image

কবি ওবায়েদ আকাশ
শুদ্ধ মননের কণ্ঠস্বর

আনোয়ার মল্লিক

ওবায়েদ আকাশ বহুপ্রজ কবি। বিষয়টা মোটেই নেতিবাচকভাবে দেখছি না। যিনি কবি, তাকে তো কবিতাকে নিয়েই থাকতে হয়, সারাক্ষণই থাকতে হয়। কবিতার সঙ্গেই চলে তার ঘর-গৃহস্থালী। কবিতা এমন এক অভিমানী রাধা, সামান্য বিরহও যার কাছে মৃত্যুর সমান। অখণ্ড মনোযোগ ছাড়া তাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। ওবায়েদ আকাশ একনিষ্ঠ প্রেমিকের মতো কবিতাকে ভালোবেসে চলেছেন। কবিতার সঙ্গে বেঁধেছেন ঘর-সংসার। বিনিময়ে কবিতাও তাকে অপার ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছে। কবিতার সঙ্গে ওবায়েদ আকাশের পথচলা এখনো থেমে যায়নি। তার মনের কাব্য ভাবনা এখনো সজীব। এখনো তিনি নানা পরিকল্পনা সাজান কবিতাকে ঘিরেই। কালের বিচারে ওবায়েদ আকাশ নব্বইয়ের দশকের কবি। যদিও কবিতার কাল বিচার তিনি অর্থহীন মনে করেন। তার মতে, কাল বিচার করে কেউ কবিতা লেখে না। একজন কবি একাধিক কাল জুড়ে সক্রিয় থাকেন, কবিতা লিখে যান। সুতরাং কবিকে কালের ফ্রেমে বন্দি করা যায় না। এটা তার প্রতি এক ধরনের অবিচারও। নব্বইয়ে লেখালেখি শুরু হলেও ওবায়েদ আকাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। এবং এ পর্যন্ত তার মৌলিক কবিতার বইয়ের সংখ্যা ২৮।

নব্বইয়ের দশকে আঙ্গিক এবং প্রকরণগতভাবে বাংলা কবিতায় একটা পরিবর্তন আসে, যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। ওই দশকের শেষের দিকে এবং বলা যায়, নব্বইয়ের শুরু থেকেই নতুন কাব্য ভাষার একটা জোয়ার সৃষ্টি হয়। ওবায়েদ আকাশের কবিতাও সেই জোয়ারের বাইরে থাকেনি। কর্ম উপলক্ষে, জীবিকার টানে ওবায়েদ আকাশ গ্রাম ছেড়ে রাজধানী ঢাকা এসেছেন।

“রূপনগর আমার হাত থেকে একদিন কেড়ে নিয়ে গেছে চালতার ব্যাগ। আমার প্রিয় চালতাফুল যাকে বড় হতে দিয়ে একদিন ছ’টাকায় উঠে পড়ি এই নগরের ট্রেনে” (রূপনগর)।

এই নগরেই তিনি সংসার পেতেছেন। এই শহরের অলি গলিতে তার বিচরণ। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত, সকালের প্রথম আলো থেকে রাতের শেষ অন্ধকার-- তার প্রাত্যহিক জীবনচর্চার প্রতিটি অনুষঙ্গ ঢাকাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি, ওবায়েদ আকাশের কবিতায় প্রায়শই গ্রামীণ জীবনের বর্ণময় চিত্র উঠে আসে। তার শৈশবের স্মৃতি, তার বেড়ে ওঠার প্রতিবেশ তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে, তাকে স্মৃতিকাতর করে।

আমগাছ দীঘিতে ঝাঁপিয়ে পড়ায় পাকুড়পাতা-নাও আর

ডিংগি নায়ে মাছ ধরে ঘরে ফিরে জ্বরের প্রকোপে পড়া--

এসব পুরনো খেলায় মায়াটান উদাস পোশাক পরে

শুয়ে আছে ঘুমের কঙ্কাল খুঁড়ে।

(মায়াটান)

এই স্মৃতিকাতরতায় কবি আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছেন। অতীতের সহজ সরল গ্রাম্যজীবনের হাতছানি এখনো তাকে বিহবল করে। কবি তার সন্তানদের আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর জীবন ভাবনার মাঝেও নিজ আকাক্সক্ষার বীজ বপনের স্বপ্ন দেখেন--

‘এবার মনে মনে ভাবছি যে, তাদের জন্মদাতা পিতার আসনে বসে

এমন কিছু চাইতে পারি : যাতে একটি মাত্র সুইচ টিপলেই

মুহূর্তে ফিরে পেতে পারি ছেলেবেলার হারানো স্মৃতি বিল ঝিল নদী

অকৃত্রিম সবুজ প্রকৃতি থেকে ঝড়বাদল আউল বাউল জারি সারি গান।’

(এক প্রকার চাওয়া)।

‘পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর’ কাব্যগ্রন্থের ‘সম্পাদকীয় নোট’ কবিতায় কবি প্রবলভাবে ফিরে গিয়েছেন তার শৈশবের স্মৃতি জড়ানো সুলতানপুর গ্রামে। আগেই বলেছি কর্মপোলক্ষে কবি গ্রাম থেকে বহু দূরের রাজধানী শহরে অবস্থান করেন। কিন্তু এই শারীরিক দূরত্ব কবিকে তার বেড়ে ওঠার গ্রামীণ নিসর্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে নাই।

‘কৃষ্ণচূড়ার বেদিতে যখন

একক বক্তৃতা দিতে দাঁড়াতাম

প্রগাঢ় নিস্তব্ধতায় শ্রোতা হতো

ভাতশালিক-দোয়েলের অঢেল কথকতা’

(সম্পাদকীয় নোট)

অথবা

‘বৃক্ষপত্রে-বাকলে পত্রিকার শিরোনাম হতো

কানকুয়োর কানকথা, ডাহুকের প্রসব বেদনা’

(প্রাগুক্ত)

কবির সমস্ত চেতনাজুড়ে তার ফেলে আসা দিনের অনুরণন ধ্বনিত হয়। তার শৈশবের আনন্দঘেরা নির্মল দিনগুলো তাকে হাতছানি দেয়। তার এই স্মৃতি কাতরতার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে সুলতানপুর গ্রাম, যেখানে তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। সুলতানপুর কবি ওবায়েদ আকাশের জীবনকে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই গ্রামকে নিয়ে তিনি একটি পূর্ণ কাব্যগ্রন্থই লিখে ফেলেন (পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর, প্রথম প্রকাশ, ২০২০)। প্রত্যেকদিন নতুনরূপে সুলতানপুর তার মানসপটে উদ্ভাসিত হয়। তিনি যেন প্রতিদিন তার কল্পরাজ্যে সুলতানপুরের অমিয় রূপ সৌন্দর্যের চিত্র অংকন করে চলেছেন। সুলতানপুরকে ঘিরে কবির এই যে আনন্দ মুখরতা, এই যে স্মৃতিময়তা, এই যে অসীম ভালোবাসা-- এই সব কিছুকে ছাপিয়ে অন্যরকম এক বেদনার ছায়া আমরা দেখতে পাই কবির হৃদয়ে। কবির শৈশবের কুমার নদ একসময় স্রোতস্বিনী ছিলো। কিন্তু আজ তা মৃতপ্রায়। কুমার নদের বর্তমান রূপ দেখে কবি ব্যথিত। কবির বেদনাসিক্ত উচ্চারণ:

‘অথচ কতকাল হলো কুমারের স্রোতে ডুব দিয়ে

নলখাগড়ার ঝোঁপে আটকে যাবার খেলা খেলে না কেউ

পৃথিবীতে স্রোতের স্তব্ধতার মতো

ভয়াবহতা আর কী হতে পারে!’

(এলিজি: প্রিয় কুমার নদ)

কবি ওবায়েদ আকাশের দৃষ্টি শুধু অতীতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান সময়ে তার চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলিও তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সমাজের নানা অনিয়ম, অসুন্দর কবির মানসপটে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কবি ঘটনার গভীরে প্রবেশ করে তার অন্তর্নিহিত সত্যকে খুঁজে পেতে চান। মানুষের সংগ্রামী জীবন, বেঁচে থাকার যুদ্ধ এবং সর্বোপরি সমাজের বিদ্যমান বৈষম্য কবিকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। কৃষ্ণকমল নামের একটা ছেলে, রিক্সার প্যাডেলে ঘোরে যার ভাগ্যের চাকা, তার দৈনন্দিন জীবনচক্রের একটি চিত্র তার কবিতায় উঠে এসেছে এভাবে--

`কমল, তার এই নাম থেকে বাজারের দূরত্ব যতটা

ততদূর, কোমরে গুটানো সুতো

এক এক করে খুলছে

আর কষে বাঁধছে ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের গ্রীবা

আর তা, যেহেতু ছিঁড়ে পড়ছে ঝড়ে

কমল, চিৎকার করে হাসছে’

(কৃষ্ণকমল)

সংবেদনশীল মন নিয়ে কবি শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বের ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করেন। পুঁজিবাদ আর রাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী মোড়লেরা দেশে দেশে স্বৈরতন্ত্রের জাল বিস্তার করে অসহায় মানুষকে শোষণ করে চলেছেন। নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠ ধারণ করে কবি বলেছেন--

`আর আমার বর্ণ ও বৈশ্বায়ন নিয়ে

পৃথিবীতে পতিত রাজতন্ত্রের নায়কেরা, যারা

অন্যায্যই প্রশ্ন তুলেছিল

আর ঝুম ঝুম প্লাবনের তোড়ে ঝরে পড়েছিল

পৃথিবীতে স্বৈরতন্ত্রের নুন’।

(বর্ণ ও বৈশ্বায়ন)

বাংলাদেশের কিশোরী মেয়ে ফালানীকে হত্যা করে একদা সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। আইন, বিধির দোয়াই দিয়ে দিনের পর দিন ফালানীর লাশ কাঁটাতারে ঝুলে ছিলো। এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে কবি ফালানীর প্রতি প্রবল মমতা অনুভব করেন। কবির মমতামাখা আর্তির হৃদয়স্পর্শী একটি চিত্র ফুটে উঠেছে নিম্নোক্ত পংক্তিমালায়:

`প্রতিদিন একা গভীর রাতে পিঁপড়ে হয়ে কাঁটাতারে উঠি

ফালানীর মৃতগলা চোয়ালে কপালে চুমু খেতে খেতে

কানে কানে বলি সে তার মায়ের বকুনি খেয়ে পিছুডাক উপেক্ষা করে

প্রতিদিন সীমান্তে আসতো কিনা’

(রংতামাশায় উপেক্ষিত ফালানীর বিচার)

সাড়া জাগানো আরেকটি ঘটনার কথা আমরা জানি। আমেরিকার মিনেসোটা শহরের শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ পেরি ফ্লয়েডকে গ্রেপ্তার করার সময় মাটিতে শায়িত করে হাঁটু দিয়ে গলা চেপে ধরে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখে। এভাবে চেপে ধরে রাখায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ফ্লয়েড মারা যান। ফ্লয়েডের মৃত্যু বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেয়। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওবায়েদ আকাশ “কাঁদো কন্যা” কবিতাটি রচনা করেন। এই কবিতায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বর্ণবাদী বৈষম্যের বিরুদ্ধে কবি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। ফ্লয়েডের মাত্র ছয় বছর বয়সী কন্যা বলেছিল, “তার বাবার মৃত্যু পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে।” ফ্লয়েড-কন্যার এই উক্তির প্রেক্ষিতে কবির উচ্চারণ--

‘কাঁদো শিশু, কাঁদো; মনে রেখো ফ্লয়েড-কন্যা তুমি

এ জগত দেখুক তোমার বুক গর্বে উঁচু হতে হতে ছুঁয়েছে আকাশ!

তোমার কান্নার প্রতিটি অশ্রুকণা হোক মারণাস্ত্রের চেয়ে তীব্রতর বারুদ’

(কাঁদো কন্যা)

কবি ওবায়েদ আকাশ শৈশবেই তার মাকে হারান। ফলে তিনি আশৈশব মায়ের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত। মায়ের সঙ্গে একেবারে শিশুকালের কিছু স্মৃতিই তার বর্তমানের সম্পদ। মায়ের ভালোবাসা না পাওয়ার বঞ্চনায় তার একমাত্র সান্ত্বনা মায়ের কবর। মায়ের কবরের কাছে গিয়ে তিনি যেন মায়ের স্পর্শ অনুভব করেন। পৃথিবীতে মায়ের শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও কবির হৃদয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ তিনি। “নকশি কাঁথায় তুলেছিলে জাতকের মুখ”, ২০২৩ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থের সব কবিতাই মাকে নিয়ে রচিত। এই কবিতাগুলোর ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে মায়ের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা:

`জানি যে মায়ের প্রতিটি কথা কিংবা

একটি বাক্যাংশও আমার স্মরণে থাকবার কথা নয়

কিন্তু তার কবরের পাতাবাহার ও শেফালী ফুলেরা

প্রত্যহ নিয়ম করে

বিচিত্র রং ও গন্ধ পাঠিয়ে থাকে--’

(প্রাকৃতিক সত্য)

“সুলতানপুর, ১৯৭৭” কবিতায় কবি অনুভব করেন তার মা এই পৃথিবীতে শারীরিকভাবে হয়তো নেই, কিন্তু কবরে শুয়ে থেকেও তিনি সংসারের যাবতীয় অনুষঙ্গে মিশে আছেন। এমনকি ঘুমের মধ্যে মা বলে চিৎকার দিলে তিনি বুকে টেনে নেন। বাড়ির প্রতিটি গৃহকোণে যেন তার অবাধ যাতায়াত। কবির ভাষায় :

`মা আমার কবরের গভীরে শুয়ে ঘ্রাণ নিতে নিতে

বাড়িভর্তি আলো হাওয়ায় একাকার হয়ে যান।’

(সুলতানপুর, ১৯৭৭)

কবি ওবায়েদ আকাশ একজন সংবেদনশীল মানুষ। তবে কোনো গণ্ডিবদ্ধ অভিধায় তাকে চিহ্নিত করা যায় না। কবিতায় জীবনকে তিনি পরিপূর্ণভাবে দেখতে চেয়েছেন। যেসব বিষয়, ঘটনা তার জীবনকে প্রভাবিত করেছে, জীবনে ধরা দিয়েছে-- কোনো কিছুকেই তিনি উপেক্ষা করেননি; কলমের শৈল্পিক আঁচড়ে অংকন করেছেন তার নিজস্ব ভাষ্য। তার জীবন দৃষ্টিতে কোনো ফাঁকি নেই, শঠতা নেই। মননের বিশুদ্ধ কণ্ঠস্বরে তিনি উন্মোচন করে চলেছেন জীবনের অন্তর্নিহিত সত্য।

ওবায়েদ আকাশের প্রেমের কবিতাগুলোতে একজন নিষ্ঠাবান প্রেমিকের সন্ধান মেলে। প্রেমকে জয় করতে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারেন, যার প্রমাণ পাওয়া যায় নিম্নোক্ত উচ্চারণে--

‘ভাবছি, ভোরবেলা গাছের গুঁড়ি ফেলে

পৃথিবীর বন্দর-নগর-রাজপথ-গলি স্তব্ধ করে দেবো

তুমি চাইলেই কেবল মুক্ত করে দেবো অকাতরে খরস্রোতা নদী।’

(আর চাইবো না)

অন্যদিকে রোমান্টিকতায় ভরপুর প্রেমিকের মন। কবি বলেন--

‘মনে পড়ে বকুল ফুল তুলতে এসে

সাদা সাদা নখগুলো ধরতে দিয়েছিলে’

(একবার, নদীতীরে)

অথবা

‘এখনো শেয়ালের পশমের মতো কোমল আর

ঝরঝরে তোমার মন।’

(প্রাগুক্ত)

‘বৃষ্টি, বকুল ও আমাদের কথা’ কবিতায় একজন দুরন্ত প্রেমিকের দেখা মেলে যিনি প্রেমিকার জন্য ফুল আনতে সমুদ্র পাড়ি দিতে দ্বিধা করেন না:

‘আমার সারা শরীর তন্ন তন্ন করে খুঁজে

হলুদ পাঞ্জাবির পকেটে পাওয়া একটা শুকনো চ্যাপ্টা

বকুল ফুল তার হাতে দিয়ে বলি:

এতদঞ্চলে বকুলের চারা রোপণে নিষেধাজ্ঞা হেতু

একবার সমুদ্র পাড়ের পুজোঘর থেকে ফুলটি হাতিয়ে নিয়েছিলাম’

(বৃষ্টি, বকুল ও আমাদের কথা)

কবি ওবায়েদ আকাশ একজন পরিপূর্ণ কবি। নানাভাবে এবং ভাষ্যে তিনি কবিতায় তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন। যেমন নিরেট গদ্য আঙ্গিকে বিভিন্ন কবির কবিতার নাম ব্যবহার করে এক ভিন্ন ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন, “প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়” (২০১১)। এটি কবির প্রিয় বত্রিশজন কবিকে নিয়ে রচিত কাব্যগ্রন্থ। এর মধ্যে কবির ভাষায় দুইজন রয়েছেন রাজনীতির কবি; একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আরেকজন কার্ল মার্কস। কবি আবুল হাসানকে নিয়ে লেখা এরকম কবিতার নাম-- ‘জাতিসংঘের মরচেধরা চাবির জন্য কবি আবুল হাসানের কোনোই দুঃখ ছিল না’ কবিতার এক অংশে কবি বলছেন-- ‘রাজা যায় রাজা আসে আর আমাদের মাঠভর্তি ধানক্ষেত দীর্ঘকাল অরক্ষিত থেকে এবার বানের জলে ভাসে। যে তুমি হরণ করো তার টিকিটি ধরে একবার পচাডোবা এঁদো পুকুরের জলে নিক্ষেপ করে প্রশান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেবেছিলে-- এইবার দীর্ঘদিন তোমার লক্ষ্মী বোনটিকে নিরুপদ্রবে লাল শাড়িতে মানিয়ে নিতে পারবে বৈকি! অথচ তার নগ্ন নিমিত্ত দেখো: একদিন তোমার নিজের চিবুকের কাছেও ভীষণ একা হয়ে গেলে।’

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়েও এরকম কবিতা আছে। একই নিয়ম অনুযায়ী শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাগ্রন্থের নাম ব্যবহার করে গভীর অর্থময়তাসমৃদ্ধ কিছু রূপকল্প পাঠকের সামনে তিনি উপস্থাপন করেন। যেমন--

‘এমন প্রচ্ছন্ন স্বদেশ-- কেবল পাতালে টেনেছে বলে-- যারা ভাববার শুধু ভাবে-- ভাত নেই, পাথর রয়েছে কেবল-- এই দেশে তবু কবিতার তুলো ওড়ে? আর যারা আনন্দের বিহবল ঘোড়ায় চড়ে বলে, সুখে আছি, ছিন্ন বিচ্ছিন্ন আছি-- তারা তো সেই-- যারা ধর্মেও থাকেন জিরাফেও থাকেন’

কবি ওবায়েদ আকাশের আরেকটি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কাজ ‘বিবিধ জন্মের মাছরাঙা’ (২০১৩)। একক বিষয়ের উপর একটি দীর্ঘ কবিতা নিয়ে সম্পূর্ণ একটা বই। গ্রন্থটি আলাদাভাবে বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। কারণ এরকম কাজ বাংলা সাহিত্যে বিরল না হলেও সংখ্যায় খুবই অল্প। গ্রন্থটিতে কবির শৈল্পিক শক্তিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো ‘কাগুজে দিন, কাগুজে রাত’ (২০২২)। এই গ্রন্থের সবা কবিতাই মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা। কবিতার ছন্দ নিয়ে কবি যে গভীরভাবে সচেতন, এই গ্রন্থ তার প্রমাণ।

কবি ওবায়েদ আকাশের কবিতা তার বিশুদ্ধ মননের ম্যানিফেস্টো। তার কবিতা সংখ্যায় বেশি হলেও কবিতার মানের প্রশ্নে তিনি আপোসহীন। কবিতার বক্তব্যকে এগিয়ে নিতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি চিত্রকল্পের ব্যবহার করেছেন। চারপাশের চেনা পরিমণ্ডল থেকে এইসব চিত্রকল্প আহৃত হওয়ায় পাঠক সহজেই তার রসাস্বাদন করতে পারেন। তার বিশাল কাব্য ভাণ্ডার থেকে আমরা কিছু চিত্রকল্পের উদ্ধৃতি দেবো:

উদ্ধৃতি (১):

‘যখন সাঁকোর কম্পন দেখে বুঝে নিতাম

মাছেদের হৃদপিণ্ডের ধ্বনি, স্রোতের প্রভাহ দেখে মনে হতো

ভেসে যাচ্ছে সম্রাট দারায়ুস কিংবা স্কাইলাস্কের অধিকৃত রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ।’

(প্রকৃতিপুত্র)

উদ্ধৃতি (২):

পথে নামলেই দূরত্ব কমে যায়

ধ্যানমগ্ন সিদ্ধার্থের পরমায়ুর ঘ্রাণে

পল্লবিত মহুয়া বৃক্ষটি জানে বুদ্ধের নির্বাণ প্রার্থনা

(পথে নামলেই দূরত্ব কমে যায়)

উদ্ধৃতি (৩):

‘আমার লাশ কাঁধে তুলে কেউ তারা

রাজতন্ত্রের ক্লান্ত গাধাটির মতো

গড়িয়ে পড়ছিল তলে।’

(বর্ণ ও বৈশ্বায়ন)

উদ্ধৃতি (৪):

‘বাগানে ফুল ফোটার কেনো স্বগতোক্তি নেই

অথচ ঝরে পড়ার আছে করুণ মর্মর ধ্বনি।’

(ফুল ফোটার কোনো স্বগতোক্তি নেই)

উদ্ধৃতি (৫):

চলো খোলা প্রান্তরে বাতাসের সৌন্দর্য ঘেঁষে

ফেলে রেখে আসি অনুদ্ধারিত মাটির বেদনা।

(অনুনয়হীন)

উদ্ধৃতি (৬):

‘আমি এক মৃত নগরের শব

কাঁধে করে নিয়ে যাই পারস্য শহরে

যেতে যেতে কেউ দেখে, হালখাতা এসে গেছে

আমারও রয়েছে কিছু কারবারি দেনা।’

(হালখাতা)

উদ্ধৃতি (৭):

‘একবার আড্ডাচ্ছলে তিনি বিউটি বোর্ডিংয়ের সুউচ্চ ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে দেখতে চেয়েছিলেন-- সদ্যমুক্ত বাঙালির পায়ের নিচের দাঁড়াবার জায়গাটুকু কতটুকু শক্ত হতে পেরেছে; আর ধুঁকে ধুঁকে মরে যাওয়া এক পতিতার লাশ দীর্ঘক্ষণই শহীদ মিনারের খোলা চত্বরে রেখে বুঝতে চেয়েছেন আমাদের চেতনার বিধ্বস্ত নীলিমা আজ কতটা সুসংহত।’

(কবি শামসুর রাহমান তার সমস্ত কবিতা একজন মুক্তিযোদ্ধাকেই নিবেদন করে যেতে পারতেন)

উদ্ধৃতি (৮):

‘সরপুঁটির কানকোর ভেতর উঁকি মেরে দেখে নেবো-- দুই পাড়ের যৌথ জীবন’

(এলিজি: প্রিয় কুমার নদ)

উদ্ধৃতি (৯):

তুমিও নদীর মতো বদলে যেতে পারো

উদর স্ফীত করে ফেটে যেতে পারো

ক্রন্দসী ব্যাংগের মতো।

(তুমি যা যা পারো)।

উদ্ধৃতি (১০):

আজকাল নদীতীর ধরে হাঁটতে গেলে ইলশেমাছ

গায়ে উঠে আসে। পরিচিত মানুষের মতো কাশবন আর

সাম্প্রতিক দুঃখের মতো চিরতরুণ মেঘ। দেখে দেখে একবার

এই নদী তীরে, তুমি-আমি কান্না ধুয়েছিলাম, মনে পড়ে?

(একবার, নদীতীরে)

কবি ওবায়েদ আকাশ নানাভাবে বাংলা কবিতায় অবদান রেখে চলেছেন। তিনি যেটা বিশ্বাস করেন তা প্রকাশে কখনো আপোস করেন না। কবিতায় তিনি তার নিজস্ব একটা স্বর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে সহজেই তার কবিতাকে শনাক্ত করা যায়। এবং একজন কবির জন্য এটা অত্যন্ত বড় একটা অর্জন।

‘প্রবন্ধ’ : আরও খবর

সম্প্রতি