ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে নির্বাচনী প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। বুধবার,(১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬)সকাল থেকে ভোটগ্রহণের সরঞ্জাম বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে সকাল ১০টায় বিতরণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করে বেলা ১১টার দিকে শুরু হয়। চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করে নগরের পাঁচটি সংসদীয় আসনের নির্বাচনী সরঞ্জাম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেয়া হয়।
ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার, সিল, ভোটকক্ষের প্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ সব উপকরণ বুঝে নেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। অবশ্য তার আগে জেলার দূরবর্তী ও গ্রামীণ আসনগুলোর জন্য নির্বাচনী সরঞ্জাম সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে পাঠানো হয়। ধাপে ধাপে পুরো জেলার ১ হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রে এসব সরঞ্জাম পৌঁছে দেয়ার কাজ চলে।
নির্বাচন ব্যবস্থাপনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. জিয়াউদ্দীন বলেন, ভোট উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে সবধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো ঝুঁকি তারা দেখছেন না। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজন করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তিনি আরও জানান, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ভোটকেন্দ্রগুলোর ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা, পরিবহন ও তদারকিতে থাকবে বাড়তি সতর্কতা।
এদিকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের লক্ষে?্য মহানগর ও জেলা প্রশাসন কঠোরভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। র্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস?্যরা বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ও এলাকায় এলাকায় নিরাপত্তা নজরদারি বাড়িয়েছে। নগরী ও জেলায় বুধবার সন্ধ্যার পর হতে যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বাইরে মিলিয়ে ১৬টি সংসদীয় আসনে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রশাসন আশা করছে। চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ১৪৩ জন প্রার্থী। যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহার শেষে বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ১১০ জন প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রামে মোট ভোটার সংখ্যা ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৭ জন। আর নারী ভোটার ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭০ জন। তৃতীয় লিঙ্গ ভোটার ৭০ জন। চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে মোট ১ হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫৫ ভোটকেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। এর মধ্যে নগরে ৩১০টি এবং জেলায় ৩৪৫টি কেন্দ্র রয়েছে বলে চট্টগ্রাম জেলা রিটার্নিং অফিসার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা, ভৌগোলিক অবস্থান, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রগুলোর ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়েছে।
তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড-পাহাড়তলী) আসনে। এ আসনের ১২৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের ১০৬টি কেন্দ্রের কোনোটিকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি): ১৪০টির মধ্যে ৩টি, চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ): ৮৩টির মধ্যে ২৪টি, চট্টগ্রাম-৫ আসনে ৩০টি, চট্টগ্রাম-৬ আসনে ২১টি, চট্টগ্রাম-৭ আসনে ৬টি, চট্টগ্রাম-৮ আসনে ২৫টি, চট্টগ্রাম-১২ আসনে ২৪টি, চট্টগ্রাম-১৩ আসনে ১৩টি, চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে ১১২টির মধ্যে ৪১টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। চট্টগ্রাম-১৪ ও চট্টগ্রাম-১৫ আসনের কয়েকটি কেন্দ্র দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে। এছাড়াও নগরীর খুলশী থানার অধীন ৪৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৪টি এবং আকবরশাহ থানার ২২টি কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। কোতোয়ালী, হালিশহর, পাহাড়তলী, সদরঘাট ও চান্দগাঁও থানায়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। তবে বন্দর থানার আওতায় কোনো কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ নয়।
নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর করতে সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আনসার বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনের চার দিন আগে থেকে ভোটের পর দুই দিন মোট ছয় দিন বাড়তি নিরাপত্তা থাকবে। ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৫৩৭টি কেন্দ্রের ৫,৭০৬টি কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
প্রার্থীদের অভিযোগ চট্টগ্রাম-৯ আসনের বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী অ্যাডভোকেট শরীফ উদ্দীন কবির আবিদ অভিযোগ করেন, নির্বাচনে পেশিশক্তি ও কালো টাকার ব্যবহার এখনও কমেনি এবং কিছু এলাকায় ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের বৃহত্তর সুন্নি জোটের প্রার্থী সৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় তাদের নেতাকর্মীদের হুমকি দেয়া হলেও সাধারণ মানুষের সমর্থন তাদের পক্ষে রয়েছে। চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-আংশিক সাতকানিয়া) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম রাহী বলেন, নির্বাচনে একই এলাকা থেকে আমরা দুইজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন করছি। বিভিন্ন সময় দলীয় প্রার্থীরা আমাদের কর্মী সমর্থকদের ভয় দেখিয়ে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। বিষয়টি আমরা স্থানীয়ভাবে প্রশাসনকে জানিয়েছি।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, নির্বাচনের সময় মাঠে ১১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বডিওর্ন ক্যামেরা থাকবে। তিনি বলেন, একটি শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, ঝুঁকি মোকাবিলায় জনবল বৃদ্ধি ও টহল জোরদার করা হয়েছে। যাতে ভোটাররা নির্বিঘেœ ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন।
নগর-মহানগর: ফাঁকা ঢাকা, নেই চিরচেনা যানজট-কর্মচঞ্চলতা