alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির চিত্র

আনোয়ার হোসেন

: বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

উৎসব মানেই আনন্দের বারতা, হৃদয়ে নতুন স্পন্দনের ছোঁয়া। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে উৎসব আসে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, যাপিত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে। তবে এই আনন্দের রঙ দেশভেদে ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে, বিশেষ করে যখন বিষয়টি বাজার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উৎসব মানেই হলো ত্যাগের মহিমায় পণ্যমূল্য কমিয়ে সাধারণের নাগালে আনা, অথচ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে উৎসবের পদধ্বনি শোনামাত্রই এক শ্রেণীর অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে নিত্যপণ্যের বাজার যেন আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই বৈপরীত্য কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের নৈতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক কাঠামোর এক গভীর সংকটের প্রতিফলন।

পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় বড়দিন বা ব্ল্যাক ফ্রাইডের সময় ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় নামেন কে কত বেশি ছাড় দিতে পারেন। সেখানে দোকানে দোকানে ঝুলে থাকে ‘% ছাড়’ এর বড় বড় ব্যানার, যা দেখে মধ্যবিত্তের চোখে আশার আলো জ্বলে ওঠে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রমজান বা ঈদের আগে ব্যবসায়ীরা যেন এক গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ হন, যেখানে মূল লক্ষ্য থাকে সাধারণের পকেট কাটা। এই যে ভৌগোলিক অবস্থানের পার্থক্যে ব্যবসার নীতির আমূল পরিবর্তন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। যখন লন্ডনের রাস্তায় সাধারণ মানুষ সস্তায় শীতের কাপড় কেনে, তখন ঢাকার কাঁচাবাজারে বেগুন আর শসার দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে, যা অর্থনীতির স্বাভাবিক চাহিদাগত সূত্রকেও হার মানায়।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে দেখা যায়, পৃথিবীর অন্য প্রান্তের ব্যবসায়ীরা উৎসবকে দেখেন গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক তৈরির সুযোগ হিসেবে। তারা বিশ্বাস করেন, উৎসবে কম লাভে পণ্য দিলে ক্রেতার যে আনুগত্য পাওয়া যায়, তা দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসার মূলধন। কিন্তু আমাদের দেশের এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীর মনস্তত্ত্ব কেবল ‘একবার মারলেই কেল্লাফতে’ নীতিতে বিশ্বাসী। তাদের এই লোভাতুর মানসিকতা উৎসবের আনন্দকে সাধারণ মানুষের জন্য বিষাদে পরিণত করে। একজন রিকশাচালক যখন সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর এক কেজি চাল বা তেলের বাড়তি দাম শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন সেই নীরব দীর্ঘশ্বাস আকাশের দিকে চেয়ে বলে- হায় রে উৎসব, তুমি কি কেবল ধনীদের জন্য?

ধর্মীয় দৃষ্টিতে উৎসব মানেই হলো অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেয়া, ত্যাগের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন। ইসলামে মজুদদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরিকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, আবার হিন্দু ধর্মে পূজা মানেই অশুভের বিনাশ আর শুভ শক্তির জয়। অথচ বাংলাদেশে ধর্মীয় লেবাসধারী অনেক ব্যবসায়ীও উৎসবের প্রাক্কালে অনৈতিকভাবে দাম বাড়িয়ে সেই ধর্মকেই অবমাননা করেন। এটি যেন এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক অসঙ্গতি, যেখানে মুখে ধর্মের বুলি থাকলেও কর্মে থাকে চরম শোষণের চিত্র। স্রষ্টা যেখানে ত্যাগের শিক্ষা দেন, সেখানে আমাদের ব্যবসায়ীরা গ্রহণ আর লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন।

সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব আমাদের বাজার ব্যবস্থাকে এক নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। উন্নত বিশ্বে ব্যবসায়ীরা সমাজের অংশ হিসেবে নিজেদের মনে করেন, তারা জানেন সমাজ ভালো থাকলে তারাও ভালো থাকবেন। আমাদের দেশে ক্ষুদ্র বিক্রেতা থেকে শুরু করে বড় আমদানিকারক- সবার মধ্যেই এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি গেঁড়ে বসেছে। যখন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বাজার তদারকি করতে যান, তখন তাদের ওপর হামলা করা হয়। এ ধরনের ধৃষ্টতা কেবল তখনই সম্ভব, পেশি শক্তির অভয়ারণ্য পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষের হাহাকার আর কর্পোরেট লোভের এই দ্বন্দ্বে সমাজ দিন দিন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে।

কবিতার ভাষায় বলতে গেলে, ‘সবাই হাসে উৎসবের রঙে, কেউ কাঁদে দামের বিষম ঢঙে/ত্যাগের নামে চলে যেথা লুঠতরাজ, সেথা মানুষ কাঁদে সয়ে অপলাজ।’ সত্যিই তো, উৎসবের যে রঙ সবার হওয়ার কথা ছিল, তা কেন এক শ্রেণীর লোভের কারণে ধূসর হয়ে যাবে? আমাদের এই সমাজে কেন আমরা একে অন্যের প্রতি সহমর্মী হতে পারছি না? অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বললে, একটি টেকসই বাজার ব্যবস্থার জন্য পণ্যের সরবরাহ এবং চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এই ভারসাম্য নষ্ট করা হয়, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক।

রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব বাজার সিন্ডিকেটের হাতকে শক্তিশালী করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎসবের আগে সরকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখে। আমাদের দেশেও টিসিবির মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। যখন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন, তখন আইনের প্রয়োগ শিথিল হয়ে পড়ে। এই অশুভ চক্র ভাঙতে না পারলে সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে না। ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই সিন্ডিকেট কতটা শক্তিশালী এবং তারা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

ভৌগোলিক সীমারেখা ছাপিয়ে যদি আমরা বিশ্ববাজারের দিকে তাকাই, তবে দেখব যে ডিজিটাল কমার্স বা ই-কমার্স সাইটগুলো উৎসবের সময় ‘মেগা সেল’ এর আয়োজন করে। এটি কেবল উন্নত বিশ্বের চিত্র নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোতেও উৎসবের সময় বিশেষ ছাড়ের ধুম পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে অনলাইন বা অফলাইন-সবখানেই যেন দাম বাড়ানোর উৎসব শুরু হয়। এক অদ্ভুত অতি-আবেগ কাজ করে আমাদের মধ্যে, যেখানে আমরা উৎসবের জন্য পাগল হয়ে যাই আর সেই সুযোগটি গ্রহণ করে ব্যবসায়ীরা। আমাদের এই আবেগ যখন শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা সত্যিই বেদনার।

শিক্ষিত এবং সচেতন সমাজ হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমরা যদি অনৈতিকভাবে দাম বাড়ানো ব্যবসায়ীদের বর্জন করতে শিখতাম, তবে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। কিন্তু বাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ কম থাকার দোহাই দিয়ে যে লুটতরাজ চলে, তার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন আজও দানা বাঁধেনি। রম্য করে কেউ কেউ বলেন, ‘বাংলাদেশে উৎসবের আগে দাম বাড়ে কারণ ব্যবসায়ীদের তখন উৎসব করার জন্য বাড়তি টাকার দরকার হয়।’ এই তিতা সত্যটি আমাদের নৈতিক দেউলিয়াত্বেরই প্রমাণ দেয়।

উৎসবের সময় মূল্যহ্রাস করলে টার্নওভার বা বিক্রির পরিমাণ এত বাড়ে যে দিনশেষে ব্যবসায়ীদের মুনাফা কম হয় না। এটি একটি উচ্চমানের ব্যবসায়িক দর্শন। কিন্তু আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা অল্প বিক্রি করে বেশি মুনাফা করার মধ্যযুগীয় কৌশলে আটকে আছেন। এই সনাতনী ও ক্ষতিকর চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে না এলে বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মেলানো অসম্ভব। মধ্যবিত্ত যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন তারা উৎসব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্যই ক্ষতির কারণ।

মানবিকতার চরম বিপর্যয় ঘটে যখন আমরা দেখি উৎসবের খুশিতে কেউ অতিরিক্ত খাবার নষ্ট করছে, আর কেউ এক কেজি চালের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে লাঞ্ছিত হচ্ছে। উৎসবের প্রকৃত নির্যাস হলো ভালোবাসা আর সহমর্মিতা। এই মানবিক গুণাবলী যখন বাজার থেকে বিদায় নেয়, তখন সমাজটি একটি কংক্রিটের জঙ্গল ছাড়া আর কিছু থাকে না। আমাদের ব্যবসায়ীদের বুঝতে হবে, মানুষের অভিশাপ নিয়ে অর্জিত সম্পদ কখনও সুখ বয়ে আনে না। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের ব্যবসায়ীরা যখন মানুষকে হাসিয়ে লাভ করেন, আমাদের ব্যবসায়ীরা তখন মানুষকে কাঁদিয়ে পকেট ভরেন- এই পার্থক্যটুকু মুছে ফেলা সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের উৎসবের বাজার এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে গুটিকতক মানুষের আকাশচুম্বী লোভ, অন্যদিকে কোটি মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। এ বৈষম্য আর অনৈতিকতার দেয়াল ভাঙতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও সামাজিক মূল্যবোধের জাগরণ। বাজার মনিটরিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। উৎসব আসুক সবার ঘরে সমান আনন্দ নিয়ে, পণ্যের ভারে নয় বরং প্রাণের উচ্ছ্বাসে সিক্ত হোক প্রতিটি মন।

মূলত এটি স্পষ্ট যে, বিশ্বের উৎসবের চিত্র আর বাংলাদেশের উৎসবের বাস্তবতার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, তা আমাদের জাতির জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। আমরা যদি উৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে চাই, তবে লুণ্ঠন নয়, সেবার মানসিকতা জাগ্রত করতে হবে। ব্যবসায়ীরা যখন নিজেদের শোষক নয় বরং সেবক হিসেবে ভাববেন, তখনই বাংলাদেশের উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির এই অলিখিত নিয়ম রহিত হবে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একসময় হয়তো বাংলাদেশেও উৎসবের পদধ্বনিতে মানুষ আতঙ্কিত না হয়ে খুশিতে উদ্বেলিত হবে, এবং বাজার হবে সাধারণ মানুষের প্রকৃত উৎসবের জায়গা।

[লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল]

আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ভূমি কমিশন কেন জরুরি?

জোর যার, মুল্লুক তার: সাম্রাজ্যের নতুন পোশাক

‘পানিয়ালীর পোলার বইমেলা’

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

ইরান ইস্যুতে মহাশক্তির পরীক্ষা

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির চিত্র

আনোয়ার হোসেন

বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

উৎসব মানেই আনন্দের বারতা, হৃদয়ে নতুন স্পন্দনের ছোঁয়া। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে উৎসব আসে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, যাপিত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে। তবে এই আনন্দের রঙ দেশভেদে ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে, বিশেষ করে যখন বিষয়টি বাজার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উৎসব মানেই হলো ত্যাগের মহিমায় পণ্যমূল্য কমিয়ে সাধারণের নাগালে আনা, অথচ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে উৎসবের পদধ্বনি শোনামাত্রই এক শ্রেণীর অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে নিত্যপণ্যের বাজার যেন আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই বৈপরীত্য কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের নৈতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক কাঠামোর এক গভীর সংকটের প্রতিফলন।

পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় বড়দিন বা ব্ল্যাক ফ্রাইডের সময় ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় নামেন কে কত বেশি ছাড় দিতে পারেন। সেখানে দোকানে দোকানে ঝুলে থাকে ‘% ছাড়’ এর বড় বড় ব্যানার, যা দেখে মধ্যবিত্তের চোখে আশার আলো জ্বলে ওঠে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রমজান বা ঈদের আগে ব্যবসায়ীরা যেন এক গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ হন, যেখানে মূল লক্ষ্য থাকে সাধারণের পকেট কাটা। এই যে ভৌগোলিক অবস্থানের পার্থক্যে ব্যবসার নীতির আমূল পরিবর্তন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। যখন লন্ডনের রাস্তায় সাধারণ মানুষ সস্তায় শীতের কাপড় কেনে, তখন ঢাকার কাঁচাবাজারে বেগুন আর শসার দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে, যা অর্থনীতির স্বাভাবিক চাহিদাগত সূত্রকেও হার মানায়।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে দেখা যায়, পৃথিবীর অন্য প্রান্তের ব্যবসায়ীরা উৎসবকে দেখেন গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক তৈরির সুযোগ হিসেবে। তারা বিশ্বাস করেন, উৎসবে কম লাভে পণ্য দিলে ক্রেতার যে আনুগত্য পাওয়া যায়, তা দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসার মূলধন। কিন্তু আমাদের দেশের এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীর মনস্তত্ত্ব কেবল ‘একবার মারলেই কেল্লাফতে’ নীতিতে বিশ্বাসী। তাদের এই লোভাতুর মানসিকতা উৎসবের আনন্দকে সাধারণ মানুষের জন্য বিষাদে পরিণত করে। একজন রিকশাচালক যখন সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর এক কেজি চাল বা তেলের বাড়তি দাম শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন সেই নীরব দীর্ঘশ্বাস আকাশের দিকে চেয়ে বলে- হায় রে উৎসব, তুমি কি কেবল ধনীদের জন্য?

ধর্মীয় দৃষ্টিতে উৎসব মানেই হলো অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেয়া, ত্যাগের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন। ইসলামে মজুদদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরিকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, আবার হিন্দু ধর্মে পূজা মানেই অশুভের বিনাশ আর শুভ শক্তির জয়। অথচ বাংলাদেশে ধর্মীয় লেবাসধারী অনেক ব্যবসায়ীও উৎসবের প্রাক্কালে অনৈতিকভাবে দাম বাড়িয়ে সেই ধর্মকেই অবমাননা করেন। এটি যেন এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক অসঙ্গতি, যেখানে মুখে ধর্মের বুলি থাকলেও কর্মে থাকে চরম শোষণের চিত্র। স্রষ্টা যেখানে ত্যাগের শিক্ষা দেন, সেখানে আমাদের ব্যবসায়ীরা গ্রহণ আর লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন।

সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব আমাদের বাজার ব্যবস্থাকে এক নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। উন্নত বিশ্বে ব্যবসায়ীরা সমাজের অংশ হিসেবে নিজেদের মনে করেন, তারা জানেন সমাজ ভালো থাকলে তারাও ভালো থাকবেন। আমাদের দেশে ক্ষুদ্র বিক্রেতা থেকে শুরু করে বড় আমদানিকারক- সবার মধ্যেই এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি গেঁড়ে বসেছে। যখন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বাজার তদারকি করতে যান, তখন তাদের ওপর হামলা করা হয়। এ ধরনের ধৃষ্টতা কেবল তখনই সম্ভব, পেশি শক্তির অভয়ারণ্য পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষের হাহাকার আর কর্পোরেট লোভের এই দ্বন্দ্বে সমাজ দিন দিন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে।

কবিতার ভাষায় বলতে গেলে, ‘সবাই হাসে উৎসবের রঙে, কেউ কাঁদে দামের বিষম ঢঙে/ত্যাগের নামে চলে যেথা লুঠতরাজ, সেথা মানুষ কাঁদে সয়ে অপলাজ।’ সত্যিই তো, উৎসবের যে রঙ সবার হওয়ার কথা ছিল, তা কেন এক শ্রেণীর লোভের কারণে ধূসর হয়ে যাবে? আমাদের এই সমাজে কেন আমরা একে অন্যের প্রতি সহমর্মী হতে পারছি না? অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বললে, একটি টেকসই বাজার ব্যবস্থার জন্য পণ্যের সরবরাহ এবং চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এই ভারসাম্য নষ্ট করা হয়, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক।

রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব বাজার সিন্ডিকেটের হাতকে শক্তিশালী করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎসবের আগে সরকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখে। আমাদের দেশেও টিসিবির মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। যখন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন, তখন আইনের প্রয়োগ শিথিল হয়ে পড়ে। এই অশুভ চক্র ভাঙতে না পারলে সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে না। ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই সিন্ডিকেট কতটা শক্তিশালী এবং তারা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

ভৌগোলিক সীমারেখা ছাপিয়ে যদি আমরা বিশ্ববাজারের দিকে তাকাই, তবে দেখব যে ডিজিটাল কমার্স বা ই-কমার্স সাইটগুলো উৎসবের সময় ‘মেগা সেল’ এর আয়োজন করে। এটি কেবল উন্নত বিশ্বের চিত্র নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোতেও উৎসবের সময় বিশেষ ছাড়ের ধুম পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে অনলাইন বা অফলাইন-সবখানেই যেন দাম বাড়ানোর উৎসব শুরু হয়। এক অদ্ভুত অতি-আবেগ কাজ করে আমাদের মধ্যে, যেখানে আমরা উৎসবের জন্য পাগল হয়ে যাই আর সেই সুযোগটি গ্রহণ করে ব্যবসায়ীরা। আমাদের এই আবেগ যখন শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা সত্যিই বেদনার।

শিক্ষিত এবং সচেতন সমাজ হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমরা যদি অনৈতিকভাবে দাম বাড়ানো ব্যবসায়ীদের বর্জন করতে শিখতাম, তবে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। কিন্তু বাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ কম থাকার দোহাই দিয়ে যে লুটতরাজ চলে, তার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন আজও দানা বাঁধেনি। রম্য করে কেউ কেউ বলেন, ‘বাংলাদেশে উৎসবের আগে দাম বাড়ে কারণ ব্যবসায়ীদের তখন উৎসব করার জন্য বাড়তি টাকার দরকার হয়।’ এই তিতা সত্যটি আমাদের নৈতিক দেউলিয়াত্বেরই প্রমাণ দেয়।

উৎসবের সময় মূল্যহ্রাস করলে টার্নওভার বা বিক্রির পরিমাণ এত বাড়ে যে দিনশেষে ব্যবসায়ীদের মুনাফা কম হয় না। এটি একটি উচ্চমানের ব্যবসায়িক দর্শন। কিন্তু আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা অল্প বিক্রি করে বেশি মুনাফা করার মধ্যযুগীয় কৌশলে আটকে আছেন। এই সনাতনী ও ক্ষতিকর চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে না এলে বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মেলানো অসম্ভব। মধ্যবিত্ত যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন তারা উৎসব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্যই ক্ষতির কারণ।

মানবিকতার চরম বিপর্যয় ঘটে যখন আমরা দেখি উৎসবের খুশিতে কেউ অতিরিক্ত খাবার নষ্ট করছে, আর কেউ এক কেজি চালের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে লাঞ্ছিত হচ্ছে। উৎসবের প্রকৃত নির্যাস হলো ভালোবাসা আর সহমর্মিতা। এই মানবিক গুণাবলী যখন বাজার থেকে বিদায় নেয়, তখন সমাজটি একটি কংক্রিটের জঙ্গল ছাড়া আর কিছু থাকে না। আমাদের ব্যবসায়ীদের বুঝতে হবে, মানুষের অভিশাপ নিয়ে অর্জিত সম্পদ কখনও সুখ বয়ে আনে না। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের ব্যবসায়ীরা যখন মানুষকে হাসিয়ে লাভ করেন, আমাদের ব্যবসায়ীরা তখন মানুষকে কাঁদিয়ে পকেট ভরেন- এই পার্থক্যটুকু মুছে ফেলা সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের উৎসবের বাজার এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে গুটিকতক মানুষের আকাশচুম্বী লোভ, অন্যদিকে কোটি মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। এ বৈষম্য আর অনৈতিকতার দেয়াল ভাঙতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও সামাজিক মূল্যবোধের জাগরণ। বাজার মনিটরিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। উৎসব আসুক সবার ঘরে সমান আনন্দ নিয়ে, পণ্যের ভারে নয় বরং প্রাণের উচ্ছ্বাসে সিক্ত হোক প্রতিটি মন।

মূলত এটি স্পষ্ট যে, বিশ্বের উৎসবের চিত্র আর বাংলাদেশের উৎসবের বাস্তবতার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, তা আমাদের জাতির জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। আমরা যদি উৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে চাই, তবে লুণ্ঠন নয়, সেবার মানসিকতা জাগ্রত করতে হবে। ব্যবসায়ীরা যখন নিজেদের শোষক নয় বরং সেবক হিসেবে ভাববেন, তখনই বাংলাদেশের উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির এই অলিখিত নিয়ম রহিত হবে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একসময় হয়তো বাংলাদেশেও উৎসবের পদধ্বনিতে মানুষ আতঙ্কিত না হয়ে খুশিতে উদ্বেলিত হবে, এবং বাজার হবে সাধারণ মানুষের প্রকৃত উৎসবের জায়গা।

[লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল]

back to top