ভোরের আলো ফোটার আগেই অসংখ্য নারী কাজ শুরু করেন- কেউ তৈরি পোশাক কারখানায়, কেউ ক্ষেতখামারে, কেউ হাসপাতালে নার্স হিসেবে, আবার কেউ মানুষের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। সারাদিনের কঠোর পরিশ্রমের পর যখন তারা মজুরি হাতে পান, তখন অনেকেই লক্ষ্য করেন-একই কাজ করেও পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় তাদের পারিশ্রমিক কম। এই নীরব বাস্তবতাই আমাদের সমাজে মজুরি বৈষম্যের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে নারীরা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা-সব ক্ষেত্রেই নারীদের অবদান প্রতিদিন দেশের অগ্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই অবদানের যথাযথ মূল্য সবসময় তারা পান না। অনেক ক্ষেত্রে এখনও এমন ধারণা কাজ করে যে পুরুষই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী, তাই তার মজুরি বেশি হওয়া স্বাভাবিক। এই পুরনো চিন্তাধারা ধীরে ধীরে বৈষম্যকে সমাজে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করেছে।
বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হন। গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক, পারিবারিক ব্যবসায় সহায়তাকারী নারী বা ছোট কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের অনেকেরই নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই। ফলে তারা প্রায়ই কম পারিশ্রমিক পান এবং প্রতিবাদ করার সুযোগও পান না। অনেক সময় তাদের কাজকে “সহায়ক” বা “অতিরিক্ত” কাজ হিসেবে দেখা হয়, যেন সেই শ্রমের আলাদা কোনো মূল্য নেই। অথচ সেই শ্রম ছাড়া অনেক পরিবার ও প্রতিষ্ঠানই সঠিকভাবে চলতে পারত না। মজুরি বৈষম্যের আরেকটি বড় দিক হলো কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি ও সুযোগের সীমাবদ্ধতা। একই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী উচ্চপদে কাজ করার সুযোগ পান না বা বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেন। এতে তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা কমে যায় এবং পরিবার ও সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এই বৈষম্য শুধু নারীদের নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে, কারণ দক্ষ ও পরিশ্রমী মানুষের সঠিক ব্যবহার তখন সম্ভব হয় না।
এই সমস্যা দূর করতে হলে প্রথমেই দরকার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আমাদের বুঝতে হবে, কাজের মূল্য নির্ধারণ হবে দক্ষতা, পরিশ্রম ও দায়িত্বের ভিত্তিতে-লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়। পরিবার থেকেই ছেলে ও মেয়েদের সমান মর্যাদার শিক্ষা দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সমতার মূল্য বুঝে বড় হয়। গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে; তারা সচেতনতা বাড়াতে পারে এবং সমান অধিকারের বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের। “সমান কাজের জন্য সমান মজুরি” নীতি শুধু কাগজে নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত ও সমাধানের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে নারী শ্রমিকরা নিরাপদে নিজেদের অধিকার দাবি করতে পারেন। পাশাপাশি নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তারা আরও উচ্চ দক্ষতার কাজ করতে পারেন এবং আয়ের ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়।
নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি শ্রেণির মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা নয়; এটি পুরো সমাজের উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করা। যখন একজন নারী তার পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পান, তখন তার পরিবারের জীবনমান উন্নত হয়, সন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ে, এবং সমাজে দারিদ্র?্য কমতে শুরু করে। অর্থাৎ নারীর ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা মানেই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা।
আজ সময় এসেছে মজুরি বৈষম্যকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার। নারী ও পুরুষ-উভয়ের পরিশ্রমই দেশের উন্নয়নের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা শুধু ন্যায়বিচারের দাবি নয়, এটি একটি উন্নত ও মানবিক সমাজ গড়ার অপরিহার্য শর্ত।
কাজী মাধুর্য রহমান