এক কেজি আলুর দাম ৭ টাকা (উত্তরবঙ্গে)। অথচ একজন পুরুষ কৃষিশ্রমিকের দিনমজুরি প্রায় ৭০০ টাকা। দুই বিঘা জমিতে উৎপাদিত আলু বিক্রি করেও অনেক কৃষক সেই শ্রমিকের মজুরি পর্যন্ত মেটাতে পারছেন না। মাঠে ফসল আছে, গোলা ভরা আলু আছে- কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। বরং আছে হতাশা, দুশ্চিন্তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।
গ্রামের মাঠে যে আলু ৭ বা ৮ টাকায় বিক্রি হয়, সেই একই আলু শহরের বাজারে গিয়ে অনেক সময় ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রশ্ন হলো এই বাড়তি টাকা কোথায় যায়? এর বড় অংশই যায় মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের হাতে। কৃষক সাধারণত সরাসরি শহরের বাজারে আলু বিক্রি করতে পারেন না। তিনি স্থানীয় পাইকার বা আড়তদারের কাছে আলু বিক্রি করেন। এরপর সেই আলু বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে খুচরা বাজারে পৌঁছায়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কৃষক সবচেয়ে কম লাভ পান, অথচ উৎপাদনের পুরো ঝুঁকিটাই তাকে নিতে হয়।
আলুর দাম কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো- সংরক্ষণ সমস্যাও। দেশে অনেক কোল্ড স্টোরেজ থাকলেও সব কৃষক সেখানে আলু রাখতে পারেন না। কারণ কোল্ড স্টোরেজে আলু রাখতে হলে ভাড়া দিতে হয়, যা অনেক কৃষকের পক্ষে দেয়া কঠিন। ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে মৌসুমের শুরুতেই আলু বিক্রি করে দেন। এতে বাজারে একসঙ্গে প্রচুর আলু চলে আসে এবং দাম আরও কমে যায়। যদি সংরক্ষণব্যবস্থা আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হতো, তাহলে কৃষক সময়মতো ভালো দামে আলু বিক্রি করার সুযোগ পেতেন। বাংলাদেশের কৃষক শুধু অর্থনৈতিক কারণে চাষ করেন না, জমির সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফসল ফলানো তাদের জীবনের অংশ। কিন্তু যখন বছরের পর বছর লোকসান হয়, তখন সেই সম্পর্কও দুর্বল হয়ে যায়। অনেক কৃষক এখন বলতে শুরু করেছেন- এভাবে চলতে থাকলে তারা আর আলু চাষ করবেন না। কেউ কেউ অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন, আবার কেউ কৃষিকাজ ছেড়ে শহরে কাজ খুঁজতে যাচ্ছেন। যদি এই প্রবণতা বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের কৃষি খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এই সংকটের মধ্যেও সমাধানের পথ অবশ্যই থাকবে যদি সঠিক সময়ে সঠিক পরিকল্পনা নেয়া যায়। কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যদি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে আলু কিনে, তাহলে বাজারে একটি স্থিতিশীল দাম তৈরি হবে। বাংলার কৃষক আর কতদিন লোকসানে চাষ করবে? এই প্রশ্ন শুধু কৃষকেরÑ পুরো দেশের কাছে। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলেই টিকে থাকবে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি।
এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন সরকার কাঠামোর কাছে একটি আন্তরিক অনুরোধ রয়ে যায়- দেশের কৃষকদের দিকে আরও গভীরভাবে নজর দেয়া হোক। মাঠে যারা দিনরাত পরিশ্রম করে দেশের খাদ্য নিশ্চিত করেন, তাদের ন্যায্য অধিকার ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন।
তামান্না ইসলাম
অর্থ-বাণিজ্য: ভরিতে ৩ হাজার ২৩৬ টাকা বাড়লো সোনার দাম
অর্থ-বাণিজ্য: ঈদের ছুটিতে কাস্টম হাউসগুলো খোলা থাকবে