alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

মাহরুফ চৌধুরী

: বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

(শেষাংশ)

সভ্যতা কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বা সামরিক সক্ষমতার সমার্থক নয়। ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে যে, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, অস্ত্রভান্ডার ও বৈজ্ঞানিক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও কোনো সমাজ যদি ন্যায়বোধ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান হারায়, তবে তার অগ্রগতি ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। দর্শনের ভাষায়, সভ্যতার ভিত্তি হলো নৈতিক চুক্তির মাধ্যমে এক ধরনের সামাজিক সমঝোতা, যেখানে শক্তির ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করে নীতি ও মূল্যবোধ। এই নৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভই উদ্দেশ্যে পরিণত হয়, আর মানবকল্যাণ পেছনে পড়ে যায়; অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নই মুখ্য হয়ে ওঠে।

সমাজ-মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ তাই মানুষের মধ্যে ‘নৈতিক অব্যাহতি’ (মোরাল ডিসএনগেইজমেন্ট) তৈরি করে অর্থাৎ অন্যের কষ্টকে উপেক্ষা করার প্রবণতা জন্ম নেয়। যখন পেশিশক্তি জ্ঞানের ওপর, আর সামরিক আধিপত্য নীতির ওপর প্রাধান্য পায়, তখন সভ্যতা বাহ্যিকভাবে সমৃদ্ধ হলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষ তখন মানবিকতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় না; বরং তার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায়। বর্তমানে সেটাই আমরা প্রত্যক্ষ করছি।

অতএব সভ্যতার প্রকৃত অগ্রযাত্রা নির্ভর করে মানবিক মূল্যবোধের লালন ও বিস্তারের ওপর। ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সম্মান যদি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় রীতিনীতির কেন্দ্রে স্থান না পায়, তবে উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্য টেকসই হবে না। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতার উল্লাস যতই উচ্চকিত হোক, ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে সভ্যতা সামনে এগোয় না; বরং ইতিহাসের বহু উদাহরণের মতোই একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে। মানবসভ্যতা আজ যেন এক ঐতিহাসিক দ্বৈরথের মুখোমুখি শক্তির প্রয়োগে ক্ষমতার রাজনীতি বনাম সমঝোতার মাধ্যমে ন্যায়ের রাজনীতি। একদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌম সমতা ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার আদর্শ। যদি আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিকতার চর্চা পুনরুজ্জীবিত না হয়, তবে পেশিশক্তির জয়জয়কার আরও বিস্তৃত হবে, আর সভ্যতার সংকট গভীরতর রূপ নেবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে বহুপাক্ষিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল বিশেষত জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অনুসরণের মাধ্যমে তার মূল দর্শন ছিল শক্তির উন্মত্ততাকে নীতির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা এবং আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সমস্যাদির সমাধান করা। সেই দর্শন দুর্বল হলে বিশ্বব্যবস্থা আবারও প্রতিযোগিতামূলক সামরিকীকরণের দিকে ধাবিত হতে পারে। আমাদের জন্য ইতিহাসের শিক্ষা সুস্পষ্ট যে, কোনো রাষ্ট্র, জোট বা সাম্রাজ্যের শক্তি চিরন্তন নয়।

প্রাচীন সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক পরাশক্তি সবাই সময়ের পরীক্ষায় পরিবর্তিত ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। শক্তির কেন্দ্র স্থানান্তরিত হয়েছে, কিন্তু ন্যায় ও মানবিকতার প্রশ্ন অম্লান থেকেছে। রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনায় মার্কিন চিন্তক জন রলসের (১৯২১-২০০২) ‘ন্যায়ভিত্তিক সমাজ’ ধারণা কিংবা জার্মান চিন্তক ইমানুয়েল কান্টের (১৭২৪-১৮০৪) ‘চিরস্থায়ী শান্তি’র স্বপ্ন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় টেকসই শান্তি কেবল সামরিক ভারসাম্যে নয়, বরং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। অতএব ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার দায় কোনো একক রাষ্ট্রের নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির নৈতিক দায়িত্ব। নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রসমূহ সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই অবক্ষয়িত বিশ্বব্যবস্থার পুনর্গঠন সম্ভব নয়। অন্যথায় শক্তির উন্মত্ততা ও প্রতিশোধের চক্র মানবসভ্যতাকে এমন এক অন্ধকার যুগে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে নীতি-নৈতিকতা ইতিহাসের পাতায় বন্দী স্মারকে পরিণত হবে। সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বিশ্ব নাগরিক হিসেবে আমরা কোন পথকে অনুসরণ করছি- ভয় ও আধিপত্যের, নাকি ন্যায় ও সহমর্মিতার।

[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

ইরান ইস্যুতে মহাশক্তির পরীক্ষা

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

ফুলের নিচে চাপা পড়া ভাষার আর্তনাদ

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

মাহরুফ চৌধুরী

বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

(শেষাংশ)

সভ্যতা কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বা সামরিক সক্ষমতার সমার্থক নয়। ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে যে, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, অস্ত্রভান্ডার ও বৈজ্ঞানিক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও কোনো সমাজ যদি ন্যায়বোধ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান হারায়, তবে তার অগ্রগতি ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। দর্শনের ভাষায়, সভ্যতার ভিত্তি হলো নৈতিক চুক্তির মাধ্যমে এক ধরনের সামাজিক সমঝোতা, যেখানে শক্তির ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করে নীতি ও মূল্যবোধ। এই নৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভই উদ্দেশ্যে পরিণত হয়, আর মানবকল্যাণ পেছনে পড়ে যায়; অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নই মুখ্য হয়ে ওঠে।

সমাজ-মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ তাই মানুষের মধ্যে ‘নৈতিক অব্যাহতি’ (মোরাল ডিসএনগেইজমেন্ট) তৈরি করে অর্থাৎ অন্যের কষ্টকে উপেক্ষা করার প্রবণতা জন্ম নেয়। যখন পেশিশক্তি জ্ঞানের ওপর, আর সামরিক আধিপত্য নীতির ওপর প্রাধান্য পায়, তখন সভ্যতা বাহ্যিকভাবে সমৃদ্ধ হলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষ তখন মানবিকতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় না; বরং তার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায়। বর্তমানে সেটাই আমরা প্রত্যক্ষ করছি।

অতএব সভ্যতার প্রকৃত অগ্রযাত্রা নির্ভর করে মানবিক মূল্যবোধের লালন ও বিস্তারের ওপর। ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সম্মান যদি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় রীতিনীতির কেন্দ্রে স্থান না পায়, তবে উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্য টেকসই হবে না। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতার উল্লাস যতই উচ্চকিত হোক, ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে সভ্যতা সামনে এগোয় না; বরং ইতিহাসের বহু উদাহরণের মতোই একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে। মানবসভ্যতা আজ যেন এক ঐতিহাসিক দ্বৈরথের মুখোমুখি শক্তির প্রয়োগে ক্ষমতার রাজনীতি বনাম সমঝোতার মাধ্যমে ন্যায়ের রাজনীতি। একদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌম সমতা ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার আদর্শ। যদি আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিকতার চর্চা পুনরুজ্জীবিত না হয়, তবে পেশিশক্তির জয়জয়কার আরও বিস্তৃত হবে, আর সভ্যতার সংকট গভীরতর রূপ নেবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে বহুপাক্ষিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল বিশেষত জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অনুসরণের মাধ্যমে তার মূল দর্শন ছিল শক্তির উন্মত্ততাকে নীতির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা এবং আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সমস্যাদির সমাধান করা। সেই দর্শন দুর্বল হলে বিশ্বব্যবস্থা আবারও প্রতিযোগিতামূলক সামরিকীকরণের দিকে ধাবিত হতে পারে। আমাদের জন্য ইতিহাসের শিক্ষা সুস্পষ্ট যে, কোনো রাষ্ট্র, জোট বা সাম্রাজ্যের শক্তি চিরন্তন নয়।

প্রাচীন সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক পরাশক্তি সবাই সময়ের পরীক্ষায় পরিবর্তিত ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। শক্তির কেন্দ্র স্থানান্তরিত হয়েছে, কিন্তু ন্যায় ও মানবিকতার প্রশ্ন অম্লান থেকেছে। রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনায় মার্কিন চিন্তক জন রলসের (১৯২১-২০০২) ‘ন্যায়ভিত্তিক সমাজ’ ধারণা কিংবা জার্মান চিন্তক ইমানুয়েল কান্টের (১৭২৪-১৮০৪) ‘চিরস্থায়ী শান্তি’র স্বপ্ন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় টেকসই শান্তি কেবল সামরিক ভারসাম্যে নয়, বরং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। অতএব ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার দায় কোনো একক রাষ্ট্রের নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির নৈতিক দায়িত্ব। নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রসমূহ সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই অবক্ষয়িত বিশ্বব্যবস্থার পুনর্গঠন সম্ভব নয়। অন্যথায় শক্তির উন্মত্ততা ও প্রতিশোধের চক্র মানবসভ্যতাকে এমন এক অন্ধকার যুগে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে নীতি-নৈতিকতা ইতিহাসের পাতায় বন্দী স্মারকে পরিণত হবে। সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বিশ্ব নাগরিক হিসেবে আমরা কোন পথকে অনুসরণ করছি- ভয় ও আধিপত্যের, নাকি ন্যায় ও সহমর্মিতার।

[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]

back to top