alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

সাঈদ বারী

: বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

এক বছরে ৪০৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা আমাদের সমাজের জন্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি এক গভীর নৈতিক ও মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। এই সংখ্যা প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের জন্য এক কঠিন আত্মসমালোচনার আহ্বান। কারণ একটি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা মানে কেবল একটি জীবন হারানো নয়, হারিয়ে যাওয়া একটি সম্ভাবনা, একটি স্বপ্ন এবং একটি ভবিষ্যৎ।

সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ২০২৫ সালে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার মিলিয়ে ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে, যা উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো- আত্মহত্যাকারীদের বড় অংশই স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, জীবনের শুরুতেই তারা এমন এক মানসিক অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে, যেখান থেকে ফেরার পথ তারা খুঁজে পাচ্ছে না।

এই বাস্তবতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামোর একটি অস্বস্তিকর সত্যকে সামনে আনে। আমরা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছি, নাকি শুধু ফলাফলমুখী প্রতিযোগিতার যন্ত্রে পরিণত করছি। পরীক্ষার ফল, ক্যারিয়ার, সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক প্রত্যাশার ভারে অনেক শিক্ষার্থীর মানসিক জগৎ ভেঙে পড়ছে। অথচ তাদের ভাঙন আমরা দেখতে পাই না, কিংবা দেখতে চাই না।

আত্মহত্যার পেছনে যে কারণগুলো উঠে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে হতাশা, অভিমান, সম্পর্কগত টানাপোড়েন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মানসিক অস্থিতিশীলতা এবং যৌন নির্যাতনের মতো নির্মম বাস্তবতা। এসব কারণ আলাদা আলাদা নয়, বরং একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। পরিবারে যোগাযোগের অভাব, সন্তানকে বোঝার অক্ষমতা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ কিংবা অবহেলা শিক্ষার্থীদের মনে একাকিত্বের বোধ তৈরি করে। যখন তারা নিজেদের সংকট নিয়ে কথা বলার জায়গা পায় না, তখন নীরব হতাশা ধীরে ধীরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে রূপ নেয়।

লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা বেশি, বিশেষ করে কৈশোরে। সামাজিক বিধিনিষেধ, সম্পর্কের জটিলতা, শরীর ও পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক চাপ মেয়েদের মানসিকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়পর্যায়ে ছেলেদের আত্মহত্যার হার তুলনামূলক বেশি, যেখানে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের চাপ এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার উদ্বেগ বড় ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, বয়স ও সামাজিক অবস্থানভেদে সংকটের ধরন বদলালেও মূল সমস্যাটি একই থাকে, তা হলো সহমর্মিতার অভাব এবং মানসিক সহায়তার ঘাটতি।

আত্মহত্যার প্রবণতা ঢাকা বিভাগে বেশি হওয়াও তাৎপর্যপূর্ণ। নগরজীবনের প্রতিযোগিতা, একক পরিবারব্যবস্থা, ব্যস্ততা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। জনসমাগমের ভিড়ে থেকেও তারা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। এই নিঃসঙ্গতা ধীরে ধীরে তাদের মনে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে, যেখানে তারা নিজেকে একা ও অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করে।

ডিজিটাল যুগে নতুন একটি ঝুঁকি যুক্ত হয়েছে, তা হলো সাইবার বুলিং ও অনলাইন সহিংসতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান, ট্রল, গোপন তথ্যের অপব্যবহার কিংবা সম্পর্ক ভাঙনের প্রকাশ্য নাটকীয়তা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য মানসিক আঘাতকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও ডিজিটাল মানসিক নিরাপত্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে না। ফলে শিক্ষার্থীরা একদিকে বাস্তব জীবনের চাপ, অন্যদিকে ভার্চুয়াল আক্রমণের মধ্যে পড়ে দ্বিমুখী সংকটে পড়ছে।

এই সংকটকে কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক স্বাস্থ্য সংকট। আমাদের সমাজ ক্রমশ ফলাফলকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে, কিন্তু মানসিক সুস্থতা নিয়ে আলোচনা এখনও অনেক ক্ষেত্রে ট্যাবু। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া যেন লজ্জার বিষয়, কাউন্সেলিং যেন দুর্বলতার লক্ষণ। এই মানসিকতা শিক্ষার্থীদের সাহায্য চাওয়ার পথকে সংকুচিত করে দেয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। অধিকাংশ স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত কাউন্সেলিং সেবা নেই। শিক্ষকরা পাঠদানেই ব্যস্ত থাকেন, শিক্ষার্থীর মানসিক সংকট চিহ্নিত করার প্রশিক্ষণ তাদের নেই। ফলে শিক্ষার্থীর আচরণে পরিবর্তন, হতাশার লক্ষণ কিংবা আত্মবিধ্বংসী চিন্তার ইঙ্গিত সময়মতো ধরা পড়ে না।

এ অবস্থায় পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও জীবনদক্ষতার বিষয়গুলো যুক্ত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ব্যর্থতা গ্রহণ, সম্পর্কের জটিলতা মোকাবিলা এবং সাহায্য চাওয়ার সাহস শেখানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে মৌলিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের সংকট বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারেন।

অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তাদের অনুভূতি মন দিয়ে শোনা, অযৌক্তিক তুলনা না করা এবং ব্যর্থতাকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখানো দরকার। অনেক সময় অভিভাবকের অজান্তেই তারা সন্তানের ওপর এমন প্রত্যাশা চাপিয়ে দেন, যা শিশুর আত্মসম্মানকে ভেঙে দেয়। সন্তান যখন বুঝতে পারে যে তার ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা কেবল সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল, তখন তার মনে নিরাপত্তাহীনতা জন্ম নেয়।

গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনে সংবেদনশীলতা বজায় রাখা এবং প্রতিরোধমূলক বার্তা তুলে ধরা প্রয়োজন। অতিরঞ্জিত উপস্থাপন কখনো কখনো অনুকরণ প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি সচেতনতা তৈরি এবং সহায়তা পাওয়ার পথ সম্পর্কে তথ্য দেয়া জরুরি।

এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, কাউন্সেলিং সেবা চালু, শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশিক্ষণ, সামাজিক কলঙ্ক দূরীকরণে প্রচারণা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ একটি কার্যকর প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যকে জনস্বাস্থ্যের অপরিহার্য অংশ হিসেবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি আত্মহত্যার আগে অসংখ্য অদৃশ্য সংকেত থাকে। আচরণে পরিবর্তন, নিঃসঙ্গতা, আগ্রহ হারানো, হতাশার প্রকাশ কিংবা বারবার ব্যর্থতার ভয় এসবই সাহায্যের নীরব আবেদন। যদি পরিবার, শিক্ষক বা বন্ধুরা সময়মতো সেই আবেদন শুনতে পারে, তাহলে অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

বাংলাদেশ তরুণদের দেশ। এই তরুণরাই আগামী দিনের সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত না করে উন্নয়নের কথা বলা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। একটি দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার তরুণরা স্বপ্ন দেখার সাহস পায় এবং ব্যর্থতার মধ্যেও বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজে পায়।

৪০৩টি আত্মহত্যা আমাদের কাছে এক একটি নিভে যাওয়া আলোর নাম। এই আলো নিভে যাওয়ার আগে আমরা কি তাদের কান্না শুনেছিলাম? আমরা কি তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানবিক পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিলাম? এই প্রশ্নের উত্তর যদি অস্বস্তিকর হয়, তবে এখনই সময় বদলের। শিক্ষাব্যবস্থাকে মানবিক করতে হবে, পরিবারকে সংলাপমুখী করতে হবে, সমাজকে সহমর্মিতার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

শিক্ষার্থীরা যেন বুঝতে পারে, ব্যর্থতা জীবনের শেষ নয়, সম্পর্ক ভেঙে গেলে জীবন ভেঙে যায় না এবং সংকটের সময় সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়। তাদের এই বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারলেই হয়তো আমরা আরেকটি সম্ভাবনাময় জীবন নিভে যাওয়া থেকে ঠেকাতে পারব। এখন প্রশ্ন একটাই, আমরা কি সেই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?

[লেখক: প্রকাশক]

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

ইরান ইস্যুতে মহাশক্তির পরীক্ষা

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

ফুলের নিচে চাপা পড়া ভাষার আর্তনাদ

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

সাঈদ বারী

বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

এক বছরে ৪০৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা আমাদের সমাজের জন্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি এক গভীর নৈতিক ও মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। এই সংখ্যা প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের জন্য এক কঠিন আত্মসমালোচনার আহ্বান। কারণ একটি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা মানে কেবল একটি জীবন হারানো নয়, হারিয়ে যাওয়া একটি সম্ভাবনা, একটি স্বপ্ন এবং একটি ভবিষ্যৎ।

সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ২০২৫ সালে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার মিলিয়ে ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে, যা উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো- আত্মহত্যাকারীদের বড় অংশই স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, জীবনের শুরুতেই তারা এমন এক মানসিক অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে, যেখান থেকে ফেরার পথ তারা খুঁজে পাচ্ছে না।

এই বাস্তবতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামোর একটি অস্বস্তিকর সত্যকে সামনে আনে। আমরা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছি, নাকি শুধু ফলাফলমুখী প্রতিযোগিতার যন্ত্রে পরিণত করছি। পরীক্ষার ফল, ক্যারিয়ার, সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক প্রত্যাশার ভারে অনেক শিক্ষার্থীর মানসিক জগৎ ভেঙে পড়ছে। অথচ তাদের ভাঙন আমরা দেখতে পাই না, কিংবা দেখতে চাই না।

আত্মহত্যার পেছনে যে কারণগুলো উঠে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে হতাশা, অভিমান, সম্পর্কগত টানাপোড়েন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মানসিক অস্থিতিশীলতা এবং যৌন নির্যাতনের মতো নির্মম বাস্তবতা। এসব কারণ আলাদা আলাদা নয়, বরং একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। পরিবারে যোগাযোগের অভাব, সন্তানকে বোঝার অক্ষমতা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ কিংবা অবহেলা শিক্ষার্থীদের মনে একাকিত্বের বোধ তৈরি করে। যখন তারা নিজেদের সংকট নিয়ে কথা বলার জায়গা পায় না, তখন নীরব হতাশা ধীরে ধীরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে রূপ নেয়।

লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা বেশি, বিশেষ করে কৈশোরে। সামাজিক বিধিনিষেধ, সম্পর্কের জটিলতা, শরীর ও পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক চাপ মেয়েদের মানসিকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়পর্যায়ে ছেলেদের আত্মহত্যার হার তুলনামূলক বেশি, যেখানে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের চাপ এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার উদ্বেগ বড় ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, বয়স ও সামাজিক অবস্থানভেদে সংকটের ধরন বদলালেও মূল সমস্যাটি একই থাকে, তা হলো সহমর্মিতার অভাব এবং মানসিক সহায়তার ঘাটতি।

আত্মহত্যার প্রবণতা ঢাকা বিভাগে বেশি হওয়াও তাৎপর্যপূর্ণ। নগরজীবনের প্রতিযোগিতা, একক পরিবারব্যবস্থা, ব্যস্ততা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। জনসমাগমের ভিড়ে থেকেও তারা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। এই নিঃসঙ্গতা ধীরে ধীরে তাদের মনে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে, যেখানে তারা নিজেকে একা ও অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করে।

ডিজিটাল যুগে নতুন একটি ঝুঁকি যুক্ত হয়েছে, তা হলো সাইবার বুলিং ও অনলাইন সহিংসতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান, ট্রল, গোপন তথ্যের অপব্যবহার কিংবা সম্পর্ক ভাঙনের প্রকাশ্য নাটকীয়তা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য মানসিক আঘাতকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও ডিজিটাল মানসিক নিরাপত্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে না। ফলে শিক্ষার্থীরা একদিকে বাস্তব জীবনের চাপ, অন্যদিকে ভার্চুয়াল আক্রমণের মধ্যে পড়ে দ্বিমুখী সংকটে পড়ছে।

এই সংকটকে কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক স্বাস্থ্য সংকট। আমাদের সমাজ ক্রমশ ফলাফলকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে, কিন্তু মানসিক সুস্থতা নিয়ে আলোচনা এখনও অনেক ক্ষেত্রে ট্যাবু। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া যেন লজ্জার বিষয়, কাউন্সেলিং যেন দুর্বলতার লক্ষণ। এই মানসিকতা শিক্ষার্থীদের সাহায্য চাওয়ার পথকে সংকুচিত করে দেয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। অধিকাংশ স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত কাউন্সেলিং সেবা নেই। শিক্ষকরা পাঠদানেই ব্যস্ত থাকেন, শিক্ষার্থীর মানসিক সংকট চিহ্নিত করার প্রশিক্ষণ তাদের নেই। ফলে শিক্ষার্থীর আচরণে পরিবর্তন, হতাশার লক্ষণ কিংবা আত্মবিধ্বংসী চিন্তার ইঙ্গিত সময়মতো ধরা পড়ে না।

এ অবস্থায় পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও জীবনদক্ষতার বিষয়গুলো যুক্ত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ব্যর্থতা গ্রহণ, সম্পর্কের জটিলতা মোকাবিলা এবং সাহায্য চাওয়ার সাহস শেখানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে মৌলিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের সংকট বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারেন।

অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তাদের অনুভূতি মন দিয়ে শোনা, অযৌক্তিক তুলনা না করা এবং ব্যর্থতাকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখানো দরকার। অনেক সময় অভিভাবকের অজান্তেই তারা সন্তানের ওপর এমন প্রত্যাশা চাপিয়ে দেন, যা শিশুর আত্মসম্মানকে ভেঙে দেয়। সন্তান যখন বুঝতে পারে যে তার ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা কেবল সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল, তখন তার মনে নিরাপত্তাহীনতা জন্ম নেয়।

গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনে সংবেদনশীলতা বজায় রাখা এবং প্রতিরোধমূলক বার্তা তুলে ধরা প্রয়োজন। অতিরঞ্জিত উপস্থাপন কখনো কখনো অনুকরণ প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি সচেতনতা তৈরি এবং সহায়তা পাওয়ার পথ সম্পর্কে তথ্য দেয়া জরুরি।

এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, কাউন্সেলিং সেবা চালু, শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশিক্ষণ, সামাজিক কলঙ্ক দূরীকরণে প্রচারণা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ একটি কার্যকর প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যকে জনস্বাস্থ্যের অপরিহার্য অংশ হিসেবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি আত্মহত্যার আগে অসংখ্য অদৃশ্য সংকেত থাকে। আচরণে পরিবর্তন, নিঃসঙ্গতা, আগ্রহ হারানো, হতাশার প্রকাশ কিংবা বারবার ব্যর্থতার ভয় এসবই সাহায্যের নীরব আবেদন। যদি পরিবার, শিক্ষক বা বন্ধুরা সময়মতো সেই আবেদন শুনতে পারে, তাহলে অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

বাংলাদেশ তরুণদের দেশ। এই তরুণরাই আগামী দিনের সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত না করে উন্নয়নের কথা বলা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। একটি দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার তরুণরা স্বপ্ন দেখার সাহস পায় এবং ব্যর্থতার মধ্যেও বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজে পায়।

৪০৩টি আত্মহত্যা আমাদের কাছে এক একটি নিভে যাওয়া আলোর নাম। এই আলো নিভে যাওয়ার আগে আমরা কি তাদের কান্না শুনেছিলাম? আমরা কি তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানবিক পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিলাম? এই প্রশ্নের উত্তর যদি অস্বস্তিকর হয়, তবে এখনই সময় বদলের। শিক্ষাব্যবস্থাকে মানবিক করতে হবে, পরিবারকে সংলাপমুখী করতে হবে, সমাজকে সহমর্মিতার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

শিক্ষার্থীরা যেন বুঝতে পারে, ব্যর্থতা জীবনের শেষ নয়, সম্পর্ক ভেঙে গেলে জীবন ভেঙে যায় না এবং সংকটের সময় সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়। তাদের এই বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারলেই হয়তো আমরা আরেকটি সম্ভাবনাময় জীবন নিভে যাওয়া থেকে ঠেকাতে পারব। এখন প্রশ্ন একটাই, আমরা কি সেই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?

[লেখক: প্রকাশক]

back to top