alt

উপ-সম্পাদকীয়

ফুটবলের সৌন্দর্য

এম এ কবীর

: রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২
image

চড়া দামের পরও ৩০ লাখ টিকেট বিক্রি করেছে কাতার। মানবাধিকার কিংবা মদ বিক্রি সব ইস্যুতেই কাতারের সমালোচনায় পশ্চিমারা। কোথাও কোথাও এই বিশ্বকাপ বয়কটের ডাকও উঠে। সেখান থেকেই ধারণা করা হয়েছিল কাতার বিশ্বকাপের আমেজ কিংবা টিকেট বিক্রিতে পশ্চিমাদের এমন কান্ডের বড় প্রভাব পড়বে। তবে ঘটনা ঘটছে উল্টো। ব্রাজিলকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের শীর্ষে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। ব্রাজিলের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ইউওএলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ২২৫টি অঞ্চলের মানুষ টেলিভিশন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসে কাতার বিশ্বকাপ সরাসরি উপভোগ করছেন। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ দেখেন ২২৩টি অঞ্চলের মানুষ। আর ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ দেখা গেছে ২১২টি অঞ্চলে। এবার রেকর্ড ৫০০ কোটি মানুষ কাতার বিশ্বকাপ দেখছেন। ইউওএলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের ৫৬টি করে অঞ্চলে, পুরো আমেরিকার (উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য) ৫০টি, এশিয়ার ৪৩টি ও ওশেনিয়ার ২০টি অঞ্চলে কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি হয়েছে।

ফিফার হিসাবে এবার চ্যাম্পিয়ন দল পাবে রেকর্ড ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৩৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা)। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বিশ্বকাপের প্রাইজমানি থেকে এবার ৬০ লাখ ডলার বাড়ানো হয়েছে। ২০০৬ বিশ্বকাপের সঙ্গে তুলনা করলে প্রাইজমানি বেড়েছে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

৯২ বছরের যাত্রায় অনেক নতুনের জন্ম দিয়েছে বিশ্বকাপ, প্রতি আসরেই সংযোজন হয়েছে নতুন কিছুর। তবে এবার কাতার বিশ্বকাপে যেন ‘নতুনের আসর’ বসেছে। বিশ্বকাপের আগের সব আসরই অনুষ্ঠিত হয় জুন-জুলাইয়ে। কাতারের তপ্ত জলবায়ুর কারণেই এবারের আসর শীত মৌসুমে সরিয়ে আনা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ কাতার, যারা বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়, আরববিশ্বেও কাতারই প্রথম। এশিয়ায় এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। প্রথমবার হয় ২০০২ সালে, যৌথভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে এবার কাতার বিশ্বকাপে ব্যবহার করা হয়েছে অ্যাডিডাসের তৈরি বল ‘আল রিহলা’। বাংলায় যার অর্থ ‘ভ্রমণ’। চামড়ায় তৈরি বলটিতে আছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। বলের নিখুঁত গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য এর ভেতরে ৫০০ হার্জ আইএমইউ সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। যে তথ্য ব্যবহার করে নিখুঁত সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রযুক্তিসম্পন্ন বল ব্যবহার করা হচ্ছে এবারই প্রথম। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপে ভিএআর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। কাতারে অফসাইডের সিদ্ধান্ত হবে আরও নিখুঁত। চালু হয়েছে সেমিঅটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি। প্রতিটি স্টেডিয়ামের ছাদের নিচের অংশে ১২টি ট্র্যাকিং ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

ফুটবলারদের পারফরম্যান্সের আরও বিশ্লেষণী ও নিখুঁত তথ্য পেতে সংযোজন করা হয়েছে ডেটা অ্যাপ। ৩২টি দলের প্রত্যেক ফুটবলার ম্যাচের পর নিজের খেলাসম্পর্কিত তথ্যগুলো দেখতে পারবেন। ডেটার মধ্যে থাকবে ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ কোন মুহূর্তে তিনি কেমন খেলেছেন, বল পায়ে কেমন ছিলেন, কতটুকু কী প্রচেষ্টা ছিল।

কাতার বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলো একটি অন্যটির খুবই কাছাকাছি। মাত্র ৫৫ কিলোমিটার জায়গার মধ্যে ৮টি স্টেডিয়ামের অবস্থান। ভৌগোলিকভাবে এটিই সবচেয়ে ‘আঁটসাঁট’ জায়গার বিশ্বকাপ। বৃহৎ প্রতিবেশী সৌদি আরব ও ইরানের মাঝখানে বিশ্ব মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া দায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিটে হারিয়ে আয়োজক দেশের মর্যাদা আদায় করে দেশটি। অভিযোগ ওঠে রাজপরিবার টাকার বিনিময়ে বিশ্বকাপ আয়োজন বাগিয়ে নিয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করে ফিফা। শেষ পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদনে তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি।

এবারই প্রথম ছেলেদের বিশ্বকাপে নারী রেফারি ম্যাচ পরিচালনা করছেন। ৬৪টি ম্যাচের জন্য মোট ৩৬ জন প্রধান রেফারির নাম ঘোষণা করে ফিফা। এর মধ্যে নারী আছেন তিনজন।

কাতার বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে অ্যালকোহল। পান করা যাবে না বিয়ার। ধূমপানেও কড়া নিষেধাজ্ঞা। নারী দর্শকরা খোলামেলা পোশাক পরলে তৎক্ষণাৎ শাস্তির আওতায় আনা হবে। দর্শনীয় স্থান ও সরকারি দপ্তরে গেলেও শরীর ঢাকা পোশাক পরতে হবে। পোশাকের বিষয়ে নজরদারি করতে স্টেডিয়ামের ভেতর ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পুরুষদের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিধিনিষেধ। হাতা কাটা টি-শার্ট পরতে পারবেন না তারা। বিতর্কিত কিছু লেখা যাবে না টি-শার্টে। নিয়ম ভঙ্গকারীকে জেল থেকে শুরু করে ২ হাজার ৮০০ ডলার পর্যস্ত জরিমানা গুনতে হবে। ফুটবলের ইতিহাসে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে ৩২টি দেশের ফুটবল খেলোয়াড়সহ ১২ লাখেরও বেশি দর্শককে ধারণ করবে কাতার।

এশিয়া, ইউরোপ বা আফ্রিকায় তাদের নিজ নিজ সংস্কৃতি রয়েছে, নিজ নিজ মূল্যবোধ রয়েছে, তেমনি আরব বিশ্বেরও। ভারতের বড় বড় শহরগুলোতে গরু হেঁটে বেড়াচ্ছে, ইউরোপের পার্কে পোষা কুকুর থাকছে, আরবে উটকে প্রিয় পশু হিসেবে সমাদর করা হচ্ছে। প্রত্যেকটা অনুভূতিকে তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ দিয়ে ভাবতে হয়। নৃবিজ্ঞানী আর বি টেইলর বলেছেন, ‘প্রতিটি সংস্কৃতির প্রথা ও রীতিনীতিসমূহকে সংস্কৃতির বাস্তবতার নিরিখেই মূল্যায়ন করতে হবে।’ ভিন্ন সংস্কৃতিকে গ্রহণ না করা, শ্রদ্ধা না করা থেকে মূলত জেনোফোবিয়া তৈরি হয়। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, প্রথা ও মূল্যবোধের সঙ্গে একে অপরের পরিচয় ঘটানোর জন্য বিশ্ব ক্রীড়া আসরগুলোর আয়োজন হয়ে থাকে। ফলে কাতারে টুর্নামেন্ট উদ্বোধন যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতির মতো হবে না এটাই স্বাভাবিক।

শুধু ফুটবল আয়োজন নয়, এর আগে থেকেই ধীরে ধীরে বিশ্বের বুকে একটি কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী ও শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে মাত্র ৩ লাখ জনসংখ্যার কাতার। লেবানন, ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া, লিবিয়া, সুদানসহ বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ও দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্যস্থতা করেছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান শান্তি প্রক্রিয়ার মূল সঞ্চালক ছিল কাতার। এছাড়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের আয়োজক ছিল কাতার। বর্তমানে তুরস্ক-সৌদি আরব, ইরান-সৌদি আরব বিরোধ নিষ্পত্তির প্রস্তাবও দিয়ে রেখেছে দেশটি। কাতারের এসব মধ্যস্থতার ভূমিকায় সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করছে কাতারের মালিকানাধীন নিউজ মিডিয়া ‘আলজাজিরা’।

তেল ও গ্যাসে কাতারের অর্থনীতি ফুলে-ফেঁপে উঠলেও এয়ারলাইনস ও ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাবে রয়েছে তাদের বিশাল বিনিয়োগ। রূপকল্প ২০৩০-এর অংশ হিসেবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় বিশেষ অবস্থান করে নেয়ার পরিকল্পনা কাতারের। বিশ্বের টপ র‌্যাংকিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শাখা রয়েছে কাতারে। এখন সেসব বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েটদের ৪২ শতাংশই নারী। এছাড়া ‘কাতার ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে বিশ্বের নানা জায়গায় চ্যারিটি করা হচ্ছে। এসবের মূল ভাবনায় আছেন সাবেক আমির শেখ হামাদের স্ত্রী ও বর্তমান আমিরের মা শায়খা মোজাহ।

৯২ বছরের বিশ্বকাপ আয়োজনের ইতিহাসে প্রথম স্বাগতিক দেশ হিসেবে হেরে গিয়েছে। এই বিশ্বকাপে কাতার খরচ করেছে প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলার। প্রথম ম্যাচে যে ইকুয়েডর কাতারকে হারিয়েছে তাদের জিডিপি মাত্র ১০০ বিলিয়নের কিছু বেশি আর ২৫ শতাংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এই দারিদ্র্যপীড়িত ইকুয়েডর অনায়াসে হারিয়ে দিল এক বিশ্বকাপেই ২২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেলা একটি ধনী দেশকে। এটাই ফুটবলের সৌন্দর্য কাতারের বিরুদ্ধে স্টেডিয়াম নির্মাণের সময় শ্রমিকদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের। এই অভিযোগে বিবিসি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করেনি। কাতার নয় শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। নিউইয়র্ক থেকে সিডনি, দোহা থেকে দুবাই বড় বড় ইমারত নির্মাণ হয়েছে শ্রমিকদের ঘামে-রক্তে। শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করে পুঁজিপতিদের পুঁজি জ্যামিতিক হারে বেড়েছে এসব দেশে।

প্রত্যেক সিভিলাইজেশনের রয়েছে শ্রমিক শোষণ করার নিষ্ঠুর ইতিহাস। মোগল সাম্রাজ্যের কালজয়ী নিদর্শন তাজমহল নির্মাণেও শ্রমিকদের অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়। আবার মোগল সাম্রাজ্যের মূল্যবান রত্নও লুট করে ব্রিটিশরা। এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার বহু দেশকে শোষণ-শাসন করেই আজ ইউরোপ-আমেরিকা এত সমৃদ্ধ। ইউক্রেনীয় রিফিউজিদের প্রতি ইউরোপের যে ব্যবহার ছিল সিরিয়ান রিফিউজিদের প্রতি তা ছিল না। আবার ইউক্রেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইউক্রেনীয় শিক্ষার্থীদের ইউরোপের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলেও তাদের অ-ইউরোপীয় সহপাঠীদের পাঠানো হয় ডিটেনশন ক্যাম্পে।

কিন্তু ইউরোপীয়দের সেকালের কলোনিয়ালিজমের অপরাধের কারণে এখনকার ইউরোপ মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে যে অবস্থান নিয়েছে তা খারিজ করা যায় না। কাতার একটি সুন্দর ও নির্মোহ আয়োজন করেছে বলে তার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের মজুরি ও নির্মাণকাজে নিহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না তা নয়। কাতার ২২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে পেরেছে কিন্তু নির্মাণ শ্রমিকদের ইন্স্যুরেন্স কেন দিতে পারবে না, কেন নিহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেবে না? এই প্রশ্ন থাকতেই পারে।

ফুটবল একটি শিল্প। ফুটবলের এই উন্মাদনা বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। কারও ব্যক্তিজীবন যেন আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, সাময়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সংঘাতে না গড়ায়। এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং তা হতে হবে সহমর্মিতায়।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে

ধর্মীয় সংখ্যালঘু খ্রিস্টানরা ভালো নেই

বঙ্গবন্ধু, বাংলা ও বাঙালি

ডিসি সম্মেলন : ধান ভানতে শিবের গীত

সন্তানের অভিভাবক হিসেবে মায়ের স্বীকৃতি ও বাস্তবতা

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

বিপর্যয়ের মুখে ধান ও পাট আবাদ : বিপাকে কৃষককুল

বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস

নগরে আগুন লাগলে দেবালয় কি অক্ষত থাকে

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি

পাঠ্য বইয়ে ডারউইনের তত্ত্ব

ভাঙ্গা-মাওয়া এক্সপ্রেস সড়কে দুর্ঘটনা রোধে ব্যবস্থা নিন

প্রাণীর জন্য ভালোবাসা

সন্দেহের বশে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার

শিক্ষকরাই পারেন শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ শেখাতে

ফ্লোর প্রাইস ও স্থিতিশীল শেয়ারবাজার

ছবি

বায়ুদূষণের ঝুঁকিতে দেশ

বিএনপি নেতৃত্বের সংকট ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ

তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সচেতনতা

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে চাই দক্ষ জনসম্পদ

ছবি

অঙ্গদানের অনন্য উদাহরণ

মডেল গ্রাম মুশুদ্দির গল্প

ফাইভ-জি : ডিজিটাল শিল্পযুগের মহাসড়ক

ছবি

স্মৃতির পাতায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

ছবি

দক্ষিণডিহির স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ

একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলাম জরুরি

বায়ুদূষণে বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান আর কতকাল

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুশাসনের প্রধান উপাদান

নিয়মের বেড়াজালে ‘অপারেশন জ্যাকপট’

নতুন কারিকুলামে বিজ্ঞান শিক্ষা

নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা

খেলার মাঠের বিকল্প নেই

কেমন আছে খ্রিস্টান সম্প্রদায়

কিছু মানুষের কারণে...

tab

উপ-সম্পাদকীয়

ফুটবলের সৌন্দর্য

এম এ কবীর

image

রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২

চড়া দামের পরও ৩০ লাখ টিকেট বিক্রি করেছে কাতার। মানবাধিকার কিংবা মদ বিক্রি সব ইস্যুতেই কাতারের সমালোচনায় পশ্চিমারা। কোথাও কোথাও এই বিশ্বকাপ বয়কটের ডাকও উঠে। সেখান থেকেই ধারণা করা হয়েছিল কাতার বিশ্বকাপের আমেজ কিংবা টিকেট বিক্রিতে পশ্চিমাদের এমন কান্ডের বড় প্রভাব পড়বে। তবে ঘটনা ঘটছে উল্টো। ব্রাজিলকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের শীর্ষে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। ব্রাজিলের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ইউওএলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ২২৫টি অঞ্চলের মানুষ টেলিভিশন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসে কাতার বিশ্বকাপ সরাসরি উপভোগ করছেন। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ দেখেন ২২৩টি অঞ্চলের মানুষ। আর ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ দেখা গেছে ২১২টি অঞ্চলে। এবার রেকর্ড ৫০০ কোটি মানুষ কাতার বিশ্বকাপ দেখছেন। ইউওএলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের ৫৬টি করে অঞ্চলে, পুরো আমেরিকার (উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য) ৫০টি, এশিয়ার ৪৩টি ও ওশেনিয়ার ২০টি অঞ্চলে কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি হয়েছে।

ফিফার হিসাবে এবার চ্যাম্পিয়ন দল পাবে রেকর্ড ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৩৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা)। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বিশ্বকাপের প্রাইজমানি থেকে এবার ৬০ লাখ ডলার বাড়ানো হয়েছে। ২০০৬ বিশ্বকাপের সঙ্গে তুলনা করলে প্রাইজমানি বেড়েছে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

৯২ বছরের যাত্রায় অনেক নতুনের জন্ম দিয়েছে বিশ্বকাপ, প্রতি আসরেই সংযোজন হয়েছে নতুন কিছুর। তবে এবার কাতার বিশ্বকাপে যেন ‘নতুনের আসর’ বসেছে। বিশ্বকাপের আগের সব আসরই অনুষ্ঠিত হয় জুন-জুলাইয়ে। কাতারের তপ্ত জলবায়ুর কারণেই এবারের আসর শীত মৌসুমে সরিয়ে আনা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ কাতার, যারা বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়, আরববিশ্বেও কাতারই প্রথম। এশিয়ায় এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। প্রথমবার হয় ২০০২ সালে, যৌথভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে এবার কাতার বিশ্বকাপে ব্যবহার করা হয়েছে অ্যাডিডাসের তৈরি বল ‘আল রিহলা’। বাংলায় যার অর্থ ‘ভ্রমণ’। চামড়ায় তৈরি বলটিতে আছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। বলের নিখুঁত গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য এর ভেতরে ৫০০ হার্জ আইএমইউ সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। যে তথ্য ব্যবহার করে নিখুঁত সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রযুক্তিসম্পন্ন বল ব্যবহার করা হচ্ছে এবারই প্রথম। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপে ভিএআর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। কাতারে অফসাইডের সিদ্ধান্ত হবে আরও নিখুঁত। চালু হয়েছে সেমিঅটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি। প্রতিটি স্টেডিয়ামের ছাদের নিচের অংশে ১২টি ট্র্যাকিং ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

ফুটবলারদের পারফরম্যান্সের আরও বিশ্লেষণী ও নিখুঁত তথ্য পেতে সংযোজন করা হয়েছে ডেটা অ্যাপ। ৩২টি দলের প্রত্যেক ফুটবলার ম্যাচের পর নিজের খেলাসম্পর্কিত তথ্যগুলো দেখতে পারবেন। ডেটার মধ্যে থাকবে ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ কোন মুহূর্তে তিনি কেমন খেলেছেন, বল পায়ে কেমন ছিলেন, কতটুকু কী প্রচেষ্টা ছিল।

কাতার বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলো একটি অন্যটির খুবই কাছাকাছি। মাত্র ৫৫ কিলোমিটার জায়গার মধ্যে ৮টি স্টেডিয়ামের অবস্থান। ভৌগোলিকভাবে এটিই সবচেয়ে ‘আঁটসাঁট’ জায়গার বিশ্বকাপ। বৃহৎ প্রতিবেশী সৌদি আরব ও ইরানের মাঝখানে বিশ্ব মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া দায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিটে হারিয়ে আয়োজক দেশের মর্যাদা আদায় করে দেশটি। অভিযোগ ওঠে রাজপরিবার টাকার বিনিময়ে বিশ্বকাপ আয়োজন বাগিয়ে নিয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করে ফিফা। শেষ পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদনে তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি।

এবারই প্রথম ছেলেদের বিশ্বকাপে নারী রেফারি ম্যাচ পরিচালনা করছেন। ৬৪টি ম্যাচের জন্য মোট ৩৬ জন প্রধান রেফারির নাম ঘোষণা করে ফিফা। এর মধ্যে নারী আছেন তিনজন।

কাতার বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে অ্যালকোহল। পান করা যাবে না বিয়ার। ধূমপানেও কড়া নিষেধাজ্ঞা। নারী দর্শকরা খোলামেলা পোশাক পরলে তৎক্ষণাৎ শাস্তির আওতায় আনা হবে। দর্শনীয় স্থান ও সরকারি দপ্তরে গেলেও শরীর ঢাকা পোশাক পরতে হবে। পোশাকের বিষয়ে নজরদারি করতে স্টেডিয়ামের ভেতর ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পুরুষদের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিধিনিষেধ। হাতা কাটা টি-শার্ট পরতে পারবেন না তারা। বিতর্কিত কিছু লেখা যাবে না টি-শার্টে। নিয়ম ভঙ্গকারীকে জেল থেকে শুরু করে ২ হাজার ৮০০ ডলার পর্যস্ত জরিমানা গুনতে হবে। ফুটবলের ইতিহাসে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে ৩২টি দেশের ফুটবল খেলোয়াড়সহ ১২ লাখেরও বেশি দর্শককে ধারণ করবে কাতার।

এশিয়া, ইউরোপ বা আফ্রিকায় তাদের নিজ নিজ সংস্কৃতি রয়েছে, নিজ নিজ মূল্যবোধ রয়েছে, তেমনি আরব বিশ্বেরও। ভারতের বড় বড় শহরগুলোতে গরু হেঁটে বেড়াচ্ছে, ইউরোপের পার্কে পোষা কুকুর থাকছে, আরবে উটকে প্রিয় পশু হিসেবে সমাদর করা হচ্ছে। প্রত্যেকটা অনুভূতিকে তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ দিয়ে ভাবতে হয়। নৃবিজ্ঞানী আর বি টেইলর বলেছেন, ‘প্রতিটি সংস্কৃতির প্রথা ও রীতিনীতিসমূহকে সংস্কৃতির বাস্তবতার নিরিখেই মূল্যায়ন করতে হবে।’ ভিন্ন সংস্কৃতিকে গ্রহণ না করা, শ্রদ্ধা না করা থেকে মূলত জেনোফোবিয়া তৈরি হয়। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, প্রথা ও মূল্যবোধের সঙ্গে একে অপরের পরিচয় ঘটানোর জন্য বিশ্ব ক্রীড়া আসরগুলোর আয়োজন হয়ে থাকে। ফলে কাতারে টুর্নামেন্ট উদ্বোধন যুক্তরাষ্ট্র বা অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতির মতো হবে না এটাই স্বাভাবিক।

শুধু ফুটবল আয়োজন নয়, এর আগে থেকেই ধীরে ধীরে বিশ্বের বুকে একটি কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী ও শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে মাত্র ৩ লাখ জনসংখ্যার কাতার। লেবানন, ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া, লিবিয়া, সুদানসহ বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ও দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্যস্থতা করেছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান শান্তি প্রক্রিয়ার মূল সঞ্চালক ছিল কাতার। এছাড়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের আয়োজক ছিল কাতার। বর্তমানে তুরস্ক-সৌদি আরব, ইরান-সৌদি আরব বিরোধ নিষ্পত্তির প্রস্তাবও দিয়ে রেখেছে দেশটি। কাতারের এসব মধ্যস্থতার ভূমিকায় সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করছে কাতারের মালিকানাধীন নিউজ মিডিয়া ‘আলজাজিরা’।

তেল ও গ্যাসে কাতারের অর্থনীতি ফুলে-ফেঁপে উঠলেও এয়ারলাইনস ও ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাবে রয়েছে তাদের বিশাল বিনিয়োগ। রূপকল্প ২০৩০-এর অংশ হিসেবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় বিশেষ অবস্থান করে নেয়ার পরিকল্পনা কাতারের। বিশ্বের টপ র‌্যাংকিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শাখা রয়েছে কাতারে। এখন সেসব বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েটদের ৪২ শতাংশই নারী। এছাড়া ‘কাতার ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে বিশ্বের নানা জায়গায় চ্যারিটি করা হচ্ছে। এসবের মূল ভাবনায় আছেন সাবেক আমির শেখ হামাদের স্ত্রী ও বর্তমান আমিরের মা শায়খা মোজাহ।

৯২ বছরের বিশ্বকাপ আয়োজনের ইতিহাসে প্রথম স্বাগতিক দেশ হিসেবে হেরে গিয়েছে। এই বিশ্বকাপে কাতার খরচ করেছে প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলার। প্রথম ম্যাচে যে ইকুয়েডর কাতারকে হারিয়েছে তাদের জিডিপি মাত্র ১০০ বিলিয়নের কিছু বেশি আর ২৫ শতাংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এই দারিদ্র্যপীড়িত ইকুয়েডর অনায়াসে হারিয়ে দিল এক বিশ্বকাপেই ২২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেলা একটি ধনী দেশকে। এটাই ফুটবলের সৌন্দর্য কাতারের বিরুদ্ধে স্টেডিয়াম নির্মাণের সময় শ্রমিকদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের। এই অভিযোগে বিবিসি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করেনি। কাতার নয় শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। নিউইয়র্ক থেকে সিডনি, দোহা থেকে দুবাই বড় বড় ইমারত নির্মাণ হয়েছে শ্রমিকদের ঘামে-রক্তে। শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করে পুঁজিপতিদের পুঁজি জ্যামিতিক হারে বেড়েছে এসব দেশে।

প্রত্যেক সিভিলাইজেশনের রয়েছে শ্রমিক শোষণ করার নিষ্ঠুর ইতিহাস। মোগল সাম্রাজ্যের কালজয়ী নিদর্শন তাজমহল নির্মাণেও শ্রমিকদের অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়। আবার মোগল সাম্রাজ্যের মূল্যবান রত্নও লুট করে ব্রিটিশরা। এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার বহু দেশকে শোষণ-শাসন করেই আজ ইউরোপ-আমেরিকা এত সমৃদ্ধ। ইউক্রেনীয় রিফিউজিদের প্রতি ইউরোপের যে ব্যবহার ছিল সিরিয়ান রিফিউজিদের প্রতি তা ছিল না। আবার ইউক্রেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইউক্রেনীয় শিক্ষার্থীদের ইউরোপের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলেও তাদের অ-ইউরোপীয় সহপাঠীদের পাঠানো হয় ডিটেনশন ক্যাম্পে।

কিন্তু ইউরোপীয়দের সেকালের কলোনিয়ালিজমের অপরাধের কারণে এখনকার ইউরোপ মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে যে অবস্থান নিয়েছে তা খারিজ করা যায় না। কাতার একটি সুন্দর ও নির্মোহ আয়োজন করেছে বলে তার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের মজুরি ও নির্মাণকাজে নিহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না তা নয়। কাতার ২২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে পেরেছে কিন্তু নির্মাণ শ্রমিকদের ইন্স্যুরেন্স কেন দিতে পারবে না, কেন নিহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেবে না? এই প্রশ্ন থাকতেই পারে।

ফুটবল একটি শিল্প। ফুটবলের এই উন্মাদনা বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। কারও ব্যক্তিজীবন যেন আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, সাময়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সংঘাতে না গড়ায়। এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং তা হতে হবে সহমর্মিতায়।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

back to top