image

বিশ্লেষণ

রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শেষ হওয়ার পর ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। বেসরকারি ফলাফল বলছে, দীর্ঘ ২০ বছর পর আবারও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

২৯৯টি আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ১৭৫টি আসনে। বিপরীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৫৬টি আসন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৬টি আসন। স্বতন্ত্র ও অন্যান্য প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ১১টিতে। বাকি ৪২টি আসনের ফলাফল এখনো প্রক্রিয়াধীন।

তবে পরিসংখ্যান বলছে, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে বিএনপি। ফলে সংসদের প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখা যেতে পারে জামায়াতে ইসলামকে। সেই সঙ্গে সংসদে এবার নতুন মুখের তরুণ নেতৃত্ব দেখা যাবে। যারা সংসদকে প্রাণবন্ত ও সরব রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটার ২৯৯টি আসনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম সাড়ে সাত ঘণ্টায় ভোট পড়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। কয়েকটি আসনে ভোটের হার ৭০ শতাংশেরও বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় পর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার এমন স্পষ্ট দ্বিমুখী রূপ ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ দুই আসনেই বেসরকারি ফলে জয়ী হয়েছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। বিশেষ করে বগুড়া-৬ আসনে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে জয় পেয়েছেন। ঝিনাইদহ-১, কুমিল্লা-৩, সুনামগঞ্জ-১, পটুয়াখালী-৩সহ বিভিন্ন আসনে দলীয় ও জোটপ্রার্থীদের জয় বিএনপির সারা দেশেই জয়ের চিত্র দেখাচ্ছে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, বরিশাল- প্রায় সব বিভাগেই ছড়িয়ে রয়েছে তাদের সাফল্য। এতে বোঝা যাচ্ছে, সমর্থন কেবল নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত। অন্যদিকে, সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও জামায়াতে ইসলামী রংপুর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর ও যশোরসহ কয়েকটি অঞ্চলে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। কুমিল্লা-৪ আসনে বড় ব্যবধানে জয় তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সংসদে কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিএনপি সর্বশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। ১৯৯১ সালে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালেও স্বল্প সময়ের জন্য সরকার গঠন করে দলটি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এবার আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

২০০৮ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে দেশে ক্ষমতার প্রকৃত পালাবদল হয়নি- এমন অভিযোগ রাজনৈতিক মহলে ছিল। ফলে জবাবদিহি, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সেই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি গণতন্ত্রে উত্তরণের একটি বড় ধাপ, তবে পথ এখনো সহজ নয়।

সামনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বিজয়ী দলকে। নতুন সরকারকে সামনে রেখে কয়েকটি বড় প্রশ্ন উঠে আসছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও বিরোধী দলের প্রতি আচরণ কেমন হবে, নির্বাচনোত্তর অভিযোগ ও অসন্তোষ কীভাবে সমাধান করা হবে, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে আর সর্বশেষ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত করা হবে।

অন্যদিকে, মূল ধারার গণমাধ্যমের অনুকূল সমর্থন পেয়েছে বিএনপি। প্রতিক্রিয়াশীল আর চরমপন্থিদের হামলার শিকার হয়েছে বড় বড় গণমাধ্যম। ফলে সেসব গণমাধ্যম বিএনপির ন্যারেটিভ বির্নিমাণে ও ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে মিত্রভূমিকা পালন করেছে। তবে আগামীতে এই ধরনের মিত্রভূমিকার বদলে বৈরিতা দেখা দিতে পারে।

দিনশেষে এটাই স্পষ্ট যে, ত্রয়োদশ সংসদে ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে যাচ্ছে। ভোটাররা তাদের মত প্রকাশ করেছেন। এখন দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের, এই ফলকে কি তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে রূপ দেবেন, নাকি নতুন করে আরেক অধ্যায়ের সূচনা হবে, সেটিই দেখার বিষয়।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি