alt

উপ-সম্পাদকীয়

ব্যাংকে আমানত কমছে কেন

রেজাউল করিম খোকন

: বুধবার, ১৭ মে ২০২৩

দীর্ঘ সময় ধরে দেশে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। এতে একদিকে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের উপার্জন কমে গেছে; পাশাপাশি লাগামহীনভাবে বেড়েছে নিত্যপণ্য ও সেবার মূল্য। ফলে সব শ্রেণীর মানুষের ব্যয় বেড়েছে। আয় কমে যাওয়া ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকছে কম। যে কারণে অনেকেই সঞ্চয় করতে পারছেন না।

মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। সঞ্চয় করার সক্ষমতা নেই। ব্যয় যতটা বেড়েছে, আয় ততটা বাড়েনি। তাই মানুষ সঞ্চয় থেকেও ভেঙে খাচ্ছেন। এর ফলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। তাই আমানত কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- অর্থনৈতিক মন্দায় বাংলাদেশে মাথাপিছু ঋণ গ্রহণ দ্বিগুণ বেড়েছে। ৩৭ শতাংশ পরিবার ঋণ গ্রহণ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

মানুষের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের একটি সঙ্গতি থাকতে হয়। যদি আয় বেশি ও খরচ কম হয় তাহলে বাড়তি অর্থ সঞ্চয় করেন। এখন মানুষের আয় কমেছে, ব্যয় বেড়েছে। ফলে সঞ্চয় করতে পারছে না। উলটো ঋণ করে সংসার চালাচ্ছে। এতে একদিকে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সঞ্চয় কমে যাওয়ার কারণে। সঞ্চয় কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ কম হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান কম হবে। মানুষের আয়ও কমবে। নতুন শ্রমশক্তি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ পাবে না।

দীর্ঘ সময় এমন অবস্থা চলতে থাকলে অর্থনীতি মন্দার ফাঁদে পড়ে যাবে। কারণ ২০২০ সালে করোনার সময় থেকে এ মন্দা চলছে। এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন বছর হয়ে গেছে। এখন অর্থনীতিকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারির তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির হার কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।

সরকারি খাতের সঞ্চয়পত্র বিক্রি এখন আর বাড়ছে না। বরং কমে যাচ্ছে। অন্যান্য সঞ্চয়ী উপকরণেও নেতিবাচক অবস্থা। চলতি অর্থবছরের জুলাই ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকিং খাতে আমানত বেড়েছে ৩৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল ৫৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে আমানত বাড়ার হার কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।

এছাড়া দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলা ডলার সংকট পণ্যের আমদানি মূল্য বাড়িয়েছে। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য মানুষকে আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে। পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ অন্য সব খাতেই খরচ বেড়েছে। এতে মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে।

সঞ্চয়পত্র কেনা বা বিনিয়োগে মানুষের আগ্রহ কমেছে। ফলে তলানিতে ঠেকেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২২-২৩অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে যে টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে তা দিয়ে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধ করাও সম্ভব হয়নি। বিক্রির চেয়ে সুদ-আসল পরিশোধেই চলে যাচ্ছে বেশি টাকা। অর্থাৎ কেনার চেয়ে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ বেশি লক্ষ্য করা গেছে। ফলে সরকারের কোষাগার থেকে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল শোধ করতে হচ্ছে।

এদিকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তাও পূরণ হয়নি। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসে এ খাত থেকে কোনো ঋণ পায়নি সরকার। উল্টো সরকার কোষাগার থেকে ৪ হাজার ১৬১ কোটি টাকারও বেশি পরিশোধ করেছে। সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সরকারের নানা ধরনের কড়াকড়ি আরোপ, মুদ্রাস্ফীতির চাপ, সুদের হার হ্রাস এবং সঞ্চয়পত্র কেনার সীমা থাকায় সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ধস নেমেছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে টাকার প্রবাহ বা তারল্যের পরিমাণ কমছেই। গত নয় মাসে তারল্য কমেছে ৬৩ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুনের শেষে বা জুলাইয়ের শুরুতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। গত মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকায়। আলোচ্য সময়ে তারল্য কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ।

করোনার সময়ে ২০২১ সালের জুনে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় উঠেছিল। এরপর থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত তারল্য ওঠানামার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিল। গত জুনের পর থেকে নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়, যা এখনো অব্যাহত। ডিসেম্বর ও জুনে ব্যাংক ক্লোজিংয়ের সময়ে সাধারণত তারল্য বৃদ্ধি পায়। গত ডিসেম্বরে তারল্য বাড়েনি। বরং কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতে তারল্য কমার জন্য ছয়টি কারণকে শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে করোনার পর হঠাৎ ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয়ের মাত্রাতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি, ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলে গ্রাহকদের হাতে রাখার প্রবণতা বেড়েছে। এছাড়া আমানত, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমার বিষয়টিও চিহ্নিত হয়।

সব মিলে ব্যাংকে যেমন আমানত কমেছে, তেমনি অন্যান্য সঞ্চয়ী উপকরণে বিনিয়োগের প্রবণতা কমে গেছে। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক মন্দায় মানুষের আয় কমায় ভাটা পড়েছে সঞ্চয়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, মোট সঞ্চয়ের প্রায় ৮২ শতাংশই হচ্ছে ব্যাংক খাতে। বাকি ১৮ শতাংশের মধ্যে জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্পে ১৪ শতাংশ ও ৪ শতাংশ অন্যান্য খাতে। সঞ্চয়ের প্রধান দুটি উপকরণ ব্যাংক আমানত ও জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্প খাতে বিনিয়োগ বেশ কমে গেছে।

নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রাইজবন্ডসহ অন্যান্য খাতেও সঞ্চয় কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত পাঁচ কারণে সঞ্চয় কমেছে। এর মধ্যে- ১. দীর্ঘ সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দা, ২. রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে সব ধরনের পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যাওয়া, ৩. ডলারের বিপরীতে টাকার মান লাগামহীনভাবে কমে যাওয়া, ৪. মানুষের আয় হ্রাস এবং ৫. জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বৈশ্বিক মন্দায় বাংলাদেশের কমপক্ষে ৩৭ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। কর্ম হারিয়ে ফেলে নতুন কর্মে যোগ দিতে না পারা, নিয়মিত বেতন-ভাতা না পাওয়া, বেতন-ভাতা কমে যাওয়া, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে মানুষের আয় কমেছে।ছোট সঞ্চয়ের একটি সহজ উপকরণ হচ্ছে প্রাইজবন্ড। এটি যে কোনো ব্যাংক বা সঞ্চয় ব্যুরো কিংবা ডাকঘর থেকে টাকা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কেনা যায়। তিন মাস পরপর লটারির মাধ্যমে এর মুনাফা বাবদ পুরস্কার দেয়া হয়। এর বিক্রিও সামান্য বাড়লেও এতে সঞ্চয়ের স্থিতি কমে গেছে। গত বছরের ৩০ জুন এ খাতে সঞ্চয়ের স্থিতি ছিল ২৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ৩১ ডিসেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় ২১ কোটি ৯০ টাকা। ৩১ জানুয়ারি তা আরও কমে দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে এক মাসে কমেছে সাড়ে ৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে কমেছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। এর আগের বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত স্থিতি ছিল ৩১ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮২ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড বিক্রি হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিক্রি হয়েছে ৮৭ কোটি ২০ লাখ টাকার।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে ব্যাংকগুলো আমানত হারাচ্ছে। কারণ এখন মানুষের ব্যাংকে টাকা রেখে বেশি মুনাফা পাচ্ছে না। বরং জমানো টাকার ওপর ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক পরিশোধের পর যে পরিমাণ মুনাফা হয়, মূল্যস্ফীতি তার থেকে বেশি। ফলে ব্যাংকে আমানত না রেখে নিজেদের কাছে টাকা রেখে খরচ করছেন মানুষ।২০২০ সালের ডিসেম্বরে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমানতের স্থিতি ছিল প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে তা কমে ৪৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ওই সময়ে আমানত কমেছে আড়াই শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তা ৪১ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছিল। মূল্যস্ফীতির কাছে ব্যাংকের আমানতকারীরা অসহায় এখন।

মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় ব্যাংকে আমানত রাখলে এখন লোকসান। যেটুকু সুদ দেয়া হয়, তার ওপর আবার কর কেটে রাখা হয়। এমন অবস্থায় ব্যাংকে টাকা জমিয়ে তাহলে লাভ কী?

সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, আবার ব্যাংকে আমানতের সুদও বেঁধে দিয়েছে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ। ফলে ব্যাংকে টাকা রাখা আমানতকারীদের কাছে এখন বড় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিসাবি আমানতকারীরা তাই দ্বিধাগ্রস্ত ও চিন্তায়। তাদের প্রশ্ন, ব্যাংকে টাকা জমিয়ে তাহলে তাদের লাভ কী? ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে এনে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (লিজিং) রাখবেন, সে উপায়ও নেই। সেখানে সুদ বেশি পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তখন মূল টাকা ফেরত পাওয়া যাবে কিনা, সেই আশঙ্কাও রয়েছে। কারণ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখে মূল টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য অনেক গ্রাহক মাসের পর মাস ঘুরছেন।

গত বছরের আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। তাতে সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যায়। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যে কমে গেছে, তা বাজারে গেলেই বোঝা যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশ আমানতের সুদের হার বাড়িয়েছে; কিন্তু আমরা ওই একই জায়গায় আছি। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় ব্যাংকে আমানত রাখলে এখন লোকসান। যেটুকু সুদ দেয়া হয়, তার ওপর আবার কর কেটে রাখা হয়। এমন অবস্থায় ব্যাংকে টাকা জমিয়ে তাহলে লাভ কী?

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

আবিষ্কারমূলক শিখন পদ্ধতি

টেকসই কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা

ছবি

জয়নুলের সাঁওতাল দম্পতি এবং সুমনের সৌন্দর্যপ্রিয়তা

এরপরও কি গাছ লাগাবেন না, বন রক্ষা করবেন না?

বিশ্ব ধরিত্রী দিবস

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিলের শেষ কোথায়

খুব জানতে ইচ্ছে করে

কোন দিকে মোড় নিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট?

কৃষিগুচ্ছ : ভর্তির আবেদনের নূ্যূনতম যোগ্যতা ও ফলাফল প্রস্তুতিতে বৈষম্য

ছবি

গণপরিবহনে নৈরাজ্যের শেষ কোথায়

ছাত্র রাজনীতি : পক্ষে-বিপক্ষে

ছবি

বি আর আম্বেদকর : নিম্নবর্গের মানুষের প্রতিনিধি

চেকের মামলায় আসামির মুক্তির পথ কী

রাম-নবমী : হিন্দুত্বের নয়া গবেষণাগার

‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ উদ্যোগ কি সফল হবে

কিশোর গ্যাং : সমস্যার মূলে যেতে হবে

গীতি চলচ্চিত্র ‘কাজল রেখা’ : সুস্থধারার চলচ্চিত্র বিকাশ ঘটুক

ছবি

ঋতুভিত্তিক চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতি

ছবি

স্মরণ : কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস

দাবদাহে সুস্থ থাকবেন কীভাবে

কত দিন পরে এলে, একটু শোনো

রম্যগদ্য : আনন্দ, দ্বিগুণ আনন্দ...

ছবি

ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম

বৈসাবি : ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসব

‘ইন্ডিয়া আউট’ ক্যাম্পেইন

উদার-উদ্দাম বৈশাখ চাই

ঈদ নিয়ে আসুক শান্তি ও সমৃদ্ধি, বিস্তৃত হোক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ

প্রসঙ্গ: বিদেশি ঋণ

ছাত্ররাজনীতি কি খারাপ?

জাকাত : বিশ্বের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা

বাংলাদেশ স্কাউটস দিবস : শুরুর কথা

ছবি

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত

প্রবাসীর ঈদ-ভাবনা

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস

ধানের ফলন বাড়াতে ক্লাইমেট স্মার্ট গুটি ইউরিয়া প্রযুক্তি

tab

উপ-সম্পাদকীয়

ব্যাংকে আমানত কমছে কেন

রেজাউল করিম খোকন

বুধবার, ১৭ মে ২০২৩

দীর্ঘ সময় ধরে দেশে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। এতে একদিকে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের উপার্জন কমে গেছে; পাশাপাশি লাগামহীনভাবে বেড়েছে নিত্যপণ্য ও সেবার মূল্য। ফলে সব শ্রেণীর মানুষের ব্যয় বেড়েছে। আয় কমে যাওয়া ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকছে কম। যে কারণে অনেকেই সঞ্চয় করতে পারছেন না।

মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। সঞ্চয় করার সক্ষমতা নেই। ব্যয় যতটা বেড়েছে, আয় ততটা বাড়েনি। তাই মানুষ সঞ্চয় থেকেও ভেঙে খাচ্ছেন। এর ফলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। তাই আমানত কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- অর্থনৈতিক মন্দায় বাংলাদেশে মাথাপিছু ঋণ গ্রহণ দ্বিগুণ বেড়েছে। ৩৭ শতাংশ পরিবার ঋণ গ্রহণ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

মানুষের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের একটি সঙ্গতি থাকতে হয়। যদি আয় বেশি ও খরচ কম হয় তাহলে বাড়তি অর্থ সঞ্চয় করেন। এখন মানুষের আয় কমেছে, ব্যয় বেড়েছে। ফলে সঞ্চয় করতে পারছে না। উলটো ঋণ করে সংসার চালাচ্ছে। এতে একদিকে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সঞ্চয় কমে যাওয়ার কারণে। সঞ্চয় কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ কম হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান কম হবে। মানুষের আয়ও কমবে। নতুন শ্রমশক্তি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ পাবে না।

দীর্ঘ সময় এমন অবস্থা চলতে থাকলে অর্থনীতি মন্দার ফাঁদে পড়ে যাবে। কারণ ২০২০ সালে করোনার সময় থেকে এ মন্দা চলছে। এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন বছর হয়ে গেছে। এখন অর্থনীতিকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারির তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির হার কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।

সরকারি খাতের সঞ্চয়পত্র বিক্রি এখন আর বাড়ছে না। বরং কমে যাচ্ছে। অন্যান্য সঞ্চয়ী উপকরণেও নেতিবাচক অবস্থা। চলতি অর্থবছরের জুলাই ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকিং খাতে আমানত বেড়েছে ৩৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল ৫৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে আমানত বাড়ার হার কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।

এছাড়া দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলা ডলার সংকট পণ্যের আমদানি মূল্য বাড়িয়েছে। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য মানুষকে আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে। পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ অন্য সব খাতেই খরচ বেড়েছে। এতে মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে।

সঞ্চয়পত্র কেনা বা বিনিয়োগে মানুষের আগ্রহ কমেছে। ফলে তলানিতে ঠেকেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২২-২৩অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে যে টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে তা দিয়ে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধ করাও সম্ভব হয়নি। বিক্রির চেয়ে সুদ-আসল পরিশোধেই চলে যাচ্ছে বেশি টাকা। অর্থাৎ কেনার চেয়ে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ বেশি লক্ষ্য করা গেছে। ফলে সরকারের কোষাগার থেকে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল শোধ করতে হচ্ছে।

এদিকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তাও পূরণ হয়নি। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসে এ খাত থেকে কোনো ঋণ পায়নি সরকার। উল্টো সরকার কোষাগার থেকে ৪ হাজার ১৬১ কোটি টাকারও বেশি পরিশোধ করেছে। সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সরকারের নানা ধরনের কড়াকড়ি আরোপ, মুদ্রাস্ফীতির চাপ, সুদের হার হ্রাস এবং সঞ্চয়পত্র কেনার সীমা থাকায় সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ধস নেমেছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে টাকার প্রবাহ বা তারল্যের পরিমাণ কমছেই। গত নয় মাসে তারল্য কমেছে ৬৩ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুনের শেষে বা জুলাইয়ের শুরুতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। গত মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকায়। আলোচ্য সময়ে তারল্য কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ।

করোনার সময়ে ২০২১ সালের জুনে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় উঠেছিল। এরপর থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত তারল্য ওঠানামার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিল। গত জুনের পর থেকে নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়, যা এখনো অব্যাহত। ডিসেম্বর ও জুনে ব্যাংক ক্লোজিংয়ের সময়ে সাধারণত তারল্য বৃদ্ধি পায়। গত ডিসেম্বরে তারল্য বাড়েনি। বরং কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতে তারল্য কমার জন্য ছয়টি কারণকে শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে করোনার পর হঠাৎ ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয়ের মাত্রাতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি, ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলে গ্রাহকদের হাতে রাখার প্রবণতা বেড়েছে। এছাড়া আমানত, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমার বিষয়টিও চিহ্নিত হয়।

সব মিলে ব্যাংকে যেমন আমানত কমেছে, তেমনি অন্যান্য সঞ্চয়ী উপকরণে বিনিয়োগের প্রবণতা কমে গেছে। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক মন্দায় মানুষের আয় কমায় ভাটা পড়েছে সঞ্চয়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, মোট সঞ্চয়ের প্রায় ৮২ শতাংশই হচ্ছে ব্যাংক খাতে। বাকি ১৮ শতাংশের মধ্যে জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্পে ১৪ শতাংশ ও ৪ শতাংশ অন্যান্য খাতে। সঞ্চয়ের প্রধান দুটি উপকরণ ব্যাংক আমানত ও জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্প খাতে বিনিয়োগ বেশ কমে গেছে।

নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রাইজবন্ডসহ অন্যান্য খাতেও সঞ্চয় কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত পাঁচ কারণে সঞ্চয় কমেছে। এর মধ্যে- ১. দীর্ঘ সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দা, ২. রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে সব ধরনের পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যাওয়া, ৩. ডলারের বিপরীতে টাকার মান লাগামহীনভাবে কমে যাওয়া, ৪. মানুষের আয় হ্রাস এবং ৫. জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বৈশ্বিক মন্দায় বাংলাদেশের কমপক্ষে ৩৭ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। কর্ম হারিয়ে ফেলে নতুন কর্মে যোগ দিতে না পারা, নিয়মিত বেতন-ভাতা না পাওয়া, বেতন-ভাতা কমে যাওয়া, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে মানুষের আয় কমেছে।ছোট সঞ্চয়ের একটি সহজ উপকরণ হচ্ছে প্রাইজবন্ড। এটি যে কোনো ব্যাংক বা সঞ্চয় ব্যুরো কিংবা ডাকঘর থেকে টাকা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কেনা যায়। তিন মাস পরপর লটারির মাধ্যমে এর মুনাফা বাবদ পুরস্কার দেয়া হয়। এর বিক্রিও সামান্য বাড়লেও এতে সঞ্চয়ের স্থিতি কমে গেছে। গত বছরের ৩০ জুন এ খাতে সঞ্চয়ের স্থিতি ছিল ২৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ৩১ ডিসেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় ২১ কোটি ৯০ টাকা। ৩১ জানুয়ারি তা আরও কমে দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে এক মাসে কমেছে সাড়ে ৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে কমেছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। এর আগের বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত স্থিতি ছিল ৩১ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮২ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড বিক্রি হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিক্রি হয়েছে ৮৭ কোটি ২০ লাখ টাকার।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে ব্যাংকগুলো আমানত হারাচ্ছে। কারণ এখন মানুষের ব্যাংকে টাকা রেখে বেশি মুনাফা পাচ্ছে না। বরং জমানো টাকার ওপর ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক পরিশোধের পর যে পরিমাণ মুনাফা হয়, মূল্যস্ফীতি তার থেকে বেশি। ফলে ব্যাংকে আমানত না রেখে নিজেদের কাছে টাকা রেখে খরচ করছেন মানুষ।২০২০ সালের ডিসেম্বরে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমানতের স্থিতি ছিল প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে তা কমে ৪৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ওই সময়ে আমানত কমেছে আড়াই শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তা ৪১ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছিল। মূল্যস্ফীতির কাছে ব্যাংকের আমানতকারীরা অসহায় এখন।

মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় ব্যাংকে আমানত রাখলে এখন লোকসান। যেটুকু সুদ দেয়া হয়, তার ওপর আবার কর কেটে রাখা হয়। এমন অবস্থায় ব্যাংকে টাকা জমিয়ে তাহলে লাভ কী?

সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, আবার ব্যাংকে আমানতের সুদও বেঁধে দিয়েছে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ। ফলে ব্যাংকে টাকা রাখা আমানতকারীদের কাছে এখন বড় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিসাবি আমানতকারীরা তাই দ্বিধাগ্রস্ত ও চিন্তায়। তাদের প্রশ্ন, ব্যাংকে টাকা জমিয়ে তাহলে তাদের লাভ কী? ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে এনে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (লিজিং) রাখবেন, সে উপায়ও নেই। সেখানে সুদ বেশি পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তখন মূল টাকা ফেরত পাওয়া যাবে কিনা, সেই আশঙ্কাও রয়েছে। কারণ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখে মূল টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য অনেক গ্রাহক মাসের পর মাস ঘুরছেন।

গত বছরের আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। তাতে সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যায়। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যে কমে গেছে, তা বাজারে গেলেই বোঝা যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশ আমানতের সুদের হার বাড়িয়েছে; কিন্তু আমরা ওই একই জায়গায় আছি। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় ব্যাংকে আমানত রাখলে এখন লোকসান। যেটুকু সুদ দেয়া হয়, তার ওপর আবার কর কেটে রাখা হয়। এমন অবস্থায় ব্যাংকে টাকা জমিয়ে তাহলে লাভ কী?

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

back to top