সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও ‘সংস্কার পরিষদের’ শপথ বয়কট বিএনপির, ক্ষুব্ধ জামায়াত ও এনসিপি

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। তবে নাটকীয়তা দেখা দেয় যখন পূর্বনির্ধারিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানায় দলটি। জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিএনপি সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংস্কার পরিষদের শপথ বর্জন করলেও, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) উভয় শপথই গ্রহণ করেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছেন

আমরা গণপরিষদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ

সরকারি দল সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে জুলাইকে উপেক্ষা এবং অবজ্ঞা করেছে: শফিকুর রহমান

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। সাধারণত স্পিকার শপথ পড়ালেও গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে এবার সিইসি এই দায়িত্ব পালন করেন।

শপথ অনুষ্ঠানের শুরুতে সংসদ সচিবালয় থেকে নবনির্বাচিত সদস্যদের সামনে দুটি ভিন্ন রঙের ফরম দেয়া হয়। এর মধ্যে সাদা রঙের ফরমটি ছিল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার জন্য এবং নীল রঙের ফরমটি ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার জন্য। কিন্তু শপথ শুরুর ঠিক আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার-১ আসনের নবনির্বাচিত এমপি সালাহউদ্দিন আহমদ দলীয় সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন, তারা সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা গণপরিষদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে।’ তিনি আরও যুক্তি দেখিয়ে বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদেরকে শপথ পড়াবেন এবং শপথের ফরম কী হবে, তা সংবিধানে বা তৃতীয় তফসিলে উল্লেখ নেই।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এই রকম ফরম (নীল ফরম) সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসবে। সেগুলো জাতীয় সংসদে সাংবিধানিকভাবে গৃহীত হওয়ার পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেয়ার বিধান করা যাবে বিধায় আমরা এখন সাংবিধানিকভাবে এই পর্যন্ত এসেছি।’ দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে তিনি সহকর্মীদের জানান। ফলে সংসদ সচিবালয়ের পূর্ণ প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও বিএনপির এমপিরা নীল রঙের ফরমটিতে স্বাক্ষর করেননি বা ওই শপথ নেননি।

শপথ অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান উপস্থিত ছিলেন। তার ডান পাশে ছিলেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং বাম পাশে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শপথ শেষে বিএনপির সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্যের শপথপত্রে সই করেন।

বিএনপির শপথ অনুষ্ঠানের পর দুপুর ১২টার দিকে শপথ নেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচিত ৬৮ জন সংসদ সদস্য। বিএনপির অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পরপরই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা গণভোটের রায়কে সম্মান করেছি, জুলাইয়ের আকাক্সক্ষাকে সম্মান করেছি। যারা আমাদের ভোট দিয়েছেন, তাদের সম্মান করেছি এবং আমরা একমত হয়েছি যে এই শপথ নেয়া আমাদের কর্তব্য।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিএনপি সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করেছে। শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা মনে করি, সরকারি দল শপথ না নিয়ে তারা জুলাইকে উপেক্ষা এবং অবজ্ঞা করেছে। এতে জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে তাদের অবস্থান বলে আমরা মনে করি।’

জামায়াতের আমির আরও উল্লেখ করেন, সংসদ সচিবালয় থেকে দেয়া চিঠিতে দুটি শপথের কথা স্পষ্ট উল্লেখ ছিল এবং তারা উভয় শপথ নিতেই প্রস্তুত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ছাব্বিশের নির্বাচনটা হয়েছে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের কারণে। জুলাইকে অসম্মান-অশ্রদ্ধা করে, স্বীকৃতি না দিয়ে ছাব্বিশের এই পার্লামেন্ট নিশ্চয়ই কোনো গৌরবের আসনে বসতে পারবে না।’

https://sangbad.net.bd/images/2026/February/18Feb26/news/Untitled-1.jpg

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিএনপির এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আজকে সরকারি দল হিসেবে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিল না, এটা গণভোটের যে গণরায় এসেছে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে, সংস্কারের পক্ষে, সেই রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়েছে।’

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সরকার গঠনের প্রথম দিনই যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল, তাদের কাছ থেকে জাতি কী আশা করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিএনপির দেয়া সাংবিধানিক ব্যাখ্যার জবাবে তিনি বলেন, ‘গণভোট সংবিধানে ছিল না। তবে গণভোটের বৈধতা দিয়েছে জুলাই সনদ। সেটি সবাই মেনে নিয়ে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে অংশ নিয়েছে।’ তিনি একে কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ নয়, বরং আইনি সংকট তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেন।

শপথ অনুষ্ঠানে কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনাও ঘটে। বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ শেষ হলে দলটির নেতা ইশরাক হোসেন জামায়াত ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সঙ্গে শপথ নিতে যান। তবে যখন সংবিধান সংস্কার বিষয়ক শপথ শুরু হয়, তখন রুমিন ফারহানা (স্বতন্ত্র) এবং ইশরাক হোসেন শপথ কক্ষ থেকে উঠে চলে যান। তারা দুজন এমপি হিসেবে শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এনসিপির ছয়জন নির্বাচিত এমপি এবং জামায়াত জোটের শরিক দলগুলোর সদস্যরা দুটি শপথই গ্রহণ করেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল ও ২৭৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২৯৯ আসনে ভোটগ্রহণ হলেও আদালতের নির্দেশে দুটি আসনের ফল স্থগিত থাকে। ঘোষিত ফলাফলে বিএনপি ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, যা মোট ভোটের ৪৯.৯৭ শতাংশ।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৮টি আসন পায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যাদের প্রাপ্ত ভোট ৩১.৭৬ শতাংশ। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে বিজয়ী হন।

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ অনুসারে, নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়। এই আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করার কথা এবং এই পরিষদ সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সব ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।

শপথ গ্রহণ শেষে সংসদ সদস্যদের পরিচয়পত্রের জন্য ছবি, আঙ্গুলের ছাপ ও ডিজিটাল স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করা হয়। শপথ কার্যক্রম শেষে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি