image

রক্তাক্ত ইরান

যখন দিগন্তজোড়া আকাশে যুদ্ধবিমান ছুটে যায়, তখন শুধু বোমা পড়ে না, পড়ে একটি জাতির আত্মমর্যাদা, পড়ে ইতিহাসের গায়ে নতুন ক্ষত। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে ইরান যেন আজ সেই একা দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষ, যাকে ঘিরে ঝড় উঠেছে। কিন্তু ঝড় যতই প্রবল হোক, শেকড় যদি গভীরে থাকে, গাছ উপড়ে ফেলা সহজ নয়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক আগ্রাসন এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনির হত্যাকান্ড কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাত। প্রশ্ন এখন শুধু সামরিক শক্তির নয়, প্রশ্ন নৈতিকতার, প্রশ্ন মুসলিম বিশ্বের ভূমিকার।

ইরানের ওপর চালানো ধ্বংসযজ্ঞের পর পুনরায় শক্তভাবে উঠে দাঁড়াতে হলে কয়েকটি সুসংগঠিত ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। প্রথমতো, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। সর্বোচ্চ নেতৃত্বে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছ- তা দ্রুত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় পূরণ করতে হবে। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়। তাই জনগণের আস্থা বজায় রাখতে স্বচ্ছ ও ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত জরুরি। দ্বিতীয়তো, জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। এই মুহূর্তে অভ্যন্তরীণ বিভাজন দূরে সরিয়ে সরকার, বিরোধী শক্তি, সামরিক বাহিনী ও সাধারণ জনগণকে একই লক্ষ্য রাষ্ট্র রক্ষা ও পুনর্গঠন এর অধীনে আনতে হবে। জাতীয় সংকটে ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। তৃতীয়তো, অবকাঠামো পুনর্গঠন ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার। ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র, সামরিক ঘাঁটি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিল্পকারখানা দ্রুত সংস্কার করতে হবে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বাস্তবতায় বিকল্প বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল নিতে হবে। চতুর্থতো, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও আধুনিক করা। হামলা প্রমাণ করেছে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ফাঁক ছিল। সাইবার নিরাপত্তা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা সক্ষমতা উন্নত করা এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আকস্মিক আঘাত ঠেকানো যায়। পঞ্চমতো, কূটনৈতিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি করা। মুসলিম বিশ্ব, এশীয় শক্তি ও ও নিরপেক্ষ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করতে হবে। আগ্রাসনের নৈতিক প্রশ্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তুললে কৌশলগত সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

ইরান আজ একা লড়ছে কিন্তু একা মানে দুর্বল নয়। ইতিহাস সাক্ষী, যারা আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আপস করেনি, তারা সাময়িক ক্ষতি স্বীকার করেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে গেছে। ?খামেনির মৃত্যু ইরানের জন্য গভীর শোকের, কিন্তু এটি একই সঙ্গে প্রতিরোধের নতুন অধ্যায়ও। একটি জাতিকে নেতৃত্বহীন করে দিলে সে ভেঙে পড়বে এই ধারণা বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ?মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো যদি আজ নীরব থাকে, তবে আগামীকাল তাদেরও একই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতে পারে। ন্যায়বিচার কখনও শক্তির একচেটিয়া সম্পত্তি হতে পারে না। ইরানের প্রতি এই আগ্রাসন শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে হামলা নয়, এটি একটি স্বাধীন অবস্থানের বিরুদ্ধে বার্তা। আর সেই বার্তার জবাব দিতে হলে প্রয়োজন ঐক্য, নৈতিক সাহস এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বোধের পুনর্জাগরণ।

নুসরাত জাহান স্মরনীকা

সম্প্রতি