alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদ: বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কী?

মতিউর রহমান

: শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬

আধুনিক বিশ্বায়ন আমাদের শিখিয়েছে যে, পৃথিবী এখন একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রাম। কিন্তু এই সুন্দর সংজ্ঞার একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে, যা আমরা বারবার প্রত্যক্ষ করিÑ যখন কোনো সুদূরপ্রান্তের যুদ্ধ আমাদের রান্নাঘরের বাজেটকে ওলটপালট করে দেয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে আমরা আবারও সেই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন ইসরায়েলি ও মার্কিন যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা গেল এবং ইরানের তেহরানসহ বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনায় বিস্ফোরণ ঘটল, তখন তার কম্পন কেবল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণ এবং নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার খবর বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তার অভিঘাত থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। ভৌগোলিকভাবে তেহরান থেকে ঢাকা প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে হলেও, আমাদের অর্থনীতির নাড়ি আটকে আছে সেই তপ্ত মরুভূমির তেলের খনি আর প্রবাসী শ্রমিকদের ঘামে। ফলে এই যুদ্ধ কেবল টেলিভিশনের সংবাদ নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক অশনিসংকেত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ সামরিক অভিযানকে তারা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস এবং নেতৃত্বের কাঠামোকে পঙ্গু করার একটি ‘প্রতিরোধমূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করেছে। তবে যুদ্ধের ভাষা কখনোই কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান যখন পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধার ইঙ্গিত দিয়েছে, তখন থেকেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আগুন লেগেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এই সংকীর্ণ জলপথটি যদি যুদ্ধের কারণে রুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এই অনিশ্চয়তাই মূলত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক অস্থির সময়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায় যে, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকাংশেই আমদানিনির্ভর। বর্তমানে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় পুরোটাই এবং এলএনজির একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগ্রহ করি। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন ৮০ ডলার ছাড়িয়ে ১০০ ডলারের দিকে ধাবিত হয়, তখন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন একটি ঊর্ধ্বমুখী মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছে, তখন জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো কাজ করবে। তেলের দাম বাড়লে কেবল যাতায়াত খরচ বাড়ে না, বরং এর একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হয়। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের সেচ খরচ বাড়ে, ট্রাকের ভাড়া বাড়লে সবজির দাম বাড়ে এবং বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে অর্থনীতিবিদরা ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা ব্যয়-চালিত মুদ্রাস্ফীতি বলে অভিহিত করেন। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন আগে থেকেই সংকুচিত, তখন এই নতুন আপদ তাদের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।

জ্বালানি সংকটের এই মেঘ কেবল আমদানিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের রপ্তানি খাতের আকাশকেও অন্ধকার করে তুলছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জীবনীশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প। আমাদের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানি এখন লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে বিকল্প দীর্ঘ পথে যাত্রা শুরু করেছে। এর ফলে জাহাজ ভাড়া যেমন বেড়েছে, তেমনই সময়ও লাগছে অনেক বেশি। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের পরিবহন ব্যয় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন আমরা ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে আছি, তখন এই অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় আমাদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে, যা বিদেশি ক্রেতাদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। ওয়ালমার্ট বা এইচঅ্যান্ডএম-এর মতো বড় ক্রেতারা যদি ঝুঁকির আশঙ্কায় বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করে, তবে আমাদের লাখ লাখ পোশাক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকিতে পড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিকটি হলো আমাদের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং কুয়েতের মতো দেশে কর্মরত আছেন। প্রতি বছর তারা যে ২৭ থেকে ৩২ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান, তা আমাদের অর্থনীতির ফুসফুসের মতো কাজ করে। ২০২৬ সালের বাজেটে বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে এই রেমিট্যান্সের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু যুদ্ধ যখন কোনো অঞ্চলের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ে, তখন সেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নির্মাণ প্রকল্পগুলো ধীর হয়ে যায়। যদি মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়, তবে নতুন করে শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ হতে পারে এবং যারা কাজ করছেন তারা ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তেলের দাম বাড়লে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর আয় বাড়লেও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, যার ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। প্রবাসী আয়ের এই অনিশ্চয়তা আমাদের ডলার সংকটে থাকা অর্থনীতিকে আরও খাদের কিনারে নিয়ে যেতে পারে।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নে একটি নিরপেক্ষ কিন্তু স্থিতিশীলতাপন্থী অবস্থান বজায় রাখে। ইরানের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুব সামান্য হলেও, ওআইসি বা অন্যান্য মুসলিম ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের এক ধরনের নৈতিক অবস্থান রয়েছে। তবে বাংলাদেশের আসল স্বার্থ জড়িয়ে আছে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। সংঘাত যদি ছড়িয়ে পড়ে এবং লেবানন, সিরিয়া বা ইয়েমেনের মতো দেশগুলো সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে যায়, তবে পুরো অঞ্চলটি দীর্ঘস্থায়ী অশান্তির কবলে পড়বে। শরণার্থী সমস্যা থেকে শুরু করে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান- সবই বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ যদিও রণক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে, কিন্তু আধুনিক সাইবার যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ঘাত যেকোনো দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তৈরি হওয়া তেল সংকট বিশ্বকে এক ভয়াবহ মন্দার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও বাংলাদেশ তার প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশকে সরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল, যা সেই সময়কার ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বড় আঘাত হেনেছিল। ২০২৬ সালের এই সংকট আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা বিগত দশকগুলোতে জ্বালানি বহুমুখীকরণে যথেষ্ট মনোযোগ দিইনি। যদি আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা নিজেদের প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতা বেশি থাকত, তবে আজ তেহরান বা তেলআবিবের সংবাদের দিকে আমাদের এমন শঙ্কিত চোখে তাকাতে হতো না। এই সংকট থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন যে, জাতীয় নিরাপত্তাকে কেবল সীমান্ত রক্ষার গণ্ডিতে না দেখে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে হলে বাংলাদেশকে এখন থেকেই কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে একক কোনো অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজার অনুসন্ধান করতে হবে। এলএনজি আমদানির জন্য কাতার বা ওমানের বাইরেও অন্য দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, রপ্তানি বাজারে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ওপর নির্ভরশীল না থেকে এশীয় ও আফ্রিকার নতুন নতুন বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে হবে। তৃতীয়ত, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে যাতে তারা কেবল নির্মাণশ্রমিক হিসেবে নয়, বরং কারিগরি কাজে দক্ষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, যা মন্দার সময়েও তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। সর্বোপরি, দেশে নিজেদের জ্বালানি অনুসন্ধানে এবং সৌর বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে বিনিয়োগ বহুগুণ বাড়াতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত কেবল দুটি দেশের ভূ-রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, বরং এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি অর্থনৈতিক পরীক্ষা। ঢাকার কারওয়ান বাজারে কাঁচামরিচের দাম কেন বাড়ছে বা তৈরি পোশাকের কারখানায় কেন নতুন অর্ডার আসছে না- তার উত্তর অনেক সময় সুদূর তেহরানের কোনো বিস্ফোরণের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। এই অদৃশ্য সুতোর টানই হলো আধুনিক ভূ-রাজনীতির বাস্তবতা। বাংলাদেশের জন্য এই সংকট কোনো সামরিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি একটি টিকে থাকার লড়াই। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রিজার্ভের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং মুদ্রাস্ফীতির কশাঘাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করাই এখন সরকারের প্রধান কাজ হওয়া উচিত। সংকটের মেঘ যত ঘনীভূতই হোক না কেন, সঠিক কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে বাংলাদেশ এই অভিঘাত মোকাবিলা করতে পারবে- এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা। দূরের যুদ্ধের আঁচ যেন নিকটের সম্ভাবনাকে পুড়িয়ে ছারখার না করে দেয়, সেদিকেই এখন তীক্ষè নজর রাখার সময়।

[লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের বিবাহের রীতি ও প্রথা

না হয় রহিতে কাছে!

আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ভূমি কমিশন কেন জরুরি?

উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির চিত্র

জোর যার, মুল্লুক তার: সাম্রাজ্যের নতুন পোশাক

‘পানিয়ালীর পোলার বইমেলা’

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

ইরান ইস্যুতে মহাশক্তির পরীক্ষা

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদ: বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কী?

মতিউর রহমান

শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬

আধুনিক বিশ্বায়ন আমাদের শিখিয়েছে যে, পৃথিবী এখন একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রাম। কিন্তু এই সুন্দর সংজ্ঞার একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে, যা আমরা বারবার প্রত্যক্ষ করিÑ যখন কোনো সুদূরপ্রান্তের যুদ্ধ আমাদের রান্নাঘরের বাজেটকে ওলটপালট করে দেয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে আমরা আবারও সেই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন ইসরায়েলি ও মার্কিন যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা গেল এবং ইরানের তেহরানসহ বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনায় বিস্ফোরণ ঘটল, তখন তার কম্পন কেবল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণ এবং নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার খবর বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তার অভিঘাত থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। ভৌগোলিকভাবে তেহরান থেকে ঢাকা প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে হলেও, আমাদের অর্থনীতির নাড়ি আটকে আছে সেই তপ্ত মরুভূমির তেলের খনি আর প্রবাসী শ্রমিকদের ঘামে। ফলে এই যুদ্ধ কেবল টেলিভিশনের সংবাদ নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক অশনিসংকেত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ সামরিক অভিযানকে তারা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস এবং নেতৃত্বের কাঠামোকে পঙ্গু করার একটি ‘প্রতিরোধমূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করেছে। তবে যুদ্ধের ভাষা কখনোই কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান যখন পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধার ইঙ্গিত দিয়েছে, তখন থেকেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আগুন লেগেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এই সংকীর্ণ জলপথটি যদি যুদ্ধের কারণে রুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এই অনিশ্চয়তাই মূলত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক অস্থির সময়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায় যে, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকাংশেই আমদানিনির্ভর। বর্তমানে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় পুরোটাই এবং এলএনজির একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগ্রহ করি। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন ৮০ ডলার ছাড়িয়ে ১০০ ডলারের দিকে ধাবিত হয়, তখন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন একটি ঊর্ধ্বমুখী মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছে, তখন জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো কাজ করবে। তেলের দাম বাড়লে কেবল যাতায়াত খরচ বাড়ে না, বরং এর একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হয়। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের সেচ খরচ বাড়ে, ট্রাকের ভাড়া বাড়লে সবজির দাম বাড়ে এবং বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে অর্থনীতিবিদরা ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা ব্যয়-চালিত মুদ্রাস্ফীতি বলে অভিহিত করেন। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন আগে থেকেই সংকুচিত, তখন এই নতুন আপদ তাদের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।

জ্বালানি সংকটের এই মেঘ কেবল আমদানিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের রপ্তানি খাতের আকাশকেও অন্ধকার করে তুলছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জীবনীশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প। আমাদের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানি এখন লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে বিকল্প দীর্ঘ পথে যাত্রা শুরু করেছে। এর ফলে জাহাজ ভাড়া যেমন বেড়েছে, তেমনই সময়ও লাগছে অনেক বেশি। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের পরিবহন ব্যয় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন আমরা ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে আছি, তখন এই অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় আমাদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে, যা বিদেশি ক্রেতাদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। ওয়ালমার্ট বা এইচঅ্যান্ডএম-এর মতো বড় ক্রেতারা যদি ঝুঁকির আশঙ্কায় বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করে, তবে আমাদের লাখ লাখ পোশাক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকিতে পড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিকটি হলো আমাদের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং কুয়েতের মতো দেশে কর্মরত আছেন। প্রতি বছর তারা যে ২৭ থেকে ৩২ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান, তা আমাদের অর্থনীতির ফুসফুসের মতো কাজ করে। ২০২৬ সালের বাজেটে বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে এই রেমিট্যান্সের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু যুদ্ধ যখন কোনো অঞ্চলের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ে, তখন সেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নির্মাণ প্রকল্পগুলো ধীর হয়ে যায়। যদি মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়, তবে নতুন করে শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ হতে পারে এবং যারা কাজ করছেন তারা ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তেলের দাম বাড়লে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর আয় বাড়লেও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, যার ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। প্রবাসী আয়ের এই অনিশ্চয়তা আমাদের ডলার সংকটে থাকা অর্থনীতিকে আরও খাদের কিনারে নিয়ে যেতে পারে।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নে একটি নিরপেক্ষ কিন্তু স্থিতিশীলতাপন্থী অবস্থান বজায় রাখে। ইরানের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুব সামান্য হলেও, ওআইসি বা অন্যান্য মুসলিম ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের এক ধরনের নৈতিক অবস্থান রয়েছে। তবে বাংলাদেশের আসল স্বার্থ জড়িয়ে আছে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। সংঘাত যদি ছড়িয়ে পড়ে এবং লেবানন, সিরিয়া বা ইয়েমেনের মতো দেশগুলো সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে যায়, তবে পুরো অঞ্চলটি দীর্ঘস্থায়ী অশান্তির কবলে পড়বে। শরণার্থী সমস্যা থেকে শুরু করে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান- সবই বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ যদিও রণক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে, কিন্তু আধুনিক সাইবার যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ঘাত যেকোনো দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তৈরি হওয়া তেল সংকট বিশ্বকে এক ভয়াবহ মন্দার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও বাংলাদেশ তার প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশকে সরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল, যা সেই সময়কার ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বড় আঘাত হেনেছিল। ২০২৬ সালের এই সংকট আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা বিগত দশকগুলোতে জ্বালানি বহুমুখীকরণে যথেষ্ট মনোযোগ দিইনি। যদি আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা নিজেদের প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতা বেশি থাকত, তবে আজ তেহরান বা তেলআবিবের সংবাদের দিকে আমাদের এমন শঙ্কিত চোখে তাকাতে হতো না। এই সংকট থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন যে, জাতীয় নিরাপত্তাকে কেবল সীমান্ত রক্ষার গণ্ডিতে না দেখে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে হলে বাংলাদেশকে এখন থেকেই কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে একক কোনো অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজার অনুসন্ধান করতে হবে। এলএনজি আমদানির জন্য কাতার বা ওমানের বাইরেও অন্য দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, রপ্তানি বাজারে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ওপর নির্ভরশীল না থেকে এশীয় ও আফ্রিকার নতুন নতুন বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে হবে। তৃতীয়ত, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে যাতে তারা কেবল নির্মাণশ্রমিক হিসেবে নয়, বরং কারিগরি কাজে দক্ষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, যা মন্দার সময়েও তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। সর্বোপরি, দেশে নিজেদের জ্বালানি অনুসন্ধানে এবং সৌর বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে বিনিয়োগ বহুগুণ বাড়াতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত কেবল দুটি দেশের ভূ-রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, বরং এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি অর্থনৈতিক পরীক্ষা। ঢাকার কারওয়ান বাজারে কাঁচামরিচের দাম কেন বাড়ছে বা তৈরি পোশাকের কারখানায় কেন নতুন অর্ডার আসছে না- তার উত্তর অনেক সময় সুদূর তেহরানের কোনো বিস্ফোরণের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। এই অদৃশ্য সুতোর টানই হলো আধুনিক ভূ-রাজনীতির বাস্তবতা। বাংলাদেশের জন্য এই সংকট কোনো সামরিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি একটি টিকে থাকার লড়াই। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রিজার্ভের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং মুদ্রাস্ফীতির কশাঘাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করাই এখন সরকারের প্রধান কাজ হওয়া উচিত। সংকটের মেঘ যত ঘনীভূতই হোক না কেন, সঠিক কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে বাংলাদেশ এই অভিঘাত মোকাবিলা করতে পারবে- এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা। দূরের যুদ্ধের আঁচ যেন নিকটের সম্ভাবনাকে পুড়িয়ে ছারখার না করে দেয়, সেদিকেই এখন তীক্ষè নজর রাখার সময়।

[লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

back to top