্রচলিত রাষ্ট্র নয়; এটি এক নেটওয়ার্কভিত্তিক শক্তি। ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কয়েক দশক ধরে লেবানন, ইরাক, ইয়েমেনসহ বিস্তৃত অঞ্চলে অংশীদারদের সশস্ত্র ও অর্থায়ন করে প্রভাব গড়ে তুলেছে। শীর্ষনেতৃত্বে আঘাত কিছু ব্যক্তিকে সরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তা প্রতিষ্ঠান মুছে দেয় না। আর অস্তিত্বসংকটে আবদ্ধ কোনো শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার যুক্তিকেও তা নিভিয়ে দিতে পারে না। রাষ্ট্র খুব কমই আত্মহত্যা করে। তারা পাল্টা আঘাত হানে।
এমন পরিস্থিতিতে, ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়, প্রক্সিদের মাধ্যমে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ঘাঁটিতে হামলা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা হবে না; বরং এগুলো হবে পুরোপুরি প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া। আর একবার এই সর্পিল গতি শুরু হলে, তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। যুদ্ধের একটি স্বভাব আছে- তা শুরুকারীদের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে।
এদিকে কৌশলগত মনোযোগ সরে যেতে থাকে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ‘ইন্দো-প্যাসিফিকে ঝোঁক’ নেয়ার কথা বলে আসছেন। যুক্তিটা সরল: যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রকৃত সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হলো চীন। শিল্পক্ষমতার ব্যাপ্তি, প্রযুক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা এবং জনমিতিক শক্তিতে সে এমন এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে, যা কোনো মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির পক্ষে সম্ভব নয়।
কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মনোযোগ, অস্ত্রভান্ডার, গোয়েন্দা সম্পদ এবং রাজনৈতিক পুঁজি গ্রাস করবে। উপসাগরে মোতায়েন করা প্রতিটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিটি বিমানবাহী রণতরী বহর- পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অনুপস্থিত রয়ে যাবে। ওয়াশিংটনের মনোযোগ সরে গেলে বেইজিংকে লাভবান হতে একটি গুলিও ছুড়তে হবে না। সময় ও মনোযোগই হবে তার নীরব মিত্র।
এ ছাড়া আখ্যানের প্রশ্ন রয়েছে। যুদ্ধ প্রায়শই জরুরি দাবি- আসন্ন হুমকি, ছায়াময় ষড়যন্ত্র, টিক টিক করা ঘড়ি দিয়ে বিক্রি করা হয়। ইতিহাস সন্দেহপ্রবণতার পরামর্শ দেয়। ইরাক আক্রমণের আগে, মার্কিন জনগণকে অস্ত্র কর্মসূচির আশ্বাস দেয়া হয়েছিল যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আজ, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বা পারমাণবিক সময়সীমা সম্পর্কে অভিযোগগুলোর প্রশংসাসূচক বক্তব্য নয়, কঠোর যাচাই প্রয়োজন।
যখন নেতারা জনসমক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণের বাইরে গিয়ে হুমকিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করেন, তখন তারা দেশের অভ্যন্তরে আস্থা এবং বিদেশে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেন। প্রজাতন্ত্রকে এর মূল্য দিতে হয় দুবার- প্রথমে রক্ত ও সম্পদে, তারপর গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার ক্ষয়ের মাধ্যমে।
এসব কিছুই ইরানি শাসনব্যবস্থাকে আদর্শায়িত করার জন্য বলছি না। এটি নিজ দেশে দমনমূলক এবং বিদেশে অস্থিতিশীল শক্তি। এর নিরাপত্তা বাহিনী ভিন্নমত দমন করেছে; এর আঞ্চলিক কর্মকান্ড প্রতিবেশী দেশগুলোকে অস্থিতিশীল করেছে। কিন্তু এই বাস্তবতাগুলো স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, নীতিনির্ধারকরা বিচক্ষণতার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবেন।
বিচক্ষণতা মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়। এটি হলো উপায় ও লক্ষ্যের একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সমন্বয়। যদি উদ্দেশ্য শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন হয়, তাহলে একজনকে দখলদারিত্ব, পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের দীর্ঘ, ক্লান্তিকর পরিশ্রমের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি উদ্দেশ্য প্রতিরোধ হয়, তাহলে বলপ্রয়োগকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে সেই অগ্নিকান্ডই সৃষ্টি না হয় যেটি প্রতিরোধ করতে চাওয়া হচ্ছে। যদি উদ্দেশ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর জন্য সম্পদ সংরক্ষণ করতে হবে।
বিপদটি হলো একটি কৌশলগত সাফল্যকে কৌশলগত সমাধান হিসেবে ভুল করা। শীর্ষনেতাদের হত্যা কমান্ড কাঠামোকে বিপর্যস্ত করতে পারে। এটি সমন্বয় নষ্ট করতে পারে ও দৃঢ় সংকল্পের বার্তা দিতে পারে। কিন্তু এটি নিজে থেকে ক্ষমতার অন্তর্নিহিত ভারসাম্যের সমাধান করে না, কিংবা এটি বন্ধুত্বপূর্ণ উত্তরসূরির নিশ্চয়তাও দেয় না।
ইতিহাস নির্দয়। এটি বাড়াবাড়ির শাস্তি দেয় এবং বিভ্রম উন্মোচিত করে। উচ্চপর্যায়ের মহলে যে উল্লাস যদি তা সত্যিই থেকে থাকে- তা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। আঘাতের পরই শুরু হয় কঠিন কাজ: বাজার স্থিতিশীল রাখা, মিত্রদের আশ্বস্ত করা, প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করা এবং উত্তেজনা বিস্তার রোধ করা। এই কাজ যদি সংযম ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে না করা হয়, তবে প্রাথমিক বিজয়োল্লাস দ্রুতই বিবর্ণ হয়ে উঠবে।
মহাশক্তি একক ভুলে ধ্বংস হয় না। তারা ধ্বংস হয় এক ধারাবাহিক প্রবণতায়-কৌশলের স্থলে আবেগ, সারবস্তুর স্থলে প্রদর্শনীকে বারবার প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এখনও অতুলনীয় শক্তি রয়েছে: মিত্রশক্তি, উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক গভীরতা, সামরিক সক্ষমতা। প্রশ্ন তা নয়- এটি আঘাত হানতে পারে কি না। স্পষ্টতই পারে। প্রশ্নটি হলো এটি তার কর্মকা-কে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের একটি সুসংহত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে কি না?
যদি উত্তর ‘না’ হয়- যদি গত তিন দশকের ধারা অব্যাহত থাকে তবে দিনটিতে বিজয়ের ধ্বনি হিসেবে নয়, বরং আরেকটি ব্যয়বহুল শিক্ষার সূচনা হিসেবে স্মরণ করা হবে। শক্তি বাস্তব। সীমাবদ্ধতাও বাস্তব। রাষ্ট্রনায়ক এ দুটির যেকোনো একটিকে উপেক্ষা করে মূলত নিজের বিপদই ডেকে আনেন।
[লেখক : প্রাবন্ধিক]