নগর সবুজের সঙ্গে মানুষের প্রাণেরই নিবিড় সম্পর্ক। অথচ আজ সেই সম্পর্ক ভগ্নদ্বারে দাঁড়িয়ে। যখন আমরা শহরের পথে চোখ মেলাই, সেখানেই চোখে পড়ে নগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা তুচ্ছ কয়েক গাছ যারাই বাঁচল, তারা দাঁড়িয়ে আছে নিরুপায়, নিঃশ্বাসহীন পরিবেশের মধ্যে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে: “নগরের শেষ গাছগুলো কারা কেটে নিচ্ছে?”
নগরায়নের এই কলঙ্ক পুরোনো নয়; বরং গত কয়েক দশক ধরে শহরের বিস্তারের নামে বেঁধে দেওয়া হয়েছে নির্মাণের থিম। যে অট্টালিকা, শেখর-মহল আর বাণিজ্যিক ভবনগুলো আমাদের শহরকে “আধুনিক” দেখায়, তাদের বুনিয়াদের নিচে রয়েছে পেছনে ফেলে আসা সবুজ বনকেটে। সরকারি প্রকল্প, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, ভূমি দখলগ্রস্ত সিন্ডিকেট এসবই আজ গাছ কাটায় মূল ধারার অংশ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই অননুমোদিত গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতার সুযোগে। টেন্ডারবিহীন কাটাছেঁড়ার কাজ চলে, আর কোনো সরকারি নজরদারি নেই এমন অভিযোগ উঠছে সমাজকর্মী, পরিবেশকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে। যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ বলেন “অভিযান চলছে”, তখনই অন্যদিকে গাছের টুকরো টুকরো ছাই রাস্তায় পড়ে থাকে জানিয়ে দেয় কোথাও যেন শাস্তি নেই। অপরদিকে, অনেক জায়গায় সরকারি উদ্যোগে লাগানো গাছগুলোও বাঁচাতে পারছে না। সঠিক পরিচর্যা না থাকায় অনেকে শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে, পড়ে যাচ্ছে অর্থাৎ কেবল গাছ লাগানোই যথেষ্ট নয়, জীবিত রাখা দরকার।
কিন্তু নাগরিকের আশাই বেঁচে আছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো এখন শহরব্যাপী বৃক্ষ রক্ষা কর্মসূচি চালাচ্ছে, বৃক্ষ উপদেষ্টা কমিটি গঠন হচ্ছে, শিক্ষার্থী-সমাজবাসী মাঠে নামছে। তারা বলছে, গাছ যেন নগরের নাগরিকের মতোই গণ্য হয় অবান্ধনীয়, অপরিবর্তনীয়। এখন সময় এসেছে সবার সরকার, ব্যবসায়ী, নাগরিক একটি সুসংহত পরিকল্পনার। নগরের সবুজ রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ, গাছ কাটার অনুমোদনে স্বচ্ছতা, পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়ন নীতি এগুলো এখন আর বিকল্প নয়। নগরের শেষ গাছগুলো যখন নিঃশ্বাস ছাড়ছে, তখন আমাদের দায়িত্ব শুধু প্রশ্ন করা নয় তার শব্দে উত্তরও দেওয়া। “নগরের শেষ গাছগুলো কারা কেটে নিচ্ছে?” এ প্রশ্ন আজ শুধু প্রতিবাদের স্লোগান নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের রক্ষাকবচ; একটি শহরকে বাঁচিয়ে রাখার সংকটসঙ্কুল ডাক।
মাহিন উদ্দিন