বাবুল রবিদাস
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি, গণকপাড়া, রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরে ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। এ লক্ষ্যে তারা আন্দোলন, মিছিল ও সভা-সমাবেশ করছে। তাদের দাবি, বিদ্যমান আইন থাকা সত্ত্বেও আদালতে তারা কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছে না। বিষয়টি বোঝার জন্য প্রচলিত আইনের দিকে তাকানো প্রয়োজন।
১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্পত্তি সুরক্ষার জন্য প্রণীত। এ ধারায় তাদের সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অনগ্রসর ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী যাতে ভূমিহীন না হয়ে পড়ে, সে উদ্দেশেই এই বিধান রাখা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তি অন্য কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তির কাছে অনুমতি ছাড়াই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। তবে অ-আদিবাসীর কাছে বিক্রি করতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর অনুমতি নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আবেদন পাওয়ার পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সরেজমিন তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা হয়। শুনানি নিয়ে সন্তুষ্ট হলে তিনি বিক্রির অনুমতি দেন এবং সেই অনুমতির নম্বর দলিলে উল্লেখ করতে হয়। সন্তুষ্ট না হলে আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রতারক ক্রেতারা অনুমতি না নিয়ে দলিল সম্পাদন করেন। কখনও বিক্রেতার প্রকৃত পদবি গোপন রেখে ভিন্ন পদবি ব্যবহার করা হয়। অথচ ৯৭ (৭) উপধারায় স্পষ্ট বলা আছে, এ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে করা যেকোনো হস্তান্তর বাতিল বলে গণ্য হবে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নজিরও রয়েছে।
৯৭ (৮) উপধারা অনুযায়ী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) স্বপ্রণোদিত হয়ে বা আবেদনের ভিত্তিতে অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করতে পারেন এবং সম্পত্তি বিক্রেতা বা তার উত্তরাধিকারীর কাছে ফেরত দিতে পারেন। উত্তরাধিকারী না থাকলে আইনানুগ প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাও সম্ভব না হলে সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত হয় এবং পরবর্তীতে অন্য কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তিকে বন্দোবস্ত দেয়া যায়।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার লকনাহার ও ছালাখুর মৌজার মোট ১.১১ একর জমির মালিক ছিলেন পটে উড়াও। তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে তুরিয়া উড়াও সম্পত্তির মালিক হন। অভিযোগ রয়েছে, ১৯৪৭ সালের একটি দলিলে ‘উড়াও’ পদবি ব্যবহার না করে ‘সরকার’ পদবি ব্যবহার করে সম্পত্তি হস্তান্তর দেখানো হয় এবং আইন এড়িয়ে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়।
বিষয়টি জানতে পেরে তুরিয়া উড়াও ৯৭ (৮) ধারায় সম্পত্তি উদ্ধারের আবেদন করেন। তদন্তে অনুমতি না নেয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলেও মামলা তামাদি দোষে খারিজ হয়। পরবর্তী সময়ে আপিল ও রিভিশন করা হলেও একই কারণে আবেদন নামঞ্জুর হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর মামলা চলার পরও চূড়ান্ত প্রতিকার মেলেনি।
এ ঘটনা দেখায়, আইনে সুরক্ষা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ জটিল ও দীর্ঘসূত্রতায় বাধাগ্রস্ত। তামাদি আইনের অজুহাতে বহু আদিবাসী পরিবার তাদের জমি ফিরে পায় না। ফলে আইনের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
এ প্রেক্ষাপটে একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন জরুরি হতে পারে। বিশেষায়িত কমিশন থাকলে দ্রুত তদন্ত, শুনানি ও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
বাবুল রবিদাস
বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি, গণকপাড়া, রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরে ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। এ লক্ষ্যে তারা আন্দোলন, মিছিল ও সভা-সমাবেশ করছে। তাদের দাবি, বিদ্যমান আইন থাকা সত্ত্বেও আদালতে তারা কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছে না। বিষয়টি বোঝার জন্য প্রচলিত আইনের দিকে তাকানো প্রয়োজন।
১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্পত্তি সুরক্ষার জন্য প্রণীত। এ ধারায় তাদের সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অনগ্রসর ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী যাতে ভূমিহীন না হয়ে পড়ে, সে উদ্দেশেই এই বিধান রাখা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তি অন্য কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তির কাছে অনুমতি ছাড়াই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। তবে অ-আদিবাসীর কাছে বিক্রি করতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর অনুমতি নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আবেদন পাওয়ার পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সরেজমিন তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা হয়। শুনানি নিয়ে সন্তুষ্ট হলে তিনি বিক্রির অনুমতি দেন এবং সেই অনুমতির নম্বর দলিলে উল্লেখ করতে হয়। সন্তুষ্ট না হলে আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রতারক ক্রেতারা অনুমতি না নিয়ে দলিল সম্পাদন করেন। কখনও বিক্রেতার প্রকৃত পদবি গোপন রেখে ভিন্ন পদবি ব্যবহার করা হয়। অথচ ৯৭ (৭) উপধারায় স্পষ্ট বলা আছে, এ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে করা যেকোনো হস্তান্তর বাতিল বলে গণ্য হবে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নজিরও রয়েছে।
৯৭ (৮) উপধারা অনুযায়ী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) স্বপ্রণোদিত হয়ে বা আবেদনের ভিত্তিতে অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করতে পারেন এবং সম্পত্তি বিক্রেতা বা তার উত্তরাধিকারীর কাছে ফেরত দিতে পারেন। উত্তরাধিকারী না থাকলে আইনানুগ প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাও সম্ভব না হলে সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত হয় এবং পরবর্তীতে অন্য কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তিকে বন্দোবস্ত দেয়া যায়।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার লকনাহার ও ছালাখুর মৌজার মোট ১.১১ একর জমির মালিক ছিলেন পটে উড়াও। তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে তুরিয়া উড়াও সম্পত্তির মালিক হন। অভিযোগ রয়েছে, ১৯৪৭ সালের একটি দলিলে ‘উড়াও’ পদবি ব্যবহার না করে ‘সরকার’ পদবি ব্যবহার করে সম্পত্তি হস্তান্তর দেখানো হয় এবং আইন এড়িয়ে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়।
বিষয়টি জানতে পেরে তুরিয়া উড়াও ৯৭ (৮) ধারায় সম্পত্তি উদ্ধারের আবেদন করেন। তদন্তে অনুমতি না নেয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলেও মামলা তামাদি দোষে খারিজ হয়। পরবর্তী সময়ে আপিল ও রিভিশন করা হলেও একই কারণে আবেদন নামঞ্জুর হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর মামলা চলার পরও চূড়ান্ত প্রতিকার মেলেনি।
এ ঘটনা দেখায়, আইনে সুরক্ষা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ জটিল ও দীর্ঘসূত্রতায় বাধাগ্রস্ত। তামাদি আইনের অজুহাতে বহু আদিবাসী পরিবার তাদের জমি ফিরে পায় না। ফলে আইনের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
এ প্রেক্ষাপটে একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন জরুরি হতে পারে। বিশেষায়িত কমিশন থাকলে দ্রুত তদন্ত, শুনানি ও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]