মাহতাব হোসাইন মাজেদ
ঈদ মুসলমানদের জীবনে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি সামাজিক সংহতি, পারিবারিক বন্ধন ও আনন্দ ভাগাভাগির একটি বড় উপলক্ষ। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন সত্য হলো- ঈদের এই আনন্দময় সময় ঘিরেই প্রতিবছর বাজারে সৃষ্টি হয় এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী- সবকিছুর দাম যেন হঠাৎ করেই নাগালের বাইরে চলে যায়। ভোক্তা তখন আনন্দ ও প্রয়োজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে অসহায় অবস্থায়। এই অসহায়ত্ব আজ আর ব্যক্তিগত ভোগান্তির গল্প নয়; এটি নতুন সরকারের আস্থা ও সক্ষমতা যাচাইয়ের এক ধরনের রাষ্ট্রীয় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
ঈদবাজার : উৎসবের সঙ্গে অনিয়মেরও উৎসব
ঈদের আগে বাজারে গেলেই চোখে পড়ে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা। একই পণ্যের দাম এক দোকানে একরকম, অন্য দোকানে ভিন্ন। কোথাও মূল্যতালিকা নেই, কোথাও আবার দরদাম করতে গেলেই ক্রেতাকে অপমানজনক আচরণের মুখে পড়তে হয়। পোশাকের দোকানে ‘ঈদ কালেকশন’ বা ‘লিমিটেড এডিশন’ নাম দিয়ে কয়েক দিনের ব্যবধানে দাম কয়েকগুণ বাড়ানো হয়। খাদ্যপণ্যে দেখা যায় ভেজাল, নিম্নমানের কাঁচামাল কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির অভিযোগ। এসব অনিয়ম যেন ঈদের বাজারে নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন ঈদের সময়ই ভোক্তা সবচেয়ে অসহায় : ঈদ-পূর্ব সময়ে ভোক্তার অসহায়ত্ব বাড়ে কয়েকটি কারণে। প্রথমত, ঈদের কেনাকাটা অনেক ক্ষেত্রে ঐচ্ছিক নয়; সামাজিক বাস্তবতায় তা প্রায় বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেনাকাটা শেষ করার চাপ থাকে। ফলে যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ কমে যায়। তৃতীয়ত, পরিবার ও শিশুদের আবদার উপেক্ষা করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। এই পরিস্থিতির সুযোগ নেয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। ফলে ভোক্তা জানেন তিনি ঠকছেন, তবু প্রতিবাদ করার জায়গা খুঁজে পান না।
অনিয়মের পেছনের কাঠামোগত দুর্বলতা : ঈদবাজারের অনিয়ম কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। বাজারে কার্যকর তদারকির অভাব, নিয়মিত মনিটরিং না থাকা এবং শাস্তির নজির কম-এসব মিলেই অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযান হয় নির্দিষ্ট কিছু এলাকায়; কিন্তু বাজারের বড় অংশ থেকে যায় নজরের বাইরে। আবার অভিযানের খবর আগেভাগেই ফাঁস হয়ে গেলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাময়িকভাবে সতর্ক হয়ে যায়। ফলে সমস্যার মূল জায়গায় আঘাত লাগে না।
ভোক্তার অসহায়ত্ব : শুধু দাম নয়, নিরাপত্তার প্রশ্ন ভোক্তার অসহায়ত্ব শুধু অতিরিক্ত দাম দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ঝুঁকি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। শিশুদের জন্য কেনা খেলনা বা পোশাকের মান নিয়েও প্রশ্ন থাকে। অনেক সময় ভোক্তা বুঝতেই পারেন না তিনি কী কিনছেন। এই অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশই ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের বড় প্রমাণ।
নতুন সরকারের সামনে কেন এটি বড় পরীক্ষা
নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা থাকে- দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলোতে দ্রুত ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। ঈদবাজার সেই প্রত্যাশার একটি বড় ক্ষেত্র। কারণ এখানে সরাসরি যুক্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, স্বস্তি ও নিরাপত্তা। ঈদের আগে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা মানে কেবল কয়েকটি দোকানে জরিমানা করা নয়; এটি প্রমাণ করা যে সরকার প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে সক্ষম।
ভোক্তা অধিকার অভিযান: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা : ভোক্তা অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান সরকারি সংস্থা হলো ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। প্রতিবছর ঈদের আগে এই সংস্থার পক্ষ থেকে বাজারে অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে জরিমানা, পণ্য জব্দ কিংবা দোকান সিলগালা করার খবর পাওয়া যায়। নিঃসন্দেহে এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে বাস্তবতা হলো- এই অভিযানগুলোর প্রভাব বেশিরভাগ সময়ই স্বল্পমেয়াদি। এর মূল কারণ জনবল ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা, বাজারের বিশাল বিস্তৃতি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী চক্রের অদৃশ্য চাপ। ফলে অভিযান শেষ হলে বাজার আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এই চক্র ভাঙতে না পারলে ভোক্তার অসহায়ত্ব থেকেই যাবে।
নতুন সরকারের জোরালো ভূমিকা: কী করা দরকার
এই জায়গাতেই নতুন সরকারের জোরালো ও দৃশ্যমান ভূমিকা প্রয়োজন। প্রথমত, ঈদকে কেন্দ্র করে আলাদা বিশেষ মনিটরিং টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, অভিযান যেন শুধু ভোক্তা অধিকার সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিটি করপোরেশনকে সম্পৃক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটাতে হবে।
সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা
ঈদবাজারের শৃঙ্খলা ফেরাতে একক কোনো সংস্থার পক্ষে সফল হওয়া কঠিন। এখানে প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। বাজার কমিটি, ব্যবসায়ী সমিতি ও স্থানীয় প্রশাসন- সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। মূল্যতালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা, ডিজিটাল বিল ও রসিদ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তদারকি-এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে অনিয়ম অনেকটাই কমে আসতে পারে।
প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতার ভূমিকা : নতুন সরকার চাইলে প্রযুক্তিকে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ডিজিটাল মূল্যতালিকা, কিউআর কোডের মাধ্যমে পণ্যের তথ্য যাচাই এবং অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা- এসব উদ্যোগ ভোক্তার ক্ষমতায়ন ঘটাতে পারে। এতে করে ভোক্তা শুধু ক্রেতা নয়, বরং বাজার নজরদারিরও অংশীদার হয়ে উঠতে পারেন।
ভোক্তার ভূমিকা: নীরবতা ভাঙা জরুরি : ভোক্তা সচেতনতা ছাড়া কোনো উদ্যোগই টেকসই হয় না। রসিদ নেয়া, দরদাম করা, সন্দেহজনক পণ্য এড়িয়ে চলা এবং অনিয়ম দেখলে অভিযোগ জানানো- এসব ছোট পদক্ষেপ বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে ভোক্তাকে সাহস দিতে রাষ্ট্রকেই আগে এগিয়ে আসতে হবে।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব : ঈদবাজারে ভোক্তার অসহায়ত্ব তুলে ধরতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রশাসনকে সঠিক পথে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। নতুন সরকারের জন্যও এটি একটি সুযোগ- সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে সংস্কারের পথে এগোনোর।
দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া মুক্তি নেই : ঈদবাজারের সমস্যা আসলে আমাদের সামগ্রিক বাজারব্যবস্থার প্রতিফলন। নতুন সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথে হাঁটে-কঠোর আইন প্রয়োগ, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নিয়মিত মনিটরিং এবং ব্যবসায়ীদের নৈতিক প্রশিক্ষণ-তাহলে ঈদ এলেই আলাদা করে আতঙ্ক বা বিশেষ অভিযান চালানোর প্রয়োজন পড়বে না।
পরিশেষে বলা যায়, ঈদ আনন্দের উৎসব। কিন্তু সেই আনন্দ যেন বাজারের অনিয়মে ম্লান না হয়। ঈদবাজারে ভোক্তার অসহায়ত্ব নতুন সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে-মানুষ কেবল আশ্বাস নয়, বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। সরকার যদি দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে, তাহলে ঈদের আনন্দ শুধু ঘরের মধ্যেই নয়, বাজারের প্রতিটি লেনদেনেও প্রতিফলিত হবে। তখনই বলা যাবে- নতুন সরকার সত্যিকার অর্থেই মানুষের আস্থা অর্জনের পথে এগোচ্ছে।
[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মাহতাব হোসাইন মাজেদ
সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬
ঈদ মুসলমানদের জীবনে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি সামাজিক সংহতি, পারিবারিক বন্ধন ও আনন্দ ভাগাভাগির একটি বড় উপলক্ষ। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন সত্য হলো- ঈদের এই আনন্দময় সময় ঘিরেই প্রতিবছর বাজারে সৃষ্টি হয় এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী- সবকিছুর দাম যেন হঠাৎ করেই নাগালের বাইরে চলে যায়। ভোক্তা তখন আনন্দ ও প্রয়োজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে অসহায় অবস্থায়। এই অসহায়ত্ব আজ আর ব্যক্তিগত ভোগান্তির গল্প নয়; এটি নতুন সরকারের আস্থা ও সক্ষমতা যাচাইয়ের এক ধরনের রাষ্ট্রীয় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
ঈদবাজার : উৎসবের সঙ্গে অনিয়মেরও উৎসব
ঈদের আগে বাজারে গেলেই চোখে পড়ে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা। একই পণ্যের দাম এক দোকানে একরকম, অন্য দোকানে ভিন্ন। কোথাও মূল্যতালিকা নেই, কোথাও আবার দরদাম করতে গেলেই ক্রেতাকে অপমানজনক আচরণের মুখে পড়তে হয়। পোশাকের দোকানে ‘ঈদ কালেকশন’ বা ‘লিমিটেড এডিশন’ নাম দিয়ে কয়েক দিনের ব্যবধানে দাম কয়েকগুণ বাড়ানো হয়। খাদ্যপণ্যে দেখা যায় ভেজাল, নিম্নমানের কাঁচামাল কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির অভিযোগ। এসব অনিয়ম যেন ঈদের বাজারে নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন ঈদের সময়ই ভোক্তা সবচেয়ে অসহায় : ঈদ-পূর্ব সময়ে ভোক্তার অসহায়ত্ব বাড়ে কয়েকটি কারণে। প্রথমত, ঈদের কেনাকাটা অনেক ক্ষেত্রে ঐচ্ছিক নয়; সামাজিক বাস্তবতায় তা প্রায় বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেনাকাটা শেষ করার চাপ থাকে। ফলে যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ কমে যায়। তৃতীয়ত, পরিবার ও শিশুদের আবদার উপেক্ষা করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। এই পরিস্থিতির সুযোগ নেয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। ফলে ভোক্তা জানেন তিনি ঠকছেন, তবু প্রতিবাদ করার জায়গা খুঁজে পান না।
অনিয়মের পেছনের কাঠামোগত দুর্বলতা : ঈদবাজারের অনিয়ম কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। বাজারে কার্যকর তদারকির অভাব, নিয়মিত মনিটরিং না থাকা এবং শাস্তির নজির কম-এসব মিলেই অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযান হয় নির্দিষ্ট কিছু এলাকায়; কিন্তু বাজারের বড় অংশ থেকে যায় নজরের বাইরে। আবার অভিযানের খবর আগেভাগেই ফাঁস হয়ে গেলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাময়িকভাবে সতর্ক হয়ে যায়। ফলে সমস্যার মূল জায়গায় আঘাত লাগে না।
ভোক্তার অসহায়ত্ব : শুধু দাম নয়, নিরাপত্তার প্রশ্ন ভোক্তার অসহায়ত্ব শুধু অতিরিক্ত দাম দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ঝুঁকি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। শিশুদের জন্য কেনা খেলনা বা পোশাকের মান নিয়েও প্রশ্ন থাকে। অনেক সময় ভোক্তা বুঝতেই পারেন না তিনি কী কিনছেন। এই অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশই ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের বড় প্রমাণ।
নতুন সরকারের সামনে কেন এটি বড় পরীক্ষা
নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা থাকে- দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলোতে দ্রুত ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। ঈদবাজার সেই প্রত্যাশার একটি বড় ক্ষেত্র। কারণ এখানে সরাসরি যুক্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, স্বস্তি ও নিরাপত্তা। ঈদের আগে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা মানে কেবল কয়েকটি দোকানে জরিমানা করা নয়; এটি প্রমাণ করা যে সরকার প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে সক্ষম।
ভোক্তা অধিকার অভিযান: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা : ভোক্তা অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান সরকারি সংস্থা হলো ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। প্রতিবছর ঈদের আগে এই সংস্থার পক্ষ থেকে বাজারে অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে জরিমানা, পণ্য জব্দ কিংবা দোকান সিলগালা করার খবর পাওয়া যায়। নিঃসন্দেহে এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে বাস্তবতা হলো- এই অভিযানগুলোর প্রভাব বেশিরভাগ সময়ই স্বল্পমেয়াদি। এর মূল কারণ জনবল ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা, বাজারের বিশাল বিস্তৃতি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী চক্রের অদৃশ্য চাপ। ফলে অভিযান শেষ হলে বাজার আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এই চক্র ভাঙতে না পারলে ভোক্তার অসহায়ত্ব থেকেই যাবে।
নতুন সরকারের জোরালো ভূমিকা: কী করা দরকার
এই জায়গাতেই নতুন সরকারের জোরালো ও দৃশ্যমান ভূমিকা প্রয়োজন। প্রথমত, ঈদকে কেন্দ্র করে আলাদা বিশেষ মনিটরিং টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, অভিযান যেন শুধু ভোক্তা অধিকার সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিটি করপোরেশনকে সম্পৃক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটাতে হবে।
সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা
ঈদবাজারের শৃঙ্খলা ফেরাতে একক কোনো সংস্থার পক্ষে সফল হওয়া কঠিন। এখানে প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। বাজার কমিটি, ব্যবসায়ী সমিতি ও স্থানীয় প্রশাসন- সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। মূল্যতালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা, ডিজিটাল বিল ও রসিদ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তদারকি-এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে অনিয়ম অনেকটাই কমে আসতে পারে।
প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতার ভূমিকা : নতুন সরকার চাইলে প্রযুক্তিকে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ডিজিটাল মূল্যতালিকা, কিউআর কোডের মাধ্যমে পণ্যের তথ্য যাচাই এবং অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা- এসব উদ্যোগ ভোক্তার ক্ষমতায়ন ঘটাতে পারে। এতে করে ভোক্তা শুধু ক্রেতা নয়, বরং বাজার নজরদারিরও অংশীদার হয়ে উঠতে পারেন।
ভোক্তার ভূমিকা: নীরবতা ভাঙা জরুরি : ভোক্তা সচেতনতা ছাড়া কোনো উদ্যোগই টেকসই হয় না। রসিদ নেয়া, দরদাম করা, সন্দেহজনক পণ্য এড়িয়ে চলা এবং অনিয়ম দেখলে অভিযোগ জানানো- এসব ছোট পদক্ষেপ বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে ভোক্তাকে সাহস দিতে রাষ্ট্রকেই আগে এগিয়ে আসতে হবে।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব : ঈদবাজারে ভোক্তার অসহায়ত্ব তুলে ধরতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রশাসনকে সঠিক পথে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। নতুন সরকারের জন্যও এটি একটি সুযোগ- সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে সংস্কারের পথে এগোনোর।
দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া মুক্তি নেই : ঈদবাজারের সমস্যা আসলে আমাদের সামগ্রিক বাজারব্যবস্থার প্রতিফলন। নতুন সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথে হাঁটে-কঠোর আইন প্রয়োগ, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নিয়মিত মনিটরিং এবং ব্যবসায়ীদের নৈতিক প্রশিক্ষণ-তাহলে ঈদ এলেই আলাদা করে আতঙ্ক বা বিশেষ অভিযান চালানোর প্রয়োজন পড়বে না।
পরিশেষে বলা যায়, ঈদ আনন্দের উৎসব। কিন্তু সেই আনন্দ যেন বাজারের অনিয়মে ম্লান না হয়। ঈদবাজারে ভোক্তার অসহায়ত্ব নতুন সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে-মানুষ কেবল আশ্বাস নয়, বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। সরকার যদি দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে, তাহলে ঈদের আনন্দ শুধু ঘরের মধ্যেই নয়, বাজারের প্রতিটি লেনদেনেও প্রতিফলিত হবে। তখনই বলা যাবে- নতুন সরকার সত্যিকার অর্থেই মানুষের আস্থা অর্জনের পথে এগোচ্ছে।
[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]