alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নতুন গভর্নর অপরিহার্য ছিল

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের চতুর্দশ গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তিনি সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ৪১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রিয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন।

আস্থা আর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলে কোনো ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা যায় না। অনেকেই মনে করেন, গভর্নর মনসুর সত্য বলেছেন। কিন্তু সব সত্য বলা যায় না এবং যায় না বলেই গুরুত্বপূর্ণ পদধারীদের কিছু সত্য গোপন রাখার শপথ পড়ানো হয়

তাকে নিয়োগ দেয়ার পর গভর্নর হিসেবে তার যোগ্যতা নিয়ে চারিদিক থেকে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। গভর্নর হওয়ার জন্য কোন নির্ধারিত যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না, কী যোগ্যতা থাকলে একজন কেন্দ্রিয় ব্যাংকের গভর্নর হতে পারবেন তার কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালাও নেই। থাকা উচিতও নয়। রাষ্ট্র বা সরকার চালানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভার সদস্যদের যদি নির্ধারিত যোগ্যতার প্রয়োজন না হয়, তাহলে গভর্নর হতে লাগবে কেন ? অন্তর্বর্তী সরকার বহু আনকোরা লোককে বিদেশ থেকে ডেকে এনে সরকারে স্থান দিয়েছিল, বাসা থেকে ধরে এনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিরাট বিরাট পদে অধিষ্ঠিত করেছিল। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য দরকার নেতৃত্ব দেয়ার দৃঢ়তা এবং দাপ্তরিক কাজ চালানোর জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা। প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিজীবী জগতে নতুন গভর্নরের পরিচিতি না থাকায় নানাবিধ প্রশ্ন উঠেছে। তিনি একজন ব্যবসায়ী, আমলা বা ব্যাংকার নন। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ব্যবসায়ী আছেন যারা ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাংকিং সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ। তিনি যেহেতু আমলা নন, দাপ্তরিক কাজে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সমস্যা হতে পারে। এই ক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করার জন্য রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রায় পাঁচ হাজার দক্ষ, অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী কর্মী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিকাংশ গভর্নর ছিলেন আমলা, অর্থ মন্ত্রণালয় বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত সচিব। গভর্নরদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৃতীয় গভর্নর মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম, যিনি ১৯৭৬ সন থেকে ১৯৮৭ সন পর্যন্ত দীর্ঘ ১১ বছর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সিভিল সার্ভিস অফ পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৫০ সনে। তবে গভর্নর হিসেবে যিনি সবচেয়ে বেশি সুনাম অর্জন করেছিলেন তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বিতীয় গভর্নর এ. কে. নাজিরউদ্দীন আহমেদ। তিনি আমলা ছিলেন না, ছিলেন কয়েকটি ব্যাংকের নির্বাহী প্রধান। অবশ্য তার আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাকের প্রথম গভর্নর আ ন ম হামিদুল্লাহ এবং ষষ্ঠ গভর্নর লুৎফর রহমান সরকারও ছিলেন বাণিজ্যিক ব্যাংকের নির্বাহী প্রধান। দশম গভর্নর আতিউর রহমান ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ। বাকি সবাই ছিলেন আমলা। তৃতীয় গভর্নর মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম থেকে একাদশ গভর্নর ফজলে কবির পর্যন্ত নয় জন গভর্নরের সঙ্গে কাজ করাকালীন দেখেছি আমলা গভর্নর হলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা পাওয়া সহজ হয়।

বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের বিরুদ্ধে শুধু দক্ষতা ও জ্ঞানের কমতির অভিযোগ নয়, ঋণ খেলাপির অভিযোগও রয়েছে। তিনি নাকি কিছুদিন আগেও ঋণ খেলাপি ছিলেন, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতপশীল করে খেলাপি থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ঋণ নিলে খেলাপি হওয়া অস্বাভাবিক নয় বা অপরাধও নয়, আয়ত্তের বাইরের প্রভাবকের কারণে ঋণ বা ঋণের কিস্তি অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। হাওলাত নিয়েও আমরা বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত তারিখে তা ফেরত দিতে পারি না। কেন্দ্রিয় ব্যাংক বিষয়টি সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত বলেই ঋণের পুনঃতপশীলিকরণের ব্যবস্থা রেখেছে। আরেকটি প্রতীতি হচ্ছে, গভর্নর পদে চাকরি করতে হলে আইএমএফ, আইডিবি বা বিশ্ব ব্যাংকে চাকরি করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আইএমএফ-এ গভর্নর আহসান এইচ মনসুরও কাজ করেছেন, তাতে দেশের কী লাভ হলো, ব্যাংক ও দেশের অর্থনীতিকে তিনি ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন।

আইএমএফ খ্যাত আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হয়েই দিল্লীর সুলতান মুহাম্মদ বিন তুগলকের মতো উদ্ভট আচরণ শুরু করে দেন। তিনি গভর্নর হয়েই আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে তপশীলি ব্যাংকগুলোকে সবুজ, হলুদ, লাল রঙে ভাগ করে জনগণকে ডাক দিয়ে বলতে থাকেন, লাল রঙের ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে গেছে। তার এমন কথা শুনে আমানতকারীরা তাদের জমা টাকা তোলার জন্য গভর্নর কর্তৃক চিহ্নিত ‘লাল’ রঙের ব্যাংকগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, একই সময়ে শত শত লোকের চেকের টাকা পরিশোধ করতে ব্যাংকগুলো ব্যর্থ হয়। শুরু হয় হৈচৈ, প্রতিটি ব্যাংক শাখার সম্মুখে আমানতকারীদের ভিড়, ব্যাংক শাখা বাধ্য হলো দরজা বন্ধ করতে। শুধু ব্যাংক শাখায় নয়, রাস্তায়ও ব্যাংকের লোকজন আমানতকারীদের দেখলে মুখ লুকাতো। অনেক শাখা ব্যবস্থাপক দরজা বন্ধ করে অসহায় হয়ে কেঁদেছে, কেঁদে কেঁদে গভর্নর মনসুরকে অভিশাপ দিয়েছেন। হঠাৎ সব আমানত তোলার হিড়িক পড়লে পৃথিবীর কোনো শক্তিশালী ব্যাংকও চেকের টাকা পরিশোধ করতে সমর্থ হয় না।

কয়েকটি ব্যাংককে দেউলিয়া ঘোষণার আগে আহসান এইচ মনসুর ভুলে গিয়েছিলেন যে, তিনি কেন্দ্রিয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তপশীলি ব্যাংকগুলোরও অভিভাবক এবং আমানতকারীদের নির্ভরযোগ্য ভরসাস্থল। ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া ঘোষণার পূর্বে আমানতও এসেছে, চেকের টাকাও পরিশোধ হয়েছে। গভর্নর মনসুর এখানে থেমে যাননি, তার অপরিণামদর্শী ও হঠকারী বক্তব্য চলতেই থাকে। তিনি ঘোষণা দেন যে, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক টাকাও দেবেন না। এই কথায় আমানতকারীরা আরও বেশি ভীত হয়ে পড়ে, তারা বুঝতে পারে যে, ব্যাংকগুলোর কোন দায় বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে না। গভর্নর মনসুর জনগণের আস্থায় ধস নামিয়ে দিয়েছিলেন, তার অবিবেচক কথায় ব্যাংকিং সেক্টরে সুনামি নেমে এসেছিল। তার প্রতিদিনের বিচারবুদ্ধিহীন বক্তব্য থেকে প্রতিপন্ন হতো, এসআলম ব্যাংকগুলো থেকে বস্তায় ভরে সব টাকা নিয়ে চলে গেছে। তার এমন অপরিশীলিত বক্তব্যে আমানতকারীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

আওয়ামী লীগ আমলেও কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট ছিল, কিন্তু তা বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ থেকে আমানতকারীদের বুঝতে দেয়া হয়নি, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ দিয়ে ব্যাংকগুলোর তারল্য সঙ্কট মোকাবিলা করা হয়েছে। কিন্তু গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ইউটিউবারের মতো উদ্ভট কথা বলতেই থাকলেন। তিনি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকগুলো থেকে টাকা ধার নিতে পরামর্শ দিলেন। প্রজ্ঞাবান গভর্নর বুঝলেন না যে, যে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ দেয় না, সেই ব্যাংকগুলোকে অন্য ব্যাংকও ঋণ দেবে না। এত ক্যারিকেচার না করে তিনি যদি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর তারল্য সঙ্কটে ঋণ দেয়ার কথা বলতেন, তাহলে আমানতকারীদের আস্থা নষ্ট হতো না, সবাই একযোগে টাকা তোলার জন্য ভিড় করতো না, ব্যাংকগুলোও অস্তিত্বহীন হয়ে যেত না। গভর্নরের এই ঋণ প্রদান কোন দয়া নয়, তপশীলি ব্যাংকের তারল্য সঙ্কটে ঋণ দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ। আহসান এইচ মনসুর যখন তার ভুল বুঝতে পারলেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, পরে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢেলেও ব্যাংকগুলোকে আর বাঁচানো যায়নি। আস্থা আর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলে কোনো ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা যায় না। অনেকেই মনে করেন, গভর্নর মনসুর সত্য বলেছেন। কিন্তু সব সত্য বলা যায় না এবং যায় না বলেই গুরুত্বপূর্ণ পদধারীদের কিছু সত্য গোপন রাখার শপথ পড়ানো হয়।

গভর্নর মনসুর দেশের অর্থনীতিরও ধ্বংস করেছেন। পলাতক ও জেলে থাকা অনেক ব্যবসায়ীর পূর্বানুমোদিত ঋণের যোগান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, চলতি মূলধনের অভাবে বেক্সিমকোসহ শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে শুধু হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েনি, হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ হয়েছে খেলাপি। খেলাপি ঋণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক সিদ্ধান্ত। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার ১০ শতাংশের নিচে নামাতে গভর্নর মনসুর রাজি না হওয়ায় অধিক সুদে ঋণ নিয়ে কেউ বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়নি। গভর্নর সুদহার অতিরিক্ত বৃদ্ধি করে টাকাকে ডলারের চেয়েও দামি করে মূল্যস্ফীতি ৪-৫ শতাংশে কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা তিনি পারেননি, এখনও মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের কাছাকাছি। সুদহার অতিরিক্ত রেখেও মূল্যস্ফীতি কমাতে পারলেন না, অথচ সংকুচিত হলো বিনিয়োগ আর ক্রয়ক্ষমতা। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- ও কর্মসংস্থানও সংকুচিত হয়েছে, বেড়েছে বেকার সংখ্যা। ডাক বিভাগাধীন মোবাইল আর্থিক পরিষেবা ‘নগদ’কে ধ্বংস করেছেন গভর্নর মনসুর। কী আক্রোশে তিনি একটি সম্ভাবনাময় কোম্পানিটি ধ্বংস করার উদ্যোগ নিলেন তা পরিষ্কার হওয়া দরকার। তার অবিমৃষ্যকারী সিদ্ধান্তে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোকে নিয়ে একীভূত ব্যাংক করা হলো, কিন্তু এক্ষেত্রেও তার সততা ছিল না। বস্তুনিষ্ঠ বিবেচনার স্থলে তার আত্মবাদী বিবেচনায় অধিকতর দুর্বল ব্যাংককে একীভূত না করে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে।

শিল্প খাতে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ সুদহারের কারণে শেয়ার বাজারেও ধস নেমেছে। শেয়ার বাজার থেকে শিল্প উদ্যোক্তাদের মূলধন সংগ্রহের পথও তিনি রুদ্ধ করে দেন, শেয়ারে বিনিয়োগ করে হাজার হাজার লোক এখন কপর্দকশূন্য। আহসান এইচ মনসুর গবেষক, গবেষণার তত্ত্ব আর তত্ত্বের বাস্তবায়ন এক কথা নয়।দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকের যে করুণ অবস্থা তৈরি হয়েছে, তার থেকে উত্তরণের জন্য একজন নতুন গভর্নরের দরকার ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসার্স কাউন্সিলসহ সর্বস্তরের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের বাহবা দিতে হয়, তাদের বুদ্ধিদীপ্ত সচেতনতায় ব্যাংক ও দেশের অর্থনীতির আরও অধিকতর অবনমন থেকে রক্ষা পেয়েছে। নতুন গভর্নর কাজে যোগ দিয়েই বন্ধ কলকারখানা আবার চালুর করার আশ্বাস দিয়েছেন, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধক উচ্চ সুদহার পর্যালোচনাপূর্বক পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, শুধু এই দুটি ব্যবস্থা নেয়া হলেই অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বহির্ভূত ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করতে হবে, রাজনৈতিক চাপ এলে তা তাকে জানাতে হবে। নতুন গভর্নরের আরেকটি আশাপ্রদ খবর হচ্ছে, তিনি গণমাধ্যমে বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে সংযমী থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন। এই সব ঘোষণায় ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট কেটে যাবে।

পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি খুব বেশি বড় নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্বও অপেক্ষাকৃত কম। তাই বাংলাদেশের কেন্দ্রিয় ব্যাংকের গভর্নরের জ্ঞান-গরিমা দ্বারা বিশ্ব অর্থনীতি প্রভাবিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান-পতনে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রভাবিত হয় বিধায় বিশ্ব অর্থনীতির ওপর আমাদের গভর্নরেরও হালনাগাদ জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। অর্থনীতির তাত্ত্বিক, গবেষক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে কাজ করার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বেসরকারি খাতের বিকাশ রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নতুন গভর্নর নিয়োগ দিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নতুন গভর্নরকে নিয়ে আতঙ্কিত বুদ্ধিজীবীদের হাহুতাশ করার কিছু নেই, কারণ আগের মহাপণ্ডিত গভর্নরের চেয়ে খারাপ কিছু করার সুযোগ খুব বেশি আর নেই। মুদ্রা ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় শুধু জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকলে হয় না, প্রজ্ঞারও প্রয়োজন হয়, গভর্নর মনসুরের জ্ঞান থাকলেও প্রজ্ঞা ছিল না।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আন্তর্জাতিক নারী দিবস

বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা

উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের বিবাহের রীতি ও প্রথা

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদ: বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কী?

না হয় রহিতে কাছে!

আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ভূমি কমিশন কেন জরুরি?

উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির চিত্র

জোর যার, মুল্লুক তার: সাম্রাজ্যের নতুন পোশাক

‘পানিয়ালীর পোলার বইমেলা’

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

ইরান ইস্যুতে মহাশক্তির পরীক্ষা

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নতুন গভর্নর অপরিহার্য ছিল

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের চতুর্দশ গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তিনি সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ৪১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রিয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন।

আস্থা আর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলে কোনো ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা যায় না। অনেকেই মনে করেন, গভর্নর মনসুর সত্য বলেছেন। কিন্তু সব সত্য বলা যায় না এবং যায় না বলেই গুরুত্বপূর্ণ পদধারীদের কিছু সত্য গোপন রাখার শপথ পড়ানো হয়

তাকে নিয়োগ দেয়ার পর গভর্নর হিসেবে তার যোগ্যতা নিয়ে চারিদিক থেকে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। গভর্নর হওয়ার জন্য কোন নির্ধারিত যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না, কী যোগ্যতা থাকলে একজন কেন্দ্রিয় ব্যাংকের গভর্নর হতে পারবেন তার কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালাও নেই। থাকা উচিতও নয়। রাষ্ট্র বা সরকার চালানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভার সদস্যদের যদি নির্ধারিত যোগ্যতার প্রয়োজন না হয়, তাহলে গভর্নর হতে লাগবে কেন ? অন্তর্বর্তী সরকার বহু আনকোরা লোককে বিদেশ থেকে ডেকে এনে সরকারে স্থান দিয়েছিল, বাসা থেকে ধরে এনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিরাট বিরাট পদে অধিষ্ঠিত করেছিল। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য দরকার নেতৃত্ব দেয়ার দৃঢ়তা এবং দাপ্তরিক কাজ চালানোর জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা। প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিজীবী জগতে নতুন গভর্নরের পরিচিতি না থাকায় নানাবিধ প্রশ্ন উঠেছে। তিনি একজন ব্যবসায়ী, আমলা বা ব্যাংকার নন। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ব্যবসায়ী আছেন যারা ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাংকিং সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ। তিনি যেহেতু আমলা নন, দাপ্তরিক কাজে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সমস্যা হতে পারে। এই ক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করার জন্য রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রায় পাঁচ হাজার দক্ষ, অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী কর্মী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিকাংশ গভর্নর ছিলেন আমলা, অর্থ মন্ত্রণালয় বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত সচিব। গভর্নরদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৃতীয় গভর্নর মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম, যিনি ১৯৭৬ সন থেকে ১৯৮৭ সন পর্যন্ত দীর্ঘ ১১ বছর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সিভিল সার্ভিস অফ পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৫০ সনে। তবে গভর্নর হিসেবে যিনি সবচেয়ে বেশি সুনাম অর্জন করেছিলেন তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বিতীয় গভর্নর এ. কে. নাজিরউদ্দীন আহমেদ। তিনি আমলা ছিলেন না, ছিলেন কয়েকটি ব্যাংকের নির্বাহী প্রধান। অবশ্য তার আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাকের প্রথম গভর্নর আ ন ম হামিদুল্লাহ এবং ষষ্ঠ গভর্নর লুৎফর রহমান সরকারও ছিলেন বাণিজ্যিক ব্যাংকের নির্বাহী প্রধান। দশম গভর্নর আতিউর রহমান ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ। বাকি সবাই ছিলেন আমলা। তৃতীয় গভর্নর মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম থেকে একাদশ গভর্নর ফজলে কবির পর্যন্ত নয় জন গভর্নরের সঙ্গে কাজ করাকালীন দেখেছি আমলা গভর্নর হলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা পাওয়া সহজ হয়।

বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের বিরুদ্ধে শুধু দক্ষতা ও জ্ঞানের কমতির অভিযোগ নয়, ঋণ খেলাপির অভিযোগও রয়েছে। তিনি নাকি কিছুদিন আগেও ঋণ খেলাপি ছিলেন, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতপশীল করে খেলাপি থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ঋণ নিলে খেলাপি হওয়া অস্বাভাবিক নয় বা অপরাধও নয়, আয়ত্তের বাইরের প্রভাবকের কারণে ঋণ বা ঋণের কিস্তি অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। হাওলাত নিয়েও আমরা বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত তারিখে তা ফেরত দিতে পারি না। কেন্দ্রিয় ব্যাংক বিষয়টি সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত বলেই ঋণের পুনঃতপশীলিকরণের ব্যবস্থা রেখেছে। আরেকটি প্রতীতি হচ্ছে, গভর্নর পদে চাকরি করতে হলে আইএমএফ, আইডিবি বা বিশ্ব ব্যাংকে চাকরি করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আইএমএফ-এ গভর্নর আহসান এইচ মনসুরও কাজ করেছেন, তাতে দেশের কী লাভ হলো, ব্যাংক ও দেশের অর্থনীতিকে তিনি ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন।

আইএমএফ খ্যাত আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হয়েই দিল্লীর সুলতান মুহাম্মদ বিন তুগলকের মতো উদ্ভট আচরণ শুরু করে দেন। তিনি গভর্নর হয়েই আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে তপশীলি ব্যাংকগুলোকে সবুজ, হলুদ, লাল রঙে ভাগ করে জনগণকে ডাক দিয়ে বলতে থাকেন, লাল রঙের ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে গেছে। তার এমন কথা শুনে আমানতকারীরা তাদের জমা টাকা তোলার জন্য গভর্নর কর্তৃক চিহ্নিত ‘লাল’ রঙের ব্যাংকগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, একই সময়ে শত শত লোকের চেকের টাকা পরিশোধ করতে ব্যাংকগুলো ব্যর্থ হয়। শুরু হয় হৈচৈ, প্রতিটি ব্যাংক শাখার সম্মুখে আমানতকারীদের ভিড়, ব্যাংক শাখা বাধ্য হলো দরজা বন্ধ করতে। শুধু ব্যাংক শাখায় নয়, রাস্তায়ও ব্যাংকের লোকজন আমানতকারীদের দেখলে মুখ লুকাতো। অনেক শাখা ব্যবস্থাপক দরজা বন্ধ করে অসহায় হয়ে কেঁদেছে, কেঁদে কেঁদে গভর্নর মনসুরকে অভিশাপ দিয়েছেন। হঠাৎ সব আমানত তোলার হিড়িক পড়লে পৃথিবীর কোনো শক্তিশালী ব্যাংকও চেকের টাকা পরিশোধ করতে সমর্থ হয় না।

কয়েকটি ব্যাংককে দেউলিয়া ঘোষণার আগে আহসান এইচ মনসুর ভুলে গিয়েছিলেন যে, তিনি কেন্দ্রিয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তপশীলি ব্যাংকগুলোরও অভিভাবক এবং আমানতকারীদের নির্ভরযোগ্য ভরসাস্থল। ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া ঘোষণার পূর্বে আমানতও এসেছে, চেকের টাকাও পরিশোধ হয়েছে। গভর্নর মনসুর এখানে থেমে যাননি, তার অপরিণামদর্শী ও হঠকারী বক্তব্য চলতেই থাকে। তিনি ঘোষণা দেন যে, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক টাকাও দেবেন না। এই কথায় আমানতকারীরা আরও বেশি ভীত হয়ে পড়ে, তারা বুঝতে পারে যে, ব্যাংকগুলোর কোন দায় বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে না। গভর্নর মনসুর জনগণের আস্থায় ধস নামিয়ে দিয়েছিলেন, তার অবিবেচক কথায় ব্যাংকিং সেক্টরে সুনামি নেমে এসেছিল। তার প্রতিদিনের বিচারবুদ্ধিহীন বক্তব্য থেকে প্রতিপন্ন হতো, এসআলম ব্যাংকগুলো থেকে বস্তায় ভরে সব টাকা নিয়ে চলে গেছে। তার এমন অপরিশীলিত বক্তব্যে আমানতকারীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

আওয়ামী লীগ আমলেও কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট ছিল, কিন্তু তা বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ থেকে আমানতকারীদের বুঝতে দেয়া হয়নি, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ দিয়ে ব্যাংকগুলোর তারল্য সঙ্কট মোকাবিলা করা হয়েছে। কিন্তু গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ইউটিউবারের মতো উদ্ভট কথা বলতেই থাকলেন। তিনি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকগুলো থেকে টাকা ধার নিতে পরামর্শ দিলেন। প্রজ্ঞাবান গভর্নর বুঝলেন না যে, যে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ দেয় না, সেই ব্যাংকগুলোকে অন্য ব্যাংকও ঋণ দেবে না। এত ক্যারিকেচার না করে তিনি যদি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর তারল্য সঙ্কটে ঋণ দেয়ার কথা বলতেন, তাহলে আমানতকারীদের আস্থা নষ্ট হতো না, সবাই একযোগে টাকা তোলার জন্য ভিড় করতো না, ব্যাংকগুলোও অস্তিত্বহীন হয়ে যেত না। গভর্নরের এই ঋণ প্রদান কোন দয়া নয়, তপশীলি ব্যাংকের তারল্য সঙ্কটে ঋণ দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ। আহসান এইচ মনসুর যখন তার ভুল বুঝতে পারলেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, পরে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢেলেও ব্যাংকগুলোকে আর বাঁচানো যায়নি। আস্থা আর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলে কোনো ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা যায় না। অনেকেই মনে করেন, গভর্নর মনসুর সত্য বলেছেন। কিন্তু সব সত্য বলা যায় না এবং যায় না বলেই গুরুত্বপূর্ণ পদধারীদের কিছু সত্য গোপন রাখার শপথ পড়ানো হয়।

গভর্নর মনসুর দেশের অর্থনীতিরও ধ্বংস করেছেন। পলাতক ও জেলে থাকা অনেক ব্যবসায়ীর পূর্বানুমোদিত ঋণের যোগান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, চলতি মূলধনের অভাবে বেক্সিমকোসহ শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে শুধু হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েনি, হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ হয়েছে খেলাপি। খেলাপি ঋণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক সিদ্ধান্ত। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার ১০ শতাংশের নিচে নামাতে গভর্নর মনসুর রাজি না হওয়ায় অধিক সুদে ঋণ নিয়ে কেউ বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়নি। গভর্নর সুদহার অতিরিক্ত বৃদ্ধি করে টাকাকে ডলারের চেয়েও দামি করে মূল্যস্ফীতি ৪-৫ শতাংশে কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা তিনি পারেননি, এখনও মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের কাছাকাছি। সুদহার অতিরিক্ত রেখেও মূল্যস্ফীতি কমাতে পারলেন না, অথচ সংকুচিত হলো বিনিয়োগ আর ক্রয়ক্ষমতা। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- ও কর্মসংস্থানও সংকুচিত হয়েছে, বেড়েছে বেকার সংখ্যা। ডাক বিভাগাধীন মোবাইল আর্থিক পরিষেবা ‘নগদ’কে ধ্বংস করেছেন গভর্নর মনসুর। কী আক্রোশে তিনি একটি সম্ভাবনাময় কোম্পানিটি ধ্বংস করার উদ্যোগ নিলেন তা পরিষ্কার হওয়া দরকার। তার অবিমৃষ্যকারী সিদ্ধান্তে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোকে নিয়ে একীভূত ব্যাংক করা হলো, কিন্তু এক্ষেত্রেও তার সততা ছিল না। বস্তুনিষ্ঠ বিবেচনার স্থলে তার আত্মবাদী বিবেচনায় অধিকতর দুর্বল ব্যাংককে একীভূত না করে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে।

শিল্প খাতে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ সুদহারের কারণে শেয়ার বাজারেও ধস নেমেছে। শেয়ার বাজার থেকে শিল্প উদ্যোক্তাদের মূলধন সংগ্রহের পথও তিনি রুদ্ধ করে দেন, শেয়ারে বিনিয়োগ করে হাজার হাজার লোক এখন কপর্দকশূন্য। আহসান এইচ মনসুর গবেষক, গবেষণার তত্ত্ব আর তত্ত্বের বাস্তবায়ন এক কথা নয়।দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকের যে করুণ অবস্থা তৈরি হয়েছে, তার থেকে উত্তরণের জন্য একজন নতুন গভর্নরের দরকার ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসার্স কাউন্সিলসহ সর্বস্তরের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের বাহবা দিতে হয়, তাদের বুদ্ধিদীপ্ত সচেতনতায় ব্যাংক ও দেশের অর্থনীতির আরও অধিকতর অবনমন থেকে রক্ষা পেয়েছে। নতুন গভর্নর কাজে যোগ দিয়েই বন্ধ কলকারখানা আবার চালুর করার আশ্বাস দিয়েছেন, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধক উচ্চ সুদহার পর্যালোচনাপূর্বক পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, শুধু এই দুটি ব্যবস্থা নেয়া হলেই অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বহির্ভূত ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করতে হবে, রাজনৈতিক চাপ এলে তা তাকে জানাতে হবে। নতুন গভর্নরের আরেকটি আশাপ্রদ খবর হচ্ছে, তিনি গণমাধ্যমে বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে সংযমী থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন। এই সব ঘোষণায় ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট কেটে যাবে।

পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি খুব বেশি বড় নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্বও অপেক্ষাকৃত কম। তাই বাংলাদেশের কেন্দ্রিয় ব্যাংকের গভর্নরের জ্ঞান-গরিমা দ্বারা বিশ্ব অর্থনীতি প্রভাবিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান-পতনে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রভাবিত হয় বিধায় বিশ্ব অর্থনীতির ওপর আমাদের গভর্নরেরও হালনাগাদ জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। অর্থনীতির তাত্ত্বিক, গবেষক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে কাজ করার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বেসরকারি খাতের বিকাশ রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নতুন গভর্নর নিয়োগ দিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নতুন গভর্নরকে নিয়ে আতঙ্কিত বুদ্ধিজীবীদের হাহুতাশ করার কিছু নেই, কারণ আগের মহাপণ্ডিত গভর্নরের চেয়ে খারাপ কিছু করার সুযোগ খুব বেশি আর নেই। মুদ্রা ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় শুধু জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকলে হয় না, প্রজ্ঞারও প্রয়োজন হয়, গভর্নর মনসুরের জ্ঞান থাকলেও প্রজ্ঞা ছিল না।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

back to top