শেখর ভট্টাচার্য
মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আয়োজিত একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল ২০১৭ সালে। মাত্র এগারটি বাঙালি পরিবার সেখানে বসবাস করে। রাজধানী উলানবাটরের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করলেও তারা একই পরিবারের মতো সেখানে বসবাস করছেন। সুবর্ণ পলির মানুষরা মঙ্গোলিয়ায় কিংবা কোস্টারিকায় বসবাস করলেও সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাসের মধ্যেই তারা আনন্দ খুঁজে পান। উলানবাটরে যারা বসবাস করেন তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পেরেছি নববর্ষ থেকে শুরু করে সমস্ত জাতীয় ও বাঙালির লোকজ অনুষ্ঠানগুলো তারা উৎসবমূখর পরিবেশে উদযাপন করে থাকেন। এসব কথা বলার উদ্দেশ্য হলো জাতি হিসেবে বাঙালি বৈচিত্র পিয়াসী, আনন্দ প্রিয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজে বসবাস করতে যে পছন্দ করেন এ কথাটি পাঠকের সামনে তুলে ধরা।
নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক প্রভাবে বাঙালি উদার, কোমল স্বভাবের আবেগপ্রবণ জাতি। উদার ও কোমল স্বভাবের মূলে রয়েছে হাজার বছরের মিশ্র সংস্কৃতি, ভৌগোলিক অবস্থান, এবং কৃষিভিত্তিক জীবনধারা। সুবর্ণ পলিমাটি দিয়ে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশ, বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর (অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আর্য, মঙ্গোলীয়) সংমিশ্রণ, উদারপন্থী সুফি ও বৈষ্ণব দর্শনের প্রভাব, সমাজবদ্ধ হয়ে মিলে মিশে বসবাস করার এই প্রবণতা সৃষ্টি করে। এ কারণেই বাঙালি কোমল, আন্তরিক ও সামাজিক মানুষ হিসেবে বসবাস করতে পছন্দ করে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সুশীলসমাজের প্রতিনিধি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা সাম্প্রতিক কালে আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলার সময় খেয়াল রাখেন না বাঙালি যে প্রকৃতিদত্তভাবেই অন্তর্ভুক্তি প্রবণ। অন্তর্ভুক্তি যদি রাষ্ট্রকাঠামোয় বিবেচনা করা হয় সেটি ভিন্ন কথা। বাঙালির সমাজ কাঠামোয় সব শ্রেণীপেশার মানুষরা চিরকাল অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রশ্ন হতে পারে সবার অন্তর্ভুক্তি কী সমস্ত অধিকারকে নিশ্চিত করতে সক্ষম। এই আলোচনা ভিন্ন ভাবে, ভিন্ন সময়ে হতে পারে তবে বাঙালি জন-সমাজের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে সমাজ গঠন।
বাঙালির আচরণের সংস্কৃতি, ভাবাবেগ প্রকাশের ধরন কখনও উগ্র ছিল না। প্রতিহিংসা পরায়ণ, উত্তেজনায় টগবগ করা কিছু বাঙালিকে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় কয়েকটি শহরে। তাদের সংখ্যা যে খুব বেশি তা বলা যাবেনা। বিত্ত, বৈভব, ক্ষমতার জোরে তারা সামজিক এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রভাব ফেলতে পারেন। তাদের কিছুটা নিষ্ঠুর কর্মকান্ড দেখে সাধারণ মানুষ ভীত হয়। সমাজে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি চেপে বসে। ভয়ের সংস্কৃতিকে সমাজে গভীর ভাবে প্রোথিত করা মানুষের কর্মকান্ড দিয়ে খুব দ্রুত এই উপসংহারে পৌঁছানো উচিত হবেনা যে বাঙালি একটি উগ্র, প্রতিহিংসা পরায়ণ জাতি। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে জাতি সমাজের বৈশিষ্ঠ বহন করা মানুষরা কিন্তু শুধুমাত্র ঢাকার বিভিন্ন চত্বর, শিক্ষাঙ্গণ, শিল্পকলা চর্চার জায়গাগুলোতে বসবাস করেন না। উল্লেখিত স্থানগুলোতে যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করে যাচ্ছেন তারা মূলত জাতির খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ।
চৈত্রের দাবদাহ কিংবা ভাদ্র, আশ্বিনের বিরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশকে মোকাবিলা করে যারা সারা বছরের ধান উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখার নিরলস চেষ্টা করে যান তারাই আসলে এই জাতি রাষ্ট্রের মূল ধারার মানুষ। এছাড়াও বিভিন্ন ঋতুর অস্বাভাবিক এবং নেতিবাচক প্রভাবকে জয় করে, ফোটা ফোটা ঘাম ঝরিয়ে বিস্তীর্ণ চর, হাওর, পাহাড় এবং উপকুলের পার্শবর্তী অঞ্চলে ধ্যানমগ্ন হয়ে শ্রম দান করে খাদ্য শস্যের যোগানকে স্বাভাবিক রাখেন তাদের সততা, শ্রম, নিবেদন, দেশের প্রতি ভালোবাসা হলো আমাদের এ জাতির জাতীয় চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট।
উপমহাদেশের অন্যান্য জাতির জাতীয় চরিত্র এবং আচরণের সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের এ বদ্বীপের মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ঠের ভিন্নতা না বুঝতে পারলে বাঙালিকে উগ্র মতবাদে বিশ্বাসী, প্রতিহিংসা পরায়ণ জাতি হিসেবে তকমা দেয়া খুব সহজ। যে মানুষগুলো গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে জীবন হারান, ঝড়-বৃষ্টি, দাবদাহের সঙ্গে যুদ্ধ করা কৃষক, পোষাক শ্রমিক, কলকারখানায় কাজ করা মজুরসহ যারা তাদের দৈহিক ও মানসিক শ্রম দেশ ও জাতির জন্য বিনিয়োগ করে যাচ্ছেন ক্রমাগত তারাই আসলে সমাজের মূল ধারার মানুষ। মূল ধারাকে এড়িয়ে গিয়ে আমরা রাজনীতি ও সমাজের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব প্রদান করছি, অতি ক্ষুদ্র ক্ষমতাশালী কিছু মানুষকে। এই ধারা চলমান আছে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়কাল থেকে।
স্লোগান, মেঠো বক্তৃতা, রাজনৈতিক সভা, সেমিনারে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের কথা নিয়ম শুনে আসছি। স্বাধীনতার বয়স প্রায় পঞ্চান্ন হতে চলেছে, আমরা গণতন্ত্রকে এখনও প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্টানিক ভাবে মূর্ত হতে দেখিনি। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল এমন কী ধর্ম যাদের রাজনীতির মূল আদর্শ তারাও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন অহোরহ।
সমতা, সমদৃষ্টি, সম অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গণতন্ত্রের বিকল্প এখনও রাজনীতিতে নেই। প্রান্তিক, অধিকারহীন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। ২০২৫ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্রের হার বেড়ে ২১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। বহমান অর্থবছরে বাংলাদেশে আরও ৩০ লাখ মানুষ অতি দরিদ্র হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। অতি দারিদ্রের হার বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হবে। এই যে ক্রমাগত ভুতের মতো পশ্চাত গমন এর প্রধান কারণ হলো- প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের অভাব।
‘বাংলাদেশ প্রথম’ অর্থাৎ দেশ ও দেশের নাগরিকদের বিবেচনা সর্বাগ্রে, এই বার্তাটিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। এই বার্তার প্রতি বিপুল সমর্থন পেয়ে দলটি দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভ করেছে সংসদ নির্বাচনে। আমরা নিশ্চয় বিএনপি’র এই অঙ্গীকারের প্রতি আস্থা রাখতে পারি। গণতন্ত্রের প্রতি বিএনপির দৃশ্যমান শ্রদ্ধা আমাদেরকে আশ্বস্ত করে দলটি মানুষের স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
আমরা দেখতে চাই, সব মত ও পথের মানুষের প্রতি সমদৃষ্টি প্রদান করা হচ্ছে, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার তৎপর এবং সুষম উন্নয়নের জন্য বাস্তব ধর্মী পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগিয়ে যাবে। নাগরিক সমাজ এসব কর্মকান্ডের জন্য সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখতে চায়।
গত বিজয় দিবসে বিএনপির জনপ্রিয় মহাসচিব ফকরুল ইসলাম আলমগীরের একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম জাতীয় সংবাদপত্রে। তিনি জনগণের স্বপ্ন এবং স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। তার ভাষায়, ‘স্বাধীনতার সময় যে গণতান্ত্রিক ও শোষণহীন সমাজের প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। তার মতে, গত ৫৪ বছরে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, হত্যা এবং গণঅভ্যুত্থান দেখা গেছে। সাম্প্রতিক উগ্রবাদের উত্থানকে তিনি মানুষের স্বল্প সময়ের ক্ষোভ বলে মনে করেন। তার মতে, দেশে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রাখতে হবে।’
তার এই অসাধারণ বিশ্লেষণ এবং প্রত্যয়ের প্রতিফলন দেখতে চাই রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বত্র।
রাজনৈতিক দলগুলো যদি বার বার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়, মানুষের স্বপ্ন যদি প্রতিবার ভেঙে যায় তাহলে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে কিংবা থাকবেনা। রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থাহীনতা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার মতো। এর ফলে রাষ্ট্র ও সমাজ অন্ধকারের দিকে পা বাড়াতে থাকবে। সুবর্ণ পলির এই দেশের কোমল, আপাতত নিরীহ মানুষদের জীবনের কথা ভেবে হলেও এরকম পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত হবে না। পাঁচ কোটি দরিদ্র, হতদরিদ্র মানুষকে দ্রুত দরিদ্রসীমার ওপরে তুলে নিয়ে আসতে হবে।
এ জন্য গণতন্ত্রের পথে হাঁটা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা হলো এটি ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করে, সরকারের ক্ষমতাকে সীমিত রাখে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়।
দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্টার বিকল্প এখনও রাজনৈতিক ধারায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকারগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে হলে বিএনপির নব যাত্রায় গণতন্ত্রের সরু পথকে মহাসড়কে রূপান্তরিত করতে হবে। এটি করতে ব্যর্থ হলে আমরা যে তিমিরে আছি সে তিমিরেই থেকে যাবো অনন্তকাল। আমরা কী তা চাই। নিবেদিত প্রাণ নাগরিক সমাজের স্বপ্ন সুষম উন্নয়নের বাংলাদেশ।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
শেখর ভট্টাচার্য
সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬
মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আয়োজিত একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল ২০১৭ সালে। মাত্র এগারটি বাঙালি পরিবার সেখানে বসবাস করে। রাজধানী উলানবাটরের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করলেও তারা একই পরিবারের মতো সেখানে বসবাস করছেন। সুবর্ণ পলির মানুষরা মঙ্গোলিয়ায় কিংবা কোস্টারিকায় বসবাস করলেও সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাসের মধ্যেই তারা আনন্দ খুঁজে পান। উলানবাটরে যারা বসবাস করেন তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পেরেছি নববর্ষ থেকে শুরু করে সমস্ত জাতীয় ও বাঙালির লোকজ অনুষ্ঠানগুলো তারা উৎসবমূখর পরিবেশে উদযাপন করে থাকেন। এসব কথা বলার উদ্দেশ্য হলো জাতি হিসেবে বাঙালি বৈচিত্র পিয়াসী, আনন্দ প্রিয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজে বসবাস করতে যে পছন্দ করেন এ কথাটি পাঠকের সামনে তুলে ধরা।
নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক প্রভাবে বাঙালি উদার, কোমল স্বভাবের আবেগপ্রবণ জাতি। উদার ও কোমল স্বভাবের মূলে রয়েছে হাজার বছরের মিশ্র সংস্কৃতি, ভৌগোলিক অবস্থান, এবং কৃষিভিত্তিক জীবনধারা। সুবর্ণ পলিমাটি দিয়ে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশ, বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর (অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আর্য, মঙ্গোলীয়) সংমিশ্রণ, উদারপন্থী সুফি ও বৈষ্ণব দর্শনের প্রভাব, সমাজবদ্ধ হয়ে মিলে মিশে বসবাস করার এই প্রবণতা সৃষ্টি করে। এ কারণেই বাঙালি কোমল, আন্তরিক ও সামাজিক মানুষ হিসেবে বসবাস করতে পছন্দ করে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সুশীলসমাজের প্রতিনিধি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা সাম্প্রতিক কালে আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলার সময় খেয়াল রাখেন না বাঙালি যে প্রকৃতিদত্তভাবেই অন্তর্ভুক্তি প্রবণ। অন্তর্ভুক্তি যদি রাষ্ট্রকাঠামোয় বিবেচনা করা হয় সেটি ভিন্ন কথা। বাঙালির সমাজ কাঠামোয় সব শ্রেণীপেশার মানুষরা চিরকাল অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রশ্ন হতে পারে সবার অন্তর্ভুক্তি কী সমস্ত অধিকারকে নিশ্চিত করতে সক্ষম। এই আলোচনা ভিন্ন ভাবে, ভিন্ন সময়ে হতে পারে তবে বাঙালি জন-সমাজের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে সমাজ গঠন।
বাঙালির আচরণের সংস্কৃতি, ভাবাবেগ প্রকাশের ধরন কখনও উগ্র ছিল না। প্রতিহিংসা পরায়ণ, উত্তেজনায় টগবগ করা কিছু বাঙালিকে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় কয়েকটি শহরে। তাদের সংখ্যা যে খুব বেশি তা বলা যাবেনা। বিত্ত, বৈভব, ক্ষমতার জোরে তারা সামজিক এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রভাব ফেলতে পারেন। তাদের কিছুটা নিষ্ঠুর কর্মকান্ড দেখে সাধারণ মানুষ ভীত হয়। সমাজে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি চেপে বসে। ভয়ের সংস্কৃতিকে সমাজে গভীর ভাবে প্রোথিত করা মানুষের কর্মকান্ড দিয়ে খুব দ্রুত এই উপসংহারে পৌঁছানো উচিত হবেনা যে বাঙালি একটি উগ্র, প্রতিহিংসা পরায়ণ জাতি। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে জাতি সমাজের বৈশিষ্ঠ বহন করা মানুষরা কিন্তু শুধুমাত্র ঢাকার বিভিন্ন চত্বর, শিক্ষাঙ্গণ, শিল্পকলা চর্চার জায়গাগুলোতে বসবাস করেন না। উল্লেখিত স্থানগুলোতে যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করে যাচ্ছেন তারা মূলত জাতির খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ।
চৈত্রের দাবদাহ কিংবা ভাদ্র, আশ্বিনের বিরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশকে মোকাবিলা করে যারা সারা বছরের ধান উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখার নিরলস চেষ্টা করে যান তারাই আসলে এই জাতি রাষ্ট্রের মূল ধারার মানুষ। এছাড়াও বিভিন্ন ঋতুর অস্বাভাবিক এবং নেতিবাচক প্রভাবকে জয় করে, ফোটা ফোটা ঘাম ঝরিয়ে বিস্তীর্ণ চর, হাওর, পাহাড় এবং উপকুলের পার্শবর্তী অঞ্চলে ধ্যানমগ্ন হয়ে শ্রম দান করে খাদ্য শস্যের যোগানকে স্বাভাবিক রাখেন তাদের সততা, শ্রম, নিবেদন, দেশের প্রতি ভালোবাসা হলো আমাদের এ জাতির জাতীয় চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট।
উপমহাদেশের অন্যান্য জাতির জাতীয় চরিত্র এবং আচরণের সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের এ বদ্বীপের মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ঠের ভিন্নতা না বুঝতে পারলে বাঙালিকে উগ্র মতবাদে বিশ্বাসী, প্রতিহিংসা পরায়ণ জাতি হিসেবে তকমা দেয়া খুব সহজ। যে মানুষগুলো গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে জীবন হারান, ঝড়-বৃষ্টি, দাবদাহের সঙ্গে যুদ্ধ করা কৃষক, পোষাক শ্রমিক, কলকারখানায় কাজ করা মজুরসহ যারা তাদের দৈহিক ও মানসিক শ্রম দেশ ও জাতির জন্য বিনিয়োগ করে যাচ্ছেন ক্রমাগত তারাই আসলে সমাজের মূল ধারার মানুষ। মূল ধারাকে এড়িয়ে গিয়ে আমরা রাজনীতি ও সমাজের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব প্রদান করছি, অতি ক্ষুদ্র ক্ষমতাশালী কিছু মানুষকে। এই ধারা চলমান আছে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়কাল থেকে।
স্লোগান, মেঠো বক্তৃতা, রাজনৈতিক সভা, সেমিনারে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের কথা নিয়ম শুনে আসছি। স্বাধীনতার বয়স প্রায় পঞ্চান্ন হতে চলেছে, আমরা গণতন্ত্রকে এখনও প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্টানিক ভাবে মূর্ত হতে দেখিনি। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল এমন কী ধর্ম যাদের রাজনীতির মূল আদর্শ তারাও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন অহোরহ।
সমতা, সমদৃষ্টি, সম অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গণতন্ত্রের বিকল্প এখনও রাজনীতিতে নেই। প্রান্তিক, অধিকারহীন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। ২০২৫ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্রের হার বেড়ে ২১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। বহমান অর্থবছরে বাংলাদেশে আরও ৩০ লাখ মানুষ অতি দরিদ্র হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। অতি দারিদ্রের হার বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হবে। এই যে ক্রমাগত ভুতের মতো পশ্চাত গমন এর প্রধান কারণ হলো- প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের অভাব।
‘বাংলাদেশ প্রথম’ অর্থাৎ দেশ ও দেশের নাগরিকদের বিবেচনা সর্বাগ্রে, এই বার্তাটিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। এই বার্তার প্রতি বিপুল সমর্থন পেয়ে দলটি দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভ করেছে সংসদ নির্বাচনে। আমরা নিশ্চয় বিএনপি’র এই অঙ্গীকারের প্রতি আস্থা রাখতে পারি। গণতন্ত্রের প্রতি বিএনপির দৃশ্যমান শ্রদ্ধা আমাদেরকে আশ্বস্ত করে দলটি মানুষের স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
আমরা দেখতে চাই, সব মত ও পথের মানুষের প্রতি সমদৃষ্টি প্রদান করা হচ্ছে, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার তৎপর এবং সুষম উন্নয়নের জন্য বাস্তব ধর্মী পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগিয়ে যাবে। নাগরিক সমাজ এসব কর্মকান্ডের জন্য সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখতে চায়।
গত বিজয় দিবসে বিএনপির জনপ্রিয় মহাসচিব ফকরুল ইসলাম আলমগীরের একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম জাতীয় সংবাদপত্রে। তিনি জনগণের স্বপ্ন এবং স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। তার ভাষায়, ‘স্বাধীনতার সময় যে গণতান্ত্রিক ও শোষণহীন সমাজের প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। তার মতে, গত ৫৪ বছরে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, হত্যা এবং গণঅভ্যুত্থান দেখা গেছে। সাম্প্রতিক উগ্রবাদের উত্থানকে তিনি মানুষের স্বল্প সময়ের ক্ষোভ বলে মনে করেন। তার মতে, দেশে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রাখতে হবে।’
তার এই অসাধারণ বিশ্লেষণ এবং প্রত্যয়ের প্রতিফলন দেখতে চাই রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বত্র।
রাজনৈতিক দলগুলো যদি বার বার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়, মানুষের স্বপ্ন যদি প্রতিবার ভেঙে যায় তাহলে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে কিংবা থাকবেনা। রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থাহীনতা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার মতো। এর ফলে রাষ্ট্র ও সমাজ অন্ধকারের দিকে পা বাড়াতে থাকবে। সুবর্ণ পলির এই দেশের কোমল, আপাতত নিরীহ মানুষদের জীবনের কথা ভেবে হলেও এরকম পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত হবে না। পাঁচ কোটি দরিদ্র, হতদরিদ্র মানুষকে দ্রুত দরিদ্রসীমার ওপরে তুলে নিয়ে আসতে হবে।
এ জন্য গণতন্ত্রের পথে হাঁটা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা হলো এটি ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করে, সরকারের ক্ষমতাকে সীমিত রাখে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়।
দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্টার বিকল্প এখনও রাজনৈতিক ধারায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকারগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে হলে বিএনপির নব যাত্রায় গণতন্ত্রের সরু পথকে মহাসড়কে রূপান্তরিত করতে হবে। এটি করতে ব্যর্থ হলে আমরা যে তিমিরে আছি সে তিমিরেই থেকে যাবো অনন্তকাল। আমরা কী তা চাই। নিবেদিত প্রাণ নাগরিক সমাজের স্বপ্ন সুষম উন্নয়নের বাংলাদেশ।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]