alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

কৃষিঋণ মওকুফ: কৃষকের স্বস্তি, বাস্তবায়নে দরকার সুশাসন

মিহির কুমার রায়

: সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬

কৃষকের স্বার্থরক্ষায় নবনির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিষয়টি উল্লেখ ছিল। সেখানে বলা হয়েছে, ঋণ মওকুফের সুবিধা ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের কৃষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এতে বলা হয়েছে, এখন থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ নেয়ার পর সুদ যতই হোক না কেন, সুদ-আসলসহ পুরো ঋণই মওকুফ করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক মিলিয়ে সুদসহ বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা সরাসরি উপকৃত হবেন। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণের দায় থেকে মুক্ত হতে পারবেন, যা তাদের কর্মস্পৃহা বাড়াবে এবং দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এখন ঋণের কিস্তি বাবদ যে অর্থ কৃষকের ব্যয় হতো, সেই অর্থ তারা উন্নত মানের বীজ বা আধুনিক সেচ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারবেন। মাথার ওপর ঋণের বোঝা না থাকায় কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নতুন উদ্যমে চাষাবাদ শুরু করতে সক্ষম হবেন। এছাড়া এই মওকুফ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃষকদের ক্রেডিট রেকর্ড বা ঋণমান ভালো হবে। ফলে তারা ব্যাংক থেকে পুনরায় স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ নিতে পারবেন, যা তাদের স্থানীয় মহাজনী ঋণের উচ্চ সুদের হাত থেকে রক্ষা করবে। ঋণ মওকুফের প্রায় তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে গ্রাম থেকে নগরমুখী অভিবাসন কমতে পারে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরতে পারে। কৃষিঋণ মওকুফে ব্যাংকের অবস্থান অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফের অর্থ পাবে ১৫টি ব্যাংক। এর মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক আটটি। এগুলো হলো- কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এবং আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক। এছাড়া ৭টি বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে। এগুলো হলো-ইসলামী ব্যাংক, আল- আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্র?্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক। রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ৮টি ব্যাংক ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৭ জন কৃষকের কৃষি ঋণের বিপরীতে পাবে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি ৭টি ব্যাংক ৪৫১ জন কৃষকের ঋণের বিপরীতে পাবে ৩৯ লাখ টাকা। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মওকুফ সুবিধার আওতায় থাকা ১৫টি ব্যাংকের দেয়া কৃষিঋণের আসল ৯১৭ কোটি টাকা এবং সুদ ৭৮২ কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর অনিশ্চিত (ইন্টারেস্ট সাসপেন্স) হিসাবে রয়েছে আরও ১৩৮ কোটি টাকা, যা মওকুফের হিসাব থেকে বাদ রাখা হয়েছে। খেলাপি হওয়ার পর অর্জিত সুদ অনিশ্চিত হিসেবে জমা রাখা হয়, যা ব্যাংকের প্রকৃত আয় হিসেবে গণ্য হয় না। আসল ও সুদের পাশাপাশি মওকুফের আওতায় রাখা হয়েছে ঋণ আদায়ে বিভিন্ন ব্যাংকের করা মামলার বিপরীতে আইনি খরচও। কৃষি ব্যাংক, রাকাব, সোনালী, অগ্রণী ও জনতাসহ সাতটি ব্যাংকের মামলার বিপরীতে আইনি খরচ বাবদ সরকার থেকে দেয়া হবে ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, মওকুফ সুবিধার আওতায় ৬ লাখ ৮৯ হাজার ৬২৮ জন কৃষকের বিপরীতে সুদসহ ঋণের টাকা বাবদ কৃষি ব্যাংক পাবে ৮২০ কোটি ২২ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। ৩ লাখ ৪ হাজার ৪৪৭ জন কৃষকের বিপরীতে এ ব্যাংক পাবে ৩৫০ কোটি ১২ লাখ টাকা। রাকাবের কাছ থেকে এই সুবিধা পাবেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৪ জন কৃষক। এ জন্য সরকারের কাছ থেকে ব্যাংকটি পাবে ১৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২২৮ কৃষকের ঋণ মওকুফের বিপরীতে সবচেয়ে বেশি ২০ লাখ ৯৮ হাজার টাকা পাবে ইসলামী ব্যাংক। পরের অবস্থানে আছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। ১৯৩ কৃষকের ঋণের বিপরীতে এ ব্যাংক পাবে ১৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা : অর্থ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ছক তৈরি করবে। সেই ছকের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো তাদের তথ্য অর্থ বিভাগে পাঠাবে। তার আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনারোপিত সুদের হিসাব করে ব্যাংকগুলো তাদের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ঋণ মওকুফের অনুমোদন নেবে। এসব হিসাবে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন করে আর কোনো সুদ আরোপ করা যাবে না এবং ব্যাংকের খতিয়ান (লেজার) থেকে তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করতে হবে। ঋণসংক্রান্ত মামলা থাকলে স্ট্যাম্প মাশুলসহ অন্যান্য খরচ সরকার বহন করবে, তবে আইনজীবীর খরচ বহন করবে না। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, অনিশ্চিত হিসাবে থাকা সুদ ও আসলের দায় গ্রহণের সুযোগ সরকারের নেই। বিষয়টি সরকার ও ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করা হবে। ব্যাংকগুলো ঋণ মওকুফের যে তথ্য দেবে, তা আবার নিরীক্ষা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিরীক্ষিত চূড়ান্ত হিসাব পরে সরকারের কাছে পাঠানো হবে এবং সরকার পর্যায়ক্রমে সেই দায় পরিশোধ করবে। এরপর ব্যাংকগুলো মামলা প্রত্যাহার করবে এবং প্রতি মাসে মামলা প্রত্যাহারের তথ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে জানাবে।

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ওপর প্রভাব : কর্তৃপক্ষ বলছেন, ঋণ মওকুফের এই সহায়তা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর তাতক্ষণিক আর্থিক চাপ কমাবে। এতে তারা গুণগত মানসম্পন্ন বীজ, সেচ ও কৃষিযন্ত্রপাতিসহ প্রয়োজনীয় খাতে বিনিয়োগ করতে পারবেন।

ঋণ মওকুফের পাশাপাশি সরকার স্মার্ট কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষকদের ডিজিটালভাবে নিবন্ধন ও সহায়তা দেয়ার জন্য টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের মডেলে এই কার্ড তৈরি করা হচ্ছে। প্রথমে নির্বাচিত অঞ্চলে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এটি চালু করা হবে, পরে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে।

কার্ডটির লক্ষ্য হলো কৃষকদের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করা, যেখানে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও মোবাইল ফোন নম্বর সংযুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি সুবিধা দেয়া সম্ভব হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপ কমবে। এই স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ভর্তুকি, কৃষিঋণ ও নগদ প্রণোদনা সরাসরি পাবেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সুফল নির্ভর করবে সহায়ক সংস্কারের ওপর। যেমন- ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ, ফসল বীমা এবং কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা। ঋণ মওকুফ ও স্মার্ট কৃষক কার্ড যৌথভাবে কৃষি খাতকে শক্তিশালী করতে পারে। নিঃসন্দেহে এটি সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকেও আরও জোর দিতে হবে। দেশের খাদ্য উৎপাদন, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বিপুল কর্মসংস্থান তৈরিতে কৃষি খাতের ভূমিকা অপরিসীম। ফলে এই খাতের মূল কারিগর কৃষকের স্বার্থরক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের বড় হাতিয়ার হলো বাজেট বরাদ্দের সুষম বণ্টন এবং কৃষি অর্থায়নের সব সুযোগ-সুবিধা নীতিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে কৃষি ঋণ বিতরণ ও ঋণের সুষম বণ্টনের বিষয়টি তদারকি করতে হবে সরকারকে। কারণ বাস্তবে ব্যাংকগুলো অনেক সময় সরাসরি কৃষকদের ঋণ দিতে আগ্রহী হয় না। কৃষিঋণ পেতে হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কিছু আনুষ্ঠানিকতা ও শর্তপূরণ করতে হয়, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে অনেক সময় সম্ভব হয় না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এনজিও, ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সমবায় থেকে ঋণ নিতে হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে ঋণ পাওয়া সহজ হলেও সুদের হার অনেক বেশি। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, এনজিওতে ঋণের সুদহার প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় প্রায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি। তাই এনজিও বা সমবায় থেকে ঋণ নিয়ে কৃষক প্রকৃতপক্ষে কতটা লাভবান হন, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এক্ষেত্রে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতাও দায়ী। প্রতি বছর কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র বলছে, ব্যাংকগুলোর নানা কৌশলের কারণে কৃষি ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশই কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। অনেক সময় অন্য খাতে ঋণ দিয়ে তা কৃষিঋণ হিসেবে দেখানো হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাত নিয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়া অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না-এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি ও ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়াও যেন সহজ ও ভোগান্তিহীন হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

[লেখক: সাবেক ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]

নারীর অধিকার নিশ্চিত হলে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব

‘কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস!’

ইরানে হামলা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও পরিণতি

ঈদবাজারে ভোক্তার অসহায়ত্ব

নবযাত্রায় কেমন বাংলাদেশ চাই

আন্তর্জাতিক নারী দিবস

বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা

নতুন গভর্নর অপরিহার্য ছিল

উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের বিবাহের রীতি ও প্রথা

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদ: বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কী?

না হয় রহিতে কাছে!

আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ভূমি কমিশন কেন জরুরি?

উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির চিত্র

জোর যার, মুল্লুক তার: সাম্রাজ্যের নতুন পোশাক

‘পানিয়ালীর পোলার বইমেলা’

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

ইরান ইস্যুতে মহাশক্তির পরীক্ষা

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

কৃষিঋণ মওকুফ: কৃষকের স্বস্তি, বাস্তবায়নে দরকার সুশাসন

মিহির কুমার রায়

সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬

কৃষকের স্বার্থরক্ষায় নবনির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিষয়টি উল্লেখ ছিল। সেখানে বলা হয়েছে, ঋণ মওকুফের সুবিধা ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের কৃষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এতে বলা হয়েছে, এখন থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ নেয়ার পর সুদ যতই হোক না কেন, সুদ-আসলসহ পুরো ঋণই মওকুফ করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক মিলিয়ে সুদসহ বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা সরাসরি উপকৃত হবেন। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণের দায় থেকে মুক্ত হতে পারবেন, যা তাদের কর্মস্পৃহা বাড়াবে এবং দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এখন ঋণের কিস্তি বাবদ যে অর্থ কৃষকের ব্যয় হতো, সেই অর্থ তারা উন্নত মানের বীজ বা আধুনিক সেচ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারবেন। মাথার ওপর ঋণের বোঝা না থাকায় কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নতুন উদ্যমে চাষাবাদ শুরু করতে সক্ষম হবেন। এছাড়া এই মওকুফ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃষকদের ক্রেডিট রেকর্ড বা ঋণমান ভালো হবে। ফলে তারা ব্যাংক থেকে পুনরায় স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ নিতে পারবেন, যা তাদের স্থানীয় মহাজনী ঋণের উচ্চ সুদের হাত থেকে রক্ষা করবে। ঋণ মওকুফের প্রায় তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে গ্রাম থেকে নগরমুখী অভিবাসন কমতে পারে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরতে পারে। কৃষিঋণ মওকুফে ব্যাংকের অবস্থান অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফের অর্থ পাবে ১৫টি ব্যাংক। এর মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক আটটি। এগুলো হলো- কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এবং আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক। এছাড়া ৭টি বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে। এগুলো হলো-ইসলামী ব্যাংক, আল- আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্র?্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক। রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ৮টি ব্যাংক ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৭ জন কৃষকের কৃষি ঋণের বিপরীতে পাবে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি ৭টি ব্যাংক ৪৫১ জন কৃষকের ঋণের বিপরীতে পাবে ৩৯ লাখ টাকা। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মওকুফ সুবিধার আওতায় থাকা ১৫টি ব্যাংকের দেয়া কৃষিঋণের আসল ৯১৭ কোটি টাকা এবং সুদ ৭৮২ কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর অনিশ্চিত (ইন্টারেস্ট সাসপেন্স) হিসাবে রয়েছে আরও ১৩৮ কোটি টাকা, যা মওকুফের হিসাব থেকে বাদ রাখা হয়েছে। খেলাপি হওয়ার পর অর্জিত সুদ অনিশ্চিত হিসেবে জমা রাখা হয়, যা ব্যাংকের প্রকৃত আয় হিসেবে গণ্য হয় না। আসল ও সুদের পাশাপাশি মওকুফের আওতায় রাখা হয়েছে ঋণ আদায়ে বিভিন্ন ব্যাংকের করা মামলার বিপরীতে আইনি খরচও। কৃষি ব্যাংক, রাকাব, সোনালী, অগ্রণী ও জনতাসহ সাতটি ব্যাংকের মামলার বিপরীতে আইনি খরচ বাবদ সরকার থেকে দেয়া হবে ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, মওকুফ সুবিধার আওতায় ৬ লাখ ৮৯ হাজার ৬২৮ জন কৃষকের বিপরীতে সুদসহ ঋণের টাকা বাবদ কৃষি ব্যাংক পাবে ৮২০ কোটি ২২ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। ৩ লাখ ৪ হাজার ৪৪৭ জন কৃষকের বিপরীতে এ ব্যাংক পাবে ৩৫০ কোটি ১২ লাখ টাকা। রাকাবের কাছ থেকে এই সুবিধা পাবেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৪ জন কৃষক। এ জন্য সরকারের কাছ থেকে ব্যাংকটি পাবে ১৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২২৮ কৃষকের ঋণ মওকুফের বিপরীতে সবচেয়ে বেশি ২০ লাখ ৯৮ হাজার টাকা পাবে ইসলামী ব্যাংক। পরের অবস্থানে আছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। ১৯৩ কৃষকের ঋণের বিপরীতে এ ব্যাংক পাবে ১৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা : অর্থ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ছক তৈরি করবে। সেই ছকের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো তাদের তথ্য অর্থ বিভাগে পাঠাবে। তার আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনারোপিত সুদের হিসাব করে ব্যাংকগুলো তাদের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ঋণ মওকুফের অনুমোদন নেবে। এসব হিসাবে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন করে আর কোনো সুদ আরোপ করা যাবে না এবং ব্যাংকের খতিয়ান (লেজার) থেকে তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করতে হবে। ঋণসংক্রান্ত মামলা থাকলে স্ট্যাম্প মাশুলসহ অন্যান্য খরচ সরকার বহন করবে, তবে আইনজীবীর খরচ বহন করবে না। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, অনিশ্চিত হিসাবে থাকা সুদ ও আসলের দায় গ্রহণের সুযোগ সরকারের নেই। বিষয়টি সরকার ও ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করা হবে। ব্যাংকগুলো ঋণ মওকুফের যে তথ্য দেবে, তা আবার নিরীক্ষা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিরীক্ষিত চূড়ান্ত হিসাব পরে সরকারের কাছে পাঠানো হবে এবং সরকার পর্যায়ক্রমে সেই দায় পরিশোধ করবে। এরপর ব্যাংকগুলো মামলা প্রত্যাহার করবে এবং প্রতি মাসে মামলা প্রত্যাহারের তথ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে জানাবে।

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ওপর প্রভাব : কর্তৃপক্ষ বলছেন, ঋণ মওকুফের এই সহায়তা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর তাতক্ষণিক আর্থিক চাপ কমাবে। এতে তারা গুণগত মানসম্পন্ন বীজ, সেচ ও কৃষিযন্ত্রপাতিসহ প্রয়োজনীয় খাতে বিনিয়োগ করতে পারবেন।

ঋণ মওকুফের পাশাপাশি সরকার স্মার্ট কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষকদের ডিজিটালভাবে নিবন্ধন ও সহায়তা দেয়ার জন্য টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের মডেলে এই কার্ড তৈরি করা হচ্ছে। প্রথমে নির্বাচিত অঞ্চলে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এটি চালু করা হবে, পরে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে।

কার্ডটির লক্ষ্য হলো কৃষকদের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করা, যেখানে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও মোবাইল ফোন নম্বর সংযুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি সুবিধা দেয়া সম্ভব হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপ কমবে। এই স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ভর্তুকি, কৃষিঋণ ও নগদ প্রণোদনা সরাসরি পাবেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সুফল নির্ভর করবে সহায়ক সংস্কারের ওপর। যেমন- ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ, ফসল বীমা এবং কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা। ঋণ মওকুফ ও স্মার্ট কৃষক কার্ড যৌথভাবে কৃষি খাতকে শক্তিশালী করতে পারে। নিঃসন্দেহে এটি সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকেও আরও জোর দিতে হবে। দেশের খাদ্য উৎপাদন, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বিপুল কর্মসংস্থান তৈরিতে কৃষি খাতের ভূমিকা অপরিসীম। ফলে এই খাতের মূল কারিগর কৃষকের স্বার্থরক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের বড় হাতিয়ার হলো বাজেট বরাদ্দের সুষম বণ্টন এবং কৃষি অর্থায়নের সব সুযোগ-সুবিধা নীতিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে কৃষি ঋণ বিতরণ ও ঋণের সুষম বণ্টনের বিষয়টি তদারকি করতে হবে সরকারকে। কারণ বাস্তবে ব্যাংকগুলো অনেক সময় সরাসরি কৃষকদের ঋণ দিতে আগ্রহী হয় না। কৃষিঋণ পেতে হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কিছু আনুষ্ঠানিকতা ও শর্তপূরণ করতে হয়, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে অনেক সময় সম্ভব হয় না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এনজিও, ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সমবায় থেকে ঋণ নিতে হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে ঋণ পাওয়া সহজ হলেও সুদের হার অনেক বেশি। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, এনজিওতে ঋণের সুদহার প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় প্রায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি। তাই এনজিও বা সমবায় থেকে ঋণ নিয়ে কৃষক প্রকৃতপক্ষে কতটা লাভবান হন, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এক্ষেত্রে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতাও দায়ী। প্রতি বছর কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র বলছে, ব্যাংকগুলোর নানা কৌশলের কারণে কৃষি ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশই কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। অনেক সময় অন্য খাতে ঋণ দিয়ে তা কৃষিঋণ হিসেবে দেখানো হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাত নিয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়া অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না-এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি ও ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়াও যেন সহজ ও ভোগান্তিহীন হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

[লেখক: সাবেক ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]

back to top