নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসে, ততই আমাদের দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক। নির্বাচন-পূর্ববর্তী ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি ও বাড়ি দখলের মতো ঘটনাগুলো আর বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক নয়; বরং এগুলো একটি পুনরাবৃত্ত, সুপরিচিত এবং ভয়াবহ রাজনৈতিক বাস্তবতা। নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে এই সহিংসতার এক ধরনের অদৃশ্য যোগসূত্র তৈরি হয়েছে, যা রাষ্ট্র ও সমাজ-উভয়ের জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র প্রায়শই নিরপেক্ষ রক্ষকের ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনের বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া এবং বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের স্পষ্ট বার্তা দেয়Ñএ ধরনের সহিংসতার মূল্য খুব বেশি নয়। রাজনৈতিক পরিচয় যদি ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তবে অপরাধ প্রায় ‘নিরাপদ বিনিয়োগে’ পরিণত হয়। এই দায় শুধু স্থানীয় প্রশাসনের নয়; কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্র এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর রাজনৈতিক দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।
নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা বিশেষ সুবিধা নয়Ñএটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক, রাজনৈতিক ও মানবাধিকারগত দায়। এই দায় থেকে বারবার পালিয়ে যাওয়া মানে গণতন্ত্রকে কেবল সংখ্যার খেলায় নামিয়ে আনা, যেখানে মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের কোনো স্থান নেই।নির্বাচনের সাফল্য পরিমাপ হবে কেবল ভোটের হার বা ক্ষমতা বদলের মাধ্যমে নয়; বরং পরিমাপ হবেÑকতটা নিরাপদে, ভয়মুক্তভাবে এবং সমান মর্যাদায় সংখ্যালঘুরাও ভোট দিতে পেরেছে তার মধ্য দিয়ে। এই মানদ-েই রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের নৈতিক উত্তরণ বিচারিত হবে।
সুধীর বরণ মাঝি