ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়, উন্নয়নের অগ্রগতি সত্ত্বেও দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা একটি বড় সমস্যা। জনসেবার মান উন্নয়ন, সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং নীতিনির্ধারণে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। উদাহরণস্বরূপ, অবকাঠামো উন্নয়নে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয়ের অতিরিক্ততা প্রায়ই আলোচিত হয়। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে তাই কেবল উন্নয়ন প্রকল্প ঘোষণা নয়, বরং কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল স্বচ্ছতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ই-গভর্ন্যান্স, ওপেন ডাটা প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক নিরীক্ষা প্রক্রিয়া চালু করা বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে।
গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের আরেকটি বড় দায়িত্ব। নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদের কার্যকারিতা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সক্ষমতা-এসবই গণতন্ত্রের স্তম্ভ। যদি এসব প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবমুক্ত ও দক্ষভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে রাজনৈতিক আস্থা কমে যায়। নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রতি আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। স্বচ্ছ নির্বাচন, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে তোলে। একই সঙ্গে সংসদে কার্যকর বিতর্ক, আইন প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ মতামত এবং জনমতের প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা উচিত। যদিও সামগ্রিক দারিদ্র?্য হার কমেছে, আয় বৈষম্য এখনও একটি বাস্তবতা। শহর ও গ্রামের উন্নয়নের ব্যবধান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-এসব বিষয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে অভিযোজন ও টেকসই উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, সবুজ জ্বালানি ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পনীতি গ্রহণ করা সময়ের দাবি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব।
এটা ঠিক যে নব্বইয়ের দশক থেকে আমাদের গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা কখনোই সুখকর ছিল না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং চর্চা অভ্যন্তরীণ দলীয় কাঠামো বা দেশ পরিচালনায় কখনোই ছিল না। সব রাজনৈতিক নেতৃত্বই চেয়েছে নির্বাচিত হয়ে এক নায়কের মতোই দেশ চালাতে। নব্বইয়ের পর থেকে আমরা লক্ষ করি যে একের পর এক পর্যায়ক্রমিক নির্বাচিত সরকার কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে চলেছে। যার পরিণতি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো এখন মোটামুটি ধূলিসাৎ। কিন্তু গণতন্ত্র উপেক্ষা করে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিক বা রাতারাতি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে-এ রকম স্বপ্ন দেখানোটাও কতটুকু বাস্তবসম্মত, সেটাও চিন্তার বিষয়। পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস, সভ্যতা ও সংস্কৃতি দক্ষিণ এশিয়ার থেকে অনেক ক্ষেত্রেই অন্য রকম। এছাড়া যারা বাংলাদেশে এই মডেলের প্রবক্তা, তারা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা ভুলে যায়, সেটা হলো যে পূর্ব এশিয়ার এই সব দেশে হয়তো নির্বাচনমুখী, বহুদলীয় গণতন্ত্র ছিল না। কিন্তু সেই সব দেশে আইনের শাসন, ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সম্পদের সুরক্ষা-সবই নিশ্চিত করা হয়েছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো ছাড়া এই সব নির্বাচনমুখী গণতন্ত্র অর্থহীন এবং মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের উদাহরণ টানাটাও অনেকখানিই অবাস্তব।
উন্নত বিশ্বে নেতৃত্ব বিকাশ একটি সমন্বিত, বহুমাত্রিক এবং মূল্যবোধ-নির্ভর কৌশল। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ, উচ্চমানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ব্যবহার, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, বৈচিত্র্যও অন্তর্ভুক্তি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি-এসব উপাদান একত্রে একটি কার্যকর নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তোলে। যে দেশগুলো উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে চায়, তাদের উচিত এই কৌশলগুলো নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে অভিযোজিত করা। কারণ কার্যকর নেতৃত্বই একটি জাতিকে স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কিংবা মৌলিক বদলের পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। নেতৃত্ব হতে হবে এমন, যা দলকে ছাপিয়ে দেশের স্বার্থ বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছি, যা বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে রূপান্তরিত করতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, কেবল ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্ব নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিনির্ভর নেতৃত্ব গড়ে তোলা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা, তরুণ ও নারীদের নেতৃত্বে সুযোগ প্রদান, এবং নীতি-ভিত্তিক রাজনীতিকে উৎসাহিত করা। নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে-তারা সচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণা ও নীতিগত বিতর্কের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতি উন্নত করতে পারে। সর্বশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন এক নেতৃত্বের ওপর, যারা সততা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতার সমন্বয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে সক্ষম। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ-এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই টেকসই গণতন্ত্র গড়ে উঠতে পারে। এখনই সময় দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে-সঠিক তথ্য যাচাই করা, নীতি-ভিত্তিক আলোচনা উৎসাহিত করা এবং যোগ্য নেতৃত্বকে সমর্থন করা। একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ইতিবাচক রূপান্তরই হতে পারে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।
[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ
শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়, উন্নয়নের অগ্রগতি সত্ত্বেও দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা একটি বড় সমস্যা। জনসেবার মান উন্নয়ন, সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং নীতিনির্ধারণে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। উদাহরণস্বরূপ, অবকাঠামো উন্নয়নে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয়ের অতিরিক্ততা প্রায়ই আলোচিত হয়। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে তাই কেবল উন্নয়ন প্রকল্প ঘোষণা নয়, বরং কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল স্বচ্ছতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ই-গভর্ন্যান্স, ওপেন ডাটা প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক নিরীক্ষা প্রক্রিয়া চালু করা বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে।
গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের আরেকটি বড় দায়িত্ব। নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদের কার্যকারিতা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সক্ষমতা-এসবই গণতন্ত্রের স্তম্ভ। যদি এসব প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবমুক্ত ও দক্ষভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে রাজনৈতিক আস্থা কমে যায়। নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রতি আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। স্বচ্ছ নির্বাচন, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে তোলে। একই সঙ্গে সংসদে কার্যকর বিতর্ক, আইন প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ মতামত এবং জনমতের প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা উচিত। যদিও সামগ্রিক দারিদ্র?্য হার কমেছে, আয় বৈষম্য এখনও একটি বাস্তবতা। শহর ও গ্রামের উন্নয়নের ব্যবধান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-এসব বিষয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে অভিযোজন ও টেকসই উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, সবুজ জ্বালানি ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পনীতি গ্রহণ করা সময়ের দাবি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব।
এটা ঠিক যে নব্বইয়ের দশক থেকে আমাদের গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা কখনোই সুখকর ছিল না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং চর্চা অভ্যন্তরীণ দলীয় কাঠামো বা দেশ পরিচালনায় কখনোই ছিল না। সব রাজনৈতিক নেতৃত্বই চেয়েছে নির্বাচিত হয়ে এক নায়কের মতোই দেশ চালাতে। নব্বইয়ের পর থেকে আমরা লক্ষ করি যে একের পর এক পর্যায়ক্রমিক নির্বাচিত সরকার কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে চলেছে। যার পরিণতি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো এখন মোটামুটি ধূলিসাৎ। কিন্তু গণতন্ত্র উপেক্ষা করে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিক বা রাতারাতি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে-এ রকম স্বপ্ন দেখানোটাও কতটুকু বাস্তবসম্মত, সেটাও চিন্তার বিষয়। পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস, সভ্যতা ও সংস্কৃতি দক্ষিণ এশিয়ার থেকে অনেক ক্ষেত্রেই অন্য রকম। এছাড়া যারা বাংলাদেশে এই মডেলের প্রবক্তা, তারা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা ভুলে যায়, সেটা হলো যে পূর্ব এশিয়ার এই সব দেশে হয়তো নির্বাচনমুখী, বহুদলীয় গণতন্ত্র ছিল না। কিন্তু সেই সব দেশে আইনের শাসন, ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সম্পদের সুরক্ষা-সবই নিশ্চিত করা হয়েছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো ছাড়া এই সব নির্বাচনমুখী গণতন্ত্র অর্থহীন এবং মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের উদাহরণ টানাটাও অনেকখানিই অবাস্তব।
উন্নত বিশ্বে নেতৃত্ব বিকাশ একটি সমন্বিত, বহুমাত্রিক এবং মূল্যবোধ-নির্ভর কৌশল। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ, উচ্চমানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ব্যবহার, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, বৈচিত্র্যও অন্তর্ভুক্তি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি-এসব উপাদান একত্রে একটি কার্যকর নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তোলে। যে দেশগুলো উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে চায়, তাদের উচিত এই কৌশলগুলো নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে অভিযোজিত করা। কারণ কার্যকর নেতৃত্বই একটি জাতিকে স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কিংবা মৌলিক বদলের পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। নেতৃত্ব হতে হবে এমন, যা দলকে ছাপিয়ে দেশের স্বার্থ বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছি, যা বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে রূপান্তরিত করতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, কেবল ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্ব নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিনির্ভর নেতৃত্ব গড়ে তোলা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা, তরুণ ও নারীদের নেতৃত্বে সুযোগ প্রদান, এবং নীতি-ভিত্তিক রাজনীতিকে উৎসাহিত করা। নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে-তারা সচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণা ও নীতিগত বিতর্কের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতি উন্নত করতে পারে। সর্বশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন এক নেতৃত্বের ওপর, যারা সততা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতার সমন্বয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে সক্ষম। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ-এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই টেকসই গণতন্ত্র গড়ে উঠতে পারে। এখনই সময় দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে-সঠিক তথ্য যাচাই করা, নীতি-ভিত্তিক আলোচনা উৎসাহিত করা এবং যোগ্য নেতৃত্বকে সমর্থন করা। একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ইতিবাচক রূপান্তরই হতে পারে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।
[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]