alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির রাজনীতি: প্রযুক্তি, ক্ষমতা ও মুসলিম বিশ্বের সংকট

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬
image

ইরান যুদ্ধ করতে চায়নি, জোর করে এই যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ প্রায় ৫০ জন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি । অন্যদিকে ইসরায়েলের সৈন্য লেবাননের ভেতরে ঢুকে ইরানের সমর্থক হিজবুল্লাহদেরও হামাসের মতো নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। দেড় কোটি ইহুদি ২শ’ কোটি মুসলমানকে জিম্মি করে রেখেছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ১৯৭৩ সনে যুদ্ধে নেমে মিশর হঠাৎ যুদ্ধ থামিয়ে আপোষ করে ফেলে; কেন যুদ্ধ থামিয়ে দিল এই প্রশ্নের উত্তরে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি, কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে নয়’। শুধু প্রযুক্তি আর অস্ত্র নয়, অর্থ সম্পদেও আমেরিকা বর্তমান বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রযুক্তি আমেরিকার চেয়েও উন্নততর। ইতোমধ্যে ইরানের নৌশক্তি ধ্বংস হয়ে গেছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তছনছ হয়ে গেছে, আমেরিকা এবং ইসরায়েলের বিমান খুশিমত ইরানের আকাশে ঘুরে ঘুরে ইচ্ছা মতো স্থাপনায় বোমা ফেলছে, সব তেল শোধনাগার জ্বলছে, ধোঁয়ায় তেহরান অন্ধকারাচ্ছন্ন ।

ইরান যুদ্ধ করতে চায়নি, জোর করে এই যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইরান বুঝতে পেরেছিল, ইসরায়েল এবং আমেরিকার তুলনায় ইরানের প্রযুক্তি জ্ঞান জিরো। আশির দশকের শুরুতে ইরান-ইরাকের ৮ বছর ব্যাপী যুদ্ধের অতন্দ্র সতর্কতার মধ্যেও ইসরায়েলের যুদ্ধ বিমান ইরাকের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দিয়েছিল, ইরাক টেরও পায়নি। ঠিক একইভাবে গত বছর জুন মাসে প্রায় ১৩ হাজার কেজির ‘বাঙ্কার বাস্টার’ মেরে ইরানের ৩টি পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসকরণে যে বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে তা কেবল আমেরিকার কাছেই আছে, এই ‘বি-টু স্টেলথ বোমারু বিমান’ সনাক্ত করার ক্ষমতাও ইরানের ছিল না, ধ্বংস করে বিমানগুলো ফেরত যাওয়ার পর ইরান টের পেয়েছে। আমেরিকা তাদের ঘাতক অস্ত্র ‘গ্র্যাভিটি বোমা’ও ইরানের ওপর প্রয়োগ করার কথা ভাবছে; এই বোমা মজবুত বাঙ্কার এবং ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনাকে ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয়।

কিছুদিন আগে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়ার পরও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। হয়নি বলেই ইরানের রেজিম চেঞ্জ জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল বিরোধী কোনো শাসক বা সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হচ্ছে না। আমেরিকা এবং ইসরায়েল নির্ধারণ করে দিচ্ছে কোন দেশ কে শাসন করবে। ইসরায়েলের বিরোধিতা করে সাদ্দাম হোসেন টিকেননি, মুয়াম্মের গাদ্দাফির হয়েছে করুণ মৃত্যু, রাশিয়ায় পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে হয়েছে বশির আল আসাদকে। হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াহ এবং হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুও হয়েছে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বর্তমান পৃথিবীতে আমেরিকা আর ইসরায়েল ব্যতীত আর কোন দেশের স্বার্বভৌমত্বও নেই। ১৯৮৯ সনে লাতিন আমেরিকার দেশ পানামায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির তৎকালীন প্রধান জেনারেল ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক একইভাবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকেও অপহরণ করে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। কথা অগ্রাহ্য করায় শেখ হাসিনার পতনে আমেরিকা খরচ করেছে মাত্র ২৯ মিলিয়ন ডলার, আমেরিকার কথা না শোনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখন জেলের ভেতর।

পশ্চিমের দেশগুলোর সরকার ব্যবস্থায় এখন ধর্ম আর নিয়ন্তা নয়, খ্রিস্টান ধর্ম ও তার যাজকের জন্য ‘ভ্যাটিকান সিটি’ নামক একটি দেশ দিয়ে ধর্মকে ওখানে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। খ্রিস্টান ধর্ম ভ্যাটিকান সিটিতে আবদ্ধ থাকায় ইউরোপসহ পশ্চিমের দেশগুলোয় এখন আর ধর্ম ও সরকারের মধ্যে আগের মতো সংঘাত হয় না, সংঘাত হয় না বলেই অবাধে বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব হচ্ছে, নতুন নতুন প্রযুক্তির আবিস্কারে ধর্ম প্রতিবন্ধক হচ্ছে না। রেজিম চেঞ্জ করা আমেরিকার লক্ষ্য হলেও ইরানে পশ্চিমা ধাঁচে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা তাদের লক্ষ্য নয়। আমেরিকা ইসলাম ধর্ম বিরোধী নয়, ইসলামের উগ্রপন্থারও বিরোধী নয়- বিরোধী হচ্ছে উগ্রপন্থার আমেরিকান স্বার্থ বিরোধী কর্মকা-ের। মুসলমান পশ্চিমের মতো আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক হোক, এটাও আমেরিকা চায় না। চাইলে ধর্মনিরপেক্ষ সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মের গাদ্দাফি বা বশির আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় মোল্লাতন্ত্র কায়েমে আমেরিকা সহায়তা করতো না। ইরানের মতো ধর্মভিত্তিক বহু মুসলিম দেশের সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ট সম্পর্ক, হিজাব বিরোধী আন্দোলনে শতাধিক ব্যক্তিকে রাস্তায় প্রতিদিন ফাঁসি দিলেও আলী খামেনিকে হত্যা করা হতো না, যদি ইরান আমেরিকা এবং ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতো।

বাংলাদেশের মুসলিম বাঙালি ও চীনপন্থি বামেরা ইরানের ধর্মভিত্তিক সরকার ব্যবস্থার কড়া সমর্থক। চীনের সঙ্গে ভালো-খারাপ সম্পর্ক থাকা সাপেক্ষে আমাদের দেশের চীনপন্থিরা তাদের পছন্দ-অপছন্দ নির্ধারণ করে। অন্যদিকে আলেমদের তরফ থেকে শিয়াদের ‘কাফের’ বলার পরও তাদের প্রতি সাধারণ মুসলমানদের সমর্থনের কোন হেরফের হচ্ছে না, তারা প্রতি মুহুর্তে ইসরায়েলের ধ্বংস কামনা করছে। শুধু তাই নয়, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সমৃদ্ধ মুসলিম দেশগুলোতে ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র আঘাত হানলেও মুসলিম বাঙালিরা ঈদের খুশি উপভোগ করে। বিজ্ঞান বিচ্যুত মুসলমানদের অসহায়ত্ব এত গভীর হয়ে ওঠেছে যে, তারা মনে মনে ইরানের পক্ষে ‘আবাবিল’ পাখির আগমনও কামনা করে, এরা বিশ্বাস করে, ১৯৬৫ সনের যুদ্ধে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে ফেরেস্তারা লড়েছে। আজগুবি ক্ষমতায় বিশ্বাস করে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন মরেছেন, মরেছেন লিবিয়ার মুয়াম্মের গাদ্দাফিও। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন প্রভৃতি দেশে শিয়া মিলিশিয়াদের অস্ত্র সরবরাহ করে ইরান শুধু ইসরায়েলের শত্রু হয়নি, মুসলিম দেশগুলোরও শত্রু হয়েছে।

সৌদি আরব, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আমির আমিরাত প্রভৃতি দেশের শাসকেরা ইরানকে যমের মতো ভয় করে, ভয় ইরানের ক্ষেপনাস্ত্রে নয়, ভয় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের। এই ভয় থেকে লাভ হয়েছে ইসরায়েল এবং আমেরিকার,- আমেরিকা কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির সুযোগ পেয়েছে, সুযোগ পেয়েছে সামরিক ঘাঁটি করার। কী ইমানদার মুসলমান, একটি মুসলিম দেশ আরেকটি মুসলিম দেশের আক্রমণ থেকে রক্ষার পাওয়ার আশায় ‘নাসারাদের’ সামরিক ঘাঁটি রেখেছে। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস থাকলে ‘নাসারাদের’ সামরিক ঘাঁটি লাগে কেন? মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ইসরায়েলকে ভয় করে না, ভয় করে ইরান, গাজার হামাস আর মিশরের ব্রাদারহুডদের। ১৯৯০ সনে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখলের পর তাদের এই ভীতি আরও শতগুণে বেড়ে যায়, তাই তারা ইরানের পারমাণবিক শক্তি অর্জনকে তাদের জন্য অভিশাপ মনে করে। অধিকাংশ মুসলিম দেশ ইসলামের কট্টরপন্থা বা মৌলবাদ বিরোধী। তাই ১৯৭০ সনে পাকিস্তানি সৈন্য দিয়ে পিটিয়ে সশস্ত্র প্যালেস্টাইনিদের জর্ডান থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল, হামাসের করুণ পরাজয়ে কোনো মুসলিম দেশ কাতর হয়নি, মিশরের উগ্রপন্থী ব্রাদারহুডের ক্ষমতাচ্যুতি হলেও কোনো মুসলিম দেশের হাহুতাশ ছিল না। একইভাবে ইরানের অপমানজনক পরাজয়েও কোন মুসলিম দেশ আহা, উহু করবে না, কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মুসলিম বাঙালিদের মধ্যে চরম হতাশা নেমে আসবে। কারণ তারা আমারিকার ধ্বংসও চায়, আবার আমেরিকার ভিসাও চায়। তারা ভারতের বিনাশ চায়, আবার ভারতে পেঁয়াজ না হলেও চলে না।

ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো মুসলমান দেশকে একসঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করার দিন শেষ, তাই মুসলমানদের হৃত গৌরবও আর ফিরে আসবে না। ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষা চালু করেছে ইংরেজরা। নাসারাদের সবকিছু পরিত্যজ্য হলেও মাদ্রাসা শিক্ষা বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ছেই। কিন্তু এই শিক্ষা দিয়ে বর্তমান দুনিয়ায় অন্য জাতির প্রযুক্তির মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। পরিবেশ অনুকূল না থাকায় বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত লোকের অবদানও প্রায় জিরো। ইরান যদি যুদ্ধ কিছুদিন প্রলম্বিত করতে পারে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখতে পারে তাহলেই বাংলাদেশ আবার আরেকটি ঝাঁকুনি খাবে, ইতোপূর্বে করোনা আর ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের ঝাঁকুনি খেয়েছে, কিন্তু মোহাম্মদ ইউনূসের রেখে যাওয়া মুমূর্ষু বাংলাদেশ আর কোনো ঝাঁকুনি সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। অন্যদিকে ইরানের দুঃখজনক পরাজয়ে ইরানের তেল-গ্যাস ও হরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে আমেরিকার কব্জায় চলে যাবে, বিশ্ব রাজনীতিতে পতন হবে রাশিয়া ও চীনের, কুর্দিরা ইরানের অংশ দখল করে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে, প্যালেস্টাইনিদের প্রতিরোধ সক্ষমতার অনুপস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে আসবে ইসরায়েল প্রদত্ত অনুকম্পার শান্তি, আর জাতিসংঘ হবে মোহাম্মদ ইউনূসদের বনভোজনের বাগানবাড়ি, আর মুণ্ডহীন ধড়।

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

ছবি

কৈবর্ত বিদ্রোহ ও বরেন্দ্র অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্য

এই পরিবর্তন কি জনস্বার্থে

ছবি

মোজতবা খামেনি: উত্তরাধিকার নাকি কৌশলগত নির্বাচন?

ঘরে ঘরে পাটওয়ারী তৈরি হলে তবেই আমরা সভ্য হব!

রাজা গিয়ে রাজা আসে, রাষ্ট্রের নীরবতায় ঝাপসা হয় বিচার

বিচারব্যবস্থায় আস্থা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা

‘বঙ্গমাতার জন্তুপোলা’

ধূমপান ছাড়ার জন্য উপযুক্ত সময়

বারুদের বাজারে শান্তির সেল

ডিগ্রির পাহাড় ও দক্ষতার মরুভূমি

নিরাপত্তার দৌড়ে খাদ্যের সুরক্ষা কোথায়?

নারীর অধিকার নিশ্চিত হলে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব

কৃষিঋণ মওকুফ: কৃষকের স্বস্তি, বাস্তবায়নে দরকার সুশাসন

‘কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস!’

ইরানে হামলা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও পরিণতি

ঈদবাজারে ভোক্তার অসহায়ত্ব

নবযাত্রায় কেমন বাংলাদেশ চাই

আন্তর্জাতিক নারী দিবস

বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা

নতুন গভর্নর অপরিহার্য ছিল

উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের বিবাহের রীতি ও প্রথা

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদ: বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কী?

না হয় রহিতে কাছে!

আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ভূমি কমিশন কেন জরুরি?

উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির চিত্র

জোর যার, মুল্লুক তার: সাম্রাজ্যের নতুন পোশাক

‘পানিয়ালীর পোলার বইমেলা’

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

ইরান ইস্যুতে মহাশক্তির পরীক্ষা

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির রাজনীতি: প্রযুক্তি, ক্ষমতা ও মুসলিম বিশ্বের সংকট

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

image

ইরান যুদ্ধ করতে চায়নি, জোর করে এই যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে

শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ প্রায় ৫০ জন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি । অন্যদিকে ইসরায়েলের সৈন্য লেবাননের ভেতরে ঢুকে ইরানের সমর্থক হিজবুল্লাহদেরও হামাসের মতো নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। দেড় কোটি ইহুদি ২শ’ কোটি মুসলমানকে জিম্মি করে রেখেছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ১৯৭৩ সনে যুদ্ধে নেমে মিশর হঠাৎ যুদ্ধ থামিয়ে আপোষ করে ফেলে; কেন যুদ্ধ থামিয়ে দিল এই প্রশ্নের উত্তরে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি, কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে নয়’। শুধু প্রযুক্তি আর অস্ত্র নয়, অর্থ সম্পদেও আমেরিকা বর্তমান বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রযুক্তি আমেরিকার চেয়েও উন্নততর। ইতোমধ্যে ইরানের নৌশক্তি ধ্বংস হয়ে গেছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তছনছ হয়ে গেছে, আমেরিকা এবং ইসরায়েলের বিমান খুশিমত ইরানের আকাশে ঘুরে ঘুরে ইচ্ছা মতো স্থাপনায় বোমা ফেলছে, সব তেল শোধনাগার জ্বলছে, ধোঁয়ায় তেহরান অন্ধকারাচ্ছন্ন ।

ইরান যুদ্ধ করতে চায়নি, জোর করে এই যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইরান বুঝতে পেরেছিল, ইসরায়েল এবং আমেরিকার তুলনায় ইরানের প্রযুক্তি জ্ঞান জিরো। আশির দশকের শুরুতে ইরান-ইরাকের ৮ বছর ব্যাপী যুদ্ধের অতন্দ্র সতর্কতার মধ্যেও ইসরায়েলের যুদ্ধ বিমান ইরাকের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দিয়েছিল, ইরাক টেরও পায়নি। ঠিক একইভাবে গত বছর জুন মাসে প্রায় ১৩ হাজার কেজির ‘বাঙ্কার বাস্টার’ মেরে ইরানের ৩টি পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসকরণে যে বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে তা কেবল আমেরিকার কাছেই আছে, এই ‘বি-টু স্টেলথ বোমারু বিমান’ সনাক্ত করার ক্ষমতাও ইরানের ছিল না, ধ্বংস করে বিমানগুলো ফেরত যাওয়ার পর ইরান টের পেয়েছে। আমেরিকা তাদের ঘাতক অস্ত্র ‘গ্র্যাভিটি বোমা’ও ইরানের ওপর প্রয়োগ করার কথা ভাবছে; এই বোমা মজবুত বাঙ্কার এবং ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনাকে ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয়।

কিছুদিন আগে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়ার পরও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। হয়নি বলেই ইরানের রেজিম চেঞ্জ জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল বিরোধী কোনো শাসক বা সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হচ্ছে না। আমেরিকা এবং ইসরায়েল নির্ধারণ করে দিচ্ছে কোন দেশ কে শাসন করবে। ইসরায়েলের বিরোধিতা করে সাদ্দাম হোসেন টিকেননি, মুয়াম্মের গাদ্দাফির হয়েছে করুণ মৃত্যু, রাশিয়ায় পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে হয়েছে বশির আল আসাদকে। হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াহ এবং হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুও হয়েছে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বর্তমান পৃথিবীতে আমেরিকা আর ইসরায়েল ব্যতীত আর কোন দেশের স্বার্বভৌমত্বও নেই। ১৯৮৯ সনে লাতিন আমেরিকার দেশ পানামায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির তৎকালীন প্রধান জেনারেল ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক একইভাবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকেও অপহরণ করে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। কথা অগ্রাহ্য করায় শেখ হাসিনার পতনে আমেরিকা খরচ করেছে মাত্র ২৯ মিলিয়ন ডলার, আমেরিকার কথা না শোনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখন জেলের ভেতর।

পশ্চিমের দেশগুলোর সরকার ব্যবস্থায় এখন ধর্ম আর নিয়ন্তা নয়, খ্রিস্টান ধর্ম ও তার যাজকের জন্য ‘ভ্যাটিকান সিটি’ নামক একটি দেশ দিয়ে ধর্মকে ওখানে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। খ্রিস্টান ধর্ম ভ্যাটিকান সিটিতে আবদ্ধ থাকায় ইউরোপসহ পশ্চিমের দেশগুলোয় এখন আর ধর্ম ও সরকারের মধ্যে আগের মতো সংঘাত হয় না, সংঘাত হয় না বলেই অবাধে বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব হচ্ছে, নতুন নতুন প্রযুক্তির আবিস্কারে ধর্ম প্রতিবন্ধক হচ্ছে না। রেজিম চেঞ্জ করা আমেরিকার লক্ষ্য হলেও ইরানে পশ্চিমা ধাঁচে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা তাদের লক্ষ্য নয়। আমেরিকা ইসলাম ধর্ম বিরোধী নয়, ইসলামের উগ্রপন্থারও বিরোধী নয়- বিরোধী হচ্ছে উগ্রপন্থার আমেরিকান স্বার্থ বিরোধী কর্মকা-ের। মুসলমান পশ্চিমের মতো আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক হোক, এটাও আমেরিকা চায় না। চাইলে ধর্মনিরপেক্ষ সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মের গাদ্দাফি বা বশির আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় মোল্লাতন্ত্র কায়েমে আমেরিকা সহায়তা করতো না। ইরানের মতো ধর্মভিত্তিক বহু মুসলিম দেশের সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ট সম্পর্ক, হিজাব বিরোধী আন্দোলনে শতাধিক ব্যক্তিকে রাস্তায় প্রতিদিন ফাঁসি দিলেও আলী খামেনিকে হত্যা করা হতো না, যদি ইরান আমেরিকা এবং ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতো।

বাংলাদেশের মুসলিম বাঙালি ও চীনপন্থি বামেরা ইরানের ধর্মভিত্তিক সরকার ব্যবস্থার কড়া সমর্থক। চীনের সঙ্গে ভালো-খারাপ সম্পর্ক থাকা সাপেক্ষে আমাদের দেশের চীনপন্থিরা তাদের পছন্দ-অপছন্দ নির্ধারণ করে। অন্যদিকে আলেমদের তরফ থেকে শিয়াদের ‘কাফের’ বলার পরও তাদের প্রতি সাধারণ মুসলমানদের সমর্থনের কোন হেরফের হচ্ছে না, তারা প্রতি মুহুর্তে ইসরায়েলের ধ্বংস কামনা করছে। শুধু তাই নয়, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সমৃদ্ধ মুসলিম দেশগুলোতে ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র আঘাত হানলেও মুসলিম বাঙালিরা ঈদের খুশি উপভোগ করে। বিজ্ঞান বিচ্যুত মুসলমানদের অসহায়ত্ব এত গভীর হয়ে ওঠেছে যে, তারা মনে মনে ইরানের পক্ষে ‘আবাবিল’ পাখির আগমনও কামনা করে, এরা বিশ্বাস করে, ১৯৬৫ সনের যুদ্ধে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে ফেরেস্তারা লড়েছে। আজগুবি ক্ষমতায় বিশ্বাস করে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন মরেছেন, মরেছেন লিবিয়ার মুয়াম্মের গাদ্দাফিও। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন প্রভৃতি দেশে শিয়া মিলিশিয়াদের অস্ত্র সরবরাহ করে ইরান শুধু ইসরায়েলের শত্রু হয়নি, মুসলিম দেশগুলোরও শত্রু হয়েছে।

সৌদি আরব, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আমির আমিরাত প্রভৃতি দেশের শাসকেরা ইরানকে যমের মতো ভয় করে, ভয় ইরানের ক্ষেপনাস্ত্রে নয়, ভয় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের। এই ভয় থেকে লাভ হয়েছে ইসরায়েল এবং আমেরিকার,- আমেরিকা কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির সুযোগ পেয়েছে, সুযোগ পেয়েছে সামরিক ঘাঁটি করার। কী ইমানদার মুসলমান, একটি মুসলিম দেশ আরেকটি মুসলিম দেশের আক্রমণ থেকে রক্ষার পাওয়ার আশায় ‘নাসারাদের’ সামরিক ঘাঁটি রেখেছে। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস থাকলে ‘নাসারাদের’ সামরিক ঘাঁটি লাগে কেন? মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ইসরায়েলকে ভয় করে না, ভয় করে ইরান, গাজার হামাস আর মিশরের ব্রাদারহুডদের। ১৯৯০ সনে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখলের পর তাদের এই ভীতি আরও শতগুণে বেড়ে যায়, তাই তারা ইরানের পারমাণবিক শক্তি অর্জনকে তাদের জন্য অভিশাপ মনে করে। অধিকাংশ মুসলিম দেশ ইসলামের কট্টরপন্থা বা মৌলবাদ বিরোধী। তাই ১৯৭০ সনে পাকিস্তানি সৈন্য দিয়ে পিটিয়ে সশস্ত্র প্যালেস্টাইনিদের জর্ডান থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল, হামাসের করুণ পরাজয়ে কোনো মুসলিম দেশ কাতর হয়নি, মিশরের উগ্রপন্থী ব্রাদারহুডের ক্ষমতাচ্যুতি হলেও কোনো মুসলিম দেশের হাহুতাশ ছিল না। একইভাবে ইরানের অপমানজনক পরাজয়েও কোন মুসলিম দেশ আহা, উহু করবে না, কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মুসলিম বাঙালিদের মধ্যে চরম হতাশা নেমে আসবে। কারণ তারা আমারিকার ধ্বংসও চায়, আবার আমেরিকার ভিসাও চায়। তারা ভারতের বিনাশ চায়, আবার ভারতে পেঁয়াজ না হলেও চলে না।

ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো মুসলমান দেশকে একসঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করার দিন শেষ, তাই মুসলমানদের হৃত গৌরবও আর ফিরে আসবে না। ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষা চালু করেছে ইংরেজরা। নাসারাদের সবকিছু পরিত্যজ্য হলেও মাদ্রাসা শিক্ষা বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ছেই। কিন্তু এই শিক্ষা দিয়ে বর্তমান দুনিয়ায় অন্য জাতির প্রযুক্তির মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। পরিবেশ অনুকূল না থাকায় বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত লোকের অবদানও প্রায় জিরো। ইরান যদি যুদ্ধ কিছুদিন প্রলম্বিত করতে পারে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখতে পারে তাহলেই বাংলাদেশ আবার আরেকটি ঝাঁকুনি খাবে, ইতোপূর্বে করোনা আর ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের ঝাঁকুনি খেয়েছে, কিন্তু মোহাম্মদ ইউনূসের রেখে যাওয়া মুমূর্ষু বাংলাদেশ আর কোনো ঝাঁকুনি সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। অন্যদিকে ইরানের দুঃখজনক পরাজয়ে ইরানের তেল-গ্যাস ও হরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে আমেরিকার কব্জায় চলে যাবে, বিশ্ব রাজনীতিতে পতন হবে রাশিয়া ও চীনের, কুর্দিরা ইরানের অংশ দখল করে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে, প্যালেস্টাইনিদের প্রতিরোধ সক্ষমতার অনুপস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে আসবে ইসরায়েল প্রদত্ত অনুকম্পার শান্তি, আর জাতিসংঘ হবে মোহাম্মদ ইউনূসদের বনভোজনের বাগানবাড়ি, আর মুণ্ডহীন ধড়।

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

back to top