আনোয়ারুল হক
বিদায়ী উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে দীর্ঘদিন যাবৎ পরিবেশ আন্দোলনের যোদ্ধা হিসেবেই জানি। তাদের আন্দোলন পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হলেও দেশে পরিবেশের অবনতি ছাড়া উন্নতি তো কোনো কালেই চোখে পড়ে নাই। এমনকি গত ১৮ মাস তিনি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার পরেও না। তবে তিনি সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। তাই যখন পরিবেশ, প্রকৃতি, নারী অধিকার ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতেন তখন মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। আমার মনে পড়ে তাকে প্রথম সামনা সামনি দেখি আজ থেকে এক যুগ আগে। তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডে যখন ব্র্যকের নার্সারি যাত্রা শুরু করে সে সময় তাদের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনীতে তিনি অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। আমার স্ত্রীকে নার্সারি কর্তৃপক্ষ ঐ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর সুবাদে আমিও উপস্থিত ছিলাম।
নার্সারীর সঙ্গে লাগোয়া রয়েছে নিকেতন সোসাইটির কয়েকটি সুউচ্চ ভবন। স্বাভাবিকভাবেই ঐ সব ভবনের বাসিন্দারা তাদের বারান্দার সামনে বাড়তি পেয়ে গেছেন সবুজে ঘেরা আর ফুলে ফলে শোভিত বেশ বড় এলাকা জুড়ে খোলা জায়গায় নার্সারি। আবার নার্সারির পাশের লিংক রোডের পরেই হাতিরঝিল। আসলেই ঐ ভবনের ১২০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটগুলোর বাসিন্দারা ভাগ্যবান। রিজওয়ানা হাসান তার বক্তব্যের শুরুতেই উপরের ফ্ল্যাটগুলোর ওপর আংগুলি ইশারায় বললেন, ‘আহা! আমার যদি এমন একটি ফ্ল্যট থাকতো।’ রিজওয়ানা হাসান ১২০০ স্কয়ারের ফ্ল্যাটেই সেদিন নিজেকে ধন্য মনে করতেন। আর মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হওয়ার পরে তারা মন্ত্রীদের জন্য ১০,০০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা করে গেলেন। সেদিনই আমার ব্র্যক নার্সারিতে দেয়া তার বক্তৃতার কথা মনে হলো। আর ভাবলাম উপদেষ্টা হওয়ার পরে ওনারা হাজার, দুহাজার বা চার হাজার স্কয়ার ফিটের হিসাব ভুলে গেছেন। দুর্বৃত্তায়িত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ক্ষমতা রাজনীতিবিদ, আমলা আর ব্যবসায়ীদের সরল? সহজ স্বাভাবিক জীবন যাপনের অভ্যসকে ভুলিয়ে দেয়। চোখের সামনেই তো মানুষ দেখছে দেশের প্রচলিত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা উন্মত্ত ভোগবাদী মনোভাবের হয়ে উঠছে। এমনিতেই নাচুনী বুড়ি, বিদায়ের আগে তার উপরে দশ হাজার স্কয়ার ফিটের ঢোলের বাড়ি দিয়ে গেলেন রিজোওয়ানা আপারা। তার কাছে আমার প্রশ্ন রইলো আমাদের দেশ সহ বিশ্ব জুড়েই প্রাণ প্রকৃতি ও পরিবেশের যে সংকট তার সূচনা তো হয়েছে মানুষের ভোগবাদী মনোভাব থেকে। ভোগবাদকে তুষ্ট করে আপনার পরিবেশ আন্দোলন কি অগ্রসর হতে পারবে?
ধান বানতে যেয়ে শিবের গীত হয়ে গেলো। আলোচনা করতে চাইছিলাম হঠাৎ করে জামায়ত ইসলাম এত কিছু বাদ দিয়ে রিজওয়ানা হাসানকে কেনো টার্গেট করলো? রিজওয়ানা হাসান নাকি বলেছেন, ‘আমরা তো ধর্মীয় উগ্রবাদীদের মেইনস্ট্রিমে আসতে দেইনি’। এতো বড় অসত্য কথা উনি কি ভাবে বললেন? তাদের ১৮ মাসের শাসনের ফলশ্রুতিতেই তো আজ বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী ধর্মীয় উগ্রবাদীরা পার্লামেন্টে প্রধান বিরোধী দল। এর চেয়ে প্রধান স্ট্রীম আর কি হতে পারে? তাদেরকে প্রধান বিরোধী দল করার উদ্দেশেই তো আপনারা যমুনার সামনে জামাত-হেফাজত- এনসিপিকে দিয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে মবউল্লোম্ফন আয়োজনের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রচন্ড গরমে মব জমায়েতকারীদের কষ্ট লাঘব করার জন্য তাদের ওপর শীতল পানি বর্ষণের ব্যবস্থা করলেন। অতপর আপনারা সরকারি আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন এবং শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন করলেন। আওয়ামী লীগের কেউ যাতে স্বতন্ত্র প্রার্থীও হতে না পারে সে জন্য স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়ে দিলেন ‘মামলা লাগবে না, আওয়ামী লীগ পাইলেই ধরো’।
আওয়ামী লীগ দল তো কোনো কালে করি নাই, কোনোদিন তাদের ভোটও দেইনি, কিন্তু এটা বুঝি এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের দ্বিতীয় স্তরের নেতাদেরকে দিয়ে মুক্ত পরিবেশে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারলে বিরোধী দল তারাই হতো। এটা জামাত-এনসিপিও বুঝে। তাই নির্বাচনটা আওয়ামীলীগবিহীন করা হলো। যেমনটা বিগত সময়ের নির্বাচনে ভিন্ন কৌশলে বিএনপি বিহীন নির্বাচনের আয়োজন করে থাকতো আওয়ামী লীগ সরকার।
জামাত-হেফাজত-এনসিপি’র জন্য এত কিছু করার পরে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে বিদায় নিয়ে রিজওয়ানা হাসান ফিরে এসেছেন তার পরিবেশ আন্দোলনে, নারী আন্দোলনে। নারী বিরোধী, নারী অধিকার বিরোধী শক্তিকে ১৮ মাস যাবত মদত দিয়ে মেইনস্ট্রিম ধারায় নিয়ে আসার ‘করিৎকর্মা উপদেষ্টা পরিষদে’ তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছেন। এখন নারীদের মাঝে ফিরে এসে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার জন?্য নানা কথা বলতে যেয়ে জামাতের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এই নারী বিরোধী মব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আপনারা কখনোই কোনো ব্যবস্থা নেন নি বরং অভিযোগ আছে উস্কে দিয়েছেন। রিজওয়ানা আপা, আওয়ামী লীগ দমনের নামে আপনারা জেনে-বুঝেই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করেছেন।
আওয়ামী লীগ দমনের নামে আপনাদের সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধের সব স্মৃতি চিহ্নকে মুছে ফেলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের আয়োজন পর্বের ধানমন্ডি ৩২নং এর ঐতিহাসিক বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরানো হয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা নির্যাতন করা হয়েছে, মন্দির, মাজার ভাঙা হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি আক্রমণের স্বীকার হয়েছে নারী স্বাধীনতা। আপনাদের সরকারের আমলে জামাত সরাসরি ঘোষণা করছে ‘নারীর নেতৃত্ব কোরআনের পরিপন্থি। নারীদের পরিচালনা করবে পুরুষ। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, পুরুষ হলো নারীর পরিচালক।’ তারা আরো ঘোষনা করছে, ‘যারা ঘরের কাজ করবেন, তাদের রত্নগর্ভা মা হিসেবে সম্মানিত করা হবে’। অর্থাৎ ঘরে বন্দী থেকে গৃহকর্মে নিয়োজিত থাকলেই জামায়াত নারীকে বিশেষ সম্মান দেবে। আপনাদের আমল ছাড়া আর কখনও জামায়াত প্রকাশ্যে সরাসরি এভাবে নারীবিদ্ধেষী কথাবার্তা বলতে সাহস পেয়েছে?
আর সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো আপনাদের সমর্থিত তরুণদের দলের নেতৃত্ব, যাদের ডাকে জুলাই আন্দোলনে রাজপথে নেমে এসেছিলেন লাখো তরুণী তাদের নারী সংগঠন ‘নারী শক্তি’র সম্মেলনে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিনে ‘পুরুষ হলো নারীর পরিচালক’ ঘোষণাকারী সংগঠন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের মানবসম্পদ ও আইন বিষয়ক সেক্রেটারি সাবিকুন নাহার মুন্নী অতিথি হিসেবে এসে একই ধরনের বক্তব্য রেখেছেন। এই হলো ‘জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক ঐক্য নয়, শুধু মাত্র নির্বাচনী ঐক্যের’ প্রকৃত চেহারা। আপনাদের সমর্থনে পরিপুষ্ট তরুণদের দলও জামাতের হয়ে রাজনীতির খেলায় নেমেছে। আপনারা এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে গেছেন যে, ইউনেস্কো স্বীকৃত বাংলাদেশের স্বাধীনতার অমর কাব্য ৭ মার্চের ভাষণ বাজালে বা শুনলে মব সন্ত্রাসীদের হামলার স্বীকার হতে হয়। হামলাকারীদের কিছুই হয় না বরং আক্রান্তকে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার হতে হয়। অতীতে এ ভাষনের অতিব্যবহার বা অপব্যবহার হয়েছে বলে কি এ ঐতিহাসিক ভাষণ আর কখনো শোনা যাবে না? আপনারা এমন অবস্থা করে গেছেন যে ৩২ নং বাড়িতে কেউ ফুল নিয়ে যেতে পারবে না। এই ঐতিহাসিক বাড়িটি কেউ পরিদর্শন করতে গেলেও মবের শিকারে পরিণত হতে হবে।
আপনাদের আমলেই ছায়ানট, উদিচী, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা, অগ্নি সংযোগ ও লুটপাট হয়েছে। আপনারা জাতীয় কবির সমাধির মর্যাদা ও গাম্ভীর্যকে ক্ষুণ্য করার ব্যবস্থা করেছেন। ৫ আগস্টের পর থেকে এ সব কাজ তৌহিদী জনতা এবং ইনকিলাব, ইনসাফ, জুলাই- এরকম নানা মঞ্চের নামে করা হয়েছে আর কলকাঠি নেড়েছে এবং অর্থ ও জনবল সরবরাহ করেছে জামায়াত। আবার আপনাদের সংস্কার কমিশনের বৈঠকে এসে তারা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেছে। জামাতের অবস্থা হচ্ছে, ‘ মুখে মধুর চাষ, অন্তরে করলার আবাস, বুঝতে বুঝতে আপনাদের গেলো ১৮ মাস, ততো দিনে পাকা বাঁশ।’
এই আঠারো মাসে জামায়াতকে, নারী স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের, মব সন্ত্রাসীদেরকে আস্কারা দিয়ে আপনারা পাকা বাঁশে পরিণত করেছেন। বাঁশ বাকা করতে বা নোয়াতে চাইলে কাঁচা থাকতেই তা করতে হয়। তা না করে এখন তাদেরকে নোয়াতে চাইছেন, তবে তো ঠাস ঠাস করে উঠবেই। যথাসময়ে ব্যবস্থা না নিলে, পরে পস্তাতেই হয়। কথায় আছে না, ‘কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
আনোয়ারুল হক
সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬
বিদায়ী উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে দীর্ঘদিন যাবৎ পরিবেশ আন্দোলনের যোদ্ধা হিসেবেই জানি। তাদের আন্দোলন পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হলেও দেশে পরিবেশের অবনতি ছাড়া উন্নতি তো কোনো কালেই চোখে পড়ে নাই। এমনকি গত ১৮ মাস তিনি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার পরেও না। তবে তিনি সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। তাই যখন পরিবেশ, প্রকৃতি, নারী অধিকার ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতেন তখন মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। আমার মনে পড়ে তাকে প্রথম সামনা সামনি দেখি আজ থেকে এক যুগ আগে। তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডে যখন ব্র্যকের নার্সারি যাত্রা শুরু করে সে সময় তাদের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনীতে তিনি অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। আমার স্ত্রীকে নার্সারি কর্তৃপক্ষ ঐ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর সুবাদে আমিও উপস্থিত ছিলাম।
নার্সারীর সঙ্গে লাগোয়া রয়েছে নিকেতন সোসাইটির কয়েকটি সুউচ্চ ভবন। স্বাভাবিকভাবেই ঐ সব ভবনের বাসিন্দারা তাদের বারান্দার সামনে বাড়তি পেয়ে গেছেন সবুজে ঘেরা আর ফুলে ফলে শোভিত বেশ বড় এলাকা জুড়ে খোলা জায়গায় নার্সারি। আবার নার্সারির পাশের লিংক রোডের পরেই হাতিরঝিল। আসলেই ঐ ভবনের ১২০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটগুলোর বাসিন্দারা ভাগ্যবান। রিজওয়ানা হাসান তার বক্তব্যের শুরুতেই উপরের ফ্ল্যাটগুলোর ওপর আংগুলি ইশারায় বললেন, ‘আহা! আমার যদি এমন একটি ফ্ল্যট থাকতো।’ রিজওয়ানা হাসান ১২০০ স্কয়ারের ফ্ল্যাটেই সেদিন নিজেকে ধন্য মনে করতেন। আর মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হওয়ার পরে তারা মন্ত্রীদের জন্য ১০,০০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা করে গেলেন। সেদিনই আমার ব্র্যক নার্সারিতে দেয়া তার বক্তৃতার কথা মনে হলো। আর ভাবলাম উপদেষ্টা হওয়ার পরে ওনারা হাজার, দুহাজার বা চার হাজার স্কয়ার ফিটের হিসাব ভুলে গেছেন। দুর্বৃত্তায়িত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ক্ষমতা রাজনীতিবিদ, আমলা আর ব্যবসায়ীদের সরল? সহজ স্বাভাবিক জীবন যাপনের অভ্যসকে ভুলিয়ে দেয়। চোখের সামনেই তো মানুষ দেখছে দেশের প্রচলিত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা উন্মত্ত ভোগবাদী মনোভাবের হয়ে উঠছে। এমনিতেই নাচুনী বুড়ি, বিদায়ের আগে তার উপরে দশ হাজার স্কয়ার ফিটের ঢোলের বাড়ি দিয়ে গেলেন রিজোওয়ানা আপারা। তার কাছে আমার প্রশ্ন রইলো আমাদের দেশ সহ বিশ্ব জুড়েই প্রাণ প্রকৃতি ও পরিবেশের যে সংকট তার সূচনা তো হয়েছে মানুষের ভোগবাদী মনোভাব থেকে। ভোগবাদকে তুষ্ট করে আপনার পরিবেশ আন্দোলন কি অগ্রসর হতে পারবে?
ধান বানতে যেয়ে শিবের গীত হয়ে গেলো। আলোচনা করতে চাইছিলাম হঠাৎ করে জামায়ত ইসলাম এত কিছু বাদ দিয়ে রিজওয়ানা হাসানকে কেনো টার্গেট করলো? রিজওয়ানা হাসান নাকি বলেছেন, ‘আমরা তো ধর্মীয় উগ্রবাদীদের মেইনস্ট্রিমে আসতে দেইনি’। এতো বড় অসত্য কথা উনি কি ভাবে বললেন? তাদের ১৮ মাসের শাসনের ফলশ্রুতিতেই তো আজ বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী ধর্মীয় উগ্রবাদীরা পার্লামেন্টে প্রধান বিরোধী দল। এর চেয়ে প্রধান স্ট্রীম আর কি হতে পারে? তাদেরকে প্রধান বিরোধী দল করার উদ্দেশেই তো আপনারা যমুনার সামনে জামাত-হেফাজত- এনসিপিকে দিয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে মবউল্লোম্ফন আয়োজনের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রচন্ড গরমে মব জমায়েতকারীদের কষ্ট লাঘব করার জন্য তাদের ওপর শীতল পানি বর্ষণের ব্যবস্থা করলেন। অতপর আপনারা সরকারি আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন এবং শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন করলেন। আওয়ামী লীগের কেউ যাতে স্বতন্ত্র প্রার্থীও হতে না পারে সে জন্য স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়ে দিলেন ‘মামলা লাগবে না, আওয়ামী লীগ পাইলেই ধরো’।
আওয়ামী লীগ দল তো কোনো কালে করি নাই, কোনোদিন তাদের ভোটও দেইনি, কিন্তু এটা বুঝি এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের দ্বিতীয় স্তরের নেতাদেরকে দিয়ে মুক্ত পরিবেশে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারলে বিরোধী দল তারাই হতো। এটা জামাত-এনসিপিও বুঝে। তাই নির্বাচনটা আওয়ামীলীগবিহীন করা হলো। যেমনটা বিগত সময়ের নির্বাচনে ভিন্ন কৌশলে বিএনপি বিহীন নির্বাচনের আয়োজন করে থাকতো আওয়ামী লীগ সরকার।
জামাত-হেফাজত-এনসিপি’র জন্য এত কিছু করার পরে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে বিদায় নিয়ে রিজওয়ানা হাসান ফিরে এসেছেন তার পরিবেশ আন্দোলনে, নারী আন্দোলনে। নারী বিরোধী, নারী অধিকার বিরোধী শক্তিকে ১৮ মাস যাবত মদত দিয়ে মেইনস্ট্রিম ধারায় নিয়ে আসার ‘করিৎকর্মা উপদেষ্টা পরিষদে’ তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছেন। এখন নারীদের মাঝে ফিরে এসে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার জন?্য নানা কথা বলতে যেয়ে জামাতের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এই নারী বিরোধী মব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আপনারা কখনোই কোনো ব্যবস্থা নেন নি বরং অভিযোগ আছে উস্কে দিয়েছেন। রিজওয়ানা আপা, আওয়ামী লীগ দমনের নামে আপনারা জেনে-বুঝেই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করেছেন।
আওয়ামী লীগ দমনের নামে আপনাদের সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধের সব স্মৃতি চিহ্নকে মুছে ফেলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের আয়োজন পর্বের ধানমন্ডি ৩২নং এর ঐতিহাসিক বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরানো হয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা নির্যাতন করা হয়েছে, মন্দির, মাজার ভাঙা হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি আক্রমণের স্বীকার হয়েছে নারী স্বাধীনতা। আপনাদের সরকারের আমলে জামাত সরাসরি ঘোষণা করছে ‘নারীর নেতৃত্ব কোরআনের পরিপন্থি। নারীদের পরিচালনা করবে পুরুষ। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, পুরুষ হলো নারীর পরিচালক।’ তারা আরো ঘোষনা করছে, ‘যারা ঘরের কাজ করবেন, তাদের রত্নগর্ভা মা হিসেবে সম্মানিত করা হবে’। অর্থাৎ ঘরে বন্দী থেকে গৃহকর্মে নিয়োজিত থাকলেই জামায়াত নারীকে বিশেষ সম্মান দেবে। আপনাদের আমল ছাড়া আর কখনও জামায়াত প্রকাশ্যে সরাসরি এভাবে নারীবিদ্ধেষী কথাবার্তা বলতে সাহস পেয়েছে?
আর সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো আপনাদের সমর্থিত তরুণদের দলের নেতৃত্ব, যাদের ডাকে জুলাই আন্দোলনে রাজপথে নেমে এসেছিলেন লাখো তরুণী তাদের নারী সংগঠন ‘নারী শক্তি’র সম্মেলনে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিনে ‘পুরুষ হলো নারীর পরিচালক’ ঘোষণাকারী সংগঠন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের মানবসম্পদ ও আইন বিষয়ক সেক্রেটারি সাবিকুন নাহার মুন্নী অতিথি হিসেবে এসে একই ধরনের বক্তব্য রেখেছেন। এই হলো ‘জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক ঐক্য নয়, শুধু মাত্র নির্বাচনী ঐক্যের’ প্রকৃত চেহারা। আপনাদের সমর্থনে পরিপুষ্ট তরুণদের দলও জামাতের হয়ে রাজনীতির খেলায় নেমেছে। আপনারা এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে গেছেন যে, ইউনেস্কো স্বীকৃত বাংলাদেশের স্বাধীনতার অমর কাব্য ৭ মার্চের ভাষণ বাজালে বা শুনলে মব সন্ত্রাসীদের হামলার স্বীকার হতে হয়। হামলাকারীদের কিছুই হয় না বরং আক্রান্তকে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার হতে হয়। অতীতে এ ভাষনের অতিব্যবহার বা অপব্যবহার হয়েছে বলে কি এ ঐতিহাসিক ভাষণ আর কখনো শোনা যাবে না? আপনারা এমন অবস্থা করে গেছেন যে ৩২ নং বাড়িতে কেউ ফুল নিয়ে যেতে পারবে না। এই ঐতিহাসিক বাড়িটি কেউ পরিদর্শন করতে গেলেও মবের শিকারে পরিণত হতে হবে।
আপনাদের আমলেই ছায়ানট, উদিচী, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা, অগ্নি সংযোগ ও লুটপাট হয়েছে। আপনারা জাতীয় কবির সমাধির মর্যাদা ও গাম্ভীর্যকে ক্ষুণ্য করার ব্যবস্থা করেছেন। ৫ আগস্টের পর থেকে এ সব কাজ তৌহিদী জনতা এবং ইনকিলাব, ইনসাফ, জুলাই- এরকম নানা মঞ্চের নামে করা হয়েছে আর কলকাঠি নেড়েছে এবং অর্থ ও জনবল সরবরাহ করেছে জামায়াত। আবার আপনাদের সংস্কার কমিশনের বৈঠকে এসে তারা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেছে। জামাতের অবস্থা হচ্ছে, ‘ মুখে মধুর চাষ, অন্তরে করলার আবাস, বুঝতে বুঝতে আপনাদের গেলো ১৮ মাস, ততো দিনে পাকা বাঁশ।’
এই আঠারো মাসে জামায়াতকে, নারী স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের, মব সন্ত্রাসীদেরকে আস্কারা দিয়ে আপনারা পাকা বাঁশে পরিণত করেছেন। বাঁশ বাকা করতে বা নোয়াতে চাইলে কাঁচা থাকতেই তা করতে হয়। তা না করে এখন তাদেরকে নোয়াতে চাইছেন, তবে তো ঠাস ঠাস করে উঠবেই। যথাসময়ে ব্যবস্থা না নিলে, পরে পস্তাতেই হয়। কথায় আছে না, ‘কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]