alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

জোর যার, মুল্লুক তার: সাম্রাজ্যের নতুন পোশাক

ফকর উদ্দিন মানিক

: বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

পৃথিবী নাকি এখন নিয়মে চলে। কাগজে-কলমে আইন আছে, চুক্তি আছে, সভা আছে, রেজুলেশন আছে। আছে এক বিশাল গোল টেবিল, যেখানে সভ্যতার প্রতিনিধিরা বসে মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু টেবিলের নিচে যে পায়ের চাপা-চাপি চলে, তা কোনো কার্যবিবরণীতে লেখা থাকে না। সেখানে পুরোনো প্রবাদটি আজও ফিসফিস করে-জোর যার, মুল্লুক তার।

বিশ্ব রাজনীতির ভাষা এক অভিনব শিল্প। এখানে ‘আক্রমণ’ শব্দটি খুব কম উচ্চারিত হয়; তার বদলে শোনা যায় ‘অভিযান’, ‘স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ’, ‘নিরাপত্তা বলয়’, ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’। শব্দের এই প্রসাধনে বোমার শব্দ মৃদু হয়ে যায়, ধ্বংসস্তূপের ধুলো পরিণত হয় উন্নয়নের কুয়াশায়। যেন আগুন লাগানোর পর দমকলের হেলমেট পরে বলা হচ্ছে- আমরাই তো আগুন নেভাতে এসেছি!

এই গ্রহটিকে যদি একটি বিশাল বাগান ধরা হয়, তবে বড় বড় বৃক্ষরা নিজেদের ছায়াকে আশীর্বাদ বলে প্রচার করে। তারা বলে-আমাদের ডালপালা না থাকলে ঝড় সামলাবে কে? কিন্তু ছোট চারাগাছগুলো জানে, অতিরিক্ত ছায়ায় আলো কমে যায়, মাটি শুকিয়ে যায়, শিকড় দুর্বল হয়। তবু তারা প্রতিবাদ করতে পারে না; কারণ বাগানের পানির কলটি থাকে বড় বৃক্ষেরই নিয়ন্ত্রণে।

বিশ্ব রাজনীতির ভাষা এক অভিনব শিল্প। এখানে ‘আক্রমণ’ শব্দটি খুব কম উচ্চারিত হয়; তার বদলে শোনা যায় ‘অভিযান’, ‘স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ’, ‘নিরাপত্তা বলয়’, ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’। শব্দের এই প্রসাধনে বোমার শব্দ মৃদু হয়ে যায়, ধ্বংসস্তূপের ধুলো পরিণত হয় উন্নয়নের কুয়াশায়। যেন আগুন লাগানোর পর দমকলের হেলমেট পরে বলা হচ্ছে- আমরাই তো আগুন নেভাতে এসেছি!

ছোট রাষ্ট্রগুলোকে এই নাট্যমঞ্চে প্রায়শই দেখা যায় পার্শ্বচরিত্র হিসেবে। তাদের ভূখণ্ড হয়ে ওঠে কৌশলগত দাবার ঘর, তাদের সমুদ্রপথ হয়ে ওঠে বাণিজ্যিক করিডর, তাদের আকাশ হয়ে ওঠে নজরদারির মানচিত্র। তারা নিজেরাই যেন নিজেদের জমির ভাড়াটে-চুক্তির সূক্ষ্ম অক্ষরে লেখা থাকে ভবিষ্যতের দায়।

বড় শক্তিগুলো সাধারণত তিনটি অজুহাত সঙ্গে রাখে- নিরাপত্তা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার। এই ত্রয়ী এক ধরনের বৈশ্বিক তাবিজ। যখন কোনো ছোট ভূখণ্ডে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন তাবিজটি ঝুলিয়ে বলা হয়- আমরা এসেছি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু শান্তির সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করে? যে আসে, না যে ভোগে?

ইতিহাস বলে, সামরিক হস্তক্ষেপের পর খুব কম ক্ষেত্রেই স্থায়ী স্থিতিশীলতা এসেছে। বরং বহু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়েছে, সশস্ত্র গোষ্ঠী বেড়েছে, অর্থনীতি ধসে গেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন এক লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে- যেখানে আগে ধ্বংস, পরে নির্মাণ; আগে বোমা, পরে ব্রিফকেস। ধ্বংসস্তূপের ইট দিয়ে নতুন চুক্তির প্রাসাদ গড়ে ওঠে।

অর্থনৈতিক শক্তিও কম কার্যকর নয়। নিষেধাজ্ঞা এক ধরনের নীরব অবরোধ। এখানে গোলা-বারুদ নেই, আছে ব্যাংকিং বিধিনিষেধ, বাণিজ্যিক বাধা, মুদ্রা সংকট। বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ে, হাসপাতালের ওষুধ কমে, সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়া কক্ষগুলোতে আলো জ্বলে উজ্জ্বলই থাকে। যেন দাবার বোর্ডে রাজা-রানির লড়াই, আর প্যাদারাই আগে ঝরে পড়ে।

আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে প্রায়ই ন্যায়ের উচ্চারণ শোনা যায়। বক্তৃতায় মানবতার কথা বলা হয়, সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তের সময় দেখা যায়, ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লায় ওজন মাপে শক্তির পাল্লা। বড় শক্তির জন্য এক মানদণ্ড, ছোট শক্তির জন্য আরেক। এই দ্বৈত মানদণ্ডই বিশ্ব রাজনীতির অঘোষিত সংবিধান।

রূপক দিয়ে বললে, পৃথিবী যেন এক বিশাল সার্কাস। বড় শক্তিগুলো সিংহের মতো- তাদের গর্জনেই আলো জ্বলে ওঠে। ছোট রাষ্ট্রগুলো দড়ির ওপর হাঁটা শিল্পী-একটু ভুল হলেই নিচে পড়ে যাওয়ার ভয়। দর্শকসারিতে বসা সাধারণ মানুষ হাত তালি দেয় বা হাহাকার করে, কিন্তু মঞ্চের নিয়ন্ত্রণ থাকে রিংমাস্টারের হাতে।

তবে দায় কেবল বাইরের শক্তির নয়। ছোট রাষ্ট্রগুলোর ভেতরকার দুর্বলতাও অনেক সময় বাইরের হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, গণতান্ত্রিক ঘাটতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন- এসব যখন ঘরের ভেতর জমা হয়, তখন বাইরের শক্তি তা ব্যবহার করে নৈতিকতার ঢাল বানায়। ঘর অগোছালো থাকলে অতিথির হস্তক্ষেপ ঠেকানো কঠিন হয়। তাই সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রথম শর্ত-ভিতরের শৃঙ্খলা।

বিশ্বব্যবস্থা এখন বদলাচ্ছে- কেউ বলে বহুমেরুকরণ, কেউ বলে নতুন শক্তির উত্থান। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: শক্তির দর্শন কি বদলাচ্ছে? নাকি কেবল শক্তির কেন্দ্র বদলাচ্ছে? যদি দর্শন একই থাকে- জোর যার, মুল্লুক তার- তবে পতাকা পাল্টালেও প্রবাদ পাল্টাবে না। কেবল বক্তৃতার ভাষা বদলাবে, বাস্তবতার ব্যথা নয়।

একটি ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা কেমন হতে পারে? সেখানে হয়তো ভেটো-সুবিধা সীমিত হবে, ছোট রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর জোরালো হবে, আন্তর্জাতিক আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ নয়; কারণ শক্তি স্বেচ্ছায় নিজেকে সীমাবদ্ধ করে না। তাকে সীমাবদ্ধ করতে হয় কাঠামো দিয়ে, সম্মিলিত চাপ দিয়ে, নৈতিক ঐক্য দিয়ে।

আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তিও শক্তির নতুন মাত্রা। সাইবার আক্রমণ, তথ্যযুদ্ধ, নজরদারি- এসব অদৃশ্য অস্ত্র। একটি ছোট রাষ্ট্রের নির্বাচন, অর্থনীতি বা সামাজিক স্থিতি দূর থেকে প্রভাবিত করা যায়। বন্দুকের শব্দ শোনা যায় না, কিন্তু ফলাফল বদলে যায়। এই অদৃশ্য শক্তিই ভবিষ্যতের মুল্লুক নির্ধারণের নতুন পদ্ধতি।

শেষ পর্যন্ত, বিশ্ব রাজনীতির এই রূপককথা আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: শক্তি ও ন্যায় এক জিনিস নয়। শক্তি দ্রুত ফল দেয়, ন্যায় ধীরে কাজ করে। কিন্তু শক্তির ফল অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী; ন্যায়ের ভিত্তি দীর্ঘস্থায়ী। ইতিহাসের দীর্ঘ নদী দেখিয়েছে- অত্যধিক জোরে বাঁধ দিলে একদিন ভেঙে যায়, আর তখন প্লাবনে ভেসে যায় নির্মাতা নিজেও।

তাই নতুন প্রবাদ লেখার সময় এসেছে। হয়তো তা হবে- জোর যার, দায়িত্বও তার। কারণ পৃথিবী কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি ভাগাভাগির বাসস্থান। যে শক্তিশালী, তার দায়ও বেশি-ধ্বংসের নয়, রক্ষার; দখলের নয়, সহাবস্থানের।

নচেৎ আমরা একই চক্রে ঘুরতেই থাকব-এক শক্তির পতন, আরেক শক্তির উত্থান; এক ভূখণ্ডের ধ্বংস, আরেক ভূখণ্ডের পুনর্গঠন। আর ইতিহাসের প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছোট রাষ্ট্রগুলো আবারও বলবে-আমাদের আকাশে কারা যেন যুদ্ধের মেঘ টেনে আনে, তারপর বৃষ্টির নাম দেয় শান্তি।

সেই দিন পর্যন্ত প্রবাদটি বেঁচে থাকবে, তীক্ষ্ণ ও তীর্যক-জোর যার, মুল্লুক তার। কিন্তু সভ্যতার সত্যিকারের পরীক্ষা হবে তখনই, যখন আমরা এই প্রবাদটিকে ইতিহাসের জাদুঘরে তুলে রাখতে পারব, আর বাস্তবে লিখতে পারব-ন্যায় যার, ভবিষ্যৎ তার।

[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ভূমি কমিশন কেন জরুরি?

উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির চিত্র

‘পানিয়ালীর পোলার বইমেলা’

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

ইরান ইস্যুতে মহাশক্তির পরীক্ষা

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

জোর যার, মুল্লুক তার: সাম্রাজ্যের নতুন পোশাক

ফকর উদ্দিন মানিক

বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

পৃথিবী নাকি এখন নিয়মে চলে। কাগজে-কলমে আইন আছে, চুক্তি আছে, সভা আছে, রেজুলেশন আছে। আছে এক বিশাল গোল টেবিল, যেখানে সভ্যতার প্রতিনিধিরা বসে মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু টেবিলের নিচে যে পায়ের চাপা-চাপি চলে, তা কোনো কার্যবিবরণীতে লেখা থাকে না। সেখানে পুরোনো প্রবাদটি আজও ফিসফিস করে-জোর যার, মুল্লুক তার।

বিশ্ব রাজনীতির ভাষা এক অভিনব শিল্প। এখানে ‘আক্রমণ’ শব্দটি খুব কম উচ্চারিত হয়; তার বদলে শোনা যায় ‘অভিযান’, ‘স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ’, ‘নিরাপত্তা বলয়’, ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’। শব্দের এই প্রসাধনে বোমার শব্দ মৃদু হয়ে যায়, ধ্বংসস্তূপের ধুলো পরিণত হয় উন্নয়নের কুয়াশায়। যেন আগুন লাগানোর পর দমকলের হেলমেট পরে বলা হচ্ছে- আমরাই তো আগুন নেভাতে এসেছি!

এই গ্রহটিকে যদি একটি বিশাল বাগান ধরা হয়, তবে বড় বড় বৃক্ষরা নিজেদের ছায়াকে আশীর্বাদ বলে প্রচার করে। তারা বলে-আমাদের ডালপালা না থাকলে ঝড় সামলাবে কে? কিন্তু ছোট চারাগাছগুলো জানে, অতিরিক্ত ছায়ায় আলো কমে যায়, মাটি শুকিয়ে যায়, শিকড় দুর্বল হয়। তবু তারা প্রতিবাদ করতে পারে না; কারণ বাগানের পানির কলটি থাকে বড় বৃক্ষেরই নিয়ন্ত্রণে।

বিশ্ব রাজনীতির ভাষা এক অভিনব শিল্প। এখানে ‘আক্রমণ’ শব্দটি খুব কম উচ্চারিত হয়; তার বদলে শোনা যায় ‘অভিযান’, ‘স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ’, ‘নিরাপত্তা বলয়’, ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’। শব্দের এই প্রসাধনে বোমার শব্দ মৃদু হয়ে যায়, ধ্বংসস্তূপের ধুলো পরিণত হয় উন্নয়নের কুয়াশায়। যেন আগুন লাগানোর পর দমকলের হেলমেট পরে বলা হচ্ছে- আমরাই তো আগুন নেভাতে এসেছি!

ছোট রাষ্ট্রগুলোকে এই নাট্যমঞ্চে প্রায়শই দেখা যায় পার্শ্বচরিত্র হিসেবে। তাদের ভূখণ্ড হয়ে ওঠে কৌশলগত দাবার ঘর, তাদের সমুদ্রপথ হয়ে ওঠে বাণিজ্যিক করিডর, তাদের আকাশ হয়ে ওঠে নজরদারির মানচিত্র। তারা নিজেরাই যেন নিজেদের জমির ভাড়াটে-চুক্তির সূক্ষ্ম অক্ষরে লেখা থাকে ভবিষ্যতের দায়।

বড় শক্তিগুলো সাধারণত তিনটি অজুহাত সঙ্গে রাখে- নিরাপত্তা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার। এই ত্রয়ী এক ধরনের বৈশ্বিক তাবিজ। যখন কোনো ছোট ভূখণ্ডে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন তাবিজটি ঝুলিয়ে বলা হয়- আমরা এসেছি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু শান্তির সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করে? যে আসে, না যে ভোগে?

ইতিহাস বলে, সামরিক হস্তক্ষেপের পর খুব কম ক্ষেত্রেই স্থায়ী স্থিতিশীলতা এসেছে। বরং বহু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়েছে, সশস্ত্র গোষ্ঠী বেড়েছে, অর্থনীতি ধসে গেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন এক লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে- যেখানে আগে ধ্বংস, পরে নির্মাণ; আগে বোমা, পরে ব্রিফকেস। ধ্বংসস্তূপের ইট দিয়ে নতুন চুক্তির প্রাসাদ গড়ে ওঠে।

অর্থনৈতিক শক্তিও কম কার্যকর নয়। নিষেধাজ্ঞা এক ধরনের নীরব অবরোধ। এখানে গোলা-বারুদ নেই, আছে ব্যাংকিং বিধিনিষেধ, বাণিজ্যিক বাধা, মুদ্রা সংকট। বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ে, হাসপাতালের ওষুধ কমে, সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়া কক্ষগুলোতে আলো জ্বলে উজ্জ্বলই থাকে। যেন দাবার বোর্ডে রাজা-রানির লড়াই, আর প্যাদারাই আগে ঝরে পড়ে।

আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে প্রায়ই ন্যায়ের উচ্চারণ শোনা যায়। বক্তৃতায় মানবতার কথা বলা হয়, সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তের সময় দেখা যায়, ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লায় ওজন মাপে শক্তির পাল্লা। বড় শক্তির জন্য এক মানদণ্ড, ছোট শক্তির জন্য আরেক। এই দ্বৈত মানদণ্ডই বিশ্ব রাজনীতির অঘোষিত সংবিধান।

রূপক দিয়ে বললে, পৃথিবী যেন এক বিশাল সার্কাস। বড় শক্তিগুলো সিংহের মতো- তাদের গর্জনেই আলো জ্বলে ওঠে। ছোট রাষ্ট্রগুলো দড়ির ওপর হাঁটা শিল্পী-একটু ভুল হলেই নিচে পড়ে যাওয়ার ভয়। দর্শকসারিতে বসা সাধারণ মানুষ হাত তালি দেয় বা হাহাকার করে, কিন্তু মঞ্চের নিয়ন্ত্রণ থাকে রিংমাস্টারের হাতে।

তবে দায় কেবল বাইরের শক্তির নয়। ছোট রাষ্ট্রগুলোর ভেতরকার দুর্বলতাও অনেক সময় বাইরের হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, গণতান্ত্রিক ঘাটতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন- এসব যখন ঘরের ভেতর জমা হয়, তখন বাইরের শক্তি তা ব্যবহার করে নৈতিকতার ঢাল বানায়। ঘর অগোছালো থাকলে অতিথির হস্তক্ষেপ ঠেকানো কঠিন হয়। তাই সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রথম শর্ত-ভিতরের শৃঙ্খলা।

বিশ্বব্যবস্থা এখন বদলাচ্ছে- কেউ বলে বহুমেরুকরণ, কেউ বলে নতুন শক্তির উত্থান। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: শক্তির দর্শন কি বদলাচ্ছে? নাকি কেবল শক্তির কেন্দ্র বদলাচ্ছে? যদি দর্শন একই থাকে- জোর যার, মুল্লুক তার- তবে পতাকা পাল্টালেও প্রবাদ পাল্টাবে না। কেবল বক্তৃতার ভাষা বদলাবে, বাস্তবতার ব্যথা নয়।

একটি ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা কেমন হতে পারে? সেখানে হয়তো ভেটো-সুবিধা সীমিত হবে, ছোট রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর জোরালো হবে, আন্তর্জাতিক আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ নয়; কারণ শক্তি স্বেচ্ছায় নিজেকে সীমাবদ্ধ করে না। তাকে সীমাবদ্ধ করতে হয় কাঠামো দিয়ে, সম্মিলিত চাপ দিয়ে, নৈতিক ঐক্য দিয়ে।

আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তিও শক্তির নতুন মাত্রা। সাইবার আক্রমণ, তথ্যযুদ্ধ, নজরদারি- এসব অদৃশ্য অস্ত্র। একটি ছোট রাষ্ট্রের নির্বাচন, অর্থনীতি বা সামাজিক স্থিতি দূর থেকে প্রভাবিত করা যায়। বন্দুকের শব্দ শোনা যায় না, কিন্তু ফলাফল বদলে যায়। এই অদৃশ্য শক্তিই ভবিষ্যতের মুল্লুক নির্ধারণের নতুন পদ্ধতি।

শেষ পর্যন্ত, বিশ্ব রাজনীতির এই রূপককথা আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: শক্তি ও ন্যায় এক জিনিস নয়। শক্তি দ্রুত ফল দেয়, ন্যায় ধীরে কাজ করে। কিন্তু শক্তির ফল অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী; ন্যায়ের ভিত্তি দীর্ঘস্থায়ী। ইতিহাসের দীর্ঘ নদী দেখিয়েছে- অত্যধিক জোরে বাঁধ দিলে একদিন ভেঙে যায়, আর তখন প্লাবনে ভেসে যায় নির্মাতা নিজেও।

তাই নতুন প্রবাদ লেখার সময় এসেছে। হয়তো তা হবে- জোর যার, দায়িত্বও তার। কারণ পৃথিবী কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি ভাগাভাগির বাসস্থান। যে শক্তিশালী, তার দায়ও বেশি-ধ্বংসের নয়, রক্ষার; দখলের নয়, সহাবস্থানের।

নচেৎ আমরা একই চক্রে ঘুরতেই থাকব-এক শক্তির পতন, আরেক শক্তির উত্থান; এক ভূখণ্ডের ধ্বংস, আরেক ভূখণ্ডের পুনর্গঠন। আর ইতিহাসের প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছোট রাষ্ট্রগুলো আবারও বলবে-আমাদের আকাশে কারা যেন যুদ্ধের মেঘ টেনে আনে, তারপর বৃষ্টির নাম দেয় শান্তি।

সেই দিন পর্যন্ত প্রবাদটি বেঁচে থাকবে, তীক্ষ্ণ ও তীর্যক-জোর যার, মুল্লুক তার। কিন্তু সভ্যতার সত্যিকারের পরীক্ষা হবে তখনই, যখন আমরা এই প্রবাদটিকে ইতিহাসের জাদুঘরে তুলে রাখতে পারব, আর বাস্তবে লিখতে পারব-ন্যায় যার, ভবিষ্যৎ তার।

[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

back to top