তিমিরে আটকে সভ্যতা

সভ্যতার ইতিহাস যত দীর্ঘ, নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসও ততটাই নির্মম। এই নিয়ন্ত্রণ কখনো সরাসরি প্রকাশ পায়নি; বরং ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক বিধিব্যবস্থার মোড়কে বৈধতা পেয়েছে। যুগে যুগে মোড়ক বদলালেও মূল উদ্দেশ্য একই রয়েছে-পুরুষকে ক্ষমতার কেন্দ্রে রাখা এবং নারীকে নিয়ন্ত্রিত সত্তায় পরিণত করা। অধিকাংশ ধর্মগ্রন্থ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রচিত হয়েছে, যেখানে পুরুষের অভিজ্ঞতা ও স্বার্থ কেন্দ্রীয় ছিল। ফলে নারীকে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণযোগ্য সত্তা হিসেবে দেখা হয়েছে।

সমস্যা ধর্মে নয়, সমস্যা সেই ব্যাখ্যায় যা যুগ বদলালেও বদলাতে দেয়া হয়নি। কারণ ব্যাখ্যা বদলালে ক্ষমতার ভারসাম্য নড়ে যায়। নারী শিক্ষিত হলে প্রশ্ন করে, অধিকার বোঝে এবং সিদ্ধান্ত নিতে চায়-যা পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শত্রু। আজও ধর্ম, শালীনতা বা সংস্কৃতির নামে নারী শিক্ষাকে প্রকাশ্যে নিরুৎসাহিত করা হয়। অথচ অসুস্থ হলে সেই একই সমাজ নারী ডাক্তারের খোঁজে ছোটে। এই দ্বিচরিত্রতা স্পষ্ট করে যে সমস্যা নারীর শিক্ষায় নয়, নারীর ক্ষমতায়নে। নারী সেবা দিতে পারে, শ্রম দিতে পারে, কিন্তু নেতৃত্ব দিতে বা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে নাÑএটাই অলিখিত সামাজিক চুক্তি।

নারী শিক্ষা কোনো পশ্চিমা ধারণা বা বিলাসিতা নয়, এটি জাতির আত্মরক্ষার শর্ত। নারী শিক্ষিত হলে পরিবার ও প্রজন্ম আলোকিত হয়। নারীর কণ্ঠরোধ মানে যুক্তির কণ্ঠরোধ। এই লড়াই নারী বনাম পুরুষের নয়, মানবতা বনাম অমানবিকতার। নারী মুক্তি রাজনৈতিকভাবে ন্যায্য, নৈতিকভাবে অপরিহার্য এবং সভ্যতার জন্য অপ্রত্যাহার্য শর্ত। নারী বন্দি থাকলে সমাজ বন্দি থাকবে-এটি ইতিহাসের রায়।

সুধীর বরণ মাঝি

সম্প্রতি