image

বেকার তরুণদের স্বপ্ন কোথায় হারায়

বেকার তরুণ মানেই অলস-এই ভুল ধারণা সমাজ খুব আন্তরিকভাবে লালন করে। অথচ সত্য হলো বেকার তরুণরা সবচেয়ে বেশিই কাজ করে। তারা ফরম পূরণ করে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ায়, এক স্থান হতে অন্য স্থান অবিরাম ছুটে যায়। ফিরে এসে পরিবার-স্বজনের কিছু হলো, কখন হবে, আর কতদিন এমন অনুপ্রেরণাবিহীন প্রশ্ন সহ্য করে। ভেঙে পড়ার পর নিজেকে আবার দাঁড় করানোর মতো সব চেয়ে বড় কাজটি বেকার তরুণরাই করে। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা যখন বলেন,“তরুণরাই দেশের সম্পদ”-তখন কথাটা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু সম্পদগুলো রাখা হয় সাধারণত লকারে আর তরুণদের রাখা হয় ফরম পূরণের লাইনে, ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে ও অপেক্ষা নামের অনন্ত করিডোরে। সেখানে কেউ বলে না তুমি ক্লান্ত হয়েছো কি না, সেখানে শুধু বলা হয় “পরবর্তী প্রার্থী।”

তরুণদের স্বপ্ন হারিয়ে যায় অনেক পথে। হারায় অনিয়মের অন্ধগলিতে, হারায় মেধা ও সুযোগের অসম লড়াইয়ে, হারায় সুপারিশের টেবিলে, হারায় ঘুষের মোটা খামের ভাঁজে। আরেকটা বড় হারানো ঘটে নীরবে পরিবারের ভিতরে। বাবা বলেন, “আর কতদিন?” মা রাতে ঢেকে কান্না করেন। ছোট ভাই বলে, “তুমি তো এখনও কিছু করলে না।” এই একেকটা বিষয় সবচেয়ে বড় চাবুক হয়ে পীড়া তৈরি করে। যে মানুষটা প্রতিদিন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে, সমাজ তাকে অলসতার, হতাশার ও অসফলতার আসামি বানিয়ে দেয়। তরুণদের কেউ কেউ নিজের সুপরিচিত স্থান ছাড়ে। মনে করে এই দেশ নয়, অন্য কোনো দেশের আকাশে হয়তো তার জন্য একটু জায়গা আছে। কেউ কেউ গ্রামের জমিতে কাজ শুরু করে, কেউ ছোট ব্যবসা শুরু করে, কেউ শিখতে শুরু করে নতুন দক্ষতা। কিন্তু সবার পক্ষে কি সব সম্ভব সবাই কি সমান সুযোগ পায় আমরা কথা বলি সুযোগের সমতার কিন্তু বাস্তবতা হয় তার বিপরীত। কেউ দেয়ালের ওপরে বসে হাসে, কেউ দেয়ালে মাথা ঠোকে।

তরুণদের স্বপ্ন হারায় শুধু রাষ্ট্রের ব্যর্থতায় নয়, হারায় আমাদের নীরবতায়। আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করে নতুন প্রজন্মকে শেখাই-স্বপ্ন দেখো, তবে ভাঙার জন্য প্রস্তুত থাকো। সর্বশেষ সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা আবার-বেকার তরুণদের স্বপ্ন কোথায় হারায় পরীক্ষার খাতায় অসম নিয়োগে দুর্নীতির নোংরা খেলায় নাকি আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতায় আমরা যদি সত্যিই তরুণদের ভালোবাসি, তাহলে শুধু উপদেশ না-দরকার সুযোগ, স্বচ্ছতা, এবং সম্মানের নিশ্চয়তা। না হলে একদিন ইতিহাস লিখবে, ‘এই দেশে তরুণরা ছিল, স্বপ্নও ছিল, কিন্তু সুযোগ ছিল না।’ আর সেই ইতিহাসের পাতায় আমাদের নামও লেখা থাকবে অন্তঃসারশূন্য দর্শক হিসেবে।

সুমন চৌধুরী

সম্প্রতি