alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ভূমি কমিশন কেন জরুরি?

বাবুল রবিদাস

: বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি, গণকপাড়া, রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরে ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। এ লক্ষ্যে তারা আন্দোলন, মিছিল ও সভা-সমাবেশ করছে। তাদের দাবি, বিদ্যমান আইন থাকা সত্ত্বেও আদালতে তারা কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছে না। বিষয়টি বোঝার জন্য প্রচলিত আইনের দিকে তাকানো প্রয়োজন।

১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্পত্তি সুরক্ষার জন্য প্রণীত। এ ধারায় তাদের সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অনগ্রসর ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী যাতে ভূমিহীন না হয়ে পড়ে, সে উদ্দেশেই এই বিধান রাখা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তি অন্য কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তির কাছে অনুমতি ছাড়াই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। তবে অ-আদিবাসীর কাছে বিক্রি করতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর অনুমতি নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আবেদন পাওয়ার পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সরেজমিন তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা হয়। শুনানি নিয়ে সন্তুষ্ট হলে তিনি বিক্রির অনুমতি দেন এবং সেই অনুমতির নম্বর দলিলে উল্লেখ করতে হয়। সন্তুষ্ট না হলে আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রতারক ক্রেতারা অনুমতি না নিয়ে দলিল সম্পাদন করেন। কখনও বিক্রেতার প্রকৃত পদবি গোপন রেখে ভিন্ন পদবি ব্যবহার করা হয়। অথচ ৯৭ (৭) উপধারায় স্পষ্ট বলা আছে, এ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে করা যেকোনো হস্তান্তর বাতিল বলে গণ্য হবে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নজিরও রয়েছে।

৯৭ (৮) উপধারা অনুযায়ী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) স্বপ্রণোদিত হয়ে বা আবেদনের ভিত্তিতে অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করতে পারেন এবং সম্পত্তি বিক্রেতা বা তার উত্তরাধিকারীর কাছে ফেরত দিতে পারেন। উত্তরাধিকারী না থাকলে আইনানুগ প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাও সম্ভব না হলে সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত হয় এবং পরবর্তীতে অন্য কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তিকে বন্দোবস্ত দেয়া যায়।

কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার লকনাহার ও ছালাখুর মৌজার মোট ১.১১ একর জমির মালিক ছিলেন পটে উড়াও। তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে তুরিয়া উড়াও সম্পত্তির মালিক হন। অভিযোগ রয়েছে, ১৯৪৭ সালের একটি দলিলে ‘উড়াও’ পদবি ব্যবহার না করে ‘সরকার’ পদবি ব্যবহার করে সম্পত্তি হস্তান্তর দেখানো হয় এবং আইন এড়িয়ে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়।

বিষয়টি জানতে পেরে তুরিয়া উড়াও ৯৭ (৮) ধারায় সম্পত্তি উদ্ধারের আবেদন করেন। তদন্তে অনুমতি না নেয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলেও মামলা তামাদি দোষে খারিজ হয়। পরবর্তী সময়ে আপিল ও রিভিশন করা হলেও একই কারণে আবেদন নামঞ্জুর হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর মামলা চলার পরও চূড়ান্ত প্রতিকার মেলেনি।

এ ঘটনা দেখায়, আইনে সুরক্ষা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ জটিল ও দীর্ঘসূত্রতায় বাধাগ্রস্ত। তামাদি আইনের অজুহাতে বহু আদিবাসী পরিবার তাদের জমি ফিরে পায় না। ফলে আইনের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।

এ প্রেক্ষাপটে একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন জরুরি হতে পারে। বিশেষায়িত কমিশন থাকলে দ্রুত তদন্ত, শুনানি ও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির চিত্র

জোর যার, মুল্লুক তার: সাম্রাজ্যের নতুন পোশাক

‘পানিয়ালীর পোলার বইমেলা’

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

ইরান ইস্যুতে মহাশক্তির পরীক্ষা

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ভূমি কমিশন কেন জরুরি?

বাবুল রবিদাস

বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি, গণকপাড়া, রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরে ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। এ লক্ষ্যে তারা আন্দোলন, মিছিল ও সভা-সমাবেশ করছে। তাদের দাবি, বিদ্যমান আইন থাকা সত্ত্বেও আদালতে তারা কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছে না। বিষয়টি বোঝার জন্য প্রচলিত আইনের দিকে তাকানো প্রয়োজন।

১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্পত্তি সুরক্ষার জন্য প্রণীত। এ ধারায় তাদের সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অনগ্রসর ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী যাতে ভূমিহীন না হয়ে পড়ে, সে উদ্দেশেই এই বিধান রাখা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তি অন্য কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তির কাছে অনুমতি ছাড়াই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। তবে অ-আদিবাসীর কাছে বিক্রি করতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর অনুমতি নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আবেদন পাওয়ার পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সরেজমিন তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা হয়। শুনানি নিয়ে সন্তুষ্ট হলে তিনি বিক্রির অনুমতি দেন এবং সেই অনুমতির নম্বর দলিলে উল্লেখ করতে হয়। সন্তুষ্ট না হলে আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রতারক ক্রেতারা অনুমতি না নিয়ে দলিল সম্পাদন করেন। কখনও বিক্রেতার প্রকৃত পদবি গোপন রেখে ভিন্ন পদবি ব্যবহার করা হয়। অথচ ৯৭ (৭) উপধারায় স্পষ্ট বলা আছে, এ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে করা যেকোনো হস্তান্তর বাতিল বলে গণ্য হবে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নজিরও রয়েছে।

৯৭ (৮) উপধারা অনুযায়ী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) স্বপ্রণোদিত হয়ে বা আবেদনের ভিত্তিতে অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করতে পারেন এবং সম্পত্তি বিক্রেতা বা তার উত্তরাধিকারীর কাছে ফেরত দিতে পারেন। উত্তরাধিকারী না থাকলে আইনানুগ প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাও সম্ভব না হলে সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত হয় এবং পরবর্তীতে অন্য কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তিকে বন্দোবস্ত দেয়া যায়।

কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার লকনাহার ও ছালাখুর মৌজার মোট ১.১১ একর জমির মালিক ছিলেন পটে উড়াও। তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে তুরিয়া উড়াও সম্পত্তির মালিক হন। অভিযোগ রয়েছে, ১৯৪৭ সালের একটি দলিলে ‘উড়াও’ পদবি ব্যবহার না করে ‘সরকার’ পদবি ব্যবহার করে সম্পত্তি হস্তান্তর দেখানো হয় এবং আইন এড়িয়ে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়।

বিষয়টি জানতে পেরে তুরিয়া উড়াও ৯৭ (৮) ধারায় সম্পত্তি উদ্ধারের আবেদন করেন। তদন্তে অনুমতি না নেয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলেও মামলা তামাদি দোষে খারিজ হয়। পরবর্তী সময়ে আপিল ও রিভিশন করা হলেও একই কারণে আবেদন নামঞ্জুর হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর মামলা চলার পরও চূড়ান্ত প্রতিকার মেলেনি।

এ ঘটনা দেখায়, আইনে সুরক্ষা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ জটিল ও দীর্ঘসূত্রতায় বাধাগ্রস্ত। তামাদি আইনের অজুহাতে বহু আদিবাসী পরিবার তাদের জমি ফিরে পায় না। ফলে আইনের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।

এ প্রেক্ষাপটে একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন জরুরি হতে পারে। বিশেষায়িত কমিশন থাকলে দ্রুত তদন্ত, শুনানি ও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

back to top