‘মূল্যস্ফীতি : সংখ্যার বাইরে মানুষের জীবনযাত্রা’

দৈনন্দিন বাজারে এখন একধরনের চাপা নিরবতা থাকে। আগের মতো দরদাম করে হাসাহাসি নেই, পরিচিত দোকানদারের সঙ্গে খোশগল্পও কমে গেছে। মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে, দাম শোনে, একটু থামে, তারপর অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে কম জিনিস কিনে ফিরে যায়। যেন বাজার নয়, প্রতিদিনই একধরনের অঘোষিত হিসাবনিকাশের পরীক্ষা চলছে। এই দৃশ্য শুধু রাজধানীর নয়, জেলা শহর থেকে শুরু করে গ্রামের হাটেও একই রকম। কারণ গত তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে আর কোনো সাময়িক অর্থনৈতিক শব্দ নয়; এটি মানুষের নিত্যদিনকার জীবনের স্থায়ী বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ী ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তার আগের মাস নভেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ টানা দুই মাস মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সংখ্যার হিসাবে এটি হয়তো বড় কোনো লাফ নয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব প্রবল। কারণ এখানে প্রশ্ন শুধু শতাংশের নয়; প্রশ্ন হলো মানুষের সংসার চলে কিনা, মাস শেষে ধার করতে হয় কিনা, কিংবা সন্তানের খাবারের থালায় কিছু কমে গেল কিনা। মূল্যস্ফীতির আলোচনা আমরা প্রায়ই অর্থনীতিবিদদের ভাষায় শুনি, যেখানে প্রসঙ্গ থাকে মুদ্রানীতি, রিজার্ভ, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় ইত্যাদি। কিন্তু এই সবকিছুর শেষ গন্তব্য একটাই- মানুষের বাজারের থলে। আজকের বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি মানে শুধু চাল-ডালের দাম বাড়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডলারের দর, রেমিট্যান্সের উত্থান, রপ্তানি খাতের দুর্বলতা এবং অর্থনীতির টানাপোড়েন।

মূল্যস্ফীতি এখন আর কোনো সাময়িক ঝড় নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী চাপ। রেমিট্যান্সের সুখবর মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু বাজারে ঢুকলেই বা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করলেই সেই স্বস্তি উবে যায়। অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে হিসাব করতে গিয়ে ভয় পাবে না; যখন মাস শেষে ধার নয়, সঞ্চয়ের কথা ভাবতে পারবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি সত্যিই মানুষের জন্য হয়, তবে মানুষের এই নীরব দীর্ঘশ্বাসই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

অর্জিতা সূত্রধর

সম্প্রতি