দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে ফসলে কীটনাশকের ব্যবহার বিগত কয়েক দশকে বহুগুণ বেড়েছে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় কীটনাশককে প্রায় অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার মানবস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। স্বল্পমেয়াদে এটি ফসল রক্ষা করলেও দীর্ঘমেয়াদে পোকামাকড়ের মধ্যে জেনেটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করেছে যে, বহু কীটনাশক ইতোমধ্যে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এই রাসায়নিকগুলো দীর্ঘদিন শরীরে জমা হয়ে স্নায়বিক রোগ, মাথাব্যথা, বমি, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, বন্ধ্যাত্ব, ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগ, হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। স্বল্পমাত্রায় হলেও দীর্ঘদিন গ্রহণের ফলে এটি Slow Poisoning-এর মতো কাজ করে। পরিবেশগত ক্ষতির দিকটি আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। কীটনাশক মাটির জৈব গুণাগুণ নষ্ট করছে এবং উপকারী অণুজীব, ব্যাকটেরিয়া ও কেঁচো ধ্বংস হওয়ায় মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। জলাশয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি মাছ, উভচর প্রাণী ও জলজ উদ্ভিদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় কৃষিতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা এক ধরনের ক্ষতিকর চক্র সৃষ্টি করছে। কীটনাশক ব্যবহারের সংকট মূলত প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়, বরং নীতিগত ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার ফল। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM), জৈব ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ, কৃষকের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং গ্রাম পর্যায়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। টেকসই কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে এখনই এই বিষচক্র ভেঙে কীটনাশকনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম