আনোয়ারুল হক
এনসিপির পৃষ্ঠপোষক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই সনদ ঘোষণার অনুষ্ঠানে বলেছিলেন এবার আমরা সভ্য হলাম। ইউনূসও রাজনীতিবিদদের মতো বক্তৃতা দিয়ে দিলেন। সেদিন এনসিপি ওই অনুষ্ঠান বর্জন করে এবং জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগ পর্যন্ত তারা ‘সনদে’ স্বাক্ষর দেয় নাই। এনসিপি-বিহীন অনুষ্ঠানে এনসিপির স্বাক্ষর ছাড়া সনদ ঘোষণা করা হলো। তাহলে আমরা কীভাবে সভ্য হলাম! না আমরা তখনও সভ্য হইনি। সভ্য হতে হলে আমাদের ঘরে ঘরে পাটওয়ারী লাগবে।
এনসিপি নামক দলটির আওয়ামী লীগ বিরোধিতা ছাড়া নিজের রাজনৈতিক আদর্শ কি- তা তারা নিজেরাই জানে বলে মনে হয় না। কখনও জামায়াতকে ‘পালিশ’ করছেন, আবার কখনও বিএনপিকে ‘ধোলাই’ করছেন। নির্বাচনের আগে দুই দলের কাছেই ধরনা দিলেন। বিএনপি অপেক্ষা জামায়াত আসন বেশি দেয়ায় জামায়াতের সঙ্গে গেলেন। বললেন, এটা শুধু নির্বাচনী ঐক্য, দল দাঁড় করাইতে সংসদে সিট লাগবে, নির্বাচনের পরে বাউন্স ব্যাক করবেন। কিসের বাউন্স ব্যাক, জামায়াত জোটের হুইপ পদে আসীন হলেন
এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বরিশালে এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে ঘরে ঘরে পাটওয়ারী তৈরি হবে। কেন ঘরে ঘরে পাটওয়ারী তৈরি করতে হবে? কারণ এবারের নির্বাচনী প্রচার অভিযানে তার মতো পারঙ্গমতা আর কেউ প্রদর্শন করতে পারেননি। নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত সবার থেকে এগিয়ে ছিলেন ‘রাজুতে আয়’-এর পারঙ্গম শিল্পী হাসনাত আব্দুল্লাহ। কিন্তু নির্বাচনে হাসনাতের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাওয়ায় তাকে আর বিশেষ পারঙ্গমতা প্রদর্শন করতে হয়নি। অবশ্য সংসদ সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণের সময় সাধারণ পোশাকের বদলে স্পোর্টস জার্সি পরে এসে বুঝিয়ে দিলেন সংসদে তিনি ‘মব খেলোয়াড়’ হিসেবেই এসেছেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন জুলাই আন্দোলনের পরে কথায় কথায় রাত বিরাতে ‘রাজুতে আয়’ ডাক দিয়ে মব সৃষ্টিতে যে পারঙ্গমতা দেখিয়েছিলেন, সংসদেও ‘অপেশাদার’ ও ‘অসম্মানজনক’ আচরণের মধ্য দিয়ে তা তিনি অব্যাহত রাখবেন।
তারপরও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সভ্য-ভদ্রতার প্রতীক হিসেবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকেই এগিয়ে রেখেছেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নির্বাচনী অভিযানে জামায়াত-হেফাজতকে নিয়ে মাঠে নামলেও, গত বছরই ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পথরেখা’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় পাটওয়ারী জামায়াতে ইসলামীর ইসলামকে ‘মওদুদীর ইসলাম’ বলে আখ্যায়িত করেন। আর হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে বলেন, হেফাজত কওমি অঙ্গনে ঘুরে ঘুরে আলেমদের ‘ট্যাবলেট খাইয়ে’ ইসলামের নামে আগামী নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেয়ার পাঁয়তারা করছে। তিনি জামায়াত ইসলামকে দিল্লির এক্সটেনশন হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন ধর্মের নামে চেতনা ব্যবসা করছে জামায়াত ইসলাম। তারা অতীতে ধানের শীষে ভোট করেছে, এখন তাদের পাখনা গজিয়েছে।
জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী বা আদর্শিক ঐক্য কোনোটাই তার এ সব বক্তব্যের সঙ্গে যায় না। আবার এ বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি ফেসবুকে পোস্ট দেন, ‘১৩ ফেব্রুয়ারি ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি জামায়াত আমির প্রধানমন্ত্রী হইছেন, সেটা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হবে।’ বাহ্! দিল্লির ‘এক্সটেনশনের প্রতিনিধি’ প্রধানমন্ত্রী হলে তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হবে। আবার গত বছর ২১ মার্চ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেয়া একটি পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লিখেছিলেন, ‘গত ৫৩ বছরে জামায়াতে ইসলামীকে বারংবার রাজনীতিতে পুনর্বাসন করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। ‘সেনা-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল লুটকারী জিয়া’ জনগণের অভিপ্রায়ের তোয়াক্কা না করে গায়ের জোরে এ অবৈধ শক্তিকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়। জেনারেল জিয়ার হাত ধরেই এ অবৈধ কাজ সম্পন্ন হয়।’ সমালোচনার মুখে পড়ে অবশ্য পোস্টটি ডিলেট করেন তিনি।
যা হোক নির্বাচনী মাঠে ও নির্বাচনের পরেও হাসনাতের মতো জার্সি না পরলেও তিনিই এনসিপির ক্যাপ্টেন। কিন্তু ক্যাপ্টেন কি সুস্থ আছেন? ওপরে উল্লেখিত তার স্ববিরোধী বয়ানসমূহ দেখে তো মনে হয় না তিনি সুস্থ মস্তিষ্কের। মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে তিনি নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিলেন। হেরে গেলেও ভালো ভোট পেয়েছেন। কিন্তু লড়াইটা তো হতে হবে রাজনৈতিক। কে কত কুৎসা প্রচার করতে পারেন- সেটাই দেখছি তরুণ দলের নেতা হয়ে ওঠার প্রধান যোগ্যতা। বিএনপির প্রবীণ নেতা মীর্জা আব্বাস নিশ্চয়ই সাধু পুরুষ নন। তার অনেক সমালোচনা থাকতেই পারে। নিজ দলের মাঝেও আছে। তার সমালোচনা করা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু যেভাবে, যে পদ্ধতিতে, যে ভাষায় পাটওয়ারী সারাক্ষণ লেগে আছেন তাতে মনে হয়েছে তিনি পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া-ফাসাদ বা বড় ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছেন। এমনকি ইফতারি ও মিলাদ মাহফিলের বক্তব্যেও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একদিকে আল্লাহ খোদার নাম নিচ্ছেন, আর একই সঙ্গে ছাপার অযোগ্য অশ্লীল ভাষায় মীর্জা আব্বাসকে গালাগাল করছেন।
এ সব বক্তব্য পাটওয়ারীর ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়, গোটা এনসিপিরই বক্তব্য। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এনসিপি নামক দলটির আওয়ামী লীগ বিরোধিতা ছাড়া নিজের রাজনৈতিক আদর্শ কি- তা তারা নিজেরাই জানে বলে মনে হয় না। কখনও জামায়াতকে ‘পালিশ’ করছেন, আবার কখনও বিএনপিকে ‘ধোলাই’ করছেন। নির্বাচনের আগে দুই দলের কাছেই ধরনা দিলেন। বিএনপি অপেক্ষা জামায়াত আসন বেশি দেওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে গেলেন। বললেন, এটা শুধু নির্বাচনী ঐক্য, দল দাঁড়া করাইতে সংসদে সিট লাগবে, নির্বাচনের পরে বাউন্স ব্যাক করবেন। কিসের বাউন্স ব্যাক, জামায়াত জোটের হুইপ পদে আসীন হলেন। এটা তো সবাই বুঝে হুইপকে হুইপ করবে জামায়াত। অর্থাৎ এনসিপি অনেকটা প্রকাশ্যেই জামায়াতের বিটিমের ভূমিকায় নেমে গেল।
এরই মাঝে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের বিরোধীতাকারী এনসিপি নেত্রী সামান্থা শারমিন সুর পাল্টিয়ে খুব গর্ব করে এক হাস্যকর দাবি করেছেন যে, ‘এনসিপিই এখন জামায়াতকে লিড দিচ্ছে’। জামায়াতের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য নানা টিম আছে। ইতোপূর্বে তারা বিপদ-আপদে প্রকাশ্য রাজনীতিতে যাতে থাকা যায় সেজন্য এবি পার্টি নামে ফ্রন্ট খুলেছিল। এনসিপিকে পেয়ে অবশ্য এবি পার্টির কদর কমে গেছে। তাই এনসিপিই এখন ‘লিডে’ আছে। এমন লিডে আছে যে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্থাপিত শোক প্রস্তাবে দন্ডপ্রাপ্ত ‘৭১-এর যুদ্ধ অপরাধীদের নাম এসেছে।
মুহাম্মদ ইউনূস তরুণ দলকে এবং তার নেতৃত্বকে কী পৃষ্ঠপোষকতা করলেন, যে দলটি ও দলের নেতারা এমন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে? এর দায় তো তাকেই নিতে হবে। হতে পারে তারা ট্রমায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাদের চিকিৎসার জন্য ‘রিহ্যাব সেন্টার’-এ না পাঠিয়ে তিনি তাদের বানিয়ে দিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা। তারা আরও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লেন। ভারসাম্যহীন রোগীরা নিজ ইচ্ছায় চিকিৎসা নিতে চায় না। ক্ষেত্র বিশেষে বল প্রয়োগ করে চিকিৎসা স্থলে নিয়ে যেতে হয়। ইউনূস সাহেব যে কাজটি করেননি, সে কাজটি কাউকে না কাউকে তো করতে হবে। তাদের ভারসাম্যহীনতাকে ব্যবহার না করে, তাদের বর্তমান মুরুব্বি জামায়াত ইসলামের আমির শফিকুল ইসলাম সাহেব এ উদ্যোগটি নিতে পারেন। অন্যথায় তো এসব বিষয় আইন আদালত ও আইনানুগ কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। হাজিরার জন্য সমন জারি হয়েছে। আদালতে আবার এ সব অশ্লীল শব্দ নিয়ে উভয় পক্ষের আইনজীবীরা তর্ক-বিতর্ক করবেন এবং আরও দুর্গন্ধ ছড়াবে। আর আমরা প্রকৃতই সভ্য হয়ে উঠব!
আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় আমরা পুরনো দিনের মানুষরা এনসিপির জুলাই যোদ্ধাদের ভাষা পড়তে ভুল করছি না তো। তাদের অশ্লীল এবং ঔদ্ধত্য শব্দভান্ডারই আধুনিক যুগের ভাষাকে সমৃদ্ধ করছে হয়তো বা। তাই পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে আমিও আমার এক বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথন তুলে ধরছি যা অশ্লীল না হলেও তার কাছাকাছি বা অপকথা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের বীরত্বগাথা, সরকারি-বেসরকারি বাহিনীর গুলি ও হামলায় অগণিত মৃত্যু, আহতের আর্তনাদ, স্বজনহারা পরিবারের মানুষগুলোর আহাজারি গোটা জাতির বিবেককে স্পর্শ করেছিল। এ পটভূমিতে আনু মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন নাগরিক সমাজ ও শিক্ষক নেটওয়ার্কের ডাকে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে দ্রোহযাত্রার ডাক দেয়া হয়। মিডিয়াতে প্রচারিত সংবাদে দ্রোহযাত্রার মিছিলে আমাকে দেখা যাওয়ায় আমার স্কুল জীবনের এক বন্ধু ফোনে আমাকে বলে, খুব তো মিছিল করছিস! পরিণতি ‘আজ বুঝবি না, বুঝবি কাল; পিছে থাবড়াবি, মারবি ফাল’। বিষয় হচ্ছে, গ্রাম দেশে ছেলেকে অতিরিক্ত শুকনো মরিচ ডলে পান্তা খেতে দেখে পিতা তাকে এ কথা বলে এটাই বুঝাতে চাইছেন যে, অতিরিক্ত শুকনা মরিচ দিয়ে পান্তা খাইতে খুব মজা লাগলেও আগামীকাল ভোরে মলত্যাগের সময় মলদ্বারের যন্ত্রণায় লাফ দিয়ে দিয়ে পেছন চাপড়াতে হবে। দ্রোহযাত্রায় যোগ দেয়ার এতদিন পরে কেন জানি বন্ধুর বলা অপকথাটি মনে পড়ছে। আমরা কি এখন ফাল মেরে পেছন চাপড়াতে চাপড়াতে সভ্য হয়ে উঠছি!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
আনোয়ারুল হক
শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
এনসিপির পৃষ্ঠপোষক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই সনদ ঘোষণার অনুষ্ঠানে বলেছিলেন এবার আমরা সভ্য হলাম। ইউনূসও রাজনীতিবিদদের মতো বক্তৃতা দিয়ে দিলেন। সেদিন এনসিপি ওই অনুষ্ঠান বর্জন করে এবং জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগ পর্যন্ত তারা ‘সনদে’ স্বাক্ষর দেয় নাই। এনসিপি-বিহীন অনুষ্ঠানে এনসিপির স্বাক্ষর ছাড়া সনদ ঘোষণা করা হলো। তাহলে আমরা কীভাবে সভ্য হলাম! না আমরা তখনও সভ্য হইনি। সভ্য হতে হলে আমাদের ঘরে ঘরে পাটওয়ারী লাগবে।
এনসিপি নামক দলটির আওয়ামী লীগ বিরোধিতা ছাড়া নিজের রাজনৈতিক আদর্শ কি- তা তারা নিজেরাই জানে বলে মনে হয় না। কখনও জামায়াতকে ‘পালিশ’ করছেন, আবার কখনও বিএনপিকে ‘ধোলাই’ করছেন। নির্বাচনের আগে দুই দলের কাছেই ধরনা দিলেন। বিএনপি অপেক্ষা জামায়াত আসন বেশি দেয়ায় জামায়াতের সঙ্গে গেলেন। বললেন, এটা শুধু নির্বাচনী ঐক্য, দল দাঁড় করাইতে সংসদে সিট লাগবে, নির্বাচনের পরে বাউন্স ব্যাক করবেন। কিসের বাউন্স ব্যাক, জামায়াত জোটের হুইপ পদে আসীন হলেন
এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বরিশালে এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে ঘরে ঘরে পাটওয়ারী তৈরি হবে। কেন ঘরে ঘরে পাটওয়ারী তৈরি করতে হবে? কারণ এবারের নির্বাচনী প্রচার অভিযানে তার মতো পারঙ্গমতা আর কেউ প্রদর্শন করতে পারেননি। নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত সবার থেকে এগিয়ে ছিলেন ‘রাজুতে আয়’-এর পারঙ্গম শিল্পী হাসনাত আব্দুল্লাহ। কিন্তু নির্বাচনে হাসনাতের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাওয়ায় তাকে আর বিশেষ পারঙ্গমতা প্রদর্শন করতে হয়নি। অবশ্য সংসদ সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণের সময় সাধারণ পোশাকের বদলে স্পোর্টস জার্সি পরে এসে বুঝিয়ে দিলেন সংসদে তিনি ‘মব খেলোয়াড়’ হিসেবেই এসেছেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন জুলাই আন্দোলনের পরে কথায় কথায় রাত বিরাতে ‘রাজুতে আয়’ ডাক দিয়ে মব সৃষ্টিতে যে পারঙ্গমতা দেখিয়েছিলেন, সংসদেও ‘অপেশাদার’ ও ‘অসম্মানজনক’ আচরণের মধ্য দিয়ে তা তিনি অব্যাহত রাখবেন।
তারপরও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সভ্য-ভদ্রতার প্রতীক হিসেবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকেই এগিয়ে রেখেছেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নির্বাচনী অভিযানে জামায়াত-হেফাজতকে নিয়ে মাঠে নামলেও, গত বছরই ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পথরেখা’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় পাটওয়ারী জামায়াতে ইসলামীর ইসলামকে ‘মওদুদীর ইসলাম’ বলে আখ্যায়িত করেন। আর হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে বলেন, হেফাজত কওমি অঙ্গনে ঘুরে ঘুরে আলেমদের ‘ট্যাবলেট খাইয়ে’ ইসলামের নামে আগামী নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেয়ার পাঁয়তারা করছে। তিনি জামায়াত ইসলামকে দিল্লির এক্সটেনশন হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন ধর্মের নামে চেতনা ব্যবসা করছে জামায়াত ইসলাম। তারা অতীতে ধানের শীষে ভোট করেছে, এখন তাদের পাখনা গজিয়েছে।
জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী বা আদর্শিক ঐক্য কোনোটাই তার এ সব বক্তব্যের সঙ্গে যায় না। আবার এ বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি ফেসবুকে পোস্ট দেন, ‘১৩ ফেব্রুয়ারি ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি জামায়াত আমির প্রধানমন্ত্রী হইছেন, সেটা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হবে।’ বাহ্! দিল্লির ‘এক্সটেনশনের প্রতিনিধি’ প্রধানমন্ত্রী হলে তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হবে। আবার গত বছর ২১ মার্চ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেয়া একটি পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লিখেছিলেন, ‘গত ৫৩ বছরে জামায়াতে ইসলামীকে বারংবার রাজনীতিতে পুনর্বাসন করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। ‘সেনা-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল লুটকারী জিয়া’ জনগণের অভিপ্রায়ের তোয়াক্কা না করে গায়ের জোরে এ অবৈধ শক্তিকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়। জেনারেল জিয়ার হাত ধরেই এ অবৈধ কাজ সম্পন্ন হয়।’ সমালোচনার মুখে পড়ে অবশ্য পোস্টটি ডিলেট করেন তিনি।
যা হোক নির্বাচনী মাঠে ও নির্বাচনের পরেও হাসনাতের মতো জার্সি না পরলেও তিনিই এনসিপির ক্যাপ্টেন। কিন্তু ক্যাপ্টেন কি সুস্থ আছেন? ওপরে উল্লেখিত তার স্ববিরোধী বয়ানসমূহ দেখে তো মনে হয় না তিনি সুস্থ মস্তিষ্কের। মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে তিনি নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিলেন। হেরে গেলেও ভালো ভোট পেয়েছেন। কিন্তু লড়াইটা তো হতে হবে রাজনৈতিক। কে কত কুৎসা প্রচার করতে পারেন- সেটাই দেখছি তরুণ দলের নেতা হয়ে ওঠার প্রধান যোগ্যতা। বিএনপির প্রবীণ নেতা মীর্জা আব্বাস নিশ্চয়ই সাধু পুরুষ নন। তার অনেক সমালোচনা থাকতেই পারে। নিজ দলের মাঝেও আছে। তার সমালোচনা করা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু যেভাবে, যে পদ্ধতিতে, যে ভাষায় পাটওয়ারী সারাক্ষণ লেগে আছেন তাতে মনে হয়েছে তিনি পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া-ফাসাদ বা বড় ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছেন। এমনকি ইফতারি ও মিলাদ মাহফিলের বক্তব্যেও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একদিকে আল্লাহ খোদার নাম নিচ্ছেন, আর একই সঙ্গে ছাপার অযোগ্য অশ্লীল ভাষায় মীর্জা আব্বাসকে গালাগাল করছেন।
এ সব বক্তব্য পাটওয়ারীর ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়, গোটা এনসিপিরই বক্তব্য। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এনসিপি নামক দলটির আওয়ামী লীগ বিরোধিতা ছাড়া নিজের রাজনৈতিক আদর্শ কি- তা তারা নিজেরাই জানে বলে মনে হয় না। কখনও জামায়াতকে ‘পালিশ’ করছেন, আবার কখনও বিএনপিকে ‘ধোলাই’ করছেন। নির্বাচনের আগে দুই দলের কাছেই ধরনা দিলেন। বিএনপি অপেক্ষা জামায়াত আসন বেশি দেওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে গেলেন। বললেন, এটা শুধু নির্বাচনী ঐক্য, দল দাঁড়া করাইতে সংসদে সিট লাগবে, নির্বাচনের পরে বাউন্স ব্যাক করবেন। কিসের বাউন্স ব্যাক, জামায়াত জোটের হুইপ পদে আসীন হলেন। এটা তো সবাই বুঝে হুইপকে হুইপ করবে জামায়াত। অর্থাৎ এনসিপি অনেকটা প্রকাশ্যেই জামায়াতের বিটিমের ভূমিকায় নেমে গেল।
এরই মাঝে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের বিরোধীতাকারী এনসিপি নেত্রী সামান্থা শারমিন সুর পাল্টিয়ে খুব গর্ব করে এক হাস্যকর দাবি করেছেন যে, ‘এনসিপিই এখন জামায়াতকে লিড দিচ্ছে’। জামায়াতের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য নানা টিম আছে। ইতোপূর্বে তারা বিপদ-আপদে প্রকাশ্য রাজনীতিতে যাতে থাকা যায় সেজন্য এবি পার্টি নামে ফ্রন্ট খুলেছিল। এনসিপিকে পেয়ে অবশ্য এবি পার্টির কদর কমে গেছে। তাই এনসিপিই এখন ‘লিডে’ আছে। এমন লিডে আছে যে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্থাপিত শোক প্রস্তাবে দন্ডপ্রাপ্ত ‘৭১-এর যুদ্ধ অপরাধীদের নাম এসেছে।
মুহাম্মদ ইউনূস তরুণ দলকে এবং তার নেতৃত্বকে কী পৃষ্ঠপোষকতা করলেন, যে দলটি ও দলের নেতারা এমন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে? এর দায় তো তাকেই নিতে হবে। হতে পারে তারা ট্রমায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাদের চিকিৎসার জন্য ‘রিহ্যাব সেন্টার’-এ না পাঠিয়ে তিনি তাদের বানিয়ে দিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা। তারা আরও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লেন। ভারসাম্যহীন রোগীরা নিজ ইচ্ছায় চিকিৎসা নিতে চায় না। ক্ষেত্র বিশেষে বল প্রয়োগ করে চিকিৎসা স্থলে নিয়ে যেতে হয়। ইউনূস সাহেব যে কাজটি করেননি, সে কাজটি কাউকে না কাউকে তো করতে হবে। তাদের ভারসাম্যহীনতাকে ব্যবহার না করে, তাদের বর্তমান মুরুব্বি জামায়াত ইসলামের আমির শফিকুল ইসলাম সাহেব এ উদ্যোগটি নিতে পারেন। অন্যথায় তো এসব বিষয় আইন আদালত ও আইনানুগ কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। হাজিরার জন্য সমন জারি হয়েছে। আদালতে আবার এ সব অশ্লীল শব্দ নিয়ে উভয় পক্ষের আইনজীবীরা তর্ক-বিতর্ক করবেন এবং আরও দুর্গন্ধ ছড়াবে। আর আমরা প্রকৃতই সভ্য হয়ে উঠব!
আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় আমরা পুরনো দিনের মানুষরা এনসিপির জুলাই যোদ্ধাদের ভাষা পড়তে ভুল করছি না তো। তাদের অশ্লীল এবং ঔদ্ধত্য শব্দভান্ডারই আধুনিক যুগের ভাষাকে সমৃদ্ধ করছে হয়তো বা। তাই পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে আমিও আমার এক বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথন তুলে ধরছি যা অশ্লীল না হলেও তার কাছাকাছি বা অপকথা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের বীরত্বগাথা, সরকারি-বেসরকারি বাহিনীর গুলি ও হামলায় অগণিত মৃত্যু, আহতের আর্তনাদ, স্বজনহারা পরিবারের মানুষগুলোর আহাজারি গোটা জাতির বিবেককে স্পর্শ করেছিল। এ পটভূমিতে আনু মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন নাগরিক সমাজ ও শিক্ষক নেটওয়ার্কের ডাকে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে দ্রোহযাত্রার ডাক দেয়া হয়। মিডিয়াতে প্রচারিত সংবাদে দ্রোহযাত্রার মিছিলে আমাকে দেখা যাওয়ায় আমার স্কুল জীবনের এক বন্ধু ফোনে আমাকে বলে, খুব তো মিছিল করছিস! পরিণতি ‘আজ বুঝবি না, বুঝবি কাল; পিছে থাবড়াবি, মারবি ফাল’। বিষয় হচ্ছে, গ্রাম দেশে ছেলেকে অতিরিক্ত শুকনো মরিচ ডলে পান্তা খেতে দেখে পিতা তাকে এ কথা বলে এটাই বুঝাতে চাইছেন যে, অতিরিক্ত শুকনা মরিচ দিয়ে পান্তা খাইতে খুব মজা লাগলেও আগামীকাল ভোরে মলত্যাগের সময় মলদ্বারের যন্ত্রণায় লাফ দিয়ে দিয়ে পেছন চাপড়াতে হবে। দ্রোহযাত্রায় যোগ দেয়ার এতদিন পরে কেন জানি বন্ধুর বলা অপকথাটি মনে পড়ছে। আমরা কি এখন ফাল মেরে পেছন চাপড়াতে চাপড়াতে সভ্য হয়ে উঠছি!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]